Published : 16 Jun 2018, 02:28 PM

অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরার চিত্রকর্ম
এক
থই থই নীলদরিয়ায়
মাঝরাতে নেমে এল ঢল
আমুণ্ড গ্রাসের ক্ষণে বলি
হায় রে যৌবন দেখিনি তো
কণ্টিকারি ঝোপ উপচে পড়ে
বেনা ফুল চোখ খোলে ধীরে
লাজনম্র কিশোরী ভ্রমরা
স্বর্নলতা বুনে গেল কোন
একদিন বরষা মেদুর
মহাকাব্য প্রেমকাহিনির
কাজলদিঘির কালোজলে
চাঁদভাঙা রাতে অন্তহীন
কারাগার শিক বেয়ে পুঁই
অচিন খাঁচার তালা ভাঙে
লালনের বাউল একতারা
ওরে ও মানুষ ভাই ভাই
আর বুঝি সত্য কিছু নাই
হত্যা করে মানুষে মানুষ
হৃদয়গগনে ওঠে চাঁদ
নিচে সাদা লাশের পাহাড়
ঘিরে শুরু মাছির কোরাস
তার ঘ্রাণ জলের ওপরে
কুয়াশায় ভারি হয়ে নামে
শীত স্যাঁতস্যাঁতে মৃত্যুহিম
হঠাৎ গুলির শব্দ ট্যাঙ্ক
মৎস্যকুল মারা পড়ে ঝাঁকে
ঝাঁক বেঁধে যাত্রাপালা গান
নিস্তর্ধনশ্বাসে ছুরে ঢোকে
বন্ধুবক্ষে পাখি উড়ে যায়
প্রাণপক্ষি কোথায় পালায়
লাশ আটকে যায় পাখিদের
ছেড়ে যাওয়া সব পথে
পথহীন তেপান্তরে
লোককথা রূপকথা জুড়ে
মায়াবিনী চোখে হাত রাখে
স্তনের বেদিতে কেশবতী
সাঁধে ধূপগন্ধে মৌ মৌ
হাসির ফোয়ারা ছেয়ে বাঁচে
মানুষ তো শুধুই পতঙ্গ
নয় ছায়া হয়ে ছায়া দিয়ে
পুড়ে যাবে দীপশিখা ঘিরে
কটূগন্ধ উতল বাতাসে
প্রাণপ্রতিমাটি ঘিরে ঘিরে
আত্মহননেও বুঝি সুখ
সুখের লাগিয়া বাঁধে ঘর
জতুগৃহ ঘৃত আর বাঁশ
ছন দিয়ে গড়া মানবিক
ভিত তবু রে মানুষ ভাই
যৌবনের দায় কে মিটায়
সাতরঙা রামধনু তার
পোড়া শব জলে না ভাসাও
দুই
ওগো পান্থ পথহীন খোঁজো
পথের সরাই বৈকুণ্ঠের
তৈলাধার তেলহীন শূন্যে
সপ্তঅশ্ব রঙধনু রঙ
কাহিনির খিলজি পদ্মাবতী
গৌতমসুজাতা পিঠাপিঠি
তোমাতে আমার বলিদান
কালসিটে লেগে আছে তৃণে
এই তবে ইতিবৃত্ত ঘোর
ইতিহাস ধুলো ও বালির
ঝুরঝুর আম্রপালি ঝরে
কদমকেশর কিশোরীর
তোমার অগস্ত্য-যাত্রা পথে
তান ধরে অমর সংগীত
কে গায় তোমার সঙ্গী সে-ও
বন্ধুজন শায়িত চিতায়
প্রতীক্ষায় আমি কবে জাগি
যদি জ্বলেপুড়ে খাঁক তবু
ছুটে আসছে ঘ্রাণ চন্দনের
একদিন আমার দুকর
উপচে শিলাবৃষ্টি ঝড্
মৃতের সৎকারে মৃতজন
আমি শুধু ফিরে চলি গাঁয়ে
কৃষ্ণকণ্ঠ সুর রাধিকার
বহুবার দাহ হল তার
বহুকাল জানাজাকাফন
কবরে চিতার অগ্নিধূম
স্রোত গর্জে ওঠে সাহারায়
ভৈরব শুকয়ে খাঁখা মাঠ
পুকুরে চাঁদের আত্মদান
অমর হয়েও মরে তবে
সেই সব বান্ধব রক্তের
গুলিখাওয়া ধড় নাচেগায়
ধড়ের পাহাড্ ঠেলে উঠে
এল ঘর বাঁধে জলেঢেউয়ে
মৎস্যকুলে জন্ম নিল তারা
হারিয়ে গিয়েও হারায়নি বা
যাদের যৌবন তার শব
ঘাড়ে হাঁটি রোদভাঙি পথে
দুপাশে শস্যের খেত দেখি
বলি ঠাঁই দাও জল নই
বরফচাঙড় হাত দাও
বহুমৃত্যু পার হয়ে বহু
জন্মান্তর আপন ঘরের
দরজা খুলে দাও আমি ঢুকি
হাওয়া যেন বাতাসের
সপ্তরঙ জলের শরীর
ছায়ামূর্তি তবু আত্মজন
তিন
আবছায়া পাখনার ছয়া
চন্দনার ডেকে ওঠে ঢেউ
বলে, ওরা মাছ হয়ে গেছে
পুকুরেদিঘিতে মৎস্যঢেউয়ে
লেজে লেজে জোনাকির আলো
জ্বলে নেভে জ্বলে নাক্ষত্রিক
দুটি চোখ একটি চোখ চোখ
জলসিক্ত জলে ধোয়া জল
মায়ায়ী জগৎ সংসারে
স্যাঁতস্যাঁত জলরঙ ধারা
খসে পড়া দেয়ালে দেয়াল
হাওয়া কাঁদে ছেঁড়াকাঁথা দাঁতে
ধুলোবালি জড়িয়ে জড়ায়
আগন্তুক দুটিপা দুহাত
অলীক স্মৃতির ধোঁয়া কাঁদে
লোকান্তরে কোমল অধীর
ব্যথাতুর সহজিয়া সুর
আউলাবাউলা যৌবনের
ভোর অতি দ্রুত আসে সন্ধ্যা
ধীর পায়ে বিযাদ গম্ভীর
রাত ওষ্ঠ সেঁটে থাকে ওষ্ঠ
যেন পিঁপড়েসারি ঝোলাগুড়ে
ছমছম অস্তরণ ভেঙে
একটি দেহে দহে অন্যদেহ
আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তর
মৃত অবশেষ বহুযুগ
পরিত্যাক্ত উদ্গিরণ লাভা
মুখফসকে একটি উচ্চারণ
আহ্ আহ্ বেহুলা বাসর
সাপ ফিরে এল শতাব্দীর
খানাখন্দ উথাল পাথাল
ভাঙা গড়া ধস নীল নীল
বিষধর খাত বীর্যহীন
কিষাণকিষাণি বারবার
গাঁয়ে ফিরতে পথ ভুল করে
ফণিমনসার আমন্ত্রণে
বিছেয়ে দিয়েছে দুটি দেহ
পরম আহ্লাদে অনিশ্চয়ে
ভোর হয় বিষকাটালির ফুলে
বাঁশি কাঁদে গমকে গমকে
ঢাকঢোলনাকারার বোল
শ্বাসচাপা অস্থির সময়
ফেরা তবে অস্তাচল ঘেরা
কেউ কাঊকে পিষে ফেলবে খাবে
ছুরি ওই গোধূলিআলোতে
দু বাহু বাড়িয়ে এল কাছে
কে কে যেন তার মুখ থেকে
শুষ্কবাষ্প বুকে এসে লাগে।
চার
গ্রহ থেকে উপগ্রহ গ্রহ
গ্রহান্তর চক্রেচক্রমাণ
একটি রাত যৌবন যৌবন
আশানিরাশার দোলাচল
জানালায় মুখ একটি হাত
ভাস্মে ধোঁয়া বক্ষ ভেঙে ঝামা
পাথর পাথর পাহাড়ের
খাদ দু:খ নয় কষ্ট নয়
উদ্গীরণ, যাই তবে আসি
বিদায় বলি না তাই বলে
শব্দগুলি উৎসর্গিত নয়
জীবনের চন্দন বহ্নিতে
হঠাৎ গুলির শব্দ ছত্রাখান
পাখিদের পাখনা পড়ে ভুঁয়ে
শ্বাস টানি বারুদে পাখির
তিনটিলাশ উবু সেজদায়
চেরাগপাহাড় মোড় রেখে
পাহারায়.ওরা আত্মজন
আজ দেখি কোনো মুখচোখ
আঁকা নেই কালের পৃষ্ঠায়
মসীলিপ্ত কই তাও নেই
পরস্পর কেউকাউকে কেউ
হত্যা খুন না করে বরং
পাগল পাগলি করে যাই্
গলায় দলায় ফুলমালা
কাগজের তবু হত্যাযজ্ঞ
নয় নয় সকলে রঙিন
হয়ে যাক কড়িকাঠমুক্ত
হোক রক্ত মৃত্যুর নিশানা
আমৃত্যু এবার জমবে মেলা
পাগল পাগলি উপগ্রহ
পাগল পাগলি মাল্যদান
বাউল বা কীর্তনিয়া গায়
সেই কবে কোন সন্ধ্যাকালে
রসকলি রসে টইটুম্বর
গানেগান পেরিয়ে বইচির ঝোপ
কখোন উন্মাদ করে গেল
সেই থেকে ধুধু দিগন্তরে
খুঁজে মরি বৈরাগীনী কই
ও্ই দূর দিনান্ত ভেলায়
শরীর ভাসিয়ে কে যায় কে
একা নায়ে কোন দিন কোন
দাঁড়বইঠাপাল পড়ে আছে
তিরে বালুঢাকা মরাখাত
শুকপাখি উড়ে, উড়ে কাঁদে
ফিরে আয় কোনো এক
বাসন্তী হাওয়া
জোছনায় জোছনায় লতাপুষ্প
ধরাময়, অচিন বসত,
মিটি মিটি হাসে সরীসৃপ!
পাঁচ
না পোড়াইয়ো চন্দনচিতায়
না ঝুলাইয়ো তমালের ডালে
আজ বলি নির্জনে ভাসাইয়ো
নীলাঞ্জন নীল নীল নীল
সপ্তরঙা জল যেন সপ্তঅশ্ব
ঘোড়দৌড়ে মৃত্যুর উৎসব
ঢেউয়েঢেউয়ে হাস্নুহেনা ডাঁটা
অতলে ডুবেও ডুবিনি তো
ভেসেও ভাসিনি কিছুকাল
কারো চোখে অশ্রুদীপ হয়ে
খুঁজিনি তো মণি কোন কথা
বলে বজ্রপাতে হাড়েমাংসে
তবে কেন লিখি ঘাম ক্ষত
নির্বিকল্প উদাস্যে নিথর
বাজি রাখি প্রজাপতি চোখ
হাঙরের দাঁত বল্লমের ফলা
দখলে নিয়েছে বধূটির
বুক চিরে ঠিকরে পড়া দুধ
সর্পিণীদংশনে নীল নীল
হতে হতে শরীরশিউরণে
চোখ মেলি জাদুমন্ত্র বলে
জলে ভাসি জলে ঘুম যাই
স্বপ্নে শুনি কে যেন কইছে বা
খ্যাপা তোর হ্যাপা না যাবে না
দুইপাড়ে শস্যখেতে গোর
জীবনেতে মরণসংগীত
মরণেতে কালের নিনাদ
সেই দিন হারিয়ে যাওয়ার
খুইয়ে ফেলা অমল প্রভাত
তাই নিয়ে জলের বাসর
সূর্য় উঁকি দেয় জানালায়
শরীরে ভেঙেছে রাঙাস্রোত
এক মহাকাব্যিক সকাল
মুখ দেখি হাসি খলখল
কুয়াশা ধুঁয়াশা জমে জমে
নীলবরফের দেহদুটি
জ্বলে যায় জলে গৃহকোণ
সূর্যলোকে অচিন পাথারে
মৎস্যকুলে জন্ম নেই ফের
মীনকুমারীর দেহ নীল
ওষ্ঠ নীল ক্ষুব্ধ অভিমানে
কতকাল প্রত্যাখান সয়
জল বাঁশ জল ছন বাঁশি
সুর স্বর কষ্ট শুষে নেয়া
ঘর বাঁধি জলজ সংসার