আবদুলরাজাক গুর্নাহ: কল্পনার দৃশ্যপটে যে অতীত সেটা এখনও আমাদের কাছে জীবন্ত

ফারুক মঈনউদ্দীনফারুক মঈনউদ্দীন
Published : 11 Oct 2021, 01:45 PM
Updated : 11 Oct 2021, 01:45 PM


সাহিত্যে ২০২১ সালের নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুল রাজাক গুর্নাহ। তার সমগ্র সাহিত্যকর্মের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তাঁকে। ঔপনিবেশিকতার প্রভাব নিয়ে আপসহীন ও সহানুভূতিশীল লেখনীর জন্য আবদুলরাজাক গুরনাহর অবদানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন নোবেল কমিটি। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের শরণার্থীদের সমস্যা, তাদের সংস্কৃতি এসব নিয়ে গুনরাহর বর্ণনা রীতিমত চমকপ্রদ।
নোবেল পাওয়ার দশ বছরেরও আগে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ওয়েবসাইট 'পলিটিকো'র অনলাইন ম্যাগাজিন ম্যাগিল-এ তাঁর এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সাংবাদিক, সমালোচক ও সম্পাদক শেন ক্রিভি। এই সাক্ষাৎকারে গুর্নাহ'র লেখালেখি এবং ভাষাগত মাধ্যম সম্পর্কে উঠে এসেছে তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস ও মনোভাব। সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে বাংলা তর্জমা করেছেন কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক ফারুক মঈনউদ্দীন। বি.স.

প্রশ্ন: প্রফেসর গুর্নাহ, আপনি বুকার প্রাইজসহ অন্যান্য সম্মানজনক পুরস্কারের জন্য দীর্ঘ ও হ্রস্ব তালিকায় আছেন. আপনি কি এসব সম্মাননা উপভোগ করেন, নাকি এড়িয়ে চলেন?
গুরনাহ: না, এসব বেশ উদ্দীপক, কারণ, আপনি জানেন এসবের মাধ্যমে নতুন পাঠক পাবেন। যাঁরা কখনো আপনার নাম শোনেননি কিংবা লেখার কথা জানেন না, তাঁরা আপনার সম্পর্কে জানবেন এবং কখনো মুগ্ধ হবেন এবং আপনার লেখা পড়বেন। তাই, এটার এত সব নাটক ছাড়াও আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের […] হচ্ছে যেটা জেতা সম্ভব সেই বাজিটা যেভাবে আছে সেভাবে সংগ্রহ করার প্রক্রিয়াটা দেখা। বেশ, এরকম বোকা কে আছে? কিন্তু আসলে এটাও মূল ব্যাপার যে এতগুলো মানুষ এখন আপনার সম্পর্কে জানতে পারছে এবং আগ্রহী হচ্ছে। সুতরাং এটা আমি খুবই উপভোগ করি। তাই আমার মনে হয় পুরস্কার এই একমাত্র কারণেই একটা ভালো জিনিস। অর্থাৎ, এগুলো হচ্ছে প্রকাশ্য বিষয়, যা মানুষকে পড়তে আগ্রহী করে। কারণ, যা কিছু প্রকাশিত হয় কোনো না কোনো কারণে সেগুলোর সব পড়ার সময় হয় না মানুষের, পুরস্কার তাদের ভালো বই সম্পর্কে জানতে দেয়, তা না হলে অন্য কোনোভাবে হয়তো বইটা সম্পর্কে তারা জানতেই পারত না।
প্রশ্ন: এই প্রসঙ্গটা ঔপন্যাসিকের ভূমিকা সম্পর্কে পরবর্তী প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়। কিছু লেখক আছেন সর্বজনবিদিতভাবে মুখচোরা, আবার অন্যেরা ব্যাপক পরিচিত। জনপরিচিত জীবনে লেখকের স্থান কোথায় বলে আপনি মনে করেন–যদি তাঁদের এরকম একটা ভূমিকা নিতে হয়।
গুরনাহ:আমি ঠিক জানি না। আমার মনে হয় 'একটা' ভূমিকা নয়, সম্ভবত ভিন্ন ভিন্ন অনেক ভূমিকা আছে, তাই আমি ঔপন্যাসিকদের ব্যাপারে বেশ খুশি, কিছুটা এই কারণে যে, কোন কাজটা ওঁদের, কোনটা তাঁদের সাথে খাপ খায়, তাঁরা কী ভাবেন সেটা বেছে নেওয়ার জন্য আমাদের সবার ভিন্ন মতামত থাকতে পারে, কিন্তু একজন লেখক যা করেন এবং কি ধরনের লেখালেখির সাথে জড়িত, বিষয়টা তাঁরা পাঠকের সাথে এবং তাঁদের সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেরাই বোঝাপড়া করে নিতে পারেন, এবং বলতে চান না যে 'এভাবে করতে হয় কিংবা ওভাবে করতে হয় না।' আমার মনে হয় এসব ঠিকই আছে।

প্রশ্ন: কেন্ট ইউনিভার্সিটির একজন প্রফেসর হিসেবে আপনার শিক্ষা বিষয়ক লেখালেখি এবং শিল্পকর্মের মধ্যে কোনো বিপরীত শক্তি টের পান কি না, না কি এই দুটো সহজেই সহাবস্থান করে?
গুরনাহ:বিষয়টার বুদ্ধিবৃত্তিক অংশের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ সাহিত্যের একজন শিক্ষক হিসেবে যিনি সাহিত্য পড়ান এবং বই লেখেন– এসব ধারণার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রকৃতপক্ষে যদি তাঁরা পরস্পরকে ভালোভাবে জানেন, যখন আপনি একটা বই সম্পর্কে বলছেন কিংবা একটা বই পড়ে ছাত্রদের সাথে সেটা আলোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আপনিও ভাবেন কীভাবে বইটা লেখা হলো, আর সেটা আপনার মনে পড়ে যায় যখন আপনি নিজের লেখা লিখছেন (অথবা বলা উচিত আমার, 'আপনার' বলা উচিত নয়, আমি বোঝাতে চাইছি 'আমি'), অর্থাৎ আমার মনে পড়ে যায়। তখন আমি ভাবতে পারি, যে উপায়ে অমুক লেখক লিখেছেন সেটি আমার কাছে উপভোগ্য মনে হয়েছে, তখন আমিও চেষ্টা করতে পারি এবং সেরকম কিছু একটা করতে পারি।

আমার মনে হয় বিরোধটা আসে, বিশেষ করে পেশাগত জীবনের পথে যেতে যেতে যখন একজন আরো জ্যেষ্ঠত্ব পেয়ে যান এবং আরো বেশি দায়িত্ব নিতে হয়– যেসবের সাথে শিক্ষকতা কিংবা লেখালেখি কিংবা যা-ই হোক না কেন, কোনো সম্পর্ক নেই, তবে প্রতিষ্ঠানের সাথে আছে, তখনই বিরোধটা আসে। তার মানে আপনার মাথা অন্যান্য ব্যাপারে পূর্ণ থাকে, তখন আপনার পছন্দ এমন সব কাজের জন্য সময় বের করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন ধরুন লেখালেখির কাজটা।
আমি যা বলতে চাইছি আমার মনে হয় সেই শেষ হোঁচট খাওয়াটা বলতে এমন বোঝায় না যে এজাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাজের মতো অন্যান্য কাজগুলো সম্পূর্ণ অর্থহীন। তবে দেখেছি এসব কাজ বেশ সময় নিয়ে ফেলে। তাই একটা ইউনিভার্সিটির সথে যুক্ত থেকে বিভিন্ন আইডিয়া সম্পর্কে ভাবনা, ডিপার্টমেন্টের কাজকর্ম চালানো, এটা-ওটা কীভাবে করতে হবে– এসব বেশ পছন্দ করি আমি। এসবও আমার কাছে যথেষ্ট উপভোগ্য মনে হয়। কিন্তু এসবে অনেকখানি চলে যায়, ফলে আপনার পেশাগত জীবন যত এগোতে থাকে, নিজের ভাবনাচিন্তা আর লেখালেখির জন্য সময় বের করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন: আপনি যখন উপন্যাস লেখেন, আমি তার প্রক্রিয়াটা সম্পর্কে আগ্রহী। আপনি কি কাহিনীর বাঁক, মোচড় সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে পরিকল্পনা করেন? এটা কি করা সম্ভব? নাকি আপনি লেখেন এবং লেখাটাকেই গল্পটা বলতে দেন?
গুরনাহ:দেখুন, আমি নিশ্চিত, বেশ ভালো পরিকল্পনা করা সম্ভব, মানে বলতে চাইছি এটা নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের লেখা লিখছেন। আমি ভাবতাম যদি আপনি একটা কাহিনীর প্রেক্ষিতে কিছু লিখেন, আপনাকে পরিকল্পনা করতে হবে, তা না হলে আপনি বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন কিংবা গল্পটা হারিয়ে ফেলতে পারেন কিংবা এজাতীয় কিছু আমি কল্পনা করতাম, আমি আসলে ঠিক জানি না। কিন্তু যেহেতু আমি সেভাবে কিংবা প্লটনির্ভর ধরনের কিছু লিখি না, সেক্ষেত্রে কিছু মাত্রার পরিকল্পনা দরকার, আর এটা সচরাচর আমার বেলায় কখনো ঘটে। কোনোকিছু নিয়ে ভাববার জন্য সচরাচর আমার কিছুক্ষণ সময় লাগে, তবে তীব্রভাবে নয়, এমন নয় যে আমি কাগজ নিয়ে বসে বলি, ঠিক আছে, এখন কীভাবে এটা নিয়ে এগুবো? আপনি অন্যকিছু করার সময় চিন্তার পেছনে চলতে থাকে, এটা এমন কিছু একটা, তারপর গড়ে ওঠে, তখন একটা সময় আসে যখন আপনি ভাবেন, চিন্তাগুলো নামিয়ে আনার সময় এসেছে বোধ হয়। আর তখন হয় নোট নেওয়া, সেসব জড়ো করা, তারপর লেখাটা শুরু হয় ইত্যাদি। সেসব জড়ো হয় যাতে আপনি একটা খসড়া লিখতে পারেন, এবং সেটা ভালো হলে আপনি দ্বিতীয় খসড়াটা করতে পারেন, তখন আরো ডিটেলস আসে অথবা মনে হয় একটা নতুন গতিপথ উপস্থিত হয়, যা আগে ছিল না। সুতরাং, একটা নির্দিষ্ট পরিমান পরিকল্পনা লাগে, তবে আপনাকে জায়গা রাখতে হয়, যাতে এগিয়ে যাওয়ার সময় অন্যান্য বিকল্পও বেছে নেওয়া যায়।

প্রশ্ন: অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স বইতে একটা মজার বাক্য ছিল। অনামা কথক বলছেন, "আমি ভিন্নতার মধ্যে বাস করতে চাই।" আপনার লেখকজীবনের সবটুকুতে কি দেরিদার প্রভাব নিয়মিত? আপনার লেখালেখিকে আবিষ্ট করে রেখেছে এমন আর কি কোনো প্রভাব আছে, যা প্রথম থেকে আজও পর্যন্ত আপনার সাথে রয়েছে?
গুরনাহ: হ্যাঁ, বহুকিছুর প্রভাব, বেড়ে ওঠা, দেশ, কাহিনী ও প্রকরণ– যার সাথে গড়ে উঠি, ধর্ম এসব কিছুর প্রভাব। অভিজ্ঞতাও, বিশেষ করে আমার নিজের অভিজ্ঞতা, 'সেখান' থেকে 'সেখানে' সরে যাওয়া, আমার জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয়। তবে তার মধ্যে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি কিংবা আমারটার চেয়ে ভিন্নতর অন্য কারো অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
হ্যাঁ, বিচিত্র জিনিষের একটা পুরো গুচ্ছ। কিন্তু যখন বলি আমি ভিন্নতার মধ্যে বাস করতে চাই, তফাতটা কোথায় সেটা দেখা ও বোঝার জন্য পার্থক্য করতে পারাটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টা কি, তার ওপর নির্ভর করে সেটাকে উদযাপন ও বর্ণনা উভয়ই এবং এসবের সবগুলোই করা কিংবা প্রত্যাখ্যান করার জন্য ভিন্নতা দরকার।
প্রশ্ন: অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স-এ কথক কিছুটা অনির্ভরযোগ্য। সে বাড়িয়ে বাড়িয়ে উদ্ভট সব গল্প করে মি: উইলোবির সাথে, এমনকি এমার সাথেও। ডেজার্শন-এ পাঠক তার স্বস্তির জায়গা থেকে ধাক্কা খায়, যখন সে দেখে বইয়ের অর্ধেকেরও বেশি জুড়ে রশিদের বর্ণনা। আমাদের চারপাশের যে গল্প-কাহিনী আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আপনি কি সেসবকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন? সবজান্তা তৃতীয় পুরুষের বর্ণনা কিংবা লেখকের স্থিরতা সম্পর্কে কী বলবেন?
গুরনাহ: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, যদিও ততটা নিজে থেকেই নয়। কারণ, আমাদের বিবেচনার জন্য গল্পগুলো যেভাবে আছে সেভাবেই সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চাই আমি, একারণে নয় যে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কেবল এটা বলতে চাই, এসব গল্প যখন শুনি তখন সম্ভবত আমাদের জানতে হয়, কে লিখছেন এগুলো? কেন এসব বলছেন তিনি? আমরা কি বিশ্বাস করছি এগুলো? এতে কি কিছু আসে যায়? সুতরাং এসব কীভাবে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করি এবং যতটুকু পারি ততটুকু বোঝার চেষ্টা করি সবই এই প্রক্রিয়ার অংশ।


তাই অবিকৃত গল্পগুলোতে বিদ্যমান থাকা যে অভিজ্ঞান আমরা নিয়ে যেতে পারি, তা আমাদের এসব প্রশ্নের কিছুটা জবাব দিতে পারে। গল্পের জট খোলার জন্য কিংবা গল্পের মধ্যে কোনো কৌশল খুঁজে পাওয়ার জন্য কিংবা এরকম কিছুর জন্য নয়, কেবল এরকম প্রশ্ন করতে পারার জন্য যে, আমরা কি এটা বিশ্বাস করছি? কেন করা হচ্ছে এটা? কেন ভাবতে হচ্ছে আপনাকে? এ নিয়ে ভাববার অন্য কোনো উপায় আছে কি? এটা সম্পর্কে সংশয়ী হলে কি আসলে এটাকে আমরা আরো মজাদার গল্প বলে মনে করি? সেটা না করে বরং আমার মনে হয় একজন পাঠক হিসেবে 'বেচারার কী একটা জীবন ছিল!' না বলে আপনি যদি সংশয় নিয়ে অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স পড়েন। অন্যভাবে বলতে গেলে আপনি যদি দেখেন তাঁর কিছু একটা উদ্দেশ্য আছে এবং বলেন, 'কী উদ্দেশ্য তার? কী হচ্ছে এসব? কেন সে এসব গল্প বলছে? এটা করার কী দরকার?'
তাহলে বলি, একই সাথে সংযুক্ত ও বিযুক্ত হওয়ার এই প্রক্রিয়াটা আমার পছন্দ। যুক্ত হওয়া একারণে যে আখ্যানটার জন্য আপনাকে তা-ই করতে হয়, আপনার কোনো বিকল্প নেই, কারণ আপনি আগ্রহী, কিন্তু একই সাথে আপনি কিছু মাত্রায় দূরত্ব বজায় রাখেন, সেকারণেই ডেজার্শান নিয়ে আপনার এই ব্যাখ্যা। 'আমরা এটা নিয়ে ভাবি, এরকম কি করতে পারব আমি?' এবং এজাতীয় ব্যাপার।
প্রশ্ন: বাই দ্য সী তে লতিফ মাহমুদ ভাবে, "এটা সেই বাড়ি যেখানে আমি থাকি […] একটা ভাষা সবদিক থেকে আমার দিকে গর্জন আর উপহাস করে।" আপনি লেখার জন্য ইংরেজিকে বেছে নিয়েছেন, কিন্তু তাতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো রয়েছে সোয়াহিলিসহ অন্যান্য ভাষার ছোট ছোট টুকরো-টাকরা। যদি ভাবি, উপনিবেশকারীদের ভাষাকে সিংহাসনচ্যুত করতে হবে ভেতর থেকেই, ভাষা বিষয়ক বিতর্কে নগুগির চেয়ে [চিনুয়া] আচেবের পক্ষ নেবেন আপনি, সেটা কি ঠিক?
গুরনাহ:আমার মনে হয় না আপনি ঠিক। মনে হয় না আমি বিতর্কের কোনো এক পক্ষে যাব, কারণ, আমার মনে হয় তাঁদের যুক্তিটা আমি যা করছি তার সপক্ষে ব্যবহার করা যুক্তির চেয়ে আলাদা।
আচেবের যুক্তি হচ্ছে ইংরেজিকে ঔপনিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের সাথে কোনোভাবে খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়। নগুগি বলছেন এটা হয় না, কারণ, আপনি যা-ই করেন ভাষা সেখানে হানা দেবেই– আপনি যা ব্যাখ্যা করবেন সেখানে হানা দেবে, ঢুকে পড়বে আপনার মূল্যবোধে, নিয়ন্ত্রণ করবে বিভিন্ন কিছু।

আমার মনে হয় না কোনোটাই ঠিক, অথবা আমার বলা উচিত ভাষা কীভাবে কাজ করে, বিশেষ করে একজন লেখকের জন্য, তাঁদের সেই ধারণার সাথে আমি একমত নই। আমার মনে হয় না ভাষা ঠিক সেভাবে কাজ করে, বলা যায়, এক ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে, অন্যভাবে এমন কিছু যার ওপর কোনো প্রতিচ্ছবি পড়েনি প্রায়, এমন কিছু যা দিয়ে কথা বলি আমরা। আমি মনে করি না, একজন লেখকের সাথে ভাষার সম্পর্ক এভাবে হয়।
সুতরাং আমি নিজেকে এই দুই শিবিরের কোনোটিতেই দেখি না। বলতে পারতাম, যে কারণে আমি ইংরেজিতে লিখতে শুরু করেছি সেটা অবশ্যই ঔপনিবেশিকতা নিয়ে উদ্বেগ পরিত্যাগ করার জন্য, অন্যথায় হয়তো ইংরেজি শিখতাম না– এটা আমি যা পড়ি, সে সম্পর্কেও প্রযোজ্য, যার প্রায় সবই ইংরেজি ভাষায়। আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন নিজেকে কোথায় খুঁজে পেয়েছি সেই ভাবনা পরিহার করতেও। এটা করেছি আরো বহু কিছু সম্পর্কে না ভাবতে … বাকিটা দুর্ঘটনা, দৈবঘটনা কিংবা অন্য যেকোনো কিছু ।

বলতে চাই, লেখালেখিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলাম আমি। দশ বা এগার বছর বয়সে ভাবিনি 'আমি একজন লেখক হতে চাই।' বিশ বছর বয়সের পর ইংল্যান্ডে থাকা অবস্থায় কিছুটা দুর্দশার মধ্যেই লেখালেখিতে নিজেকে খুঁজে পাই আমি। সেসময় আমার মাথায় কথাটা আসেনি যে 'কোন ভাষায় লিখব আমি?' যে ভাষাটা আমি লেখায় ব্যবহার করতে পারতাম, সেটা ছিল ইংরেজি, কারণ সে ভাষাতেই পড়াশোনা করেছি আমি। আমি মনে করি পড়াশোনা এবং লেখালেখির মধ্যকার এই সংযোগের ধারণা সম্পর্কে আমরা সবাই পরিচিত। বস্তুত পড়াশোনা হচ্ছে এসব পাঠ এবং আমাদের ব্যবহার করা সে সম্পর্কিত সূত্র এবং সম্পূর্ণ পাঠসূত্রের আন্তসম্পর্কের ধারাবাহিকতা, যা পাঠক ও লেখক হিসেবে আমরা তৈরি করি। এসবই যে কোনোভাবেই হোক আমার কাছে ইংরেজিতেই সহজলভ্য ছিল, অন্য ভাষায় নয়।
তবে অবশ্যই আমি জানতাম, এরকম বহু কিছু আমার কাছে জড়ো করা ছিল, যেগুলো লেখালেখি বাদ দেওয়ার মতো কিছু নয়। সুতরাং যে ধরনের লেখালেখি আমি করতে পারি, অনন্য না হলেও সেটা হচ্ছে একটা ভাষায় লিখছি আমি, অর্থাৎ ইংরেজিতে। তার সাথে অন্য সংস্কৃতি ও ভাষা থেকে আমি নিয়ে আসছি এক কল্পিত দৃশ্যপট। আমি মনে করি সেটা তৈরি করছে একটা গতিময় এবং আরো বেশি আকর্ষণীয় এক মিশ্রণ।

প্রশ্ন: সালেহ ওমর আপনমনে ভাবে "আমি সামনে তাকাতে চাই, কিন্তু সবসময় নিজেকে দেখতে পাই পেছনদিকে তাকানো অবস্থায়।" আপনার উপন্যাসগুলো অতীত আর বর্তমানের মধ্যে মোচড় খায় আর বাঁক নেয়। এটা কি বলা ঠিক হবে যে আপনার কাছে অতীত কোনো 'হারানো দুনিয়া' নয়, যেমনটি রুশদি ধারণা করেন?
গুরনাহ: দেখুন, আমি মনে করি রুশদি মনে করেন না এটা সত্যিকারভাবে একটা হারানো দুনিয়া। মনে হয়, তিনি যা বোঝাতে চান … তাঁর লেখায় আয়নার মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে টুকরো টুকরো হয়ে কাটা পড়ার সেই দৃশ্যটা আপনার মনে আছে। তিনি বোঝাতে চাইছেন যে এটা একটা যন্ত্রণাকর পদ্ধতি, আমার মনে হয় তবু এটা অতীতের কিছু, যা নিয়ে আপনি শোক করেন, অর্থাৎ চলে গেছে যা।

হ্যাঁ নিশ্চয়ই, এবিষয়ে আমি অতদূর যাই না। অনিতা দেশাইর একটা চমৎকার বাক্য আছে, বোধ হয় ক্লিয়ার লাইট অভ ডে-তে, তাঁর সেই বাক্যটা আমি অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স-এ চুরি করেছি (ধার করেছি, চুরি করিনি), সেটা হচ্ছে "কিছুই কখনো শেষ হয় না,' তাঁর কোনো একটা চরিত্র বলছে, "কিছুই কখনো শেষ হয় না।" অতীতকে আমি এভাবেই দেখি। এটা কখনোই শেষ হয় না, এমনকি শেষ হয়ে গেলেও। আসলেই এটা সত্যিকারভাবে কখনো শেষ হয় না।
প্রশ্ন: বর্তমানের মধ্যে অতীত বাস করে, এই অর্থে কি?
গুরনাহ: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। অতীত হচ্ছে বর্তমান। কারণ, আমরা আমাদের কল্পনা এবং বাস্তব জীবনের মধ্যেও বাস করি, সুতরাং আমাদের কল্পনার দৃশ্যপটে যে অতীত সেটা এখনও আমাদের কাছে জীবন্ত। এটা কখনোই শেষ হয় না, এই অর্থেই আমি ভাবি।
প্রশ্ন:
আমি ডেজার্শান-এর চরিত্র লেগব্রেকার পড়ে চমৎকৃত হয়েছিলাম।
গুরনাহ: ছেলেরা ভায়োলেন্স পছন্দ করে।
প্রশ্ন: এটা কি কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নাকি নিখাদ ফিকশন?
গুরনাহ: এটার বেশিরভাগই ফিকশন। সম্ভবত নব্বই শতাংশ ফিকশন, যদিও সেখানে আরো কুখ্যাত মানুষ ছিল, যেমন হাড় ঠিক করার হাতুড়ে বৈদ্যের মতো অনির্ভরযোগ্য চরিত্র। তাদের কাজকর্ম ছিল বিপদজনক। সুতরাং যদি কেউ ভেঙে ফেলে, সেটা উভয়ভাবেই কাজ করতে পারে।
প্রশ্ন: আপনি কি আপনার জীবন এসব মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন?
গুরনাহ: ঠিক।


প্রশ্ন: সে ছিল গ্রামের ডাক্তার, আর সমাজে ডাক্তারদের জ্ঞানবাহীর উচ্চতর ভূমিকা পালনের প্রবণতা থাকে। তারপরও হাড় জোড়া দেওয়ার সময় মনে হয় তার জ্ঞান ছিল অন্য সবার মতো সীমাবদ্ধ। আপনি কি সাঈদের কায়দায় সচেতনভাবে চাইছিলেন যে ক্ষমতা ও জ্ঞানের ভেতরকার সম্পর্ক নিয়ে আপনার পাঠকেরা প্রশ্ন করুক?
গুরনাহ: না, যেভাবে বলা হয়, আমি তাঁকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করিনি, 'এটা এমন ধরনের ওষুধ যা ব্যবহার করা হতো' কারণ, একই সময়ে অন্য ধরনের ওষুধও উপশমের জন্য ব্যবহার করা হতো, যেমন ধাত্রীবিদ্যায়, বিভিন্ন ভেষজ ওষুধ প্রয়োগ করা হতো জ্বর কিংবা অন্যকিছুর জন্য।
কিন্তু নির্দিষ্ট কিছুর অতীন্দ্রিকরণও ছিল, সুতরাং একধরনের মধ্যযুগীয় ব্যাপারও ছিল, যে অবস্থায় ধরুন আপনাকে পাদ্রির কাছে যেতে হতো, যিনি একটা পাত্রের ওপর ঐশীবাণী লিখে দিতেন, আর আপনি সেটা বাড়িতে এনে ধুয়ে সেই পানিটা খেতেন ওষুধ হিসেবে, সে অবস্থায় কোনো একটা ওষুধ দেওয়া হতো। এটা কিছু মানুষের জন্য, অন্যদের জন্য ছিল ভেষজ ওষুধ। কিছু ক্ষেত্রে খুব গুরুতর ওষুধ দেওয়া হতো, যেমন প্রসবকালীন চিকিৎসা কিংবা এজাতীয় সমস্যায়। স্পষ্টতই এসব হচ্ছে সেইসব জিনিস, যা মানুষ শিখেছিল। তাই আমি বলতে চাই না 'এসব লোকজ জিনিস এবং অর্থহীন,' তবে হাড় জোড়া দেওয়ার কাজটা ছিল খুব অনিশ্চিত বিজ্ঞান।
প্রশ্ন: আধুনিক বিশ্ব ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাদের ঘিরে রেখেছে নতুন গণমাধ্যম এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগব্যবস্থা দিয়ে। এই নতুন বিশ্বে যেখানে আমরা বাস করি, সেখানে উপন্যাসের ভূমিকা কীভাবে দেখেন আপনি, যা আর নতুন থাকে না?
গুরনাহ: আমি ঠিক নিশ্চিত করে জানি না, তবে দেখতে পাই ম্যাগাজিনের মতো জিনিসের প্রকাশনা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বহু ম্যাগাজিন এবং জর্নাল এখন অনলাইনে পাওয়া যায়, সুতরাং আপনার কাগজের মতো সম্ভবত এটার কিছুটা প্রভাব থাকবে, আমি ভাবতাম এটার কিছু একটা প্রভাব থাকবে ছোট লেখা প্রকাশনায়। কিংবা ইতিমধ্যেই এই প্রভাব পড়ে গেছে।

তবে আমি কমপক্ষে কয়েকজনকে জানি, যাঁরা আরও উচ্চাভিলাষী ভাবনা ভাবছেন এবং অনলাইনে বই প্রকাশ করছেন, যা ছাপার বই হিসেবে না চাইলে আপনিও ডাউনলোড করতে পারেন। আমি কমপক্ষে একটা ওয়েবসাইটের কথা জানি, যেটা এই কাজ করে। সুতরাং আপনি যদি একটা বই কিনতে চান, তারা তার একটিমাত্র কপি ছেপে আপনার কাছে ডাকে পাঠিয়ে দেবে। ফলে যদি চান হয় বইটা আপনি কিনতে পারেন কিংবা কেবল অনলাইনে পড়তে পারেন।
আপাতত ওরা এটা করতে পারছে কারণ মাত্র একটা কপি ছাপা এখন বেশ সহজ ব্যাপার। খরচ তেমন কিছুই না, ৫০০ কপি ছাপার চেয়ে বেশি নয়। প্রকাশনার অর্থনীতি সবসময় 'কতগুলো কপি' এই ব্যবসায়িক ভাবনায় পরিচালিত হয়ে এসেছে, তা না হলে সাশ্রয়ী হয় না।

সেজন্য আমার ধারণা একটা উপন্যাসের ৫ কপি ছাপানো এসব কারণেই সম্ভব হবে, এবং সেকারণে অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী থাকবে। ঠিক আছে ৫ কপি অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে, তবে ১০০ থেকে ২০০ মানুষের ছোট পাঠকগোষ্ঠীর জন্য আপনি ছাপতে পারেন, সেটাও টেকসই হবে যা আরো বড় আকারে করলে বাণিজ্যিকভাবে হবে না।
প্রশ্ন: তাহলে আপনি মনে করেন নতুন প্রযুক্তি উন্মুক্ত করে দেবে, ভীতিকর কিছু নয়?
গুরনাহ: আমি নিশ্চিত তা করবে। মনে হয় না এটা ভীতিকর।
প্রশ্ন: মানুষ কি কম পড়ছে?
গুরনাহ: আমি এরকম ভাবতাম না। আপনি দেখতে পাবেন মানুষ বিভিন্ন জিনিস পড়ছে। যখন একটা বই কয়েকজন পাঠক পড়ে এবং আলোচনা করে এবং আপনি বিতর্কের একটা অনুভূতি পাচ্ছেন, এমনকি কখনো এটা বোকাটে ধরনেরও যদি হয়, তখন জনগনের অংশগ্রহণের ধারণা পাওয়াটা কঠিন হতে পারে। তবে সবসময় নয়, কখনো কখনো। আমার অনুমান আপনি সেটা হারিয়ে ফেলবেন কারণ, ধরতে পারবেন না সেটা … কিংবা কে জানে সমালোচনার জন্য ইন্টারনেটে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থাকবে, যেখানে পাওয়া যাবে অন্যেরা কি লিখছে, আমি ঠিক জানি না।
আমাদের কারো জন্য যথেষ্ট দেরি হয়ে গেছে, তবে আমি দেখতে পাই কীভাবে লেখাকে এটা বিভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে, বিভিন্ন ধরনের লেখা হয়তো আসবে। যারা প্রকাশের আগে এটার বাণিজ্যিক মূল্য খুঁজছে, সেই সব মানুষকে আর আগের মতো একজন প্রকাশক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। আমি নিশ্চিত এতে একটা পরিবর্তন আসবে।
আমি নিশ্চিতভাবে ধারণা করি অনুন্নত প্রযুক্তির শ্রেণি বা সমাজে একটা পরিবর্তন আনবে এটা, যেমন, খরচের কারণে একটা বই প্রকাশ করা কঠিন। সেখানে আপনি একটা অনলাইন ম্যাগাজিন করতে পারেন, যেখানে খরচ ততবেশি পড়বে না। আমি দেখতে পাচ্ছি বিষয়টা কিছু মানুষের জন্য সেদিকেই গড়াচ্ছে ভালোভাবে।
প্রশ্ন: ডেজার্শান প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। আমি জানতে চাইছিলাম আপনি কি নতুন কোনো উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন কি না?
গুরনাহ:বেশ, মনে হয় সবেমাত্র একটা শেষ করলাম আমি।
প্রশ্ন: আপনি কি পলিটিকো র পাঠকদের জন্য এটা সম্পর্কে কিছু বলবেন?
গুরনাহ:না।
প্রশ্ন: না?! এটা কি গোপনীয় …
না, এটা গোপনীয় নয় কিন্তু […] আমি বলতে চাই না 'এই বইটা এই সম্পর্কে কিংবা সেই সম্পর্কে,' এমনকি যেগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম, সেগুলো সম্পর্কেও নয়। আমি বলতে চাই না, কারণ, প্রথমত এটা একটা কর্তৃত্ব দাবী করে যেখানে কোনো সত্যিকার অর্থ বহন করে না। পাঠকেরা নিজেরাই বের করুক, দেখি তাঁরা কি ভাবেন। কখনো আমি অবাক হই যখন মানুষ আমাকে বলেন তাঁরা কি পড়েছেন এবং প্রায়শই শুনে খুশি হই কীভাবে তাঁরা পড়েছেন ওটা। তাই আমি তাঁদের বলে দিতে চাই না, কীভাবে আমার বই পড়তে হবে।

ধন্যবাদ প্রফেসর গুর্নাহ আমরা অবশ্যই আপনার পরবর্তী বই প্রকাশের অপেক্ষায় থাকব।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক