জনগণ কখন ‘গণদেবতা’?

জাকির তালুকদার
Published : 5 April 2022, 04:54 PM
Updated : 5 April 2022, 04:54 PM


সমকালে 'যথেষ্ট আধুনিক নন' তকমাটি লাভ করা, বলা চলে, বাংলাসাহিত্যের প্রায় সকল বড় লেখকের কপালেই জুটেছে। বড় লেখকরা কেউই তাঁদের ভাষাকে যথেষ্ট স্মার্ট বলে সমকালে প্রমাণ করতে পারতেন না। তাঁদের চিন্তার মধ্যেও পশ্চাৎপদতার ছাপ পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন গুণী সুপণ্ডিত সমালোচক এবং এলিট বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বসকল। কারণ কি তাহলে এই-ই যে, সমকালীন-আধুনিকতার কষ্টিপাথর হাতে নিয়ে যারা সাহিত্য এবং সাহিত্যিকের পরিমাপ করে বেড়ান, তারা আসলে চিরন্তনতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না। না সাহিত্যে, না জীবনে, না ইতিহাসে, না মননে– চিরন্তনতা তাদের কাছে বিবেচ্য নয়। তাই ধরাও দেয় না চিরন্তনতার অনুভূতি তাদের কাছে। যে সমস্ত বাংলা-ইংরেজি পাঠদণ্ড মগজে নিয়ে তারা ঘুরে বেড়ান, সাহিত্যপত্রিকায় বা সাহিত্যপাতায় চৌকিদারি করেন, সাহিত্যের খবরদারির জায়গা জুড়ে বসে থাকেন, বসে থাকেন প্রশাসকের ও পুরস্কার দেওয়া-না দেওয়ার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে, তারা কি তাহলে চিরকালই ঊনমেধার মানুষ? তা নইলে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র থেকে আরম্ভ করে তারাশঙ্কর, মানিক, বিভূতিভূষণের সাহিত্যকর্ম নিয়ে একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে কেন? এমনকি জগদীশ গুপ্ত বা সতীনাথ ভাদুড়ীও কেন বাদ পড়েন না এই তকমার ছোঁয়া থেকে? রবীন্দ্রনাথ কবি বা শিল্পীকে ভাগ করেছিলেন দুইটি ভাগে। একদিকে বিশ্বজগতের কবি। আরেকদিকে সাহিত্যজগতের কবি। শেষোক্তরা প্রসাধনে-পারিপাট্যে-বুলিবাগিশতায় সমকালীন সাহিত্যের বড় চেয়ারগুলি দখল করে বসে থাকেন। কিন্তু তাদের স্থায়ীত্ব বড় কম। তাদের উপস্থিতি যে সবসময় ক্ষতিকারক– এমনটি বলা যাবে না। এমনও বলা যাবে না যে সাহিত্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য তাদের প্রয়োজন নেই। কিন্তু নিজেদের এবং অন্যদের বড় যে ক্ষতিটি করে থাকেন, তা হচ্ছে, তারা বিশ্বজগতের কবির উপস্থিতিকে অনেকদিন ধরে আড়াল করে রাখেন পাঠকের সামনে থেকে। কখনো ঈর্ষাবশত, আর বেশিরভাগ সময়েই শনাক্তকরণের অক্ষমতায়। আবার তরল আখ্যানলেখকদের মতো পাঠকপ্রিয়তাও এই বাংলাসাহিত্যের বড় লেখকদের কপালে সেভাবে জোটেনি। শরৎচন্দ্রের প্রবাদপ্রতিম পাঠকপ্রিয়তাও জুটেছিল অনেক দেরিতে। তবুও তাঁকে ব্যতিক্রম হিসাবেই ধরতে হবে। কারণ একমাত্র শরৎচন্দ্র ছাড়া বাংলাভাষার বড় লেখকদের আর কেউ-ই পাঠকের আনুকূল্য পাননি তেমনভাবে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে এই দুই বঞ্চনা তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিল। অভিজাত সাহিত্যপত্রিকার মালিক-সম্পাদক, ভারতীয় সাহিত্য অঙ্গনের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব, সুমার্জিত বলে সমাজে পূজিত হুমায়ুন কবির তো তারাশঙ্কর সম্পর্কে এমন অমার্জিত উক্তিও করেছিলেন যে– 'ও একটা গেঁয়ো'। বিপরীতদিকে সেই সময় সমাজে সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তার অধিকারী বলে যারা নিজেদের দাবি করতেন, সেই বামপন্থি বুদ্ধিজীবী সমাজও স্বাগত জানায়নি তাঁকে। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম বিষ্ণু দে। আবার লেখকদের মধ্যে যারা তখন ছিলেন আধুনিকতার বার্তাবাহী বলে পরিচিত, তাঁরাও কেউ গুরুত্বপূর্ণ লেখক বলে মনে করতেন না তারাশঙ্করকে। আর পাঠকের আনুকূল্য? শেষের দিকে নাম-যশের পাশাপাশি বইয়ের কাটতি কিছুটা হলেও প্রথমদিকে অবস্থা ছিল ভয়াবহ। নিজের টাকায় ছাপা প্রথম উপন্যাস 'চৈতালী ঘূর্ণি'। দেড় বছরে বিক্রি হয়েছিল পঞ্চাশ-ষাট কপি। দপ্তরি, অর্থাৎ বাঁধাইকার দেড় বছর পরে হুমকি দিয়েছিল এই বলে যে তার গুদামে এসব ফেলে রাখা যাবে না। তিনি যদি ছাপানো ফর্মাগুলো নিয়ে না যান, তাহলে সের দরে বিক্রি করে দেওয়া হবে ঠোঙাওয়ালার কাছে। 'রাইকমল' ছেপেছিলেন নিজের পয়সাতে। বিক্রি তথৈবচ। প্রকাশকদের কাছে গেলে নির্মম ঔদাসীন্য। পাঠক আনুকূল্য না দেখালে প্রকাশক পিঠ দেখাবেন, এ তো জানা কথাই। 'আগুন' উপন্যাসটি নিয়ে প্রকাশকের কাছে যেভাবে অপমানিত হয়েছিলেন, তার বর্ণনা দিয়ে স্ত্রীকে চিঠিতে লিখলেন– আজ নির্মমভাবে অপমানিত হয়েছি আমি। আমার নতুন বইখানা নিয়ে বইয়ের দোকানে গিয়েছিলাম– সেইখানেই এ ব্যাপার ঘটেছে। তারা একশো টাকা দিতে চেয়েছিল– বইখানার সমস্ত স্বত্বের জন্য। আমি তাতে আপত্তি করে বলেছিলাম– সমস্ত স্বত্ব কেন দেব? আর আপনারা তো অন্য কাউকে বেশি টাকা দেন। আর এটা তো আপনাদের– আমাদের জব্দ করে ঠকানো। কারণ আমরা যদি নিজে বই ছাপাতাম তবে তো এভাবে ঠকতাম না। বা আপনারা ঠকাতে সাহস করতেন না। — সে বললে কি জান? বললে, যদি পারেন তবে আমাদের কাছে আসেন কেন?' এইসব কারণে ঘাটে ঘাটে অপমানিত হতে হতে একসময় ভেবেছিলেন, যা লিখেছেন, সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে ফেলে চলে যাবেন গ্রামে নিজের পেশায়। তা যে যাননি, সে তো বাংলা কথাসাহিত্যের সৌভাগ্যের বিষয়। তা করলে বাঙালির চিরস্থায়ী সম্পদের তালিকায় 'গণদেবতা' যুক্ত হতো না।

মূল পাঠে প্রবেশের আগে বইটি সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যেতে পারে। 'গণদেবতা' গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৮৯ সালে। তার আগে এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় 'ভারতবর্ষ' পত্রিকায়। ১৩৪৭ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যা থেকে ছাপা হতে থাকে। শেষ হয় ১৩৪৮ সালের চৈত্র সংখ্যায়। পত্রিকায় প্রকাশের সময় এর নাম ছিল 'চণ্ডীমণ্ডপ'। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় 'চণ্ডীমণ্ডপ' শিরোনাম বদল করে পরিণত হয় 'গণদেবতা'য়। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশের সময় উৎসর্গ করা হয়েছিল বিখ্যাত সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক সরোজকুমার রায়চৌধুরীকে। প্রকাশক ছিলেন শান্তিরঞ্জন সোম। প্রথম সংস্করণের পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১+৪১৩। এই উপন্যাসই ১৯৬৬ সালে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে এনে দেয় ভারতের সর্বাধিক কাঞ্চনমূল্যের সাহিত্য পুরস্কার 'জ্ঞানপীঠ'।

০২.
উপন্যাসের প্রথম নাম 'চণ্ডীমণ্ডপ' রাখার পেছনে তারাশঙ্করের ব্যক্তিপ্রবণতা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। আকাঙ্ক্ষা অর্থে সমাজ, গ্রাম এবং দেশকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ কেবলমাত্র বাস্তবে বাঁচে না। স্বপ্ন তার সঙ্গে যোগ হয়। তারাশঙ্করের মতো সৃজনশীল সংবেদনশীল ব্যক্তিত্বের জন্য কথাটি আরও বেশি সত্য। দেশকে তিনি যেভাবে দেখতে পেয়েছেন বাস্তবে, সেই বাস্তবতা পেরিয়ে সেই দেশটিকেই তিনি ভবিষ্যতে স্বপ্নের কোন জায়গাতে দেখতে চান, তা তাঁর অনেক রচনাতে ফুটে উঠেছে বেশ প্রকটভাবেই। গ্রামসমাজকে একীভূত একটি জনগোষ্ঠীর চেহারায় দেখতে পাওয়ার বাসনা তাঁর চিরকালই বিদ্যমান ছিল। এক্ষেত্রে তাঁর মনে সম্ভবত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল প্রাচীন ভারতের স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামসমাজের চিত্র। সমৃদ্ধ দেশ বলতে তিনি মনে করতেন প্রাচীন ভারতীয় গ্রামসমাজকেই। প্রাচীন ভারতীয় গ্রামসমাজ সত্যিকার অর্থেই সুখি ও সমৃদ্ধ ছিল কি না, স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল কি না, বর্তমান পৃথিবীর সাথে পা মিলিয়ে চলার যোগ্য ছিল কি না, গ্রামসমাজের এই তথাকথিত স্বয়ংসম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা এবং জাড্যতাই ভারতবর্ষের শত শত বর্ষব্যাপী পরাধীনতার অন্যতম কারণ ছিল কি না– এসব প্রশ্ন হালের সমাজবিজ্ঞানীদের। তারাশঙ্কর রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে ধারণা করতেন যে সত্যিকারের সুখি সমাজ মানেই হচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ একীভূত গ্রামসমাজ। সেই গ্রামসমাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবেই তারাশঙ্কর কল্পনা করেছিলেন চণ্ডীমণ্ডপকে। বাস্তবেও একটা সময়ে চণ্ডীমণ্ডপ ছিল গ্রামের সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে মানুষ সমবেত হতো বারোয়ারি পূজা উপলক্ষে, সমবেত হতো কোনো সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য, আমোদ-প্রমোদের জন্য, অবসর বিনোদনের জন্য, পারিবারিক বা গ্রামীণ বিচার-আচারের জন্য, যে কোনো সামাজিক ক্রিয়া-কর্তব্যের জন্য।। এককথায় চণ্ডীমণ্ডপ পুরোপুরি প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষের চাইতে বেশিভাবেই ছিল গ্রামসমাজের নিয়ন্ত্রক-স্থান। লেখকের জবানীতে জানা যাচ্ছে যে মাত্র বছর তিরিশ পূর্বেও 'চণ্ডীমণ্ডপ নিত্য সন্ধ্যায় জমজমাট হইয়া উঠিত। গ্রাম্য-বিচার হইত, সংকীর্তন হইত, পাশা-দাবাও চলিত। গ্রামে কাহারও কোনো কুটুম্ব সজ্জন আসিলে এই চণ্ডীমণ্ডপেই বসানো হইত। ক্রিয়া-কর্ম-অন্নপ্রাশন, বিবাহ, শ্রাদ্ধ– সবই এখানে অনুষ্ঠিত হইত।' এমনকি গ্রামের কবিরাজও রোগি দেখত এই চণ্ডীমণ্ডপে বসেই। এই উপন্যাসের পাঠশালাটিও পরিচালিত হয় চণ্ডীমণ্ডপেই। আমাদের বর্তমানে পঠনীয় 'গণদেবতা' উপন্যাসে চণ্ডীমণ্ডপ প্রায় কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবেই উপস্থিত। উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যপটও সেই চণ্ডীমণ্ডপেই। যদিও লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন যে পৃথিবীর পরিবর্তনের সাথে সাথে, গ্রামসমাজের ভাঙনের সাথে সাথে চণ্ডীমণ্ডপ আর আগের ভূমিকায় নেই। সে এখন অনেক জীর্ণ। লেখকের দীর্ঘশ্বাসের মতো চোখে পড়ে চণ্ডীমণ্ডপের হাল-বর্ণনা– গ্রামের শিবতলায় বারোয়ারি চণ্ডীমণ্ডপ। তবু উপন্যাস শুরু হয় চণ্ডীমণ্ডপেই। 'মন্দিরে ময়ূরেশ্বর শিব, পাশেই ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে গ্রামদেবী মা ভাঙা-কালীর বেদি। কালী-ঘর যতবার তৈয়ারি হইয়াছে, ততবারই ভাঙিয়াছে– সেই হেতু কালীর নাম ভাঙা-কালী। চণ্ডীমণ্ডপটিও বহুকালের এবং এক কোণ ভাঙা হইয়া আছে; মধ্যে নাটমন্দির। তার চাল কাঠামো হাতিশুঁড়-ষড়দল-তীরসাঙা প্রভৃতি হরেক রকমের কাঠ দিয়া যেন অক্ষয় অমর করিবার উদ্দেশ্যে গড়া হইয়াছিল। নিচের মেঝেও সনাতন পদ্ধতিতে মাটির।'

আমরা উপন্যাসের বিভিন্ন স্থানে চণ্ডীমণ্ডপের উল্লেখ দেখতে থাকব। কখনো উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীর উচ্চারণে, কখনো লেখকের জবানীতে। চণ্ডীমণ্ডপের জীর্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে, হাতবদল হতে থাকবে তার সামাজিক মালিকানার, সামাজিক সম্পত্তির পরিবর্তে চণ্ডীমণ্ডপ হতে থাকবে ক্ষমতাবান ব্যক্তির কুক্ষিগত প্রতিষ্ঠান। আর আমরা পাঠকরা ক্রমেই বুঝতে পারব যে চণ্ডীমণ্ডপ আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে এক চলমান ইতিহাস-বর্তমানের প্রতীক হিসাবে। শুরুতেই গ্রামসমাজে বেজে ওঠা ভাঙনের সুরের কথা। চণ্ডীমণ্ডপে গ্রামের মানুষ সমবেত হয়েছে এক সঙ্কট সামনে নিয়ে। কামার আর ছুতারকে নিয়ে গ্রামসভা। তারা চিরাচরিত নিয়ম মেনে গ্রামে আর কাজ করতে রাজি নয়। তারা ময়ূরাক্ষী পাড়ি দিয়ে শহরে গিয়ে আপন আপন দোকান খুলে বসেছে। গ্রামের লোকের কাজ ঠিকমতো করে দেয় না। অন্য সকলে মিলে তাদের যুক্তি খণ্ডনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। গ্রামের মানুষ সেই আলোচনা সভার পরে সবিস্ময়ে উপলদ্ধি করে যে গ্রামের সম্মিলিত শক্তি হেরে গেছে ব্যক্তির কাছে। শুরু হয়ে গেছে বিচ্ছিন্নতার দিনযাপন। কামার এবং ছুতারকে বশে আনতে তারা ব্যর্থ কারণ তারা সকলে মিলেও কামার এবং ছুতারের সমস্যার সমাধান দিতে অপারগ। আগের দিনের মতো করে গ্রামসমাজ এখন আর ধারণ এবং লালন করতে পারছে না তার সদস্যদের। কামার গ্রামের লোকের ফাল পাঁজিয়ে দেয়, হাল লাগিয়ে দেয় চাকায়, কাস্তে গড়ে দেয়, আর বিনিময়ে তাকে দেওয়া হয় হালপিছু ধান কাঁচি পাঁচ শলি। তা-ও সবাই ঠিকমতো দেয় না। অনেকেই পরে দেবে বলে আর দেয় না। আসলে দিতে পারে না। তাহলে কামারের চলে কীভাবে? ফলে অনিরুদ্ধ কামার যখন নিজের পদক্ষেপের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে, সেই যুক্তি খণ্ডানোর উপায় কারো থাকে না। অনিরুদ্ধ কামারের পিতামহকে এই গ্রামে এনে বসত করানো হয়েছিল গ্রামবাসীর যৌথ উদ্যোগে। অর্থাৎ কামার পরিবারের বাসস্থান এবং অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিল গ্রামসমাজই। এখন গ্রামসমাজের কাজ না করার সপক্ষে অনিরুদ্ধ কামারের যুক্তি উত্থাপনে একই সঙ্গে নতুন দিনের আগমনে পুরনো গ্রামসাজের ভাঙন এবং অপ্রতুলতার চিহ্ন ফুটে ওঠে প্রকটভাবেই– এ গাঁয়ে আগে কত হাল ছিল ভেবে দেখুন। কত ঘরে হাল উঠে গিয়েছে তাও দেখুন। এই ধরুন গদাই, শ্রীনিবাস, মহেন্দ্র– আমি হিসেব করে দেখেছি, আমার চোখের ওপর এগারটি ঘরের হাল উঠে গিয়েছে। জমি গিয়ে ঢুকেছে কঙ্কনার ভদ্রলোকদের ঘরে। কঙ্কনায় কামার আলাদা। আমাদের এগারখানা হালের ধান কমে গিয়েছে। তারপরে ধরুন– আমরা চাষের সময় কাজ করতাম লাঙ্গলের– গাড়ির, অন্য সময়ে গাঁয়ের ঘরদোর হত। আমরা পেরেক গজা হাতা খুন্তি গড়ে দিতাম– বটি কোদাল কুড়ুল গড়তাম– গাঁয়ের লোকে কিনত। এখন গাঁয়ের লোকে সেসব কিনছেন বাজার থেকে। সস্তা পাচ্ছেন– তাই কিনছেন। আমাদের গিরিশ গাড়ি গড়ত, দরজা তৈরি করত; ঘরের চালকাঠামো তৈরি করতে গিরিশকেই লোকে ডাকত। এখন অন্য জায়গা থেকে সস্তায় মিস্ত্রি এনে কাজ হচ্ছে। তারপর– ধরুন– ধানের দর পাঁচ সিকে– দেড় টাকা, আর অন্য জিনিসপত্র আক্রা। এতে আমাদের এই নিয়ে পড়ে থাকলে কি করে চলে, বলুন?'
কেউ উত্তর দিতে পারেনি অনিরুদ্ধ ও গিরিশের প্রশ্নের। কারণ উত্তর কোনো ব্যক্তির জানা নেই। জানা নেই, কারণ কালান্তরের প্রভাব তারা উপলদ্ধি করতে পারলেও ব্যক্ত করার ভাষা আয়ত্ত করতে পারেনি। লেখক একবার বলেছেন বটে দেবু ঘোষের কথা– 'অনিরুদ্ধের যে অন্যায় সে অন্যায়ের মূল কোথায় সে জানে', কিন্তু উপন্যাসের অগ্রসরতার সাথে সাথে আমরা, পাঠকরা জেনে যাই যে, দেবু ঘোষও তা জানে না। জানে না বলেই, অল্প পরেই দেখা যায়, নাপিত, বায়েন, দাই, চৌকিদার, নদীর ঘাটের মাঝি, মাঠ-আগলদার– সবাই কামার-ছুতারের ধূয়া নিয়েই নিজেরাও ধূয়া তুলে বসে– অল্প ধান নিয়ে তারা আর কাজ করতে পারবে না। কাজ করিয়ে নিতে হলে তাদেরকে নগদ পয়সা দিতে হবে।
উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র দেবু ঘোষ। শুধু প্রধান চরিত্র বললেই যথেষ্ট নয়, বরং বলা চলে, লেখকের প্রধান পক্ষপাতপুষ্ট চরিত্র হচ্ছে দেবু ঘোষ। গ্রাম্য মজলিসেই আমরা 'সবলদেহ দীর্ঘকায় শ্যামবর্ণ যুবা' দেবু বা দেবনাথ ঘোষকে দেখতে পাই। জানতে পারি, সে স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলের পণ্ডিত। লেখক এটাও জানিয়ে দেন যে, নিজের সম্পর্কে দেবুর ধারণা 'গ্রামের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হইল সে।' 'আপনার বুদ্ধি-বিদ্যার উপর তাহার প্রগাঢ় বিশ্বাস। তাহার এই বুদ্ধি সম্বন্ধে চেতনার সহিত খানিকটা কল্পনা– খানিকটা স্বার্থপরতা আছে। বিদ্যা অবশ্য বেশি নয়, কিন্তু দেবু সেইটুকুকেই লইয়া অহরহ চর্চা করে। খুঁজিয়া পাতিয়া বই যোগাড় করিয়া পড়ে; খবরের কাগজের খবরগুলো রাখে; এছাড়াও মহাগ্রামের ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পৌত্র বিশ্বনাথ এম এ ক্লাসের ছাত্র, সে তাহার ঘনিষ্ট বন্ধু। তাহাকে সে অনেক বই আনিয়া দেয়। এবং মুখে মুখেও অনেক কিছু সে তাহার কাছে শিখিয়াছে। এইসব কারণে সে বেশ একটু অহঙ্কৃতও বটে। এ গ্রামে তাহার সমকক্ষ বিদ্বান ব্যক্তি কাহাকেও দেখিতে পায় না। জগন ডাক্তার পর্যন্ত তাহার তুলনায় কম শিক্ষিত। কঙ্কনার হাইস্কুলে জগন ফোর্থ ক্লাস পর্যন্ত পড়িয়া পড়া ছাড়িয়াছে; বাপের কাছে ডাক্তারি শিখিয়াছে। দেবু পড়িয়াছে ফার্স্ট ক্লাস পর্যন্ত। পড়াশুনাতে সে ভালই ছিল, পড়িলে সে ম্যাট্রিক পাশ করিত– ভালভাবেই পাশ করিত এ-কথা আজও কঙ্কনার মাস্টারেরা স্বীকার করে। দেবু নিজে জানে– পড়িতে পাইলেই সে বৃত্তি লইয়া পাস করিত।' কিন্তু পড়া তার হয়নি। দরিদ্র পরিবারের সন্তান সে। তদুপরি ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই পিতার মৃত্যু। পড়ার খরচ চালানোর কেউ নাই। কাজেই পড়া তাকে ছাড়তে হলো। সংসারের হালও ধরতে হলো। এখন সে গ্রামের ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। কিন্তু একই সাথে গ্রাম নিয়ে চিন্তা-ভাবনাও করে অবিরাম। লেখক নিজে সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই বলে যে দেবু 'আপনার গ্রামখানিকে প্রাণের সহিত ভালবাসে'। সে একদিকে মনে করে গ্রামের 'শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের সম্মান তাহারই প্রাপ্য'। তবে সে একাই ঊর্ধ্বলোকের আলোকের অধিকারী হতে চায় না; চায় যে গ্রামের মানুষও সে আলোক লাভ করুক। তবে তাকে আশ্রয় করেই।


দেবুর ঠিক বিপরীতেই আছে শ্রীহরি পাল ওরফে ছিরে পাল। সে-ও গ্রামের প্রধান হতে চায়। তবে তার পথ ভিন্ন। তার চরিত্র ভিন্ন। 'শ্রীহরির বিশাল দেহ– কিন্তু স্থূল নয়, একবিন্দু মেদশৈথিল্য নাই। বাঁশের মত মোটা হাত-পায়ের হাড়, তাহাতে জড়ানো কঠিন মাংসপেশী। প্রকাণ্ড চওড়া দুখানা হাতের পাঞ্জা, প্রকাণ্ড বড় মাথা, বড় বড় উগ্র চোখ, থ্যাবড়া নাক, আকর্ণ-বিস্তার মুখগহ্বর, তাহার উপর একমাথা কোঁকড়াঝোঁকড়া চুল। এতবড় দেহ লইয়া সে কিন্তু নিঃশব্দ পদসঞ্চারে দ্রুত চলিতে পারে। পরের ঝাড়ের বাঁশ কাটিয়া সে রাতারাতি আনিয়া আপনার পুকুরে ফেলিয়া রাখে, শব্দ-নিবারণের জন্য সে হাত-কড়াত দিয়া বাঁশ কাটে। খেপলা জাল ফেলিয়া রাত্রে সে পরের পুকুরের পোনামাছ আনিয়া নিজের পুকুর বোঝাই করে; প্রতি বৎসর তাহার বাড়ির পাঁচিল সে নিজেই বর্ষার সময় কোদাল চালাইয়া ফেলিয়া দেয়, নতুন পাঁচিল দিবার সময় অপরের সীমানা অথবা রাস্তা খানিকটা চাপাইয়া লয়। কেহ বড় প্রতিবাদ করে না, কিন্তু ব্যক্তিগত সীমানা আত্মসাৎ করিলে প্রতিবাদ না করিয়া উপায় থাকে না। তখন ছিরু কোদাল হাতেই উঠিয়া দাঁড়ায়; দন্তহীন মুখে কি বলে বোঝা যায় যায় না। মনে হয় একটা পশু গর্জন করিতেছে। এই চুয়ালি­শ বছর বয়সেই সে দন্তহীন, যৌনব্যাধির আক্রমণে তাহার দাঁতগুলি সবই পড়িয়া গিয়াছে। হরিজন-পল্লীতে সন্ধ্যার পর যখন পুরুষরা মদে বিভোর হইয়া থাকে, তখন ছিরু নিঃশব্দ পদসঞ্চারে শিকার ধরিতে প্রবেশ করে। কতবার তাহারা উহাকে তাড়া করিয়া ধরিবার চেষ্টা করিয়াছে– কিন্তু ছিরু ছুটিয়া চলে অন্ধকারচারী হিংস্র চিতাবাঘের মত।'

এত হিংস্র এত কু-সর্বস্ব করে তারাশঙ্কর এঁকেছেন শ্রীহরি পালকে! কিন্তু কেন এই বিরূপতা? নতুন যে দিন আসছে, সেই দিনগুলিতে সমাজের, গ্রামের, দেশের নেতৃত্ব যাবে ছিরু পালের মতো মানুষদের হাতে। এটি সাহিত্যিক-দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন। যতই তার পক্ষপাত থাকুক ন্যায়রত্ন মহাশয়, বা দ্বারকা চৌধুরী, কিংবা দেবু ঘোষের প্রতি, লেখক এটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের তিনি জয়ী দেখতে পাবেন না, দেখাতেও পারবেন না। গৌণ লেখক হলে ঠিক সেই কাজটিই করে ফেলতেন তিনি। কিন্তু জীবনের সত্য বাস্তবতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা কোনো অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লেখকের পক্ষে সম্ভব হয় না। যেমনটি সম্ভব হয়নি ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ট প্রতিভা বালজাকের পক্ষে। তেমনই সম্ভব হয়নি তারাশঙ্করের পক্ষেও। সম্ভব যখন হয়নি, তখন নিজের বিরূপতা পুরোপুরি বিষোদ্গার আকারে পাঠকের সামনে উপস্থিত করতে দোষ কি? এই চিন্তা থেকেই সম্ভবত ছিরুকে সর্বোচ্চ কুশ্রীতা দিয়ে আঁকতে চেয়েছেন তারাশঙ্কর।

দেবনাথ ঘোষও সমাজের নেতৃত্ব চায়। সে এই ব্যাপারে জগন ডাক্তার এবং শ্রীহরির সাথে প্রতিদ্বন্ধিতায় নামতেও প্রস্তুত। বলা যায়, প্রতিদ্বন্ধিতায় সে নেমেছে শুরু থেকেই। নিজেকে সে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেখতে চায়। ঐ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে গ্রামে সে কি কি উন্নয়ন কাজ করবে, তারও একটা কাল্পনিক পরিকল্পনা মনে মনে তৈরি করে রেখেছে। 'সে কল্পনা করিত– অসংখ্য পাকা রাস্তা! প্রতি গ্রাম হইতে লাল কাঁকরের সোজা রাস্তা বাহির হইয়া মিলিত হইয়াছে এই ইউনিয়নের প্রধান গ্রামের একটি কেন্দ্রে, সেখান হইতে একটি প্রশস্ত রাজপথ চলিয়া গিয়াছে জংশন শহরে। ওই রাস্তা দিয়া চলিয়াছে সারি সারি ধান-চালে বোঝাই গাড়ি, লোকে ফিরিতেছে পণ্য বিক্রয়ের টাকা লইয়া, ছেলেরা স্কুলে চলিয়াছে ঐ পথ ধরিয়া। সমস্ত গ্রামের জঙ্গল সাফ হইয়া– ডোবা বন্ধ হইয়া একটি পরিচ্ছন্নতায় চারিদিক ভরিয়া উঠিয়াছে। সমস্ত স্থানগুলিতে ছড়াইয়া দিয়াছে দোপাটি ফুলের বীজ; দোপাটি শেষ হইলে গাঁদার বীজ। ফুলে ফুলে গ্রামগুলি আলোকিত হইয়া উঠিয়াছে। প্রতি গ্রামের প্রতি পল্লীতে একটি করিয়া পাকা ইঁদারা খোঁড়া হইয়াছে। কোনো পুকুরে এককণা আবর্জনা নাই, কালো জল টলটল করিতেছে– পাশে পাশে ফুটিয়া আছে শালুক ও পানাড়ীর ফুল। কোর্ট বেঞ্চের সুবিচারে সমস্ত অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবিধান হইয়াছে– কঠিন হস্তে সে মুছিয়া দিতেছে উৎপীড়ন ও অবিচার।'
কিন্তু লেখক দেবুর দিবারাত্রির মানসস্বপ্নকে জানানোর পাশাপাশি একথাটিও মনে করিয়ে দেন যে 'অন্তরে শুভ আকাক্সক্ষা এবং উচ্চ কল্পনা থাকিলেই সংসারে তাহা পূর্ণ হয় না। পারিপার্শ্বিক অবস্থাটাই পৃথিবীতে বড় শক্তি।' পারিপার্শ্বিক অবস্থা যে দেবুর মতো মানুষদের জন্য অনুকূল নয়, একথা মনে করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তারাশঙ্কর আসলে কি পাঠককে প্রস্তুত করতে চান দেবুর আগাম পরাজয়কে চাক্ষুষ করার জন্য? কেননা শ্রীহরির স্বপ্নকল্পনার সময় কিন্তু এ-জাতীয় কোনো চেতাবনি উচ্চারিত হয় না উপন্যাসে। হরিজন-পল্লীতে রাতের আঁধারে আগুন দিয়েছে যে শ্রীহরি, সেই শ্রীহরিই আবার প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ঘরকে পাঁচ সের করে চাল দেয়, ধান দেয় কিছু কিছু, দশ গণ্ডা করে খড় দান করে ঘর ছাওয়ার জন্য। হরিজন-পল্লীতে এই ধান-খড় দানের ঘোষণা দিয়ে ফেরার পথে শ্রীহরি কল্পনা করতে থাকে গ্রামের জন্য আর কি কি কাজ করবে। খরার দিনে জলের অভাবে লোকের কষ্টের আর অবধি থাকে না। এবার সে একটি কুয়া কাটিয়ে দেবে গ্রামে। তাছাড়াও– 'গ্রামের পাঠশালার আসবাবের জন্য সেবার লোকের দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষাতে পাঁচটা টাকাও সংগৃহীত হয় নাই; সে পঞ্চাশ টাকা পাঠশালার আসবাবের জন্য দান করিবে।… গ্রামের পথটা কাঁকর ঢালিয়া বাঁধাই করিয়া দিবে। চণ্ডীমণ্ডপের মাটির মেঝেটা বাঁধাইয়া দিবে: সিমেন্ট-করা মেঝের উপর খুদিয়া লিখিয়া দিবে– শ্রীচরণাশ্রিত শ্রীহরি ঘোষ।'

নিজেকে ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেখতে না পেলে দেবু ঘোষের পক্ষে গ্রাম-উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা সম্ভব হয় না। শ্রীহরির কিন্তু সেই ঝামেলা নাই। সে চাইলেই করতে পারে। কোনো পদ দখল না করেই করতে পারে। এবং কাজগুলি পরবর্তীতে করেও দেখায়। বিনিময়ে সে শ্রদ্ধা চায়নি দেবুর মতো। চেয়েছে আনুগত্য।
প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই পদে পদে দেবু ঘোষের ভঙ্গুরতা।

গ্রামের লোকের পাশে যে তাদের প্রয়োজনেই দাঁড়াতে যায়। কিন্তু গ্রামের লোক সেইভাবে তার পাশে দাঁড়ায় না। দেবু ঘোষের শক্তি বলতে রয়েছে জনতার সম্মিলিত শক্তি। কিন্তু সেই জনতা তার পাশে দাঁড়ায় না। তাকে শ্রদ্ধা করে, ভক্তি করে, তার পাণ্ডিত্যের জন্য নিজেরাও গর্ব অনুভব করে, তার সততাকে প্রশ্নাতীত বলে বিশ্বাস করে, মানুষের প্রতি তার ভালোবাসাকেও সত্যিকারের ভালোবাসা বলেই স্বীকার করে। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ায় না। সেটেলমেন্টের মাপজোকের সময় গ্রামের লোকের পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকের সেই অপূরণীয় ক্ষতি রদ করার জন্য আমলা-জরিপকারীদের সাথে বিবাদ করে দেবু ঘোষ জেল খাটতে যায় পনেরো মাসের জন্য। কয়েদখাটার মেয়াদ শেষে একদিনের জন্য গ্রামে জোটে ফুলের মালা, শত শত প্রণাম, আর তার সম্মানে আয়োজিত একটি পালাগান। কিন্তু সে ঐ একটি দিনের জন্যই কেবল। গ্রামজীবন আবার যথারীতি আগের রূপে ফিরে যায়। শ্রীহরির দাপট বাড়তে থাকে। মানুষ অন্যায়-অবিচারের শিকার হতে থাকে, কিন্তু তারা রুখে দাঁড়ায় না নিজেরাও, আবার দাঁড়ায় না দেবুর পাশেও। কার্যকর সহযোগিতা যেটুকু আসে, তা সেই দুর্গার কাছ থেকে। হরিজন দুর্গা, ভ্রষ্টা দুর্গা। কিন্তু তার শক্তি আর কতটুকু। বচনামৃত দিয়ে তাকে চাঙ্গা করে যান ন্যায়রত্ন মহাশয় এবং দ্বারকা চৌধুরী। মাঝে মাঝে শহুরে ভঙ্গিতে তাকে উৎসাহ দেয় ডেটিনিউ যতীন। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। গ্রামে কলেরা শুরু হলে শ্রীহরি যথাসাধ্য চিকিৎসা-সরঞ্জামের আয়োজন করে। অন্যদিকে দেবু সমস্ত আবেগ নিয়ে নিজেকে সঁপে দেয় আক্রান্ত গ্রামবাসীর সেবায়। ফলাফলÑ দেবুর স্ত্রী এবং শিশুপুত্রের মৃত্যু।

শ্রীহরি যেখানেই হাত রাখে সেখানেই তার জয়-জয়কার। প্রথম দিকে সে দৈহিক পরিশ্রম এবং দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে নিজের প্রাথমিক ধন সঞ্চয় করেছে। তারপরে সে গ্রামের মানুষকে ঋণের জালে আবদ্ধ করে সুদ-তস্যসুদ আদায় করে তাদের সর্বস্বান্ত করে সকল সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছে। এরপরে তার দৃষ্টি আরো ওপরের দিকে উঠেছে। সে জমিদারের নায়েব-গোমস্তা, সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ-উপঢৌকন-মদ-নারী সরবরাহের মাধ্যমে জমিদারি কিনেছে, গ্রামের সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। শ্রীহরির এই উত্থান এবং সর্বজয়ী আগ্রাসনকে কি ভারতবর্ষে বিজয়ী বিকৃত পুঁজিবাদের উত্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব? বোধহয় সম্ভব। তারাশঙ্কর মার্কসবাদ না জেনে এবং না মেনেও পুঁজিবাদের আগ্রাসী চরিত্র এবং অনিবার্য বিজয় চিনতে পেরেছিলেন। তাই তার মনে এবং হৃদয়ে সর্বব্যাপী পক্ষপাত থাকা সত্ত্বেও দেবু ঘোষদের হেরে যেতে হয়। কলমে তিনি তাদেরই বিজয়গাথা রচনা করতে বাধ্য হন, যাদের আগমনের মধ্যে তিনি অমঙ্গলের চিহ্ন দেখে শিউড়ে উঠেছেন প্রতিনিয়ত। কিন্তু তাকে ঠেকানোর উপায় তাঁর জানা ছিল না। তাঁর সময়কালে যে মতবাদটিকে একমাত্র নিদান হিসাবে ধারণ করেছিল বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ, সেই মার্কসবাদের প্রতি তিনি তাঁর আস্থা স্থাপন করতে পারেননি। তাই তাঁর পরিকল্পিত সমাজ গঠনের কুশিলব দেবু ঘোষদের শেষ পর্যন্ত পরাজয়ই বরণ করতে হয়।
তাহলে 'গণদেবতা' কীভাবে গণদেবতা হয়ে উঠতে পেরেছে? পরাজিত নায়ক মানুষের সহানুভূতি অর্জন করতে পারে, কিন্তু দেবতার জায়গায় অভিষিক্ত হতে পারে না। জনগণ যে শেষ পর্যন্ত তারাশঙ্করের কাছে 'গণদেবতা' রূপেই বিরাজ করতে পারে– সেই আস্তিকতার জোরটি আসে কোত্থেকে? আসে পরাজয় মেনে না নেওয়া থেকে। তিনি মানুষকে কোনো সামাজিক-সূত্রে বা ফর্মুলায় আবদ্ধ দেখতে শেষ পর্যন্ত রাজি হননি। সেই কারণে আপাত পরাজয়কে, এমনকি অনিবার্য পরাজয়কেও শেষ কথা হিসাবে মেনে নিতে তাঁর আপত্তি। সেই কারণে তিনি উপন্যাসের শেষে যতীনের জবানীতে এই ঘোষণা দিতে ভোলেন না যে 'সংসার ও সংসারের কোনো কোনো মানুষ হিসাবের গণ্ডিতে আবদ্ধ নহে'। লেখক নিজের বিশ্বাসের দৃঢ়তাকে নির্দ্বিধায় ঘোষণা দিতে পারেন এই বলে যে– 'মানুষ সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে অঙ্কশাস্ত্রের অতিরিক্ত রহস্য। পৃথিবীর সমুদ্রতটের বালুকারাশির মধ্যে একটি বালুকণার মতই ব্রহ্মান্ড-ব্যাপ্তির অভ্যন্তরে এই পৃথিবী, তাহার মধ্যে যে জীবনরহস্য, সে রহস্য ব্রহ্মাণ্ডের গ্রহ-উপগ্রহের রহস্যের ব্যতিক্রম– এক কণা পরিমাণ জীবন, প্রকৃতির প্রতিকূলতা, মৃত্যুর অমোঘ শক্তি– সমস্তকে অতিক্রম করিয়া শত ধারায়, সহস্র ধারায়, লক্ষ ধারায়, কোটি কোটি ধারায় কালে কালে তালে তালে উচ্ছ্বসিত হইয়া মহাপ্রবাহে পরিণত হইয়া বহিয়া চলিয়াছে। সে সকল বাধাকেই অতিক্রম করিবে।'
এই বিশ্বাসের কারণেই জনগণ তারাশঙ্করের চোখে শেষদিন পর্যন্ত 'গণদেবতা', এবং সেই বিশ্বাসের শিল্পিত রূপায়নের সক্ষমতাতেই তারাশঙ্কর মহৎ ঔপন্যাসিক।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক