১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

লেখার জীবন: সময় অসময় দুঃসময় এবং এলোমেলো ভাবনা

কিন্তু লেখক পৃথিবীতে দিয়ে যায় সৃষ্টির নতুন রূপ রস গন্ধ ও পথ। যে পথে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের পাঠক আত্মার প্রশান্তি লাভ করে। লিটল ম্যাগাজিনই সেই প্লাটফর্ম যেখানে একজন কবি চিন্তাকে ও আবেগকে নিরীক্ষার মাধ্যমে পরিস্ফুট করতে পারেন।

লেখার জীবন: সময় অসময় দুঃসময় এবং এলোমেলো ভাবনা
ভাসিলি কান্দিনিস্কির চিত্রকর্ম

তৌফিক জহুর তৌফিক জহুর

Published : 19 Aug 2026, 05:24 PM

Updated : 16 Sep 2026, 12:58 PM

লেখক কি হওয়া যায়?  আমি কি সত্যি লেখক হতে চেয়েছিলাম? নাকি কোনো এক আশ্চর্য প্রতীকী পাথরের সংস্পর্শে পৌঁছে আকস্মিক আমার ভিতরে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অক্ষরেরা জোয়ারের মতো ভাসিয়ে দেয় আমার খাতা। এগুলো কি লেখা বলে? বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়,  মানিক বন্দোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, সৈয়দ এমদাদুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন কথাসাহিত্যে পাহাড়সম যে সৃষ্টি, তা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি আর গোগ্রাসে গিলতে থাকি। কবিতায় মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীমউদ্দিন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আল মাহমুদ এমন মহীরুহ শত কবির সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকি, অবাক জলপান। তাঁদের সৃষ্টির মাঝে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি নিজের অস্তিত্বের দুয়ার। কবিতা ভাবনা পেয়ে বসে। কথাসাহিত্যের সাম্রাজ্য থেকে কবিতার কোমল পেলব বাতাসে অক্সিজেন নিতে থাকি। তাহলে এই যে আধুনিক এই যুগের সর্বোচ্চ টেকনোলজি যখন ব্যবহার করছি, সে সময়ে আমার কবিতা ভাবনা কেমন হতে পারে!! 

কবিতা ভাবনা

যখন একটা বিকেল বা সন্ধ্যার কিছু আগে গোলাপি রঙের আভার মধ্যে বাতাস ভেসে এসে শরীরে ঝাপটা মারে, শরীর সতেজতা অনুভব করে। কবিতা অনেকটা সেই রকম মনে হয়। কবিতার অন্দরমহলে প্রবেশ করলে আত্মার মাঝে একটা শান্তি অনুভূত হয়। মনে হয় কবিতার অক্ষরগুলো হাতপাখার বাতাসে শীতল করছে হৃদয়। কি শক্তি কবিতার! কখনো কখনো কবিতাকে মনে হয় শান্ত লেক। যেখানে আসমানী রঙের পানি শান্ত হয়ে বয়ে যায় বাতাসের ঘোমটায়। আবার কখনো কখনো কবিতাকে মনে হয় সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। প্রবল ঝড়ের সময় সমুদ্রের ভয়াল রূপের মতো কবিতার লাইন ঝলসে ওঠে। তছনছ করে দেয় প্রবল পরাক্রান্ত কোনো রাজার রাজ সিংহাসন। মায়াবী সুরভি ছড়ানো কবিতাই কখনো এমন রুদ্র রূপে জনগণের মুখে মুখে পথ চলে শ্লোগানে মিছিলে। শিল্পের সব শাখার মধ্যে কবিতা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মনের ভাব প্রকাশের এমন ছোট ছোট বাক্যে কখনো প্রেমিকার হৃদয় বাগান তছনছ হয়ে যায় আবার কখনো মহাপরাক্রমশালী কোনো রাজার পরাজয় লেখা হয়। কবিতার একপিঠে আনন্দের ফল্গুধারা বহিছে অন্য দিকে গর্জে উঠছে ন্যায়ের পক্ষে,  সাম্যের পক্ষে, মানবতার পক্ষে বিশিষ্ট পংক্তি। কবিতা এমনই। কবিতা মানে রূপান্তর। কবিতা মানে বদল। কবিতা মানে পরিবর্তন। কবিতা মানে তির্যকতা। কবিতা বস্তুফলক নয়, নশ কল্পনাফলক... কবিতা বস্তুকে রূপান্তরিত করে এমনকি কল্পনাকেও পরিবর্তিত করে। কবিতা সময়ের সাথে সাথে সামনের দিকে এগোয়। পেছনের অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টির জ্ঞান অর্জন করে কবি প্রথমে শিক্ষিত হয়, তারপর ক্রমশ সামনের দিকে এগোতে থাকে। এজন্যই একজন কবি হয়ে যান অতিকামী ও অতীন্দ্রিয় ও উদাসীন এবং সৎ। সৎ না হলে কবি কখনোই একসঙ্গে হতে পারেন না রাজা ও সন্নাসী। এবং কবিতা সৃষ্টির জন্য একজন কবিকে নিজের গভীর বিবরে ঢুকে যেতে হয় যেখানে সমাজ নেই, রাষ্ট্র নেই, কোনো মতবাদ নেই। সেখানে বাস করে এক অপার অনন্ত " আমি "। সেই গভীর বিবরে যে সমুদ্র আছে তার নাম " আমি ", সমুদ্রের সঙ্গে যে সবুজ দ্বীপ আছে তার নাম  " আমি ", সেখানে একখানি কাগজের স্পিডবোট বাঁধা আছে তার নামও " আমি "। কবিতা এমনই এক প্রভাব নিস্তারকারী জিনিস যা মানুষের শরীর ও আত্মা দখল করে।

এই লেখার শিরোনাম লেখার জীবন: সময় অসময় দুঃসময়। অনেক চিন্তা ও দর্শন একসঙ্গে মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন তোলে। এই লেখাটি আমি যেহেতু একটানে লিখছি না, সময় নিয়ে লিখছি, তাই ভাবনাগুলো সেভাবেই ভিতর থেকে আসছে। এটাকে আমি কি সময় বলবো নাকি অসময়ের খসড়া বলবো জানি না। যেমন, এ  মুহূর্তে আমার ভেতর তাড়িত হচ্ছে দূরত্বের সৌন্দর্য এবং সৌন্দর্যের দূরত্ব নিয়ে। আমি মগ্ন হয়ে ভাবছি।

দূরত্বের সৌন্দর্য এবং সৌন্দর্যের দূরত্ব 

১.১

"The more important Poets are those Who free themselves from the restraints of Poetic diction and bring Poetry back into relation with living Speech".. (Reading and Discrimination : Denys Thompson)। 

প্রচলিত কাব্যিক ভাষার বন্ধন থেকে মুক্ত করে কবিতাকে প্রাত্যহিক জীবনের জীবন্ত ভাষার সঙ্গে সংযুক্ত করে তুলতে সচেষ্ট কবিই বিশেষ প্রভাব বিস্তারকারী। তিনি হয়ে ওঠেন দূরগামী। তাঁর কবিতা কাল পেরিয়ে মহাকালে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। একজন কবির সব কবিতাই পাঠকের হৃদয়ে চিরকালের আসন গেড়ে বসে থাকবে, তা নয়। অসংখ্য কবিতার মধ্যে থেকে কয়েকটি বা একশটি কবিতা কিংবা একটি কবিতা তাঁকে কবিতার সিংহাসনে চিরকাল বসিয়ে রাখে। কবিতার শক্তি এখানেই। ১৯২২ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের অমর সৃষ্টি ' বিদ্রোহী' কবিতা শতবছর পরও সমান জনপ্রিয় ও সময়োপযোগী। কারণ, কবিতাটি সব কালের সব সময়ের জন্য দরকারী একটি কবিতা। একজন পাঠককে প্রস্তুতি নিয়ে 'বিদ্রোহী' কবিতার অন্দরমহলে প্রবেশ করতে হয় না। যে কোনো সময়ে 'বিদ্রোহী' কবিতার সদর ফটকে ঠকঠক শব্দে নক করে প্রবেশ করা যায় এবং এর রস আস্বাদন করে উজ্জীবিত হওয়া যায়। এটি একটি জীবন্ত কবিতা। এর শক্তি অসীম। আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ জীবনানন্দ দাশ। তাঁরও হাতে গোণা কয়েকটি কবিতা পাঠকের হৃদয়ে চিরকালের আসন গেড়ে বসে আছে। কারণ ওই যে শুরুতেই ডেনিস থম্পসনের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য। জগতের শৃঙ্খলা ডিঙিয়ে নতুন টেকনিকে একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। ' রূপসী বাংলা ', ' আট বছর আগের একদিন' আমাদের স্থির করে চোখ। আমরা বিস্মিত এর রূপকল্পে, চিত্রকল্পে, বর্ণনার ঢঙে আমরা ঘোরের মধ্যে চলে যাই। 'আট বছর আগের একদিন' কবিতাটি পড়তে পড়তে চিত্রশিল্পী গঁগ্যার জীবনকাহিনীর অথবা সেই কাহিনী অবলম্বনে সমারসেট মমের ' The Moon and Six Pence'..উপন্যাসের নায়কের কথা আমাদের মনে পড়ে। এই আলোকে কবিতাটি অন্য এক ব্যঞ্জনা লাভ করে। এ মৃত্যু যেন মৃত্যু নয়, চারিপাশের জড়তার বিরুদ্ধে সংবেদনশীল আত্মার বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের জন্যই কবিতাটির আবেদন এমন। সব সময়ই পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে, জায়গা করে নেয়। জসীম উদদীনকে পল্লীকবির তকমা লাগিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ, তাঁর কবিতার মধ্যে  শস্যের ও মাটির সোঁদা গন্ধ অনুভূত হয়। চিত্রায়নে এমন দক্ষতার ছাপ রেখেছেন, তাঁর সময় থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর কবিতাগুলো ব্যাপকভাবে পাঠ করা হয় এবং আবৃত্তি শিল্পীদের পছন্দের তালিকায় চল্লিশ দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি জসীম উদদীন কবিতা সবসময়ই অগ্রগামী। তাঁর 'কবর' কবিতাটি পাঠ করেনি বাংলা ভাষায় এমন পাঠক পাওয়া সম্ভব নয়। 'কবর' কবিতার চিত্রকল্প ও বুনন এতেটাই হৃদয়কাড়া যা পঠকের মনে বহু বছর ধরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। গ্রাম বাংলার দৃশ্যায়ন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নববধূকে দেখার যে চিত্র কবি এখানে এঁকেছেন তা গ্রাম বাংলার কাল্পনিক কোনো ছবি নয়, একদম ঠিকঠাক ও যুতসই। যে পাঠক যখনই ' কবর' কবিতা পাঠ করে তখনই তাঁর চোখের সামনে অকৃত্রিম দৃশ্য ভেসে ওঠে। ষাট দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দ ' জসীম উদদীনের কবিতা'.. প্রবন্ধে জানাচ্ছেন, " জসীম উদদীনের কাব্যগ্রন্থগুলো সংস্করণের পর সংস্করণ হয়েছে (আমার হাতে রয়েছে জসীম উদদীনের " নকশিকাঁথার মাঠ,চতুর্দশ সংস্করণ ১৯৮৬;  সোজন বাদিয়ার ঘাট চতুর্দশ সংস্করণ ১৯৮৬, প্রথম বইটি দশহাজার কপিও ছাপা হয়েছে, দ্বিতীয় বইটি পাঁচ হাজার) আধুনিককালে নজরুল ব্যতীত আর কোনো কবির বই এরকম অগাধ লোকপ্রিয়তা পায়নি। এই লোকপ্রিয়তার কারণ কী? কারণ মনে হয় জসীম উদদীনের কথকতার শক্তি "... ( করতলে মহাদেশ, পৃষ্ঠা  ৯৬)। আবদুল মান্নান সৈয়দ এই প্রবন্ধ লিখেছেন কমপক্ষে চল্লিশ বছর আগে। সে সময় জসীম উদদীনের দুটি কবিতার কিতাব পনের হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। আধুনিককালে এ সময় একজন কবির কবিতার কিতাব একশ কপি বিক্রি হওয়া দুরূহ। নানান কায়দায় এখন বই বিক্রি করা হয়। কিন্তু জসীম উদদীনের কবিতার কিতাব বিক্রি করতে কায়দা লাগেনা, কবিত্ব শক্তির প্রভাব এতোটাই প্রবল, আজো মানুষ জসীম উদদীন দ্বারা আক্রান্ত। যেমন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ দ্বারা আক্রান্ত। 

১.২

জসীম উদদীনের পর যাঁর কবিতা আমাদের প্রকৃত অর্থে আধুনিকতা ও লোকজতা এবং গ্রাম বাংলার চাদর জড়িয়ে হাজির হয়, তিনি পঞ্চাশের দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি আল মাহমুদ। আল মাহমুদ আধুনিকতাকে গাছের পাতার মতো ধারণ করেন নি, আধুনিকতার শিকড় প্রোথিত ও সঞ্চারিত করেছেন তাঁর কবিতার শিরায় শিরায়। তাঁর কবিতার শিখর পঞ্চাশ দশকে থেকে শুরু হয়ে বর্তমান কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। আমরা আল মাহমুদের কবিতার আকাশে প্রথমে খুঁজে পাই আত্মনিমজ্জিত ও আত্মজগতের এক বাসিন্দা হিসেবে। সময় যতই এগিয়েছে আল মাহমুদ ক্রমশ নিজেকেই নিজে ছাড়িয়ে গেছেন। আমি থেকে পৌঁছে গেছেন আমরায়। নারী, যৌনতা, শরীরী, গার্হস্থ্য জীবন, প্রকৃতি, দেশ, কাল,ঐতিহ্য এবং প্রেম আল মাহমুদের কবিতার সাম্রাজ্যে সাজানো একটার পর একটা পদাতিক বাহিনী যেন। সুসজ্জিত, সৌন্দর্যের জাদু কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে দারুণ সাজুয্য বজায় রেখেছেন। দেশজতায়, দেশপ্রেমে আল মাহমুদের কবিতার আত্মপরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে। আল মাহমুদের সমগ্র কাব্যজীবনকে আমরা কয়েকটি ভাগে বলতেই পারি আজকে। তিনি প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তিগত, দ্বিতীয় পর্যায়ে সামাজিক, তৃতীয় পর্যায়ে শিকড়সন্ধানী। ব্যক্তিগত আল মাহমুদ আত্মতা থেকে উত্তরকালে মুক্তি পেয়েছিলেন সেখানেও ছিলো দুটি ধাপ। প্রথমত সমাজচেতনা, দ্বিতীয়ত ইতিহাস ও কল্প ইতিহাস চেতনা। লোক লোকান্তরকালের কলস, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো আল মাহমুদ নিজেকে বহুবর্ণে, বহুরূপে নিজের কবিতার জাত সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী পৃথিবীর মানুষকে চেনালেন। লোক লোকান্তরের কবি ক্রমশ কালের কলস ভাসালেন। দেশপ্রেম, স্বজাতিপ্রেম, কাল ও সমাজচেতনা আল মাহমুদকে ক্রমশ নিবিষ্ট করে সময়ের বিশেষ পটে। মূলত কালের কলস থেকে অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়েই এর সূচনা হয়। তীব্র সমাজচেতনা, স্বদেশী বোধ কবি আল মাহমুদকে যখন প্রবলভাবে ঘিরে ফেলেছে তখনও তিনি তা উপস্থিত ও উচ্চারণ করেছেন কবিতার পোশাকেই। বাংলাদেশ তখন তাঁর কবিতায় উপর্যুপরি উঠে আসছে তাঁর নির্মিত সবুজ আচ্ছাদন পড়েই।

পথে নেমেছি নব্বই দশকে : এখনো পথেই আছি

নব্বই দশকে লেখালেখি করতে এসে আমরা রূপান্তরের দর্শন দেখেছি। গভীর অধ্যায়বিশ্বাস থেকে আমরা একটা ট্রেনে চেপে বসি, গন্তব্য অজানা। নব্বইয়ের সেই ট্রেনে বাংলাদেশে তিন’শ-এর বেশি কবি যশপ্রার্থী যাত্রী হিসেবে একসাথে রওনা দেই। কেউ কেউ মাঝপথেই নেমে গেছেন। কেউ কেউ সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার তাড়ায় ক্লান্ত পাখা মুছে নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষায় নিজেকে দগ্ধ করেছেন ঋষিদৃষ্টির সাধনায়। কেউ কেউ বোদলেয়ারের মতো বিশুদ্ধ কাব্যসৃষ্টির সাধনায় লিপ্ত হন। প্রেমে যেমন শাশ্বত সত্য বলে কিছু নেই তেমনি আধুনিক কবিদের মনে হয়েছিল কালের রূপও তেমনি ক্ষয়িষ্ণু, একথা প্রবলভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেন ত্রিশের আধুনিক কবিরা। এরই ধারাবাহিকতায় নব্বই দশকের কবিরা ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ এবং ষাট দশকের কবিদের কবিতার ব্যাপক প্রভাব পাশ কাটিয়ে এগোতে থাকেন। বাংলাদেশের কবিতায় নব্বই দশকে পঞ্চাশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদ্বয় শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ এর প্রবল প্রভাব দুর্বল মেধার কবিদের আক্রান্ত করে। তাঁরা নব্বইয়ের সেই ট্রেন থেকে একদশকেই হারিয়ে যান। কিন্তু যাঁরা একটা ভোরকে ডেকে আনার সামর্থ্য রাখে, যাঁরা জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে চাঁদের রূপ বর্ণনা করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, তাঁরা নব্বই দশকের ট্রেনে আজো পথ চলছেন। গন্তব্য এখনো অনেক দূর। " আমি যদি কবি হই তাহলে কবি হিসেবে আমার কর্তব্য ভালো কবিতা লেখা,তাছাড়া কিছু নয়, জীবনের সঙ্গে সেই আমার যোগসূত্র "..একথা বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন।

কথাটি এ জন্য এখানে সংযুক্ত করলাম, একবার টিএস এলিয়টের(১৮৮৮-১৯৬৫) এক বন্ধু বিশ বছর বয়সী একজন তরুণ কবির কবিতা এলিয়টকে দেখে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এলিয়ট বন্ধুকে উত্তরে সাফ জানিয়েছিলেন," ওকে ওর চল্লিশ বছর বয়সে আসতে বলো,তখনো যদি কবিতা লেখে,তবে সে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।" ( দ্রষ্টব্য,সৈয়দ শামসুল হক, ভূমিকা,মার্জিনে মন্তব্য, অন্যপ্রকাশ,ঢাকা-২০০৫, পৃষ্ঠা ১১)

সদ্য তরুণ কবিকে নিয়ে এলিয়টের এই মন্তব্যের পেছনে কারণ একটিই: নবীনরা যাঁরা লিখতে শুরু করেন তাঁদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত লেখার উত্তাপ ধরে রাখতে পারেন না। ফলে আর লেখা হয়ে ওঠে না। নবীন থেকে প্রবীণ বয়স অবধি আমৃত্যু কবি হয়ে বেঁচে থাকবেন-- এলিয়ট এমন কবিকেই আহবান জানিয়েছেন।

১.২

লিটল ম্যাগাজিন লেখকের আঁতুড়ঘর। এই তত্ত্বের সুতীব্র আকর্ষণে নব্বই দশকে সারা বাংলাদেশে প্রায় আড়াই শত লিটল ম্যাগাজিন ভূমিষ্ঠ হয়। সে সময়ের এক তালিকা থেকে এ তথ্য জানা যায়। সৃষ্টির উত্তেজনায় নব্বই দশকের তরুণ চর্চাকারীদেরকে আবেগের নৌকায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে কতো লিটল ম্যাগাজিন। বিভিন্ন মতবাদ ও দর্শনে ভরপুর সেইসব লিটল ম্যাগাজিন আজকে ত্রিশ বছর পর অধিকাংশ ফসিলে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু লিটল ম্যাগাজিন ও তাঁর সম্পাদক মশায় অক্লান্ত পরিশ্রমে আজো প্রকাশ করে চলেছেন সৃষ্টির নেশায়, আবেগের তাড়নায়। অবৈষয়িক এই প্রকাশনার জন্য আজ পর্যন্ত তেমনভাবে ডোনেশন, বিজ্ঞাপন বা অন্য কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, যেমনটা পেয়ে থাকে বাণিজ্যিক পত্র -পত্রিকা। গত পঁচিশ বছর ধরে বাংলাদেশে উদ্যান লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করছি বিজ্ঞাপন না পেয়ে। নিজ উদ্যোগে। টাকা জমিয়ে। লিটল ম্যাগাজিন মানে আত্মার প্রশান্তি। নিজের চিন্তা, নিজের কথামালা, নিজের দর্শন সম্পূর্ণ কাটাছেঁড়া ছাড়াই প্রকাশের পরম নির্ভরতম জায়গা হলো লিটল ম্যাগাজিন। এখানে লিখেই স্বচ্ছন্দ আনন্দে এগোতে থাকি আমরা। ভবিষ্যতে কী থাকবে আর কী থাকবে না, কী টিকবে আর কোন লেখা টিকবে না, তা বিচার করবে মহাকাল। কিন্তু সান্ত্বনা, নিজের কাজ যথাযথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করে যেতে চাই। এর প্রকৃষ্ট মাধ্যম লিটল ম্যাগাজিন। লিটল ম্যাগাজিন কর্মী হিসেবে পৃথিবীর কাছে হৃদয়কে উজাড় করে লিখে রেখে গেলেও এ পৃথিবীর ঋণ শোধ হবে না। পৃথিবীর দেনা শোধ করার সামর্থ্য কোনো মানুষের কোনোদিন হবে না। কিন্তু লেখক পৃথিবীতে দিয়ে যায় সৃষ্টির নতুন রূপ রস গন্ধ ও পথ। যে পথে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের পাঠক আত্মার প্রশান্তি লাভ করে। লিটল ম্যাগাজিনই সেই প্লাটফর্ম যেখানে একজন কবি চিন্তাকে ও আবেগকে নিরীক্ষার মাধ্যমে পরিস্ফুট করতে পারেন। শিল্পকাজের উৎকর্ষের মধ্যে দিয়ে পাঠকের ভালোবাসার আসনে সমাসীন হওয়া যায়। বাংলাদেশের ষাট দশকের সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কবিতা বিষয়ক বিভিন্ন আড্ডায় তাঁর মুখ থেকে একাধিকবার শুনেছি, তিনি বলতেন " আমি লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমি আমৃত্যু লিটল ম্যাগাজিন কর্মী"..। অগ্রজের কাব্য প্যাটার্ণ, বিষয়, টেকনিক ও শব্দসচেতনতা নিয়ে তাঁর কথাগুলো এখনো কানের সামনে বাজে। আবদুল মান্নান সৈয়দ বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। লিটল ম্যাগাজিনে যাঁরা লিখতে লিখতে এগিয়ে যায়, আসলে তাঁরা প্রতিদিনই নিজেদের সমৃদ্ধ করেন ভাষায়, শব্দ প্রয়োগে, চিন্তায়, টেকনিকে। প্রতিদিন যে শব্দ মানুষ নানাভাবে ব্যবহার করে,সেটি ছাড়া কবির আর কোনো পুঁজি নেই, সেই চারপাশের শব্দকেই কবি নতুন করে নিয়ে আসেন নতুন টেকনিকে, নতুন প্যাটার্নে। এই যে লিটল ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠায় নতুন টেকনিক প্রয়োগ করেন, এতে নতুন করে নতুন ভাষার সীমানা ও সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেন। কখন যে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ কবির হাতে অন্য রকম হয়ে যায়, পাঠক তা টেরও পান না। সেই শব্দ তখন পাঠকের চেতনায় মিশে যায়, পাঠকের নিজের ভাষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তখন সে পাঠকের ভাষায় জায়গা করে নেয়। কবিতায় অক্ষরবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্তের ছন্দের বাইরে কবি সৃষ্টি করেন নিজের এক ছন্দ। প্রবল প্রতিভার কবিরা যুগে যুগে এধরণের নিরীক্ষার বনেদী ছাপ রেখে গেছেন। বাংলাদেশের কবি আবুল হোসেন। তিনি মাত্রাবৃত্তে লেখেন, স্বরবৃত্তে লেখেন, নিজের মতো করে অক্ষরবৃত্তেও লেখেন। কখনো কখনো এমন কবিতা লিখেছেন অগ্রজ কবি আবুল হোসেন যা একই সঙ্গে মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত দুটোতেই পড়া যায়। আবুল হোসেন বাংলা কবিতার ভাষায় গদ্যের স্পর্শ যুক্ত করেছেন। অগ্রজ কবি সমর সেন কবিতা ও গদ্যের দূরত্ব অনেকখানি কমিয়ে এনেছেন, তেমনি আবুল হোসেনও কবিতার ভাষাকে গদ্যের খুব কাছাকাছি নিয়ে গেছেন। স্রোতময় নদীর কিনারে গেলে যেমন ঢেউয়ের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়, পায়ে ঢেউ আছড়ে পড়ে, তেমনি গদ্যের স্রোতকে আবুল হোসেন দারুণভাবে কবিতার শরীরের কাছে নিয়ে এসেছেন। অনুভব করা যায় গদ্যের স্রোত এবং ঢেউ যা পাঠককে দিয়েছে বহু রঙের রঙধনুময় সুখানুভূতি।

১.৩

হোর্হে লুইস বোর্হেস একবার এমার্সন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, " আমার মনে হয় এমার্সন কোথাও লিখেছিলেন যে গ্রন্থাগার হলো মৃত মানুষে পরিপূর্ণ এক ধরণের জাদুর গুহা। পৃষ্ঠা ওল্টানোর মাধ্যমে আপনি সেই সব মৃত মানুষের পুনর্জন্ম ঘটাতে পারেন। তাঁদেরকে জীবন্ত করে তুলতে পারেন।"( কবিতার কারখানা, হোর্হে লুইস বোর্হেস, পৃষ্ঠা -১৫)। যেহেতু হোর্হে লুইস বোর্হেস গ্রন্থ প্রসঙ্গে একথা বলেছেন, আমরা বলতেই পারি, কবিতার বই যখন কোনো পাঠক একাগ্রচিত্তে মনোনিবেশ করেন,তখন সেই কবিতার লাইনগুলো জীবন্ত হয়ে যায়। কবিতা হলো প্রতিবার এক নতুন অভিজ্ঞতা। একটি কবিতা প্রতিবার পাঠ করার সময় এই অভিজ্ঞতা হয়। নতুন কিছু আবিষ্কার হয়। কাজী নজরুল ইসলামের " বিদ্রোহী " কবিতা। শত বছর পরও এই কালজয়ী কবিতার জনপ্রিয়তা ও আবেদন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাৎ এই কবিতা সব সময়ের সব কালের একটি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। চিরকালের সৌন্দর্য ও ইশারা পেতে কবিতার দুয়ারেই কড়া নাড়তে হয়। প্রত্যেক উত্তীর্ণ কবিতাই আসলে এক একটা বিশাল রহস্যের গুহা। ঠিকঠাক মতো প্রবেশ করতে পারলে নিশ্চয় কিছু না কিছু আস্বাদন করা সম্ভব। বিদগ্ধ পাঠক অবশ্য কবিতার শরীর খুঁড়ে খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো বের করে আনেন রূপ রস গন্ধ। কবিতাকে বুঝতে হলে কাব্যের নদীতে সাঁতার জানতে হবে। কারণ, নদী বহমান এবং নদীর পানি পরিবর্তনশীল। যে সকল কবিতার শব্দের দেহ দর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্যের চাদরে আবৃত সেখানে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পাঠ-উত্তর রস আস্বাদন করতে হয়। মনে রাখতে হবে, তিমি মাছের পথ বলতে সমুদ্রকে বোঝানো হয়। তিমির বিশালত্ব আসলে সমুদ্রের বিশালত্বের ঈঙ্গিত দেয়। কবিতার শরীরে উপরে উল্লেখিত তিনটির কোনো একটি কবিতায় আশ্রয় নিলে সমুদ্রের পথ নির্দেশ করে। 

১.৪

নব্বই দশকের যে ট্রেনে আমরা চেপে বসেছি, এখন যে স্বল্প সংখ্যক কবিতাকর্মী এখনো কবিতার ট্রেনে নব্বইয়ের বগীতে অবস্থান করছেন, যাঁরা আজো জানেন না গন্তব্যের শেষ জংশন কোথায়,  তাঁদের চর্চার মধ্যে দর্শন, ইতিহাস, ঐতিহ্য ইতোমধ্যে বারেবারে ফিরে ফিরে দেখা যাচ্ছে। কখনো প্রেমের মেখলা পোষাকে, কখনো শাড়ির জমিনে, কখনো নকশা করা পাঞ্জাবিতে। নব্বইয়ের কবিতা হেঁটে চলেছে সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে যেন বিভাবরী যেখানে জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে পথ চলেছি আমরা, অল্প ক'জন।