হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে অচলায়তন ভাঙতে ‘আগুনযাত্রা’

পুরুষশাসিত রাষ্ট্রের মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে ছিলো তার প্রেম, বিয়েও করেছিলো তারা।

চিন্তামন তুষারচিন্তামন তুষার
Published : 18 Dec 2022, 09:07 AM
Updated : 18 Dec 2022, 09:07 AM

ব্যাকরণে পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, উভলিঙ্গ বা জেন্ডার পড়তে হয় আমাদের। বই-পুস্তকের ভাষায় He, She-এর বাইরে আসলে কোন সম্বোধন খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার বাস্তব জীবনে বর্তমান যুগের অধিকাংশ রাষ্ট্রে-দেশেও এই হি-শি এর বাইরে কিছু নেই। এখানে কর্তৃত্ব করছেন নারী অথবা পুরুষ। অথচ সমাজে আরেক লিঙ্গের অস্তিত্ব বিরাজমান আবহমানকাল থেকে। ব্যাকরণে এরা কমন জেণ্ডার অথবা ক্লীবলিঙ্গ। এরা না নারী না পুরুষ, এদের পরিচয়--এরা হিজড়া। একসময় রাজ্য-ব্যবস্থায় এদের কদর ছিলো, যেমন কদর ছিলো দেহোপজীবিনীদের। এদের যাতায়াত ছিলো এবং একমাত্র অধিকার ছিলো রাজা-সম্রাটের অন্দরমহলের। আজকে হঠাৎ এদের কদর কমে গেলো কেন? ব্রিটিশ শাসনের কাল থেকে সেই ইতিহাস মলিন হয়ে গেলো কেন?

হিজড়ারা বর্তমান সমাজ-ব্যবস্থায় একটি আলাদা সমাজ গড়ে নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু আদতে এই সমাজ কোন অবস্থায় আছে সেটা অনুসন্ধানযোগ্য। রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে মৌলিক পাঁচটি অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তার প্রতিপালন করার দায়িত্বের কথা। রাষ্ট্র কি হিজড়াদের সেই মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক? হয়তো কিছু বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নের চেষ্টা করছে বা উদ্যোগ নিয়েছে। তা কতোটা কার্যকর হয়েছে বা হচ্ছে, সে খবর আমাদের হাতে নেই।

অতএব, মৌলিক অধিকারই যেখানে প্রতিষ্ঠিত নয় সেখানে পরবর্তী মানবিক চাহিদাগুলোর সংস্থান হচ্ছে কিনা, এ বিষয়ে আসলে আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি সংরক্ষণ করছি তার খোঁজ নেয়া যেতে পারে।

আমরা বলতে বোঝাচ্ছি, এই পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত দুটি পক্ষ অর্থাৎ নারী এবং পুরুষকে। পাশ্চাত্যে শিল্প-বিপ্লবের পথ ধরে পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় চিড় ধরিয়েছে নারীবাদী আন্দোলন। এই আন্দোলনে নারীর ঘরকুনো স্বভাবের বিপরীতে শিল্প-উদ্যোগের প্রসারে ভূমিকা থাকায় নারীরা কিছু মানবিক অধিকার সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয় কিন্তু দেশে-সমাজে তার প্রভাব পড়তে সময় লেগেছে। বাংলাদেশের মুসলিমশাসিত সমাজে তা এখনও ‘দূর অস্ত’। এখানে হিজড়াদের অধিকার নিয়ে কথা বলাটা সম্ভবত বাহুল্য মনে করা হয়।

সব বুঝে শুনে, এই বাহুল্য কাজকেই নিয়মিত কাজ বা উন্নয়নের ধারায় আনার চেষ্টা করছেন আমাদের গুটিকয়েক শিল্পী-সাহিত্যিক-পরিচালকবৃন্দ।

বড় পর্দার জন্য এই দেশের মাটিতেই নির্মিত হয়েছে দুটি চলচ্চিত্র— ‘কমন জেন্ডার’ ও ‘শিখণ্ডী কথা’। ‘শিখণ্ডী কথা’ বড় পর্দায় আসার আগে মঞ্চে, টিভিতে প্রদর্শিত হয়েছে নাটক রূপে। এর লেখক আনন জামান সাধুবাদ পাবেন এজন্য।

ভারতের টুকরোটাকরা খবর পাওয়া যায়। তাদের মঞ্চে, সিনেমায় হিজড়া চরিত্র ঢুকে যায় অনায়াসে। যদিও তা একটি গতানুগতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সম্প্রতি আয়ুষ্মান খুরানা ও ভানি কাপুরকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে একটি চলচ্চিত্র ‘চান্ডিগাড় কারে আশিকি’ সেই গতানুগতিক দৃষ্টিকে ডিঙিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে।

আবার রাজকুমার রাও ও ভুমি পেদনেকার অভিনীত ‘বাধাই দো’ সিনেমা মিউজিক্যাল কমেডির মাধ্যমে খুবই বলিষ্ঠভাবে সমকামীদের নিজের পছন্দের সঙ্গী বেছে নেয়াকে বৈধতা দানে আবেদন তুলেছে।

সম্প্রতি শহরের দুটি সংস্কৃতিকেন্দ্রে হয়ে গেল হিজড়া সমাজকেন্দ্রিক দুটি প্রদর্শনী। একটি হলো ‘আর্টিস্ট মেক স্পেস’ শীর্ষক আলোকচিত্রসহ বহুমুখী ডিজিটাল মাধ্যমের প্রদর্শনী। অন্যটি হলো ঢাকার জনপ্রিয় নাট্যদল প্রাচ্যনাট প্রযোজিত মঞ্চনাটক ‘আগুনযাত্রা’।

‘আর্টিস্ট মেইক স্পেইস’ ঢাকার বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট ও লন্ডনের তারা থিয়েটারের সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যোগে একটি প্রদর্শনী। এর অর্থায়ন করেছে ব্রিটিশ কাউন্সিল। এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণমূলক কাজে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের ৭ শিল্পীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যের উদীয়মান ৭ শিল্পী। তাদের মধ্যে মৃদুল কান্তি গোস্বামী এবং যুক্তরাজ্যের রুপিন্দর কাউরের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের নিজ প্রদর্শনী কেন্দ্রে।

মৃদুলের কাজের শিরোনাম ছিলো ‘ইগো’। তার তোলা আলোকচিত্রে উঠে এসেছে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভুতি। অন্যদিকে রুপিন্দর কবিতা, খন্ডচিত্রের মাধ্যমে শিল্পমাধ্যমে তার স্বাধীনতার বয়ান তুলে ধরতে চেয়েছেন।

নিজের কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মৃদুল জানাচ্ছেন, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করা ৩৭৭ পেনাল কোডে বলা হয়েছে ‘প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো শারীরিক সম্পর্ক’ গড়লে তা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। এই আইনটি যুক্তরাজ্য বিলুপ্ত করেছে অনেক আগেই। বিশ্বের অন্তত ৭০টি দেশে সমকামী সম্পর্ক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পৃথিবীর অর্ধেক দেশে রূপান্তরিত-সমকামী-উভকামীরা তাদের কাজের যোগ্য পরিবেশের অভাবে ভোগে। অনেক দেশের সরকার রূপান্তরিত নারী-পুরুষের নাম পরিবর্তন করতে বাধা সৃষ্টি করে। বিশ্বের এক চতুর্থাংশ মানুষ রূপান্তরকামী-সমকামী-উভকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

প্রদর্শনীটির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, শৈল্পিক মাধ্যমের পরিসরে হিজড়াদের বা হিজড়া সম্পর্কিত সৃজনশীলচর্চায় জড়িত থাকা এবং মতামত প্রকাশ করার জন্য একটি নিরাপদ স্থান তৈরি করা।

মৃদুল আরও জানাচ্ছেন, বাংলাদেশে আইনটি যদিও বাধ্যতামূলক নয়, তবে তার কার্যকারিতা এখনও হারায়নি। কারণ সমাজে হিজড়াদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশে নিয়মিতই সহিংস আচরণের শিকার হচ্ছেন হিজড়ারা। হত্যাসহ এরকম শারীরিক নির্যাতনের উল্লেখযোগ্য ঘটনার উদাহরণ তার জানা আছে।

এরকম এক সহিংস ঘটনার উদাহরণ ‘আগুনযাত্রা’ নাটক। পুরুষকে ভালোবেসে বিয়ে করায় এক হিজড়ার জীবন হারানোকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে নাটকটি। সে ঘটনায় অন্য আরেক হিজড়ার কাঁধে দায় চাপিয়ে তাকে জেলহাজতে ঢোকানোর মিথ্যে গল্পের পেছনে সত্যকে উন্মোচিত করতে এসে নাজেহাল হন পুরুষশাসিত সমাজের এক নারী গবেষক।

নাটকটির মূল রচয়িতা মহেশ দাত্তানি, ইংরেজি থেকে বংলায় অনুবাদ করেছেন শহীদুল মামুন। মঞ্চের জন্য রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন আজাদ আবুল কালাম। দাত্তানি ইংরেজিতে এ নাটকটি লিখেছিলেন রেডিওর জন্য। পরবর্তীকালে এটি বই আকারে বের হয়েছে। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে এটি লভ্য। ইংরেজিতে এর নাম ‘সেভেন স্টেপস অ্যারাউন্ড দ্য ফায়ার’।

মহেশ দাত্তানি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইংরেজিতে লিখে ভারতের ‘সাহিত্য আকাদেমি অ্যাওয়ার্ড’ জিতেছেন। তিনি একাধারে পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, নাট্যরচয়িতা ও লেখক। তার লেখনিতে ‘সেভেন স্টেপস অ্যারাউন্ড দ্য ফায়ার’-এর কমলা আগুনে পুড়ে নিহত হন। পুরুষশাসিত রাষ্ট্রের মন্ত্রীর ছেলের সঙ্গে ছিলো তার প্রেম, বিয়েও করেছিলেন তারা।

এসব ঘটনা নাটকে পরে জানা যায়। নাটকের শুরু হয়, হাজতে আটক আনারকলির বয়ান নিতে আসা উমা রায়ের নাজেহাল হওয়ার দৃশ্যের মাধ্যমে। উমা রায় সমাজের উচ্চতর কাঠামোর প্রতিনিধি। তিনি গবেষণা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রির জন্য। তার তত্ত্বাবধায়কের নির্দেশে তিনি কমলা খুন হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে আনারকলির সাক্ষাৎকার নিতে যান জেলহাজতে।

উমার স্বামী একজন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। উমার শ্বশুর ছেলের চেয়েও উচ্চপদের কর্মকর্তা। বাবা বিশ্ববিদ্যালের উপাধ্যক্ষ। এরকম পদধারীদের পরিবারে থেকেও তার একটা লুকোনো দুঃখ আছে। তিনি এক দত্তক পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষ। আর তার এক ভাই অথবা বোন বেড়ে উঠেছে তারই শহরের কোনো হিজড়া সমাজে। সেই ভাই বা বোনকে খুঁজে বের করা তার একটা অন্যতম উদ্দেশ্য। সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

কিন্তু আনারকলির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন বা তার ধারণা হয় কমলা হত্যার পেছনে অন্য কোন গোপন কারণ আছে।

সেই কারণ অনুসন্ধান এবং আনারকলিকে হাজত থেকে ছাড়াতে উমা শরণাপন্ন হন ‘গুরু মা’ চম্পার। চম্পার আবাসস্থলে গিয়ে নানা প্রশ্নের বানে চম্পাকে জর্জরিত করতে না করতে সেখানে হাজির হন মন্ত্রীর দেহরক্ষী সলিম। সলিম চম্পার কাছে কমলার স্থাবর সম্পত্তি তার হাতে তুলে দেয়ার হুমকি দেন। কিন্তু উমার পরিচয় পেয়ে দৃশ্যপট থেকে সরে যান।

উমার মনে তখন প্রশ্ন ওঠে, মন্ত্রীর দেহরক্ষী কেন কমলার সম্পত্তির দাবি করছে। চম্পা উত্তর দিতে চান না। উমা ফিরে যান আনারকলির কাছে। আনারকলিও উত্তর দিতে চান না। শুধু বলেন, তার জীবন থাকবে না। কিন্তু উমা ঠিকই কারণ খুঁজে বের করতে সক্ষম হন এবং তিনি পৌঁছান সলিমের প্রভুগৃহ মন্ত্রীর বাসভবনে। সেখানে তিনি দেখা পেয়ে যান সুব্বুর যে ভালোবেসেছিলো কমলাকে এবং বিয়েও করেছিলো। সুব্বুর বাবা জোর করে তার আবারও বিয়ের বন্দোবস্ত করেছে। আর কমলার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে উঠেপরে লেগেছে। সলিম তার উছিলা মাত্র।

উমা এবার রণেভঙ্গ দিতে চান। সংসার, সমাজ আর ঘটনাপ্রবাহের চাপ সামলাতে পারছেন না তিনি। এরপরও যখন জানতে পারলেন আনারকলি ছাড়া পেয়েছে এবং গুপ্ত আশ্রয়ে চলে গেছে। তখন আরেকবার জ্বলে ওঠেন উমা। চম্পার ঘরে হাজির হয়ে আনারকলিকে সামনে আনার আব্দার তার। চম্পা হার মেনে আনারকলিকে মঞ্চে প্রবেশে অনুমতি দিলেন। আর বের হয়ে এলো থলের বেড়াল।

উমা এবার জানতে পারলেন, কমলার সম্পত্তি আসলে সলিমের দরকার নেই। দরকার একটি ছবি ধ্বংস করার। সেই ছবিই কমলা-সুব্বুর বিয়ের দলিল। আনারকলিই সেই ছবির রক্ষক। কমলা হত্যার রহস্যও তার জানা। এবার সব জানা হয়ে গেলো।

সুব্বুর বিয়ে উপলক্ষে মন্ত্রির বাড়িতে আমন্ত্রিত হয়েছেন উমা ও তার স্বামী। কিন্তু উমার মন বিয়ের মণ্ডপ ছেড়ে টেনে নিয়ে যায় মন্ত্রীভৃত্য আবাসে। সেখানে সে সলিমের স্ত্রীকে খুঁজছে। সলিম এসে তাকে শাসাতেই হাজির স্বামী। আলোচনা মাঝপথে থেমে যায়।

পরের দৃশ্য হাতে পিস্তল নিয়ে সুব্বুর মঞ্চে প্রবেশের। উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। একে একে সব কুশীলবরাও তাকে সঙ্গত দিতে উপস্থিত। সুব্বু শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করলে নাটকীয়তার ইতি হয়। শেষ হয় একটি প্রেমের। যবনিকা ঘটে নাটকের।

হিজড়ারা না নারী না পুরুষ। তারা সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম অথচ ভারতের সমাজে সন্তান জন্ম নিলে বিয়ে অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি জরুরী। তারা নেচেগেয়ে দোয়াকামনা করলেই মঙ্গল হয় বিশ্বাস করেন অনেকে। কিন্তু তাদের বিয়ে বা সন্তান লালন-পালনের অধিকার দিতে যতো কুণ্ঠা। নাটকের শুরুর দিকেই এসব কথা তথ্য আকারে সংলাপ আওড়েছেন উমা। উমা আরও জানাচ্ছেন, রামায়ণে প্রভু রামের সঙ্গী হতে কতোজন পুরুষ তাদের পুরুষত্ব খুইয়েছেন।

অতএব, এতো এতো গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও হিজড়ারা আজ অস্পৃশ্য, অচ্ছুত। একবার প্রমাণিত হলে হিজড়ারা হারান তাদের নিকটজন, আত্মীয়স্বজন, পরিবার, বন্ধুবান্ধব। ছিটকে পড়েন তারা সমাজের মূল ধারা থেকে। করতে পারেন না লেখাপড়া। পান না কোনও চাকরি। থাকে না আয়-রোজগারের কোনও উপায়। সবার হাসি-তামাশা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যর পাত্র (নাকি পাত্রী?) হয়ে ওঠেন। ভিক্ষাবৃত্তি করে পরিচালিত হয় তাদের জীবন।

হিজড়ারা সমাজের যার কাছেই যান তার কাছেই ঠকেন। এই হারের অপমান তাকে করে তোলে অবিশ্বাসী। সেই অবিশ্বাস উঠে এসেছে নাটকেও। উমাকে তাই তথ্যের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হয় একবার চম্পা একবার আনারকলির দরবারে।

প্রচলিত সমাজে যখন তাদের ঠাঁই মেলে না, তখন হিজড়ারা গড়ে তোলেন নিজেদের সমাজ। কিন্তু এই সমাজেও চলে আসে আগের সমাজের পুনরাবৃত্তি। হিংসা, লোভ, দুর্বৃত্তায়ন ভর করে তাদের সমাজে। এসবের সুযোগ নেন স্বার্থান্বেষী, কুচক্রী, ক্ষমতাবান মহল।

অভিনয়ের মাধ্যমে এসব কিছু তুলে ধরেছেন শাহেদ আলী, কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন, চেতনা রহমান ভাষা, শারমিন আক্তার শর্মী, প্রদ্যুৎ কুমার ঘোষ, মোঃ আব্দুর রহিম খান, রকি খান, তানজি কুন, মোঃ শওকত হোসেন, ডায়ানা ম্যারলিন, ফয়সাল সাদী, আহমেদ সাকি, এ কে এম ইতমাম, তমাল, রানা নাভেদ, উচ্ছাস তালুকদার।

উমা রায় চরিত্রে চেতনা রহমান ভাষা, শারমিন আক্তার শর্মীর অভিনয় দারুণ উপভোগ্য ছিলো। বলা যায় নাটকের প্রাণ উমা রায় চরিত্র। এ চরিত্রে দুজনের অভিনয় আসলে একটা চরম নাটকীয় পরীক্ষা। একই মানুষ, একই সংলাপ কিন্তু দুজনে মিলে করছেন একটি চরিত্র।

অন্যদের অভিনয়ও যথেষ্ট ভালো হয়েছে। বিশেষ করে হিজড়া দলের নাচ-গান, সংলাপ আওড়ানো দারুণ উপভোগ্য। তবে অভিনয় প্রচেষ্টা সর্বাত্মক সফল হয়েছে বলা যাবে না।

নতুন নাটক, তার ওপর হয়তো কম সময়ের মধ্যে অনুশীলন সম্পন্ন করার তাগিদে কিছুটা জড়তা দেখা গেছে আনারকলি ও চম্পায়। চরিত্র দুটিতে অভিনয় করা শাহেদ আলী ও প্রদ্যুত কুমার ঘোষ তাদের শরীরিভাষায় শতভাগ উজার করে দিয়েছেন এবং তা সাধুবাদ যোগ্য, মান উত্তীর্ণ। কিন্তু সংলাপ আওড়াতে যদি কণ্ঠের কাজের অনুশীলনে আরও একটু সময় বেশি দেন বা পরবর্তী প্রদর্শনীতে শানিত করেন তাতে খুশীর মাত্রা যোগ করবে।

নাটকটির পরতে পরতে হিন্দি-বাংলা অনেক গান সংযোজিত হয়েছে, আবার এবং অবশ্যই মৌলিক সুর ও কথাও নিশ্চিত সংযোজন করা হয়েছে। রাহুল আনন্দকে এমন একটি সংগীত উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। কোরিওগ্রাফার স্নাতা শাহরিনেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য।

মঞ্চসজ্জা, পোষাক, প্রপস, আলো ও শব্দ পরিকল্পনায় প্রাচ্যনাটের মুন্সিয়ানা আগেই প্রমাণিত। এই প্রযোজনাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আরও নিরিক্ষাধর্মী মাঞ্চনাটকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে নিয়েছে ভিডিও প্রক্ষেপণ। শাহরিয়ার শাওন ও রিপন কুমার দাস ধ্রুব একাজে যথেষ্ট ছিলেন।

হিজড়ারা সমাজের মূল ধারায় যুক্ত হবে একদিন--এমন স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। তিনি ক্লীবলিঙ্গ, পুংলিঙ্গ নাকি স্ত্রীলিঙ্গ সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, অচলায়তন ভাঙতে চান তারা। তাদের চাওয়া, হিজড়াদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা। হাসি-ঠাট্টা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বন্ধ করা। শারীরিক লাঞ্ছনা বন্ধ করা। শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে কর্মের সংস্থানের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে বের করে আনা। এতো এতো সব কাজ একার পক্ষে করা সম্ভব নয়, ঐক্য দরকার হয়। যারা তাদের পক্ষে আওয়াজ তুলছেন দরকার এখন তাদের পাশে দাঁড়ানো। ঐক্য গড়ে তোলা।