২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

মিনার মনসুরের ‘নির্বাচিত কবিতা’: বাংলা কবিতা তাকে স্বাগত জানাবে

sams_arefin

Published : 30 Dec 2016, 09:01 PM

Updated : 03 Oct 2022, 11:25 AM

Image
border=0

কবিতার জগতে তিনযুগের দীর্ঘ ভ্রমণের পর প্রকাশিত হলো কবি মিনার মনসুর এর নির্বাচিত কবিতা বইটি। তার চেয়েও স্বস্তিকর সংবাদটি হলো কবিতার এ দুঃসময়ে প্রকাশের ছয়মাসের মধ্যে বইটির প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। এ পাঠকপ্রিয়তাও এ সময়ের নিভৃতচারী একজন কবির জন্যে কম গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার নয়। প্রত্যেক কবিরই থাকে স্বকীয় কাব্যভাষা। এ কাব্যভাষাই কবিকে অকবি থেকে আলাদা করে। আর তার একটা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় যে-কোনো কবির নির্বাচিত কবিতা বা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনে। এখানে এক মলাটে পাঠক বুঝে নিতে পারেন একজন কবি কীভাবে নিজেকে ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে স্বকীয় কাব্যভাষা নির্মাণ করেন। সমাজ সংস্কৃতি, জীবনবোধ, আত্মবিশ্বাস ও কাব্যদর্শন–কাব্যভাষা বিনির্মাণে রাখে প্রধানতম ভূমিকা। তার পর কবিতার শরীর নির্মাণে রূপক, উপমা, অলংকার, চিত্রকল্প, শব্দ ও শব্দ-সংস্থান ইত্যাদির উপর নির্ভর করে দাঁড়ায় কাব্যভাষা। সেই স্বকীয়তা অর্জনের গুণেই যেমন ত্রিশের কবিদের মাঝে জীবনানন্দ দাশ উজ্জ্বলতম হয়ে আছেন, তেমনি স্বকীয়তার তীব্র দ্যুতি না থাকার কারণেই অবশিষ্ট চতুর্থ পাণ্ডব তুলনামূলকভাবে অনেকটা নিষ্প্রভ। মিনার মনসুর-এর কবিতা শুধু বন্ধু রুদ্রনির্ভর রাজপথ শাসন করে না, তাঁর কবিতা আবিদ আজাদের অতি কোমল সুরের মোহনায় বিমূর্ত চেতনার সমুদ্রে আমাদের ভাসিয়ে দেয়। তিনি এই দুই-এর মাঝামাঝি সমান্তরাল রাস্তা। অলংকার ব্যবহারে সার্বজনীন হয়েও, নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করে তিনি গড়ে তুলেছেন স্বকীয় সত্তা। তাই একবাক্যে বলতে হয় মিনার মনসুরের কবিতা না প্রেম না দ্রোহ। বরং প্রেম ও দ্রোহের সমন্বয়ে দেশীয় ঐতিহ্যনির্ভর শুধু মাত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা, যার বাস্তব প্রতিবিম্ব পাই নির্বাচিত কবিতা গ্রন্থে।

বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতি, মিথ, ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে তার কবিতার পরতে-পরতে। তিনি গ্লোবাল ভিলেজ ধারণায় বিশ্বাসী নন। তিনি 'গ্লোবালাইজেশন অব পয়েট্রি'র বদলে রচনা করেছেন বাংলাদেশের কবিতা। তাই কবিতায় কাফকার মতো দুশ্চিন্তা, ভয় ও দুঃস্বপ্নের পরিমণ্ডলকে প্রাধান্য দিয়ে চারপাশের মানুষের করুণ অবস্থা তুলে ধরেন। তুলে ধরেন রাষ্ট্রের যুক্তিহীন আচরণ আর অমানবিকতার প্রতিচিত্র। তাই 'চলে যাবো'তে বলেন, 'নারী কুকুর, হোটেল মালিক, নষ্টগলির ভণ্ডকবি/সব শালাদের কসম খেয়ে বলতে পারি/ …কুত্তামরা, মানুষমরা, সদরঘাটের নারীমরা/এমনি কতো হাজার মরার গন্ধ মেখে/ এবার আমি চলেই যাবো/..নারী তুমি রাগ করো না হয়তো ক'দিন কষ্ট পাবে/ টাকা দিয়ে রূপ কিনবার মানুষ কী আর অভাব হবে/… ভণ্ড কবি তুই শালা আর যাবি কোথায়?/ জীবনটা তো পরের ঘাড়ে কর্মবমিুখ কাটিয়ে দিলি'। তিনি সব দুঃখ-বেদনাকে প্রকাশ করছেন কাফকার ধারায় কিন্তু 'রূপ কিনবার মানুষ', 'কুত্তামরা গন্ধ', নষ্ট গলির ভণ্ড কবি' এবং 'সব শালাদের কসম খেয়েও' শব্দগুলো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। এর মাধ্যমে তিনি সমাজবাস্তবতার করুণ অবস্থা তুলে ধরে নিরেট বাংলাদেশের কবিতা রচনা করেছেন।

আবার 'অনন্তের দিনরাত্রি' কবিতার বইটি যেন আরও একটি নতুন বাঁক নিয়েছে। এখানে তিনি কখনো রুমি-হাফিজের ভাষায় আলুলায়িত করেছেন তার কাব্যভাষা। আবার কখনো আল মাহমুদের প্রভাব বলয় কাটিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কাব্যসত্তা ও কাব্যবিশ্বাস। এ কবিতার বইয়ের মাধ্যমে তিনি মূলত রুদ্র ও আবিদ আজাদের কাব্যভাষা থেকে আলাদা নিজস্ব ভাষা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তাই তিনি এখানে কখনো 'নিজের স্বপ্নের তীরে বসে ব্যর্থতার ঢেউ' গুনে ক্লান্ত হন; আর বলেন, '…তুমিহীন অসার জীবন গলিত শবের মতো এও এক/ আরোপিত কুৎসিত বোঝা!'। আবার কখনো জীবিকার বোঝা বহন করতে না পারার বেদনায় চিত্রকল্প আঁকেন– 'এই যে আকাশ অসীমতা যার/আদিম উপমা সেও কি হঠাৎ/বেকার কবির ভাড়াটে বাসার মতো/তড়িঘড়ি ছোটো হয়ে আসে/সে কি সাপে কাটা মানুষের মতো/অবয়বহীন গাঢ় বেদনায় ক্রমে নীল হয়?' এ চিত্রকল্প পাঠ করে সহজেই মনে পড়ে যাবে, `A poem may itself may be an image composed from a multiplicity of images' এখানে চিত্রকল্পের গতানুগতিক সংজ্ঞা, `A picture made of word' একেবারে অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
লক্ষীর পুজো দিতে-দিতে কবি রিক্ত হস্ত। কিন্তু তার প্রেমিকার প্রতি ভালোবাসা নিবেদনে কার্পণ্য নেই। তাই প্রেমিকার স্তুতি করতে দ্বারস্থ হন হাফিজ-রুমির। তাই পুরোপুরি রাজপথ থেকে ভালোবাসায় আচ্ছন্ন মিনার মনসুর প্রেম দিয়ে শুরু করেও দ্রোহেই শেষ জবাব দেন। আর বলেন, 'অনল নিঃশ্বাসে তার বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের মতো/ বারংবার ধসে যায় আমাদের আদিগন্ত স্বপ্নের প্রাসাদ'।
কবি রাজনীতিকে কখনো জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবতে পারেন না। সময়ের হিংস্রতা দেখে তিনি অবাক হন। সময় যেন তাঁর প্রতিযোগী হয়ে আবির্ভূত হয়। ছিনিয়ে নিতে চায় তার স্বপ্ন। তাই মর্মাহত কবি তাকে তুলনা করেন এভাবে, 'এ বড়ো কঠিন যাত্রা একাকী আমার।/সামরিক গোয়েন্দার মতো চতুষ্পার্শ্বে/ওত পেতে আছে এক ভয়ানক প্রতারক কাল।'। শুধু এতটুকু বলেও যদি তিনি থামতেন তবে সত্তরের আবিদ আজাদ, রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর পর তাঁর অবস্থান থাকত। কিন্তু কখনো তা স্থায়ী হত না। আর এই অবস্থান স্থায়ী করার জন্য স্রষ্টা হয়তো তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছেন 'মৃগয়া'র মতো কবিতা। যেমন: 'প্রথমেই কেড়ে নেওয়া হলো তার স্বপ্ন। এরপর হরণ করা হলো নিদ্রা। ক্রমেই লুণ্ঠিত হলো তার চৈতন্যের মাটি, মর্মের মেদমজ্জা এবং বিশ্বাসের অন্ন ও জল।'

তিনি কখনো প্রেমিকাকে না পাওয়ার বেদনায় কাতর। আবার কখনো প্রেমিকার রূপকীর্তন করে বেদনাহত। সবসময় তিনি অভিজাত শ্রেণির প্রেম `Courtly Love' নিবেদন করেছেন যেখানে সম্পর্ক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কবিও প্রেমে অটুট থেকে প্রেমিকার বিরোধিতা করা থেকে মনকে বারণ করছেন। মনকে প্রেমিকার অনুগত থাকতে বলছেন এভাবে, 'মন তুমি সেরে ওঠো; সাইবেরিয়ার তীব্র তুষার ঝড়ের মতো/তোমাকে যে হিমায়িত করে গেলো তাকে ভুলে যাও/…সদ্য যুবতীর মতো বিপুল বর্ণাঢ্য সাজে বসন্ত নাড়ছে কড়াÑ নির্বাসিত দুয়ারে তোমার।/… এই তোমাকে ফেরাবে বলে/কিশোরী রোদেরা এসে ব্যাকুল বুলায়/হাত তোমার কপালে।…/ নিঃসঙ্গ গোলাপটিও স্বেচ্ছায় মেতেছে মৌনব্রতে;-/সেও শুধু তোমারই আশু রোগমুক্তি কামনায়/ প্রিয় মন তুমি সেরে ওঠো।'
সত্তরের কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য– তারা প্রতিবাদপ্রবণ, সংগ্রামী। তাদের কবিতা প্রেম ও বক্তব্যপ্রধান। সম্ভবত স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরশাসন পরবর্তী সামাজিক অবক্ষয়ই তাদের সরাসরি প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যেমন 'কুশল সংবাদ' কবিতায় তিনি বলেন 'তুমি নেই তবু কী চমৎকার আছি দেখে যাও;/ এখনো স্মৃতির মতো তরতাজা ভোর এসে নিত্য/কড়া নাড়ে আমার দুয়ারে।…/ জমে থাকা জিজ্ঞাসার মতো জমকালো রাত্রির রাধারা এসে/ভালোবেসে জড়ায় আমাকে'। ঠিক একইভাবে 'প্রিয় ইথাকা আমার' কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানে কবি প্রিয় ইথাকা বলতে বাংলাদেশকে বুঝিয়েছেন। যাকে কবি প্রশ্ন করেন, 'বাংলাদেশ প্রিয় ইথাকা আমার, তুমিও কি হয়েছো পাথর!' এখানে তিনি বাংলাদেশকে বসিয়েছেন প্রেমিকার স্থানে। তাই তিনি যখন একই কবিতায় বাংলদেশকে প্রেমিকারূপে কল্পনা করে লেখেন, 'আমাদের উষ্ণ আলিঙ্গনগুলি/ নতুন পলির মতো সুফলা করেছে বন্ধ্যা মাটির শরীর', তখন আমরা বুঝতে পারি দেশপ্রেম যদি বাংলাদেশ নামের রূপসীর সাথে মিশে যায়, তবে অনুন্নত বাংলাদেশ স্বনির্ভর হয়ে পড়বে।
কবিতা হবে সমাজ, সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। কবিতা যেমন হতাশের বুুকে আশা জাগাবে, তেমনি দুর্নীতিবাজদের চপেটাঘাতে করবে পর্যুদস্ত। সত্তরের রাজনীতি-সচেতন, নিভৃতচারী কবি হিসেবে খ্যাত মিনার মনসুর। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতার বই 'এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে' বাজেয়াপ্ত হয়। এর দীর্ঘ বিরতির পর গত বছর প্রকাশিত হয় 'মা এখন থেমে যাওয়া নদী'। এখানে স্মৃতিরা যেন তাঁর সঙ্গ ছাড়তে চায় না; নস্টালজিয়ায় মন যেন ডুবে থাকে কবির। এ কারণে 'অশরীরী ঈগলের ছায়া' কবিতায় তিনি বলেন, 'আমাদের নাম ধরে ডাকে পেছনের ফেলে আসা পথ…/যুগল স্বপ্নের কিছু হাড়গোড় আর সাইবেরিয়ার হংসের মতন/ধবধবে শাদা সেইসব প্রতিশ্রুতির ফসিল'। এই যে শব্দের ঝংকার তা হৃদয় না ছুঁয়ে পারে না। একে Allusion বললে ভুল হবে না। কারণ এখানে কবি পরোক্ষভাবে উল্লেখ করে বাস্তবতাকে আরও তির্যক করে তুলেছেন। এভাবেই কবি যখন বলেন, 'মহাপরাক্রান্ত পতাকা', 'সমুদ্রের সম্মোহন', 'শীতের তীক্ষ্ন দাঁত', 'প্রিয়তম দশকেরা', 'ধুলোর চাবুক', 'বাঁধভাঙা প্রাণের প্লাবন', 'রূপসী রাজনীতি', 'বর্ষণের তীক্ষ্ন শর', 'বাচালতার বীজ' তখন তাঁকে সত্তরের আবুল হাসান না বললে ভুল হবে।

পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্যের আধার নারী। তাই তার হাতে হৃদয় বন্ধক রেখেই কবিতা লেখা কবির ¯^ভাব। এ ক্ষেত্রে মিনার মনসুর কবিতায় কখনো নারীকে দেখি সুবিধাবাদী পিংকিরূপে। যাকে কবি চিত্রায়িত করেন এভাবে, 'পিংকিরা চলিয়া যায় বারংবার কবিকে মথিত করে'। আবার কখনো সেই নারীর রূপেই কবি মুগ্ধ হন। মৃত্যুর চেয়ে নারীর সৌন্দর্যের দাপটে আপ্লুত হয়ে বলেন, 'মৃত্যুর দাপট কে বলে অধিক নারীর বক্ষের চেয়ে?'। এই যে নতুন যুক্তি দাঁড় করিয়ে পাঠককে ভাবিয়ে তোলা, এই যে সাধারণ বাস্তবতাকে অসাধারণ উপস্থাপনায় দর্শন করে তোলা, তা কেবল কবির পক্ষেই সম্ভব। একজন কবি যে শুধু চিত্রাতীত বাস্তবতা তুলে ধরে উপমানির্ভর হন, তা সবসময়ে সত্য নাও হতে পারে। বরং কবিতার আকাশে তার ব্যতিক্রমও হতে পারে। তাই নারীও যে ফুলের মতো ফুটতে পারে, তা কবি ছাড়া আর কে ভাবতে পারে যেমন; 'এই যে অপরূপ নারীফুল ফুটিয়াছে তাহার সৌরভে মোহিত চারিদিক' তখন সহজেই বোঝা যায় ফুলের গন্ধে যেমন মাতোয়ারা হয়ে থাকে চারিদিক, তেমনি রূপসীর সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে থাকে কবির মন।

ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত'-এর হাত ধরে কবিতায় 'ডিসকোর্স অন মেথড'এর আগমন। এ হচ্ছে এমন এক ধরনের উচ্চারণ, যার একদিকে বক্তা কবি অন্যদিকে পাঠক বা শ্রোতা। আর এই ডিসকোর্সের বাস্তবতাও আমরা খুঁজে পাই মিনার মনসুরের বইতে। যেমন; 'ছেলেটি কোথায় তাতে কী-বা আসে যায়! শুধু মেয়েটি উড়ুক!'। এ ধরনের মনোমুগ্ধকর ডিসকোর্স সত্তরের হাতে গোনা কয়েকজন কবির সম্পদ। তাঁর এ শক্তি প্রকৃতি থেকে সঞ্চারিত। আবেগের শৈল্পিক প্রকাশও নিজস্ব। কবিতার সম্মোহনী শক্তিতে তিনি সহজেই অভিভূত করেন পাঠককে। তার নিভৃতচারী মনোভাব যেন এ শক্তিকে আরও সীমা অতিক্রম হওয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

অতি সম্প্রতি প্রকাশিত: পা পা করে তোমার দিকেই যাচ্ছি বইটির কিছু কবিতা নির্বাচিত কবিতা বইটিতে স্থান পেয়েছে। বলা যায় এই স্তরে এসে কবি তার কাব্যসম্ভারে নতুন সংযোজন করলেন। এখানে কবির স্বকীয়তা আরও বাঙময়। এখানে তিনি প্রমাণ করেছেন একজন কবির মন কখনো রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতায় পরাস্ত নয়। বরং রাজনীতিকে কবিই আঙুল তুলে পথ দেখান। তাই বিশ্বব্যাপী মানবতার শত্রুদের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে তার কবিতায়। রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে নাসিরনগরে, কাশ্মীরে, আরাকানে, আফগানিস্তানে ও মধ্যপ্রাচ্যে মানবতাকে পিষ্ঠ করে চলে তার মর্মস্পর্শী দহন ছড়িয়ে যাচ্ছে তার কবিতার সর্বাঙ্গে। তাই তিনি বলেন 'দজলা- ফোরাত থেকে গঙ্গা ও নাফ/ কোথাও জলের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু রক্তস্রোতে শ্যাওলার মতো ভেসে যাচ্ছে মানবতার বিবস্ত্র দেহ।'এই যে রূপকে রূপকে বাস্তবতা তুলে ধরাÑ তাই একজন কবির প্রকৃত কাজ। তাইতো কবি এসব নদীর অনুভূতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন 'তবু ও গঙ্গা ও নাফ তুমি বইছো কেন?' এই মানবতার প্রতিধ্বনি কীভাবে পৌঁছে দিতে হয় মন থেকে মনে কবি তা ভালোভাবেই জানেন। আর জানেন বলেই তিনি 'পঙ্গু পরিত্রাণ' কবিতা লেখেন। সভ্যতাকে পরিহাস করে তিনি বলেন ' কাঁটাতারে ঝুলন্ত যে ঝলমলে কিশোরীকে দেখছো সে আমি' । যেখানে চেঙ্গিস খাঁরা কবির কাছে বাংলাদেশের সকল শোষণকারীদের প্রতীক। 'চেঙ্গিস খাঁদের অজেয় অশ্বের পদাঘাতে উড়ে যায় যত উলুখাগড়ার প্রাণ/ আমি সেই শবাধার; অদূরে নিভৃতে খুব পাথরে মস্তক ঠোকে পঙ্গু পরিত্রাণ'

অর্থাৎ কবি বলতে চাইছেন আমি সেই সমঝোতাকারী রক্ষণশীল সমাজের প্রতিনিধি যে ছাড় দিতে দিতে জীবনকে তুচ্ছ বানিয়ে শোষক শ্রেণি ও ভূরাজনৈতিক পরাশক্তিদের সাথে সমঝোতা করে চলে। এতকিছুর পরও তিনি প্রেমিক। এবং পুরোই একজন প্রেমিক পুরুষ বলা যায়। প্রেমিকাকেই একমাত্র আরাধ্য তার। তাই বলতে পারেন 'আমি মুখ খোলার আগেই আমার সকল রক্তকণা সাতই মার্চের জনসমুদ্রের মতো সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে: 'তোমাকে চাই, তোমাকে চাই, তোমাকে চাই'। তাই প্রেমিকা জলের শয্যায় সংসার পাতলেও তিনি তার অবস্থা বর্ণনা করেন এভাবে 'কালীদহের খলজলে আমি পড়ে আছি বিপন্ন ভেলায়'। এ যেনো বেহুলার স্বামীর স্থানে প্রেমিক মিনার মনসুর পড়ে আছে। এ যে মিথকে ঘুরিয়ে দিয়ে কবিতায় নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করার প্রচেষ্টা তাই মিনার মনসুরকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে মনে করি। তার এই নির্বাচিত কবিতা বইয়ে স্থান পেয়েছে এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে (১৯৮৩), অনন্তের দিনরাত্রি (১৯৮৬), অবিনশ্বর মানুষ (১৯৮৯), আমার আকাশ (১৯৯১), জলের অতিথি (১৯৯৪), কবিতা সংগ্রহ (২০০১), মা এখন থেমে যাওয়া নদী (২০১২) এবং পা পা করে তোমার দিকেই যাচ্ছি(২০১৬) কাব্যগ্রন্থের বাছাইকৃত কবিতাগুলো যা পাঠককে আবুল হাসানের ভাষা শৈলী ও সিকদার আমিনুল হকের অসাধারণ দর্শনের সমন্বয় তৈরি একটি আলাদা কাব্যভাষার জগতে ভ্রমণের সুযোগ করে দেবে বলে আমার বিশ্বাস। বাংলা কবিতায় তাঁর উপস্থিতি অম্লান হবে বলে মনে করি। কবিতাপ্রেমী এ বাংলার আবহাওয়া তাকে নিঃসন্দেহে স্বাগত জানাবে।

নির্বাচিত কবিতা। প্রকাশক: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন ( ঢাকা: ২০১৬)।
প্রচ্ছদ: রাজীব রাজু। দাম: ২৫০ টাকা।

Image
Flag Counter