`শিনুকের শহর' লেথব্রিজে দুদিন
কিন্তু, আলবার্টা প্রদেশের ছোট শহরগুলোর অন্যতম লেথব্রিজের মতো শান্ত, সৌম্য ও দৃষ্টিনন্দন শহরগুলো সচরাচর কারও লেখার বিষয় হয়ে ওঠে না।
১.
পরিবারের সবচেয়ে ছোটজন, আয়মান, দূরের প্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাওয়ায় এডমন্টন শহরে আমাদের বাসাটা হঠাৎই ফাঁকা হয়ে গেল। ওকে আমরা আদর করে ‘বেবি’ বলে ডাকি। তিনতলার বাসায় কখনো বেইজমেন্টে, কখনো মেইন ফ্লোরে, কখনোবা ওপরের তলায় - সারাক্ষণই ঘুরে বেড়াত সে। আর আমরা, মা-বাবা মিলে, কারণে-অকারণে তাকে ‘বেবি’ বলে ডাকতাম। কী সুন্দরই না ছিল সেই দিনগুলো!
প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে অন্টারিও প্রদেশের ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বড়ো ভাই সাঈদের সাথে আয়মান উড়াল দিল মধ্যরাতে। তাকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে বাসায় ফিরে সেদিন রাতে ঘুম বলতে তেমন কিছুই হয়নি। আয়মান ওখানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে।
আলবার্টা প্রদেশের লেথব্রিজ শহরের বাসিন্দা আমার বুয়েটের বন্ধু মহসিন কবির বেশ কিছুদিন ধরেই সপরিবারে তাদের বাসায় বেড়াতে যেতে বলছিল। আয়মানের চলে যাওয়ায় আমার মন খারাপ দেখে আমার সহধর্মিণী বলল, ‘চলো, মহসিন ভাইয়ের ওদিক থেকে ঘুরে আসি; ভাই-ভাবি কতবারই না তোমাকে তাদের ওখানে যেতে বলেছেন। আমার তো মনে হয়, এটাই মোক্ষম সুযোগ - একদিকে নতুন একটা শহর ঘুরে দেখা হবে, অন্যদিকে মনটাও খানিক চাঙ্গা করা যাবে।’
বিদুষী সহধর্মিণী হালিমা আফরিনের কথাটা মনে ধরল। দেরি না করে বন্ধুকে ফোন দিলাম। ফোন ধরলেন আমাদের প্রিয় শিখা ভাবি, বন্ধুর স্ত্রী। কুশল বিনিময়ের পর ভাবি ফোন দিলেন মহসিনকে।
বন্ধু শুনল আমাদের ‘বেবি’র বাসা ছেড়ে যাওয়ার কথা। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আমার এই বন্ধুটি সরকারি চাকরি করে। তাই, ছুটি নেওয়া তার জন্য খুব কঠিন কিছু নয়। সে বলল, ‘এক্ষুনি রওনা দাও। আমি আজ ছুটি নিয়ে নিচ্ছি। তোমার ভাবিও ছুটি নেবে। চলে এসো দ্রুত।’
শিখা ভাবি ওদের শহরের সবচেয়ে বড় ওয়ালমার্ট স্টোরের একটি বিভাগের ম্যানেজার। কর্মক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় মনোয়ারা নামে।
২.
আমার বাসা থেকে ক্যালগেরি ট্রেইল নামের হাইওয়ে ধরে সোজা চলে যাওয়া যায় লেথব্রিজ। গাড়িতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ।
দুপুরের হালকা খাবার সেরে আমি আর আমার সহধর্মিণী যাত্রা শুরু করলাম আমাদের টয়োটা হাইল্যান্ডার গাড়িতে। বছর দশেক আগে গাড়িটি কিনেছিলাম। জ্বালানি একটু বেশি খরচ হলেও বেশ নির্ভরযোগ্য; দীর্ঘ যাত্রার জন্য বেশ উপযোগী। গাড়িতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে আমরা রওনা হলাম।
ক্যালগেরি ট্রেইল নামের মহাসড়ক ধরে প্রায় এক ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর গুগল ম্যাপ তুলনামূলক দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অন্য একটি রাস্তা দেখাল। ক্যালগেরি ট্রেইল ছেড়ে সেই রাস্তা ধরলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, এটি একটি আনডিভাইডেড (অবিভক্ত) হাইওয়ে, অর্থাৎ বিপরীতমুখী গাড়ির লেনের মাঝে কোনো বিভাজন নেই। ফলে চোখ-কান খোলা রেখে খুব সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, যাতে ভুল করে বিপরীতমুখী লেনে ঢুকে না পড়ি। আগে বুঝতে পারলে হয়তো কয়েক মিনিট বেশি সময় লাগলেও ক্যালগেরি ট্রেইলেই থাকতাম। যাক, যা হওয়ার হয়ে গেছে। মহাসড়কে উঠে আফসোস করার সুযোগ নেই।
মহসিন আচমকা প্রশ্ন করে, ‘দোস্ত, প্রিয়ার সঙ্গে কি তোমার যোগাযোগ আছে?’
