Published : 02 Apr 2026, 09:12 AM
সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের কর্মীদের প্রতি, এমনকি আমাদের বামমহলেও, শ্রদ্ধাবোধের পরিমাণ কিছুটা কম। মনে করা হয়, সাংস্কৃতিক কর্মীরা দ্বিতীয় সারির যোদ্ধা। যদিও তাত্ত্বিকভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া যে কোনো বিজয়ই অর্থহীন ও অসম্পূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের উপমহাদেশে এই মনোভঙ্গি বাস্তবে কখনোই প্রযুক্ত হয়নি। আইপিটিএ, প্রগতি লেখক সংঘ, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, রণেশ দাশগুপ্ত, সোমেন চন্দ, সত্যেন সেনদের আবির্ভাবও এই মনোভঙ্গি পুরোটা পাল্টাতে পেরেছে, এমনটি নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাবে না। সাংস্কৃতিক কর্মীদের মনে করা হয় বুদ্ধিজীবী। আর বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সবসময়েই সকল বাম ঘরানার সংগঠনের নেতারা অল্পবিস্তর অস্বস্তিতে ভোগেন। বুদ্ধিজীবী বলতে পার্টি নেতারা কামনা করেন মূলত প্রোপাগান্ডিস্ট কর্মী। পার্টিনেতৃত্বকে প্রধানত ব্যস্ত থাকতে হয় তাৎক্ষণিকতা নিয়ে। সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের কথা বারংবার বলা হয় বটে। কিন্তু চিরকালই দেখা গেছে সেই ‘সুদূর’ আসলে খুব বেশি দূর নয়। পক্ষান্তরে সাংস্কৃতিক কর্মী এবং চিন্তক সবসময়ই দূর ভবিষ্যৎকে সামনে নিয়ে কাজ করেন। তার কাজ মানুষের মনোজগতে যে উপনিবেশ, যে পশ্চাৎপদতা শিকড় গেড়ে বসে আছে, তাকে উৎপাটন করা। সাংস্কৃতিক আন্দোলন তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফল এনে দেয় না। তাৎক্ষণিক কোনো ফলাফলে বিশ্বাসও করে না। সেই কারণে এই আন্দোলনের ফলাফল তেমনভাবে দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু এই আন্দোলনের বা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতি এবং দুর্বলতা সমাজকে ও প্রগতিশীল রাজনীতিকে যে কতখানি পিছিয়ে দেয়, আজ মৌলবাদের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে জাতি তা মর্মে মর্মে অনুভব করছে।
অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ সংস্কৃতির শক্তি সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিবহাল, এবং তাকে কাজে লাগানোর জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসরমান। তারা সাধারণ মানুষকে সুস্থ সংস্কৃতির পরিবর্তে ‘পপুলার সংস্কৃতি’ এক বিশেষ জিনিসে ডুবিয়ে রাখার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছিল সেই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমলে। এটিকে এককথায় বলা যায় বিশেষ ধরনের ‘সংস্কৃতি কারখানা’। হর্কহেইমার এবং অ্যাডোর্নো এই নামেই অভিহিত করেছেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই প্রক্রিয়াকে। সংস্কৃতিকে সাধারণভাবে কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপরীতধর্মী হিসাবে ও ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিভিন্ন ধরনের মানবিক মূল্যবোধের স্পন্দনকে ব্যাপ্ত করে তোলে। ‘সংস্কুতি কারখানা’ সুস্থ সংস্কৃতিকে প্রতিহত করে, এবং গড়ে তোলে একটি ‘নিস্ক্রিয় সাংস্কৃতিক ভোক্তাশ্রেণী।’ এই ভোক্তাগোষ্ঠীর চেতনার জগৎ পলায়নবাদী বিনোদনের আবর্তে আবর্তিত হতে থাকে, শাসকশ্রেণীর আধিপত্যকামী মতাদর্শের জারকরসে জারিত হতে থাকে। সংস্কৃতি কারখানা যে গণ-প্রতারণার প্রক্রিয়া বানিয়ে তোলে- তা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান মিথ্যা প্রতারণা ও কারচুপির সঙ্গেই তুলনীয়।
