‘সম্মানিত ভালোবাসার বন্ধু’র প্রয়াণে

কুলদা রায়
Published : 1 Feb 2019, 05:28 AM
Updated : 1 Feb 2019, 05:28 AM


২৫ জানুয়ারি ফেসবুকে প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচ্ছদ প্রকাশ করেছিলেন অনু হোসেন। একটি বাক্য লিখেছেন, 'অভিমত চাই সম্মানিত ভালোবাসার বন্ধুদের কাছে'!

প্রচ্ছদটি কেমন হয়েছে সেই অভিমতই জানতে চাইছেন। কাদের কাছে জানতে চাইছেন? বন্ধুদের কাছে। কেমন বন্ধু? ভালোবাসার বন্ধু। যারা তাঁকে ভালোবাসেন। তিনিও তাদের ভালোবাসেন। শুধু কি ভালোবাসা? না, ভালোবাসার সঙ্গে তিনি তাদেরকে সম্মান করেন।

অসামান্য এই বাক্যটি। একালে এই বাক্যে বিশ্বাস করেন এমন মানুষ পাওয়া ভার–অন্তত বাংলাদেশে। তিনি, লেখক গবেষক অনু হোসেন, সেই বিরল মানুষের অন্তর্গত ছিলেন।

মাস দুএক আগে কোলকাতায় তিনি কেমো নিয়েছেন। ৩০ জানুয়ারি সকালে ঢাকায় একটি হাসপাতালে তাঁর অপারেশন হলো। তার বন্ধুরা ফেসবুকে লিখলেন, 'অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে'। সবাই খুব খুশি।

বিকেল থেকে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হলো। বন্ধুরা আবার প্রার্থনায় বসেছে। তাদের আর্তি মর্মস্পর্শী। এরমধ্যে ডাক্তার বলে দিয়েছেন, তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কাজ করছে না। যেকোনো মুহূর্তে চলে যেতেন পারেন।


এক বন্ধু তাঁর কাছে গেলে শেষবারের মতো মৃদু গলায় অনু হোসেন জানালেন, প্রকাশিতব্য 'সমকালে রবীন্দ্রনাথ' বইটির ফাইনাল পাণ্ডুলিপিটা দেখতে চান। দেখলেনও। হাসলেন। তারপর শান্ত সমাহিত চিত্তে চলে গেলেন গভীর ঘুমে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, বন্ধুরা হাত তুলে তাঁকে ফিরে আসতে বলছেন। কোনো মিরাকলের আশা করছেন কাঁদতে কাঁদতে–প্রার্থনা করতে করতে। এই হাহাকার অসহনীয়। চোখে জল এনে দেয়।

আজ ভোরে, ১ ফেব্রুয়ারি ৫.২২ টায় অনু হোসেন চলে গেলেন।

ফেসবুকে সম্মানিত ভালোবাসার বন্ধুদের আর্তির প্রতিটি অক্ষরের উপর শুরু থেকেই চোখ মেলে রেখেছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল, রবীন্দ্রনাথের কথা। তাঁর মেজো মেয়ে রানী চলে যাচ্ছে। যেতে যেতে বাবা রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে বলছে, পিতা নোহসি বলো, পিতা নোহসি। বাবা রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে স্ত্রোত্রটি শুনতে শুনতে মেয়ে রানী চলে গেছে অনন্ত লোকে।

অনু হোসেন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন। আর তাঁকে মনে রেখে অতি দূর দেশে এই আমি ইউটিউব থেকে সুবিনয় রায়ের গাওয়া উপনিষদের এই স্তোত্রটি বারবার শুনছি–
ওম পিতা নোহসি, পিতা নো বোধি, নমস্তেহস্তু মা মা হিংসীয় ।
বিশ্বানি দেব সবিতর্দুরিতানি পরাসুব, যদ্ভদ্রং তন্ন আসুব।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আমার নেই। কিন্তু আমার নিজের ঈশ্বর আছেন। তাঁকে আমি দেখি। তিনিও আমাকে দেখেন। তিনি আমার সখা ঈশ্বর। দুজনে একপাতে ভাত খাই। আমি তাঁর অংশ। তিনি আমার অংশ। এই আমি, তুমি, তোমরা–এই মাটি, আলো, হাওয়া, জল, প্রাণ ও অপ্রাণ–সবই তিনি। তিনিই আমার মা–তিনিই আমার পিতা। আমার সন্তানও তিনি।

প্রিয় সম্মানিত ভালোবাসার বন্ধু, অনু হোসেন, ভাই আমার–আপনি আমাদের পিতার কাছে চলে যাচ্ছেন। 'পিতা' ঈশ্বর আপনাকে তাঁর সুকোমল বুকে তুলে নিচ্ছেন। বলছি, পিতা নোহসি, পিতা নো বোধি…।

আপনার যাত্রা শুভ হোক।
সর্বেতে সুখিনো সন্তু।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক