ওরা আমায় সিংহ বলত

হালামিশদের এই আস্তানার পাশেই রয়েছে সেনাছাউনি। যাদের কাজ ইহুদিদের যাবতীয় সুবিধে অসুবিধে দেখা আর আমাদের জীবন নরক করে দেওয়া।

অর্ক দেবঅর্ক দেব
Published : 29 Oct 2023, 08:29 AM
Updated : 29 Oct 2023, 08:29 AM

আহেদ তামিমি ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর বাবা প্যালেস্তাইনের মুক্তি আন্দোলনের শরিক। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইজরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদের শাস্তি হিসেবে তাকে তুলে নিয়ে যায় সেনা। তামিমিকে অবশ্য বিশ্ব চিনেছে অনেক আগেই। ভাইয়ের গ্রেফতারির সময় তর্জনি তুলে ইজরায়েলি মিলিটারির সঙ্গে বাহাসে জড়িয়ে পড়লে সেই ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তখন তার বয়স এগারো। এর তিন বছর বাদে পাথর ছোড়ার অপরাধে ইজরায়েলি বাহিনী তাঁর ভাইকে ফের বাড়ি থেকে তুলে নিতে গেলে তাকে এক সেনাকর্তার সঙ্গে  ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। জ্ঞান হওয়া ইস্তক প্রিয়জনদের অত্যাচারিত হতে দেখা মেয়েটির সশস্ত্র সেনাকর্তাকে চড় কষাতে হাত কাঁপেনি। দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদের সেলে বসে যখন মূত্রথলি ফেটে যাওয়ার জোগাড়, অথচ তাক করে রাখা ক্যামেরার ভয়ে বাথরুমে যাওয়া যাচ্ছে না, তখন সে সিদ্ধান্ত নেয়, বিশ্বকে সব জানিয়ে দেবে সে। এই লেখা তামিমির মতো কয়েক লক্ষ ফিলিস্তিনির সঙ্গে হওয়া চরম অন্যায় আর তামিমিদের দেশপ্রেমের দলিল।

দেনা তাকরুরি এই লেখায় তামিমির সই। দেনা ফিলিস্তানি শরণার্থীর সন্তান। বড় হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বারবার ফিরে গেছেন বাপ মায়ের ভিটেয়।  বর্তমানে তিনি AJ+ এ কর্মরত। লিঙ্গনিরপেক্ষতার কারণে They Called me Lioness (২০২২) শিরোনামের সিংহ শব্দটি বেছে নেয়া হয়েছে। বইটি মূলত আহেদ তামিমির বয়ানে রচিত। দেনা তাকরুরি বইটি সম্পাদনায় সহায়তা করেছেন। ইংরেজি থেকে পুরো বইটি অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক অর্ক। আজকে বইটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো। বি. স.

আমি বড় হয়েছি ওয়েস্ট ব্যাঙ্কের ছোট্ট গ্রাম নবি সলেহ-তে। প্যালেস্টাইনের সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র, প্রবল জীবন্ত আর সম্ভাবনাময় শহর রামাল্লা থেকে গাড়িতে নবি সলেহ পৌঁছতে ২৫ মিনিট সময় লাগে। নবি সলেহ অবশ্য রামাল্লার ঠিক উল্টো, ভীষণ ছিমছাম আর সাধারণ। আমাদের গ্রামে একটা স্কুল, একটা মসজিদ, একটা বাজার, একটাই গ্যাস স্টেশন। তবে সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের আছি আমরা, অনেকে। এই গ্রামের ছ'শো বাসিন্দা পরস্পরের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে বা বৈবাহিক সম্পর্কে জুড়ে আছে, সকলেই বৃহত্তর যৌথ তামিমি পরিবারের অংশ। আমার ছাত্রজীবনের সহপাঠী বন্ধুরা আদতে ছিল আমার তুতো ভাই-বোন। এটা একটা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা গোষ্ঠী যেখানে একে অন্যের খোঁজ নেওয়া রোজের রুটিন। এমনটাই চলে আসছে কয়েক শতক ধরে। 

একবার দেখলেই নবি সলেহকে মনে হবে ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়। রমণীয়, সুখে পরিপূর্ণ একটা গ্রাম, বিন্দু বিন্দু অসংখ্য জলপাইগাছকে আশ্রয় দিয়েছে যে পাহাড়ের সারি, যে জলপাইবনে প্রায়শই বুনো ঘোড়া আর গাধা চড়ে বেড়ায় - তার ঠিকানাও এই গ্রাম। এখানে অবাধ সূর্যাস্তের লাল বেগুনি সোনালি রঙের ম্যাজিক দেখা যায়। এখানে ছোটরা মুক্তভাবে খেলে বেড়ায়, এ বাড়ি ও বাড়ি দৌড়োদৌড়ি চলতেই থাকে, বড়রা এইসব খুদেদের মুখে ঘরোয়া খাবার ঠুসে দেয়।

কিন্তু প্রাথমিক ছবিটা আপনাকে পুরো গল্পটা বলবে না কখনও। গোটা গল্পটা জানতে আপনাকে আমাদের গ্রামের ওই মূল রাস্তাটায় তাকাতে হবে, চোখ রাখতে হবে উপত্যকার অন্য প্রান্তের পাহাড়গুলির দিকে। ওদিকেই ইজরায়েলি ইহুদি হালামিশদের প্রাচীর ঘেরা জনবসতি -- লাল টালির সুসজ্জিত বাডি, চকচকে বারান্দা, খেলার মাঠ, সুইমিং পুল।  হালামিশরা চিরকাল এখানে ছিল না। ১৯৭৭ সাল নাগাদ বেআইনি ভাবে ওরা আমাদের গ্রামের জমি দখল করে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলিদের গড়ে তোলা কয়েকশো বসতির একটা এটা। এই বসতিগুলিতে মূলত ইজরায়েলি ইহুদিরাই থাকে। এবং ক্রমেই স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের তুলনায় চক্রবৃদ্ধি হারে ওরা সংখ্যায় বাড়তে থাকে। বছরের পর বছর আমরা দেখছি, ইজরাইলের রাষ্ট্রীয় মদতে হালামিশরা আমাদের জমিজিরেত, সম্পদ কেড়ে নিয়ে নিজেদের আস্তানার পরিধি বাড়িয়ে চলেছে। ইজরায়েল সরকার শুধু এই জায়গাগুলিতে ইহুদিদের থাকার ব্যাপার অনুমোদনই করেনি, যাবতীয় ব্যবস্থাপনা তাদের নেতৃত্বেই হয়েছে। হালামিশদের এই আস্তানার পাশেই রয়েছে সেনাছাউনি। যাদের কাজ ইহুদিদের যাবতীয় সুবিধে অসুবিধে দেখা আর আমাদের জীবন নরক করে দেওয়া।

এই নবী সালেহ আসলে প্যালেস্টাইনের একটা ক্ষুদ্রতম সংস্করণ। গত এক শতক ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের জমি কেড়ে নেওয়ার জিওনিস্ট প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লড়ছে।  জিওনিসম এক ধরনের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যা উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপে ইহুদিদের হাত ধরে শুরু হয়। এই আন্দোলনের জন্মদাতারা বিশ্বাস করতেন ইউরোপ জোড়া ইহুদীবিদ্বেষের উত্তর প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপন, তখন পর্যন্ত যা ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত; আরব অধ্যুষিত, যার সংখ্যাগুরু ছিল মুসলিম, পাশাপাশি ছিল খ্রিস্টান এবং সংখ্যালঘু ইহুদিরা। খুব অল্প সংখ্যক ইহুদি সে সময় এই আন্দোলনে যোগ দেয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জিওনিস্ট আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের মদত পায়।

১৯১৭ সালে ব্রিটিশরা বেলফ্যুর প্রস্তাবনা সামনে আনে যেখানে প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের একটি জাতীয় আশ্রয়স্থল গড়ে তুলতে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই অটোমানদের হাত থেকে প্যালেস্টাইনের দখল চলে যায় ব্রিটিশের হাতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনাধীন এই সময়তটে পূর্বপ্রতিশ্রুতি মাফিক কয়েক হাজার ইউরোপীয় ইহুদির অভিবাসনের ব্যবস্থা হয়েছিল প্যালেস্টাইনে। যে জমি ব্রিটিশের নিজের নয় সে জমি মূলনিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তানিদের মতের তোয়াক্কা না করে তারা ইহুদিদের দিয়ে দিয়েছিল।

এই কাজের মাশুল ঘটনাক্রমে তাদেরই দিতে হয়েছিল। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৯ ফিলিস্তানিরা গোটা দেশ জুড়ে ব্রিটিশ এবং তাদের জিওনিস্টপন্থী নীতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে। এই ঘটনা আরব বিদ্রোহ নামে পরিচিত। অতি নিষ্ঠুরভাবে এই বিদ্রোহ দমন করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু ঘটনার নিষ্পত্তি হয়নি। ১৯৪৪ সালে বহু সশস্ত্র জিওনিস্ট গোষ্ঠী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই আক্রমণ শানাল, ব্রিটিশরা তখন প্যালেস্টাইনে ইহুদি অভিবাসন আটকাতে মরিয়া। জিওনিস্টরা চাইত এই মাটি ছেড়ে ব্রিটিশরা চলে যাক। ক্রমেই তারা এই ভূখণ্ড ব্রিটিশের জন্য অসহনীয় এবং বিপজ্জনক করে তুলছিল। ১৯৪৭ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা ঠিক করল- অনেক হয়েছে, আর নয়। দায় ঝেড়ে প্যালেস্টাইন সমস্যার ভার তারা রাষ্ট্রপুঞ্জের হাতে তুলে দেয়।

মনে রাখতে হবে, এই সময়তটেই নাৎসি নিধনযজ্ঞ হয়ে গিয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৬০ লক্ষ ইহুদির। এই ঘটনায় ইউরোপের ইহুদিরা শুধু বিধ্বস্ত হলো না, বদলে গেল প্যালেস্টাইনও। হলোকাস্টের পরিণতি হিসেবেই হাজার হাজার  ইহুদি ভয়ে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে প্যালেস্টাইনে ঢুকে পড়তে লাগল। হিটলারের ক্যাম্প থেকে ইহুদিদের রক্ষা করতে না পারার লজ্জায়, ঘরোয়া পরিস্থিতির কারণে এক সময় যারা অভিবাসন আটকাতে বাধ্য হয়েছিল সেই সব আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী প্যালেস্টাইনের অভ্যন্তরেই জিওনিস্টদের নতুন দেশের দাবি মেনে নিল। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ প্যালেস্টাইন ভাগের বিষয়ে অনুমোদন দিল। এক ভাগ হলো ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েল, অন্য ভাগ আরব রাষ্ট্র প্যালেস্টাইন, আর জেরুজালেম রইল আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে।

এই দেশভাগের ফলে প্যালেস্টাইনের ঐতিহাসিক ভূমির ৫৫ শতাংশই পেল ইহুদিরা আর ৪২ শতাংশ থাকল আরব রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনের হাতে। যদিও তখনও পর্যন্ত এই দেশের জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশই ছিল  ফিলিস্তানি। স্থানীয় বেশিরভাগ জমিই ছিল তাদের। আর জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ এবং জমির ৭ শতাংশ ছিল ইহুদিদের হাতে। ফলে প্যালেস্তাইনের ভূমিপুত্ররা এই পরিকল্পনা কিছুতেই মানতে চাইল না। কেন তারা জিওনিস্ট উপনিবেশবাদীদের হাতে নিজেদের জমি তুলে দেবে? অন্য দিকে জিওনিস্টরা উৎসবে মেতে উঠেছিল কেন না শেষমেষ তারা তাদের ইহুদি রাষ্ট্রের দাবি পূরণ করতে পেরেছিল। এখান থেকেই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে  সংঘাতের শুরু।

১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইজরায়েল রাষ্ট্রগঠনের কথা ঘোষণা করল। কোনো জনশূন্য জায়গায় নয়। এই রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল আমার বাপ ঠাকুরদার জমিতে, ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইনে। রাষ্ট্রগঠনের জন্য ইউরোপীয় ইহুদিরা এমন এক ভূখণ্ডকে বেছে নিল যার অধিকাংশ মূলনিবাসীরা আসলে ফিলিস্তানি। এই রাষ্ট্র দখল করার জন্য সেদিন নৃশংসভাবে বহু ফিলিস্তানিকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। আজও বহু জিওনিস্ট চিন্তাবিদ মুক্তকণ্ঠেই বলেন ১৯৪৮ সালের এথনিক ক্লেনজিং না হলে তারা রাষ্ট্র দখল করতে পারত না।

ফিলিস্তিনিরা বেদনা ভরে আজও এই ঘটনাকে 'আল নাকাবা' বা 'বিপর্যয়' হিসেবে স্মরণ করে। নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের জন্য ইজরায়েল সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিজেদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল, ৪০০-র বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম নির্মূল করে দিয়েছিল। হাতেগোনা কিছু ফিলিস্তিনি নিজেদের ঘরবাড়ি আঁকড়ে  কোনোমতে টিকে থাকতে পেরেছিল,  কিন্তু ততদিনে তাদের ঠিকানাটা আধুনিক ইজরায়েল হয়ে গিয়েছে। এই সময় আরব দেশগুলি সম্মিলিত হয়ে ইজরায়েলকে আক্রমণ করে কিন্তু এই নতুন জিওনিস্ট রাষ্ট্রকে, যে রাষ্ট্র সেই সময় লক্ষ লক্ষ মার্কিন ডলার যুদ্ধ অনুদান হিসেবে পেয়েছিল, হারাতে ব্যর্থ হয়। জর্ডন এই সময় পূর্ব  জেরুজালেম এবং ওয়েস্ট ব্যাংক ( যার অভ্যন্তরে নবী সালেহ স্থিত) দখল করতে সমর্থ হয়, গাজার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইজিপ্টের হাতে। শেষমেষ দেখা যায়, রাষ্ট্রপুঞ্জ ইজরায়েলকে প্যালেস্টাইনের যে অংশটুকু দিয়েছিল তার থেকে অনেকটা বেশি ভূখণ্ডের দখল নিচ্ছে ইজরায়েল।

ইজরায়েলের এথনিক ক্লেনজিং, আমাদের ভূ-খণ্ডের উপর দখলদারি আর বুক ফুলিয়ে তার প্রচার ১৯৪৮ সালে শেষ হয়নি। বলা ভালো কোনদিনই শেষ হয়নি। আজও সারা বিশ্বজুড়ে সত্তর লাখের বেশি কয়েক প্রজন্মের ফিলিস্তিনি শরণার্থীর বাস। এটা পৃথিবীর দীর্ঘতম অমীমাংসিত শরণার্থী সমস্যা। এমন বহু ফিলিস্তিনি আছেন যে বাড়ি থেকে তাদের এক সময় উচ্ছেদ করা হয়েছিল সেই বাড়ির চাবিটা তারা নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, এই আশায় যে একদিন তাদের নিজেদের বাস্তুভিটেয় প্রত্যাবর্তনের অধিকার পাবে তারা, যে অধিকার আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সমর্থিত কিন্তু ইজরায়েল রাষ্ট্র দ্বারা অস্বীকৃত।

প্যালেস্টাইনের আরো জমি ইজরায়েল দখল করা শুরু করে ১৯৬৭ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্রতিবেশী আরব সৈন্যদের হেলায় হারিয়ে ইজরায়েল গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, পূর্ব জেরুজালেম করায়ত্ত করে। সেই তখন থেকে যে প্যালেস্টাইনের এই ভূখণ্ডগুলিতে সেনা আগ্রাসন শুরু হয়েছে আজও শেষ হয়নি।

বিদেশি সেনার আগ্রাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানে সারাক্ষণ রাষ্ট্র দ্বারা মান্যতাপ্রাপ্ত হিংসার বাতাবরণে থাকা। স্বাধীনতার পূর্ণ অনুপস্থিতি, যা আজকের ৫০ লক্ষ ফিলিস্তিনির নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্যালেস্টাইন আজ অধিকৃত ভূখণ্ড। আমরা ইজরায়েলি নই, অতএব আমাদের কোনো বলবার মতো কথাই যেন থাকতে পারে না। যে রাষ্ট্র প্রতিদিন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, তারা আমাদের ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছে। আমরা কোনোরকম ভবিষ্যত পরিকল্পনায় অক্ষম,  আমরা স্বাধীনভাবে ঘোরাঘুরিতে অসমর্থ। নিজেদের ভূখণ্ডে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে আমাদের সামরিক চেকপয়েন্ট-এর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, এভাবেই আমরা আটকে আছি। নিজের দেশে বাড়ি করতে গেলে আমাদের অনুমতি নিতে হয়। কাজ করা, ঘুরতে যাওয়া-- মানে যে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার এবং স্বাধীনতাগুলি নাগরিক জীবনে এমনিই পাওয়া যায়, এই সামরিক আধিপত্যে তার রেশটুকুও আমরা পাই না। এই জীবন সহজ না কিন্তু আমি এই জীবনটাই আমরা জ্ঞান হওয়া ইস্তক জেনে এসেছি।

আমাদের নিয়ন্ত্রণ করা, আমাদের অধিকারগুলিকে খর্ব করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই ইজরায়েল যুক্তি দেয়, নিরাপত্তার প্রশ্নেই এসব করা হচ্ছে। ইজরায়েলের বাসিন্দারা এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি সমর্থকরাও বিশ্বাস করে ভূমিচ্যুত হওয়ার ভয়ে ইজরায়েলকে এটা করতে হয়। কিন্তু তথ্য অন্য কথা বলে। ইজরায়েল পারমাণবিক অস্ত্রে বলীয়ান দেশ। ১৯৭৯ ও ১৯৯৪ সালে তারা প্রতিবেশি আরব দেশ ইজিপ্ট-জর্ডনের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে একগুচ্ছ আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে।  কিন্তু তা সত্ত্বেও ইজরায়েল ফিলিস্তিনিদের জমি বাজেয়াপ্ত করা, জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলা, ছড়ি ঘোরানো থামায়নি।

এক ধরনের বর্ণবাদ কায়েম করে এই ঘটনাটা ইজরায়েল ঘটায়। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ শব্দটি ব্যবহার হয়েছিল যা আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গদের বৈষম্যবাদী শাসনব্যবস্থার সূচক। বর্ণবাদী ব্যবস্থা একই ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পৃথকীকরণ এবং নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বৈষম্যকে বৈধ করে। ইজরায়েলি বর্ণবাদ বলতে বোঝায় মূলনিবাসী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি প্রভুত্বকে। ইজরায়েলি ইহুদিরা, তারাও যারা আমাদের ঘাড়ে জোর করে চেপে বসেছে, সমস্ত গণতান্ত্রিক সুযোগ সুবিধা এবং নাগরিক অধিকার ভোগ করে। কিন্তু এই অধিকৃত ভূখণ্ডে আমরা ফিলিস্তিনিরা সেসব কিছুই পাই না।  ইহুদিরা ইজরায়েলিরা শাসিত হয় ইজরায়েলি নাগরিক আইন দ্বারা, আর আমরা শাসিত হই ইজরায়েলি সামরিক আইন দ্বারা। এমনকি এই বৈষম্যকে জিইয়ে রাখার জন্য রঙের কোড দ্বারা আমাদের চিহ্নিত করার ব্যবস্থাপনা আছে। বলপূর্বক আমাদের সবুজ রঙের কার্ড রাখতে বাধ্য করা হয়, যা আমাদের জীবনের সুযোগসুবিধেগুলিকে প্রতিনিয়ত খর্ব করে। আমাদের গাড়িতে যে সাদা লাইসেন্স প্লেটটা ইসরায়েল লাগিয়ে দেয় সেটা থেকেই নির্ধারণ করা হয় আমরা কোন রাস্তায় যেতে পারি আর কোন রাস্তায় যেতে পারি না। এদিকে মসৃণ বাইপাসগুলি তৈরিই হয়েছে দখলদারদের জন্য। সেসব রাস্তায় আমরা যেতে পারি না। হলুদ লাইসেন্স লাগানো ইজরায়েলি গাড়িগুলোই সেসব রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়।

কিন্তু আমরা ফিলিস্তিনিরা কখনও হাঁটু মুড়ে এই জীবনকে মেনে নিইনি। দেশপ্রেম আর অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের নেশা ফিলিস্তিনিদের শিরায় শিরায় বইছে, বিশেষত আমার গ্রামের নাগরিকদের তো বটেই। আমরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধেও লড়াই করেছি, যখন তারা প্যালেস্টাইনের দখল নিয়েছিল। ১৯৪৮-এর যুদ্ধে আমরা লড়েছি। এবং যখন ইজরায়েলের অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা শুরু হলো,  এই নবি সলেহর অধিবাসীরা প্রত্যাঘাত করেছিল। 

১৯৬৭ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের পর, ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের একটি নতুন আন্দোলন জন্ম নিল। ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদীরা বলতে লাগল বাইবেলের সময় থেকে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক তাদের ঈশ্বরপ্রদত্ত  জমি। আমার বাবা, বাশেম, ১৯৭৭ নাগাদ তিনি যুবক ছিলেন। এই সময়েই ইহুদি বসতিস্থাপনকারীরা আমাদের গ্রামে এসে নির্মাণকাজ শুরু করে, এই চুরি এবং সাম্রাজ্যবাদ রুখতে যারা লড়েছিল, বাবা তাদের একজন ছিল। দশ বছর বয়স হওয়ার আগেই তাঁকে লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে মারা হয়েছিল।  কিন্তু মুক্ত প্যালেস্টাইনের আশায় আন্দোলনের জন্য জীবন উৎসর্গ করা থেকে দমানো যায়নি --- এর জন্য তাকে বড় মূল্য দিতে হয়েছিল।  ১৯৮৮-২০১৩ সালের মধ্যে পুলিশ তাকে ন'বার গ্রেফতার করে।  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই 'প্রশাসনিক কারণে বন্দি' হওয়া ভাগ্যে ছিল তাঁর। এই প্রশাসনিক বন্দিত্ব একটা বিশেষ ব্যবস্থা যা ইজরায়েল ব্যবহার করে যে কোনো ফিলিস্তিনিকে বিনা বিচারে কোনো অভিযোগপত্র ছাড়া ছ'মাস বন্দি করে রাখার জন্য। এমনকী ছ'মাস পরেও আবার বন্দিত্বের মেয়াদ সামরিক-প্রশাসনিক নির্দেশে বাড়িয়ে নেওয়া যায়। বহু ফিলিস্তিনি বছরের পর বছর তারা আদতে কী অন্যায় করেছেন না জেনেই এই বন্দিদশায় কাটাতে বাধ্য হন। আমার শৈশব স্মৃতির যতটায় আমার বাবার উপস্থিতি রয়েছে, ঠিক ততটাতেই আমার বাবার অনুপস্থিতিও রয়েছে। বাবাকে ছাড়া বাঁচায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠা খুবই কঠিন কিন্তু আমাদের কোন উপায়ন্তর ছিল না। রুক্ষ বাস্তবটা মেনেই নিতে হতো-- বাবা হয়তো আমাদের জন্মদিনে এবারেও থাকবে না, খুশির ঈদেও হয়তো তাকে আমরা পাব না।

আমার শৈশব স্মৃতির একটা নাকাব মরুভূমিতে একটা ইজরাইলি বন্দিশিবিরে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া। আমার তখন তিন বছর বয়স। তখন ইজরাইলি কর্তৃপক্ষ বন্দিদের পরিবারবর্গকে রান্না করে তার প্রিয়জনদের জন্য নিয়ে আসার অনুমতি দিত। আমার মা মধ্যরাত্রে ঘুম থেকে উঠে আঙুর পাতার একটা পদ অথবা গোমাংস ও মসলা দেওয়া নানাপদ বানিয়েছিল বাবার জন্য। তারপর আমাকে এবং আমার ভাই ওয়ায়েদকে মা ঘুম থেকে জাগায় মা। ভোর হওয়ার আগেই আমরা দূরের বাস ধরার জন্য প্র‍স্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। ওখানে পৌঁছানোর পর আমাদের সারা শরীরে তল্লাশি করা হতো। তারপর ওয়েটিং রুমে বসতে দেওয়া হতো। দেখা করার সময় এলে একটা টেবিলে বাবার মুখোমুখি বসতাম আমরা। যার মাঝখানে একটা ধাতব দেওয়াল তোলা।  সেই দেওয়ালের এক প্রান্তে বাবা অন্য প্রান্তে আমরা। ছিদ্রগুলো দিয়ে বাবার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমার মনে আছে ওই সরু ছিদ্রগুলি দিয়ে আঙুল ঢুকিয়ে  আমি বাবাকে ছুঁতে পেরেছিলাম। ছোট হওয়ার কারণেই বাবাকে ছুঁতে পারলাম, এ কথা ভেবে আমার আনন্দ হয়েছিল।

(চলবে)