চোখ মুছতে মুছতে আলসেমির সঙ্গে উত্তর দিলাম, ‘বছরখানেক আগে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে একবার কথা হয়েছিল।’
- ভিডিও না অডিও?
- ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভিডিও ঠিক আছে কি না। ও বলেছিল, ভিডিও কাজ করছিল না।
এই প্রিয়া আমাদের বুয়েটের আরেক ক্লাসমেট, যাকে ইঙ্গিত করে ক্লাসের কিছু বন্ধু আমার সঙ্গে ঠাট্টা করত। বাস্তবতা হলো, আমাদের দুজনের মধ্যে সহপাঠীসুলভ বন্ধুত্বের বাইরে কিছুই ছিল না। বেশভূষায় ক্লাসের অন্য মেয়েদের চেয়ে প্রিয়া বেশ আধুনিক ছিল বলে সে সবসময়ই আলোচনায় থাকত। সে সময়ের তরুণী মেয়েটির দৃষ্টিতে ছিল সমুদ্রের গভীরতা, আর মনটা ছিল ভীষণ সরল। আমার লেখালেখি সে ভীষণ পছন্দ করে, আর সেটি জানাতেই মূলত সুদূর আমেরিকা থেকে আমাকে ফোন করেছিল সেদিন, এর অধিক কিছু না।
আমি নিশ্চিত, বন্ধু মহসিন আমার ঘুম ভাঙাতেই হঠাৎ আমাদের এই পুরোনো বন্ধুর প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিল।
ওদিকে শিখা ভাবীও মজার এক গল্প বললেন।
আমার স্ত্রী ভাবীর কাছে জানতে চাইলেন, তাঁর সুন্দর থ্রি-পিসটি কোথা থেকে কেনা।
উত্তরে ভাবি বললেন, ‘গতবার দেশে গেলে ঢাকার এক মার্কেট থেকে আমার এক ভাবীর সহায়তায় এটি কিনেছি।’
আমার স্ত্রী প্রশ্ন করলেন, ‘ভাবীর সহায়তা নিতে হলো কেন?’
শিখা ভাবী বললেন, ‘কারণ, আমি কানাডা থেকে গিয়েছি বললে সেলসম্যানরা নাকি সবচেয়ে ভালো ও দামি কাপড়গুলো দেখাতো না। তারা মনে করে, কানাডায় যারা থাকে তাদের হাতে তেমন টাকাপয়সা থাকে না।’
- ‘তাহলে কোন দেশে থাকি বলতে হবে?’ আমার স্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করেন।
- বাংলাদেশে। কারণ, বাংলাদেশে এদিক-ওদিক করে যত সহজে টাকা কামানো যায়, কানাডা-আমেরিকার মতো দেশে সেভাবে পারা যায় না। দোকানের সেলসম্যানরা এটা বেশ ভালোই জানে। তাই, সেলসম্যানের সঙ্গে কথা বলে ভাবিই দরদাম ঠিক করে কিনে দিয়েছেন।
বাস্তবে তো এর বিপরীত হওয়া উচিত ছিল - কানাডার এক ডলারে না বাংলাদেশের প্রায় একশ টাকা হয়ে যায়!
৩.
একসময় রোড সাইন দেখে বুঝলাম, আমরা ওয়াটারটন লেইকে প্রবেশ করছি।
ওয়াটারটন লেইক ন্যাশনাল পার্ক কানাডার আলবার্টা প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এক অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। এখানে বিস্তীর্ণ প্রেইরি বা তৃণভূমি এসে রকি পর্বতমালার সুউচ্চ পাহাড়ের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পাহাড়, হ্রদ, জলপ্রপাত, গিরিখাত ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য মিলিয়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি এক চমৎকার গন্তব্য।
গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি।
পার্কের প্রবেশমুখে দায়িত্বে থাকা এক কর্মী হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে বললেন, ‘পার্কিংয়ের স্পট নাও পাওয়া যেতে পারে, তবে আপনারা ঘুরে দেখতে পারেন।’
ঘুরতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি স্পট পাওয়া গেল। গাড়ি রেখে আমরা সবাই সোজা লেইকের দৃশ্য উপভোগ করতে হাঁটতে লাগলাম।
সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝে নীল পানির বিশাল বিস্তার দেখে খানিকটা স্থির হয়ে গেলাম। দুধারে পাহাড়ে ঘেরা নীলাভ লেইকের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, কোনো অভিজাত রাজপ্রাসাদের বিশাল খোলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অবলোকন করছি। পাহাড়, জল আর আকাশের অপূর্ব মিতালিতে মুহূর্তটি যেন হয়ে উঠেছিল এক স্বপ্নিল ক্যানভাস।
কথা ছিল চা-পানি খাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে দেখি, গলদা চিংড়ি, ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে কোনো কিছুই ডিনারের টেবিলে বাদ পড়েনি। আমাদের জন্য অসাধারণ সব রান্না হয়েছে। মরিয়ম ভাবীকে রান্নায় সহযোগিতা করেছে তাদের পিএইচডি করা কন্যা। কানাডায় জন্ম আর বেড়ে উঠা মেয়েটিও সারাক্ষণ আমাদের সাথেই ছিল। আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা ছেলেমেয়েদের চেয়েও সে অনেক ভালো বাংলা বলে দেখে বেশ পুলকিত হলাম।
চা-পানি ঠিকই পরিবেশন করা হলো, তবে তা খাবারের পর। এ সময়ে বাসু ভাই তাঁদের বাসার ছোট্ট জিম (ব্যায়ামাগার)-এ নিয়ে ওয়েট লিফটিং, বাইক-সহ আরও বেশ কিছু ইকুইপমেন্ট দেখালেন, যা তাঁকে এ বয়সেও 'তরুণ' রাখতে সাহায্য করেছে। তাদের বাসার ভেতরে মেইন ফ্লোর থেকে ওপরের তলায় ওঠার যে বাঁকা কাঠের সিঁড়িটি, সেটি বড়ই দৃষ্টিনন্দন। মন ভরে বেশ কিছুক্ষণ সিঁড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সাজানো-গোছানো, ছিমছাম বাড়িটি দেখে মনে হলো, বাসু ভাইয়ের রুচিবোধ বেশ চমৎকার। তাছাড়া, বাড়ির পেছনেই রয়েছে একটি সুদৃশ্য লেইক। তবে রাতের আঁধারে লেইকটির সৌন্দর্য তেমন একটা উপভোগ করতে পারিনি।
বাসু ভাইয়ের বাসা ছেড়ে মহসিনদের বাসায় যখন ফিরলাম, তখন প্রায় রাত একটা। পরদিন সকাল দশটার দিকে বন্ধুর বাসা ত্যাগ করি।
দুদিনব্যাপী আদর-আপ্যায়ন করেই ক্ষান্ত হননি, শিখা ভাবী বিদায়ের সময় একটি উপহারের ব্যাগও আমার স্ত্রীর হাতে তুলে দিলেন। কিছু মানুষের বন্ধুভাগ্য বেশ ভালো হয়। নিঃসন্দেহে, সেই সৌভাগ্যবানদের একজন আমি। মহসিনের মতো একজন ভালো বন্ধু ছিল বলেই আজ জামাই-আদরে টানা দুদিন লেথব্রিজ ও তার আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম।
৪.
কানাডার বড় বড় শহর - যেমন, টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, ক্যালগেরি, এডমন্টন, ভ্যাঙ্কুভার - এসবের গল্প আমরা অনেকের লেখায় নিয়মিত পড়ি। কিন্তু, আলবার্টা প্রদেশের ছোট শহরগুলোর অন্যতম লেথব্রিজের মতো শান্ত, সৌম্য ও দৃষ্টিনন্দন শহরগুলো সচরাচর কারও লেখার বিষয় হয়ে ওঠে না। তাই ভাবলাম, নিজের চোখ দিয়ে পাঠকবন্ধুদের ‘শিনুকের শহর’ লেথব্রিজকে খানিক দেখানোর চেষ্টা করি।
সত্য বলতে কি, আমাদের এ ভ্রমণ শুধু একটি শহর দেখার উদ্দেশ্যে ছিল না। পরিবারের সবচেয়ে আদরের সন্তানটিকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে যে শূন্যতা নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম লেথব্রিজ থেকে ফেরার সময় সেই শূন্যতা খানিকটা হলেও হালকা হয়ে এসেছিল। সঙ্গে নিয়ে ফিরেছি পুরোনো বন্ধুত্বের উষ্ণতা, নতুন বন্ধুতা, অমোচনীয় স্মৃতি আর প্রকৃতির অপূর্ব কিছু দৃশ্য। সবমিলিয়ে ‘শিনুকের শহর’ লেথব্রিজ কেবল একটি বেড়ানোর জায়গা হিসেবে নয়, বরং মন খারাপের দুঃসময়ে বন্ধুর বাড়িতে পাওয়া উষ্ণতার তীর্থস্থান হিসেবেও মনে থাকবে অনেক অনেক দিন।