সংস্কৃতি কারখানায় কী পণ্য উৎপাদিত হবে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়। অ্যাডোর্নো দেখিয়েছেন যে, এই কারখানায় নির্মিত শত-সহস্র চলচ্চিত্র নির্দিষ্ট ফর্মুলা মেনে চলে। সিনেমার শুরু থেকেই এটা বোঝা যায় ছবিটি কেমনভাবে শেষ হবে এবং কে পুরস্কৃত হবে, কে শাস্তি পাবে, কাকে ভুলে যাওয়া হবে। সঙ্গীত এমনভাবে লিখিত ও সুরারোপিত হবে যে শ্রোতা প্রথম কলিটি শুনলেই বুঝতে পারবে এরপরে কী আসছে। তখন সে নিজেকে বোদ্ধা ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করবে। এইভাবেই ছোটগল্পের আয়তন কতটুকু হবে, উপন্যাস কী কী ধারণ করবে তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সংস্কৃতি কারখানার চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখেই ঠাট্টা, হাসি, মস্করা, করুণরস কোথায় কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তারও পরিমাপ করে দেওয়া হয়। সংস্কৃতি কারখানায় কোনোকিছুই স্বতঃস্ফূর্ত নয়। এই উৎপাদন প্রক্রিয়া অফিসে বসে নিয়মিত নিয়মিত বাঁধাধরা কাজের মাধ্যমে ও নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলার মাধ্যমে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। উচ্চাকাঙ্ক্ষী গীতিকারদের নির্দেশ দেওয়া হয় যে তাদের সুর ও বাণী যেন নির্দিষ্ট ফর্মুলার বাইরে না যায়। জনপ্রিয়তার বিচারে সফল গানগুলিকে অনুসরণযোগ্য মান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাদের ফর্মুলাকে অনুকরণযোগ্য মনে করা হয়। এমন যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সফলতার কারণেই গান, চলচ্চিত্র, উপন্যাস, কবিতা, সমালোচনা, নাটক, চিত্রকলা- ইত্যাদি সবকিছুই একটি বৃহৎ যন্ত্রের বিভিন্ন অংশে পরিণত হয় এবং পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করতে থাকে। এই সমস্ত কারখানা-নির্মিত শিল্প ভোক্তাদের চিত্তবিক্ষেপ ঘটায়, কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তোলে এবং পৃথিবীতে তার যথার্থ অবস্থান খুঁজে পেতে বাধা সৃষ্টি করে।
আমরা আমাদের দেশে এখন ঠিক এইরকমই এক মারাত্মক ও ভয়াবহ ‘সাংস্কৃতিক বাস্তবতা’র মুখোমুখি।
এইরকম পরিস্থিতিতে আমরা সত্যেন সেনকে স্মরণ করতে যাচ্ছিই বা কেন?
কারণ সত্যেন সেন, এমনটি যে ঘটতে পারে, সেই আশংকা অনুভব করেছিলেন অনেক আগে। শুধু তা-ই নয়, এই রকম অবস্থা যাতে না ঘটে, তার জন্য পূর্ব প্রতিরোধের চেষ্টাও করেছেন সর্বতোভাবে। বক্তৃতা বা হালের টক-শো বা জনসভা যে এই ধরনের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতিকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম নয়, সেটাও তিনি বুঝেছিলেন অনেক আগে। বুঝেছিলেন, জনগণকে তার নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে সংলগ্ন করে দিতে পারলে সেই সংস্কৃতি-বলীয়ান জনগণই কেবল পারবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ঠেকাতে। একমাত্র তাহলেই সম্ভব মৌলবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করা, এবং নতুন সমাজ নির্মাণ করা।
সেই কারণেই সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা, সেই কারণেই সত্যেন সেনের লেখালেখি। তিনি এটাও বুঝেছিলেন যে নিজের দেশের তো বটেই, পৃথিবীর যেখানে যত প্রগতিশীল-সাংস্কৃতিক উপাদান রয়েছে, সবটুকু আত্মস্থ করে নিজেদের শানিত করা প্রয়োজন। পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো কালে, যে কোনো ভাষায়, যে কোনো সম্প্রদায়ে জন্ম নেওয়া মানুষ- যিনি মানুষকে আরো বেশি মানুষ হয়ে উঠতে অবদান রেখে গেছেন, তাঁর সাথে স্বদেশবাসীর পরিচয় ঘটিয়ে দেওয়ার কাজটিকেও সত্যেন সেন তাঁর সাংস্কৃতিক-শৈল্পিক-রাজনৈতিক দায়িত্ব হিসাবেই গণ্য করেছেন। এই কাজ করতে গিয়েই তিনি আরো অনেক মনীষার সঙ্গে খুঁজে পেয়েছেন আল বেরুনীকে।
০২.
আল বেরুনী আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেরাচ্ছেন। জন্মভূমি খারিজম থেকে তিনি চলেছেন জুরজানের দিকে। দরকার আশ্রয়। আশ্রয় দরকার জীবন বাঁচানোর জন্য, মাথার ওপর আচ্ছাদন আর তিনবেলা খাদ্যের জন্য, এবং সর্বোপরি জ্ঞানচর্চার জন্য। সে আশ্রয় তিনি কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে খোঁজেন না, কোনো শহরে খোঁজেন না, কোনো কর্মীদলের কাছে খোঁজেন না। তিনি খোঁজেন রাজদরবারের আশ্রয়। শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তব। অন্তত সেকালের প্রেক্ষিতে। জ্ঞানচর্চাভিন্ন অন্য কোনো কাজ শেখেননি আল বেরুনী। তার মতো অন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকারীরাও জীবন কাটাতেন একই ভাবে। বিনিময়ে তাদের বাস করতে হতো রাজসভা বা দরবারের শোভা হিসাবে। খুব প্রচ্ছন্নভাবে জানা যাচ্ছে যে জুরজানে আল বেরুনী কিছু শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। কিন্তু সেটি কোনো মাদ্রাসা বা বিশ্ববিদ্যালয় কি না তা বলা যাচ্ছে না। ইমাম গাজ্জালীর ক্ষেত্রে বা আরো অনেক আলেমের ক্ষেত্রে এটি নিঃসংশয়ে জানা যায় যে তারা নিযামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন জীবিকার জন্য, তেমনটি নিশ্চিতভাবে জানা যাচ্ছে না আল বেরুনী সম্পর্কে। অন্তত সত্যেন সেনের গ্রন্থ থেকে নয়। অথচ তাঁকে তীব্র আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন বলে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সত্যেন সেন। হয়তো বাস্তবেও সেরকমই তিনি ছিলেন। কিন্তু পুরোপুরি রাজানুগ্রহে জীবনযাপনের সাথে তার ব্যক্তিত্ব মানায় না কোনোমতেই। সেকালে এটাই ছিল সাধারণ নিয়ম- একথাও সঠিক নয়। কারণ সমসাময়িক এবং তার আগে-পরের অনেক উদাহরণ আমরা পাচ্ছি যারা সুলতান বা খলিফার দরবারে শোভাবর্ধনের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হননি। এই একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকেই যাবে আল বেরুনী এবং তার সাথে উচ্চারিত দরবার-নির্ভর আলেমদের নামের সঙ্গে। এই দিকটি সত্যেন সেনেরও দৃষ্টি এড়ায়নি। তবে তিনি এটিকে বৈধতাই দিতে চেয়েছেন এই বলে যে ব্যাপারটি দ্বিপাক্ষিক- ‘রাজার রাজসভায় কৃতী ও খ্যাতনামা আলেমের অভাব থাকলে সেটা অগৌরবের কথা বলেই গণ্য করা হ’ত। রাজা-রাজড়ারা বাহুবলে শুধু পররাজ্য, পরধন ও পরনারী লুণ্ঠন করে নিয়ে আসতেন তাই নয়, নানা দেশ থেকে আলেমদের ধরে নিয়ে এসে রাজসভার জৌলুস বৃদ্ধি করা হ’ত। এইভাবে এক রাজ্যের জ্ঞানের বাতি অপর রাজ্যে গিয়ে আলো দিত।’
তারপরেও সাধারণ মানুষের প্রশ্নের হাত থেকে রেহাই পাননি আল বেরুনী - ‘জওয়ান মরদ মানুষ তুমি, এমন করে ঘুরে বেড়াও কেন? তোমার পেশা কি? কি কাজ জান তুমি? ভাল মানুষের মত এক জায়গায় থিতু হয়ে বসে তাই কর না কেন? আল্লাহ হাত পা দিয়েছেন খেটে খাবার জন্য। মেহনত না করলে দেনেওয়ালা নারাজ হন। কই তোমাকে তো কোন কাজ করতে দেখি না।’
এই একটি দুর্বলতার কথা বাদ দিলে আল বেরুনী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষীদের পর্যায়ভুক্ত। সেই মনীষা বিজ্ঞানের মনীষা। অতএব সর্বজনীন। এমন মনীষা যে সত্যেন সেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই, তা জানা কথা। আল বেরুনীর জীবনচেতনা ছেঁকে সত্যেন সেন তুলে আনবেন চিরন্তন কিছু উদাহরণ এবং কিছু প্রশ্ন।
আল বেরুনীর সময়কাল, অর্থাৎ একাদশ শতক ইসলামী জগতে জ্ঞানচর্চার সর্বশেষ সুবর্ণযুগ। তাদের অব্যবহিত পরেই নেমে এসেছিল অন্ধকার। গ্রিক-রোমানদের হাত ঘুরে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের মশাল মুসলিমদের হাতে এসে পৌঁছেছিল, তার অবসানের প্রাক-লক্ষণ ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আল বেরুনীর কাছেও। তিনি তটস্থ হয়ে খেয়াল করেছিলেন খারিজমের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের জন্য ব্যাকুলতা মোটেই দেখা যাচ্ছে না। তাহলে একদিন যাদের হাতে জ্ঞানের মশাল তুলে দিযে তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবেন, সেই নতুন মশালবাহীর দল কোথায় পাওয়া যাবে? তরুণদের মধ্যে মূল প্রবণতা হচ্ছে- ‘তারা বেছে বেছে কতগুলি গালভরা শব্দ, দেশী-বিদেশী কতগুলি আলেমের নাম, আর কতগুলি মহাজন-বাক্য কণ্ঠস্থ করে, তারপর নিজেদের বিদ্যা জাহির করবার জন্য জায়গা বুঝে ঝেড়ে দেয়। লোককে তাক লাগিয়ে দেবার মত কিছু কথা শিখে রাখাটাকেই এরা শিক্ষার পরমার্থ বলে মনে করে, তার বেশী জানবার প্রয়োজন এদের হয় না।’
এই প্রবণতা আমাদের খুবই চেনা। কেননা আমাদের দেশে এই একবিংশ শতকে তরুণদের মধ্যে ঠিক একই রকম প্রবণতাই আমরা দেখতে পাই।
আবার সমকালের বেশিরভাগ আলেম নামে অভিহিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে আল বেরুনীর পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- ‘এক পক্ষ গ্রীস, পারস্য, শাম বা হিন্দুস্তানের আলেমরা যে-সব কথা বলে গেছেন, তাকেই একমাত্র সত্য বাক্য বলে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন, তা থেকে একচুল এদিক-ওদিক সরবার সাহস নেই। অপর পক্ষ আরবের মোহে আচ্ছন্ন। তাদের দৃষ্টিতে আরবের যা কিছু সবই ভাল, এখানকার অতীতের আলেমরা যে-সব সিদ্ধান্ত করে গিয়েছেন, তার চেয়ে শুদ্ধতর আর কিছু হতে পারে না।... এইসব আলেমরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে গিয়ে বা কিতাব লিখতে গিয়ে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে এই অন্ধতার বীজ বপন করে চলেছেন।’
খারিজমের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা ডিগ্রির জ্যা পরিমাপের পদ্ধতি নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ মনে করে টলেমির পদ্ধতি সঠিক। আরেক পক্ষ মনে করে যে ইয়াকুব বিন তারিকের পদ্ধতি সঠিক। কিন্তু কেন একটি সঠিক, আর অন্যটা বেঠিক, তা জিজ্ঞেস করলে কেউ-ই কোনো উত্তর দিতে পারেন না। আল বেরুনী এই কাজটিতে ব্যাপৃত ছিলেন বছরের পর বছর। তার দৃষ্টিতে টলেমি এবং ইয়াকুব বিন তারিক- দুজনের পদ্ধতিই ভুল। সেই ভুল তিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন সঠিক পদ্ধতি আবিষ্কার করে। প্রথমোক্ত দুইজনের পদ্ধতি মেনে ডিগ্রির জ্যা পরিমাপ করতে গেলে দশমিকের তৃতীয় স্থান পর্যন্ত বিশুদ্ধ ফল পাওয়া যেত। কিন্তু আল বেরুনীর পদ্ধতি অনুসরণ করলে দশমিকের চতুর্দশ অঙ্ক পর্যন্ত নির্ভুল ফলাফল বেরিয়ে আসে। বিশ্বজুড়ে এখনো আল বেরুনীর পদ্ধতিই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সেই সময় তার এই আবিষ্কারকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে।
আল বেরুনীর অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা হচ্ছে ভারতবর্ষ সম্পর্কে তার শ্রদ্ধা এবং আগ্রহ। যে গণিতশাস্ত্র নিয়ে আরবরা গর্ব করেন, সেই শাস্ত্রের ভিত গড়তে খলিফা আল মামুনের দরবার থেকে সাদর আহ্বান এসেছিল ভারতীয় গণিতজ্ঞ কঙ্ক-র। একথা তো এখন সবারই জানা যে ‘শূন্য’ সংখ্যাটি বিশ্বকে দান করেছে ভারতবর্ষ। কঙ্ক সাড়া দিয়েছিলেন বাগদাদের আমন্ত্রণে, এবং সেখানে স্থাপন করেছিলেন যথার্থ গণিতশাস্ত্রের ভিত্তি। ভারতবর্ষ সেই সময় আরবদের কাছে পরিচিত হিন্দ হিসাবে। আর্যভট্ট, ব্রহ্মদত্ত, কঙ্ক আর বরাহমিহিরের হিন্দ তরুণ বয়স থেকেই আকর্ষণ করে এসেছে আল বেরুনীকে। তাঁর এই দীর্ঘলালিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল গজনীর দিগ্বিজয়ী সুলতান মাহমুদের আনুকূল্যে। তিনি দশ বছর ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে কাটিয়েছেন সেই সময়। শিখেছেন সংস্কৃতি ভাষা। মূল সংস্কৃতি থেকে অনেকগুলি মূল্যবান পুস্তক অনুবাদ করেছিলেন আরবিতে। গজনীতে ফিরে লিখেছিলেন ভারতবর্ষ নিয়ে একটি মূল্যবান গ্রন্থ ‘কিতাবুল হিন্দ’, যা এখন ‘আল বেরুনীর ভারততত্ত্ব’ নামে পরিচিত। তার সমকালীন আরব পণ্ডিতদের কাছে হিন্দ ছিল অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, কাপুরুষ জনগোষ্ঠীর দেশ। কিন্তু আল বেরুনী এই একপেশে মতামত মেনে নিতে পারেননি। হয়তো এখানে এসে তিনি তার প্রার্থীত বা আকাঙ্ক্ষিত যোগ্যতার তেমন কোনো পণ্ডিতের খোঁজ পাননি, কিন্তু দর্শনচর্চায় নিবেদিত অনেক মানুষের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। চার্বাক দর্শনের অনুসারী একজন বস্তুবাদী তাত্ত্বিকের সঙ্গে আলাপে তিনি আপ্লুতও হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার পরিচয় আরবদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টার দ্বারা আল বেরুনী জ্ঞানজগতের এক বন্ধ দরোজা উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন।
মনুষ্যত্বের মৌলিক প্রশ্ন নিয়েও ভেবেছেন আল বেরুনী। কষ্ট পেয়েছেন সুলতান এবং খলিফাদের নিষ্ঠুর শাসনপদ্ধতি দেখে। প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টাও করেছেন নিজের অবস্থান থেকে যতটুকু করা সম্ভব। দাসপ্রথার অমানবিক দিক নিয়ে মনে মনে কেঁদেছেন। তিনি গজনীতে আসার পরে সুলতান মাহমুদ প্রথম যখন হিন্দ অভিযান শেষে রাজধানীতে ফিরলেন, সেবার তিনি নারী-পুরুষ-শিশু মিলিয়ে সাড়ে দশ হাজার যুদ্ধবন্দী সঙ্গে নিয়ে এলেন। এদের সবারই পরিণতি- দাসে পরিণত হওয়া। তাদের দেখে আল বেরুনীর প্রাণ কেঁদে উঠেছিল- ‘হিন্দের কোন সুদূর অঞ্চল থেকে এরা এদের উৎপাটিত করে নিয়ে এসেছে। ওদের ঘর গেছে, ভিটা গেছে, দেশ গেছে, বাপ, মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খরস্রোতে তৃণের মত কোথায় ভেসে চলেছে!’
কিন্তু এই অনুভূতি বেশিক্ষণ লালন করতে পারেননি আল বেরুনী। তার কাছে এই বাস্তবতাও উপলব্ধ হলো যে দাসপ্রথা সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপরিহার্য। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল যত মহান দার্শনিকই হন না কেন, দাসহীন সমাজ ও রাষ্ট্রের কথা কেউ কল্পনাই করতে পারেননি। প্লেটো তো তার ‘আদর্শ রাষ্ট্র’ দাসছাড়া অচল বলেই মনে করতেন। তাদের মতো করেই আল বেরুনী নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন যে ‘দাস-দাসী সমাজে চিরদিনই ছিল, চিরদিনই থাকবে, তাদের মেহনৎ সমাজরক্ষার পক্ষে একান্তভাবে প্রয়োজনীয়। আর দাস-দাসী সংগ্রহ করতে হলে এটাই একমাত্র পথ।’
মহৎ প্রতিভাও অনেক সময় মানবিকতার সব শাখাকে সমানভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। মানবিকতার সূচকের সবগুলির শীর্ষবিন্দু খুঁজে পান না অনেকেই। ইতিহাস তার সাক্ষী। আল বেরুনী অন্তত এই কারণে ধন্যবাদের দাবিদার যে তিনি মাঝে মাঝে আত্মসমালোচনায় মগ্ন হয়েছেন। নিজের এবং নিজের জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন আচরণকে সার্বিক মানবতার মানদণ্ডে বিবেচনা করার চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো নির্মমভাবে বিদ্রুপও করেছেন নিজেকে- ‘বুদ্ধিমান হয়েছি, বিচক্ষণ হয়েছি, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে কাজ করি, বহু অন্যায় নিঃশব্দে হজম করে যাই, উপরওয়ালাদের সহজে চটাতে চাই না, কিছু রেখে কিছু ঢেকে আপোস করে চলি, তাই বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে আছি।’
একসময় যে আল বেরুনী পুরোপুরি নির্ভীকভাবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতেন। পরবর্তীতে আর দাঁড়াতে পারেননি। সেই খেদোক্তিও নিজে নিজেকে শুনিয়েছেন- ‘শুদ্ধই হোক আর ভুলই হোক, যাকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছি, তাকে নিঃসংকোচে আর নির্ভয়ে প্রকাশ করেছি। আর আজ আমি সুপ্রতিষ্ঠিত, সুযোগ-সুবিধার সমস্ত দুয়ার আমার সামনে খোলা। কিন্তু আমার পদে পদে ভয়। আমার পদ, আমার মান সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি আর আমার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে আগলে চলবার জন্য আমাকে হিসেব করে পা ফেলতে হয়।’
এখন আমরা নিঃসন্দেহ, সত্যেন সেন বেছে নিয়েছিলেন আল বেরুনীকে, আল বেরুনীর মুখ দিয়ে নিজের যুগের জন্য প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলিয়ে নেবার জন্য। আল বেরুনীর জীবন এবং মননকে এই উদ্দেশ্যের সাথে পুরোপুরি মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন তিনি।
০৩.
একথা প্রায় সকলেরই জানা যে লেখালেখি সত্যেন সেনের জীবনের মূল কাজ ছিল না। মূল লক্ষ্য ছিল সমাজবিপ্লব। তিনি প্রথাগত অর্থে লেখক ছিলেন না, বুদ্ধিজীবী ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। সক্রিয় লেখালেখি শুরু করেছিলেন ৪৮ বছর বয়সে। জেলবাসের সময়। অবশ্য ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কৃষক আন্দোলনের সংগঠক-নেতা হিসাবে কাজ করার সময় অনেক গণসঙ্গীত রচনা করেছেন। প্রগতি লেখক আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। কিন্তু তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয় অনেক পরে। ১৯৫৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তার লেখা ‘মহাবিদ্রোহের কাহিনী’। বয়স তখন পঞ্চাশ বছর। ১৯৬৯ সালে একই সাথে প্রকাশিত হলো তার লেখা ৬টি বই। ১৯৭০ সালে ১১টি, আর ১৯৭১ সালে ৩টি। বোঝাই যাচ্ছে ততদিনে তিনি পরিপূর্ণ লেখকসত্তা নিয়ে আবির্ভূত। কিন্তু তখনো তার মূল লক্ষ্য সাহিত্যিক-খ্যাতি নয়- সমাজবিপ্লব। লেখালেখিকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেই বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি হাতিয়ার হিসাবে। কিন্তু নিজের ইচ্ছা থাকুক আর না থাকুক, তিনি দেশের মানুষের কাছে পরিগণিত হলেন সত্যিকারের লেখক এবং সত্যিকারের বুদ্ধিজীবী হিসাবে। আর প্রথাগত লেখক-বুদ্ধিজীবীদের সাথে জনগণের বুদ্ধিজীবীর একটি ফারাক তিনি তৈরি করে ফেললেন নিজেকে উদাহরণ হিসাবে খাড়া করে।
এটাই সত্যেন সেনের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। প্রথাগত বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে জনগণের বুদ্ধিজীবীর (প্রকৃত বুদ্ধিজীবী) পার্থক্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া।
প্রকৃত বুদ্ধিজীবী তিনিই, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের আওতা থেকে মুক্ত তথা স্বাধীন কোনো চিন্তাশীল মানুষ যিনি প্রয়োজনে গরিষ্ঠ জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও তার বিশ্বাসমতো সত্যভাষণের সাহস ও স্পর্ধা রাখেন।
বুদ্ধিজীবীর এই বিশেষ সংজ্ঞাটি মুখ্যত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ঠান্ডা লড়াই, উপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী অবিরাম যুদ্ধপ্রবাহ, পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্ক ইত্যাদির মধ্যে গড়ে উঠে ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুব ও ছাত্র বিদ্রোহের বিস্ফোরণের মধ্যেও অর্থবহ ছিল। এই কালসীমার মধ্যেই জুলিও কুরি, বারট্রান্ড রাসেল, জাঁ পল সার্ত্র, প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন। তাদের এক-একটি আচরণ, এক-একটি বিবৃতি, এক-একটি প্রতীকি আচরণ পর্যন্ত জনগণের বিবেককে তাড়িত করেছে। যেমন ১৯৭০ সালে প্যারিসের রাস্তায় মাওপন্থী পত্রিকা ‘লা ক্লোজ দ্যু প্যপল’ ফেরি করতে গিয়ে সার্ত্র-এর গ্রেপ্তার বরণ এক নতুন প্রতিবাদী মাত্রায় উন্নীত করেছিল আন্দোলনকে।
আমাদের দেশে এমন কোনো একক যোদ্ধা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আবির্ভূত হননি। তবে সেই একই চেতনার ধারক স্বল্পসংখ্যক মানুষকে আমরা পেয়েছি। যেমন সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, আহমদ শরীফ। এরাই প্রথাগত সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীদের সাথে প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন আমাদের সামনে। সমাজজীবনের বাস্তব কাঠামোগুলির মধ্যে প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষা ও তাদের বিকাশের সঙ্গে এই প্রকৃত বুদ্ধিজীবীদের সাযুজ্য থাকতে হবে। সমাজবিকাশের এই কালপর্বে বুদ্ধিজীবীদের অস্তিত্ব আর কেবল বাগ্মিতার উপর নির্ভরশীল থাকতে পারে না, কারণ বাগ্মিতা অনুভূতি ও আবেগকে বাইরে থেকে নাড়া দিতে পারে মাত্র। প্রকৃত বুদ্ধিজীবীকে সরাসরি বাস্তব জীবনে অংশগ্রহণ করতে হবে, কেবলমাত্র মামুলি বক্তা হিসাবে নয়, নির্মাতা, সংগঠক ও স্থায়ী ‘সম্মতি উৎপাদক’ হিসাবে। তাকে বস্তুবিচ্ছিন্ন কোনো গাণিতিক স্তরের চেয়ে উন্নততর স্তরে সক্রিয় হতে হবে। কাজের মধ্যে প্রয়োগবিদ্যা আয়ত্ত করেই সেই প্রয়োগবিদ্যাকে বিজ্ঞানে পরিণত করতে হবে, এবং তা থেকেই পৌঁছুতে হবে ইতিহাসের মানবিকবাদী ধারায়, যা ছাড়া একজন কেবলমাত্র ‘বিশেষজ্ঞ’ই থেকে যায়, কিন্তু অগ্রগণ্য ভূমিকায় পৌঁছুতে পারে না।
এই জন্যই আমাদের বারবার ফিরে যেতে হয় সত্যেন সেনের কাছে।