পরভুক বুদ্ধিজীবী প্রাণী বা বিমূর্ত শ্রমিক

কামালউদ্দিন নীলুকামালউদ্দিন নীলু
Published : 13 March 2022, 04:09 PM
Updated : 13 March 2022, 04:09 PM


এই সেদিন, প্রিয় বন্ধু বাবুয়ার সাথে কথা শেষ হতেই নিজের ভেতরে এক ধরনের নস্টালজিয়া পেয়ে বসলো। দেশ, দেশের রাজনীতি, পরিবার, নাটকের বন্ধুদের সাথে কথোপকথন, ভিন্ন ভিন্ন সব পেশার বন্ধুদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সব আড্ডা ইত্যাদি ইত্যাদি… সব ভাবতে ভাবতে ঢুকে পড়লাম জ‍্যাক লাকোঁ-এর সাইকোঅ‍্যানালিটিক থিয়োরি দ‍্য মিরর স্টেজের মধ্যে : 'দ‍্য সাবভার্শন অব দ‍্য সাবজেক্ট অ‍্যান্ড দ‍্য ডায়ালেকটিক অব ডিজায়ার'। পুরো রচনাটা আমার স্নায়ুর উপর চেপে বসলো। কিছুক্ষণের জন‍্য নিশ্চুপ!!

সময় গড়ানোর তালে তালে প্রিয় কবি মায়াকোভস্কির কবিতা বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছি:

বি‍শ্বব্রহ্মান্ড ঘুমিয়ে
তার বিশাল কর্ণকুহরে-
জেগে থাকা নক্ষত্রগুলো এখন
তার থাবার ওপরে পড়ে আছে।

ভাবছি… কফি মেশিনটা অপেক্ষা করছে। উঠে দাঁড়ালাম। মেশিনের কাছ থেকে কফি নিয়ে চুমুক দিতেই নিজের মধ্যে প্রশ্ন: পৃথিবী এবং দেশ যেখানে এখন বায়োপলিটিক্সে আক্রান্ত সেখানে এতো ভেবেই বা কী! আর চিন্তা করেই বা কী! আমি কোন বালেশ্বরবাল হরিদাস পাল।

কিন্তু হরিদাসকেও যে ভাবতে হয়, না চাইলেও ভাবতে হয়! চিন্তা কড়মড় করে কামড়াতে থাকে হরিদাসের মগজ। হ‍্যাঁ, চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক, একেতো অতিমারীর ঠেলায় পৃথিবী অস্থির তারমধ‍্যে ইউক্রেন নিয়ে বিশ্বের সব বাটপার নেতাদের পাছা মারামারি। আরে শালা এইসব হচ্ছে কী? বতর্মান বিশ্বের রাজনীতি এবং এর হাল-হকিকত দেখলে মনে হয় আজকের দেশ ও বিশ্বটাই হয়ে পড়েছে রাজনীতির বক্সিং রিং। চলছে খেলা : ' বব অ‍্যান্ড উয়িভ', কখনো 'ব‍্যাক-পেডাল', কখনো বা 'কর্কস্ক্রু'-এর রঙিন রাজনীতিকদের কেউ রেফারি, কেউবা কর্নার ম‍্যান। চলছে খেলার মধ‍্যে 'ক্লিঞ্চ', যার অর্থ হলো প্রতিপক্ষের শরীরটা দুই হাতের শক্ত বাহু দিয়ে চেপে ধরা। যাতে করে প্রতিপক্ষ কোনোভাবেই যেন পাঞ্চ বা বোলো, বা মুষ্ঠাঘাত করতে না পারে। খেলাটা আসলেই দারুণ, কি বলেন? একটা ধ্বংসের খেলা। এই খেলাটার নাম নাম দিলাম- 'শিশ্ন শিশ্ন খেলা'; অর্থাৎ নুনু নুনু খেলা, যেটা খুঁজে পাওয়া যায় ডিস্টোপিয়ার স্বপ্ন রাজ‍্যের ভেতরে।

এই 'পোস্ট -আইডিওলজিক‍্যাল' সময় বা 'পোস্ট -ডেমোক্রেটিক' বা 'পোস্ট-পলিটিক‍্যাল' যুগের মধ‍্যেই কিন্তু বসবাস করছে জর্জ অরওয়েল-এর ডিস্টোপিয়ার স্বপ্ন, যে স্বপ্নের মধ‍্যে জড়িয়ে আছে 'জাল-বুনন গণতন্ত্র'। অ‍্যালান ব‍্যাজু-র ভাষায় 'ডেমোক্রেটিক ইল‍্যুশন' বা 'গণতন্ত্রের বিভ্রম'। এই বিভ্রম ও বিভ্রাটের ফলে আমাদের শরীর ও মস্তিষ্ক ঢুকে পড়ছে হেগেল-এর 'অ‍্যাবস্ট্রাক্ট নেগেটিভিটি' বা 'বিমূর্ত নেতির' এ মধ‍্যে, যা কেবলই অক্ষমতা ও অকার্যকর। এই বিমূর্ত নেতি আসলে সত‍্যতা বা সারবত্তা প্রতিপাদনে অক্ষম; আর অক্ষম বলেই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ বিন‍্যাসে প্রকৃত ভাবতত্ত্ব, জ্ঞানতত্ব, মতাদর্শ, রাজনৈতিক মতাদর্শ, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব‍্যবস্থা, সুশাসন এবং প্রকৃত রাজনীতির অবস্থান লাশকাটা ঘরে; পোস্টমর্টেমের অপেক্ষায়।

এটা একটা খেলা। কাটাকটি, রক্তারক্তির খেলা। যে খেলার রূপ আমি খুঁজে পাই বৃটিশ -আইরিশ শিল্পী ফ্রান্সিস বেকনের ক‍্যানভাস 'ক্রুসিফিকশন'-এর রং, রেখা ও টেক্সচারের গঠনে।
বিশ্ব রাজনীতির এই খেলা আমাকে টেনে নিয়ে যায় 'সার্কল অব লাইফ'-এ:

জীবনের এইতো চক্র
এই চক্রই আমাদের
ভ্রমণ করায়,
আশা ও হতাশায়
বিশ্বাস ও ভালোবাসায়।
যতোক্ষণ না জায়গা খুঁজে পাই,
পাক খুলে যাওয়া জীবনের
কোনো এক পরতে।

কফি শেষ হতেই বসে পড়লাম ল‍্যাপটপের সামনে। ইন্টারনেটে ক্লিক করতেই বেরিয়ে পড়লো একের পর এক খবর। পৃথিবীর ও দেশের খবর। রাষ্ট্র ও দেশ উদ্ধারের রাজনীতি। রাজনীতির কাতুকুতুর গপ্পো-সপ্পো:

ব্লেম গেম চলছে। ষড়যন্ত্রের রাজনীতি চলছে। ভাষার ভায়োলেন্স চলছে।
অকথ্য কথাবার্তা চলছে। মস্তিষ্কের মগজ টগবগ করে ফুটছে… ঘিলু গড়িয়ে পড়ছে!

অদ্ভুত এবং ভয়ংকর সব কাণ্ড কারখানা, যা আমার কাছে রাজনৈতিক কপটতার বিচক্ষণতা বনাম রাজনৈতিক কপটতার প্রলোভন বলেই মনে হয়। ভাবছি… হঠাৎ প্রস্রাবের বেগ চাপতেই এক ছুটে সোজা বাথরুমে। প্রস্রাব, শব্দ… হালকা কাম ভাব- শরীরটা মোচড় দিতেই বাথরুমের আয়নায় মুখ আটকে পড়লো। ধীরে ধীরে আয়নাটা হয়ে উঠছে শিল্পী রেনে মাগ্রিটের সেই ভয়ংকর চোখ; 'দ‍্য ফলস্ মিরর'। আমার মুখ হয়ে পড়েছে বোদলেয়ারের 'দ‍্য স্ট্রেঞ্জার'- এর মুখ ও মুখোশ :

…তুমি কাকে ভালোবাসো, বিস্ময়কর আগন্তুক?
আমি ভালোবাসি ওই মেঘের দল…ওই যে সাদা মেঘ…
উড়ে চলে…ওই যে…ওই উপরে…আরো আরো উপরে…
অপরূপ বিমূর্ত অন্ধকার!

এ যেন হেগেলের 'অ‍্যাবস্ট্রাক্ট নেগেটিভিটি'- যেটাকে বলা যায় বিমূর্ত নেতি। আর এরই মধ‍্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব তথা বাংলাদেশের রাজনীতি। এটা হাউসি(জুয়া) খেলার ভাষায় উল্টাপাল্টা 69- যে কারণে আজকের রাজনীতির গতিপথ ধাবিত হচ্ছে বিমূর্ত পুঁজির লক্ষ‍্যে। মার্কসের ভাষায় বলতে হয় 'রিয়েল অ‍্যাবস্ট্রাকশন'। আমাদের ভাষায় বলা চলে 'খাঁটি বিমূর্তন'। এটা আমাদের বুঝতে হবে সমকালিন পুঁজিবাদের এই বিমূর্ত রাজনৈতিক শিল্প সুকৌশলে লুকিয়ে থাকে সম্পর্ক বিনিময়ের মধ্যে। সমকালীন বিশ্ববাজার অর্থনীতির রাজনৈতিক কাঠামোয় সম্পর্কের বিনিময় ও কৌশল এতো প্রবল ও শক্তিশালী যে এটা নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব‍্যবস্থাকে। সব মিলিয়ে এই বিমূর্তনকে বলা চলে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবাদের বিমূর্তন; যেহেতু এর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে পুঁজি ও শ্রম, দেওয়া ও নেওয়া। রূপকের সংমিশ্রণে বলতে হয় আজকের পুঁজিবাদী সমাজব‍্যবস্থায় প্রতিটি বুদ্ধিজীবী রূপান্তরিত হয়ে পড়েছে মুখোশে। এই জন্যে মুখোশই পুঁজি বা পুঁজির অংশ, মানুষটি নয়। বতর্মান বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর মধ‍্যে হাজার -লক্ষ-কোটি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান, চালচলন, কথাবার্তা এবং এদের দেহ ও মুখের ভঙ্গি ও ভাষা নিয়ে আমরা চিন্তিত ও বিভ্রান্ত। কী লাভ এসবের পেছনের উদ্দেশ্যকে খুঁচিয়ে দেখা! কেন? কাকে? -যারপর নাই, সব ছাড়া ছাড়া চিন্তা ভাবনা ! আমরা এখনো কেন বুঝতে চাইছি না বা ভাবছিনা যে এই বুদ্ধিজীবীরা এখন কেবলই 'বিবৃত্ত গৃহগোধিকা'। সব ফ‍্যানটম অপেরার মুখোশ। শালা কী অসাধারণ ট্রান্সফরমেশনের দৃশ্য কাব‍্য। বাড়া…! নাও, এ যে বেকেটের- লাকি আর পোঁজোর গল্পের প‍্যারোডি- গুরুর ঘাড়ে চরেছে গরু! ফাটাফাটি কাণ্ড। আমার বালের ঠেকা এদের সমালোচনা করা। আরে এরা এখন ক্লাউন। রঙ্গ বিদূষক। লাল দোপাট্টা মল্ মল্…। ওরা ছাড়া অসম্ভব এই মহামারী বা অতিমারী বা করনাকালীন সময়কালে জীন্দা থাকা।

ঠিক আছে হে মানুষ এবার আমার সঙ্গে ঢুকে পড়ুন – "দ‍্য বাথ-হাউজ" নাটকের তৃতীয় অঙ্কে :
মঞ্চের পাত্রপাত্রী ও নাগরিকগণ হাঁটু গেড়ে বসো এবং কাঁধটা নিচু করে রাখো, তোমাদের যেন মনে হয় তোমরা ক্রীতদাস, বুঝেছো? … তোমার ভগ্ন হৃদয়টা এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন শক্তির দ্বারা আক্রান্ত। তুমি বানচোদ বুদ্ধিজীবী এখন টেস্টিকুলার একটা… অন্ডকোষ।
এটাই! এটাই এবং এটাই!

আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এখন আর কোনো সাবজেক্ট নয়, যেহেতু ওদের এখন আর নিজস্ব কোনো সত্তা নেই। আর নেই বলেই ওদের অবস্থান লাশকাটা ঘরে; পোস্টমর্টেমের অপেক্ষায়। এবং ওরা এখন অস্তিত্বহীন। আমি ও আপনি যাকে দেখছি সেটা (ও) কেবলই মুখোশ, মানুষটি নয়। এই মুখোশ যে শুধুমাত্র তার প্রকৃত অবস্থা গোপন করছে তা নয়; এই মুখোশ তার আদর্শগত অবস্থানকেও ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে। এই জন্য এই মানুষ(মুখোশ)-গুলোর নিজস্ব কোনো ভাষা নেই, অভিব‍্যক্তি নেই; এরা এখন একীভূত খাঁটি বিমূর্তনের মধ‍্যে যেখানে বিনিময়টা মুখ্য। অর্থাৎ তাদের প্রাপ্তি, নানারকম আর্থিক সুবিধা, পদ ও পদবী, পদক, খেতাব, পুরষ্কার, ইত্যাদি আরো বহু কিছুই। এই যে প্রাপ্তি এটা পাওয়া ও ধরে রাখতে এরা ক্ষমতার বলয়ের মধ‍্যে থাকতে তৎপর। এদেরও ঐ একই ভাষা। একই প্রকাশ ভঙ্গি। একই মুখোশ। একটা অবজেক্ট। এ কারণে ভাষাগতভাবে 'বুদ্ধিজীবী' শব্দটি আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ! অর্থনীতির ভাষায় এরা এখন অ‍্যাবস্ট্রাক্ট লেবার বা 'বিমূর্ত শ্রমিক'। এই বিমূর্ত শ্রমিক বুদ্ধিজীবীদের আমরা সংজ্ঞায়িত করতে পারি 'অন‍্যোন‍্যজীবী' বলে, যেহুতু এদের ভাষা ও শরীরে যুক্ত হয়ে পড়েছে অমার্জিত, অথর্ব ও সংকীর্ণমনা রাজনীতিবিদদের ভাষা ও কর্ম।

আমি বুদ্ধিজীবী শব্দটি যে লাল ক্রস চিহ্ন এঁকে দিয়ে 'অন‍্যোন‍্যজীবী' করলাম এর ব‍্যাখ‍্যাটা খুঁজে পাওয়া যায় মিশেল ফুকোর 'বায়োপলিটিক্স' এর মধ‍্যে, যেটা যুক্ত থাকে 'বায়োপাওয়ার' বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ‍্যে; যেখানে ক্রমে ক্রমে জায়গা করে নিয়েছে 'বুদ্ধিজীবী'র দল- 'বুদ্ধিজীবী শ্রমিক' হিসাবে। এদের শরীর, মন ও মনন, চিন্তা চেতনা, বিচক্ষণতা, বিজ্ঞতা আটকে পড়েছে নির্দিষ্ট আইডিয়োলজিক‍্যাল ফ্রেমওয়ার্কের মালখানায়। এটা সমকালীন বাজারব্যবস্থার একটা অংশ। পুঁজিবাদী সমাজ ব‍্যবস্থা, রাষ্ট্র ব‍্যবস্থা, ও ক্ষমতার নতুন প্রযুক্তিগত কৌশল বা 'টেকনোলজি অব পাওয়ার', যেটা ঘাপটি মেরে থাকে 'ডিসিপ্লিনারী মেকানিজম' বা সোজাসাপ্টা বলতে গেলে বলতে হয় নিয়ন্ত্রণ কৌশলের মধ‍্যে। যা আমার কাছে একটা 'ডিস্টোপিয়ার স্বপ্ন', যার বসবাস ধ্বংস প্রক্রিয়ার মধ‍্যে। এটা একটা ফ‍্যাক্টরি যা উৎপাদন করছে ঘড়ি ঘড়ি জাইগ‍্যান্টিক প‍্যারাসাইট বা পরভুক বুদ্ধিজীবী প্রাণী। এদের ভয়ংকর চেহারা আমার মগজে ঢুকে পড়তেই চোখ ফিরে গেল ড্রয়িংরুমের সবুজে লেপ্টে থাকা কাঁচপোকার আরশিতে। তুষার পড়ছে, সে ভীষণ তুষার ঝড়। দেখতে দেখতে আমার আ‍্যপার্টমেন্টের সাথের পাহাড়টা ধীরে ধীরে তুষার চাদরের ঘোমটা টেনে আমার দিকে তাকিয়ে… হঠাৎ কেঁপে উঠতেই ঘরের কাঁচপোকার আরশিটা উজ্জ্বল সবুজ রংয়ের টিপ হয়ে উঠলো! অবিকল সেই টিপ!

যে আমাকে বলছে:
মনুষ‍্য বাহিনীর জন‍্য
শব্দরাই হলো সেনাপতি।
এগিয়ে যাও এবং যাবে
যেহেতু-
এখন আমাদের পেছনের
সময়টা বিস্ফোরিত হচ্ছে
মাটিতে পোঁতা বিস্ফোরকের মতো।
অতীতকে আমরা শুধুই দিতে পেরেছি-
আমাদের কেশগুচ্ছ,
যেগুলো জট পাকিয়েছে
দুরন্ত বাতাসে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক