০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

ভোটের মাঠে পরাজয়, ইরান যুদ্ধ এড়াতে পিছে হটছেন ট্রাম্প মিত্ররা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ধাক্কা খাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সরাসরি ইরান যুদ্ধকেই এই পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ভোটের মাঠে পরাজয়, ইরান যুদ্ধ এড়াতে পিছে হটছেন ট্রাম্প মিত্ররা

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 11:30 PM

Updated : 05 Nov 2026, 11:39 PM

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বড় বিপর্যয় ঘটেছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

এই চরম পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ নিয়ে দলের ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ট্রাম্পের সহযোগীরা দলের যুদ্ধনীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সরাসরি এই সংঘাতকেই পরাজয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি লেখেন, “আমাদের পরাজয়ের মূল কারণ হল এই যুদ্ধ। গত রাতে প্রেসিডেন্টও একথা বলেছেন।”

এতদিন ধরে কট্টর ইরানবিরোধী হিসেবে পরিচিত সেনেটর টেড ক্রুজও সুর চড়িয়েছেন। বুধবার নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, “এই সংঘাত সংক্ষিপ্ত, চূড়ান্ত এবং দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল।”

তবে ভোটের মাঠে পরাজয়ের পরও নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-কে তিনি বলেন, “আমি সঠিক কাজটিই করেছি। আবারও সুযোগ এলে আমি একই সিদ্ধান্ত নিতাম।”

তাহলে ট্রাম্পের সহযোগীরা কেন দলের সিদ্ধান্ত বা নীতি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন? যুদ্ধের জন্য এর অর্থ কী? এসব প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

নেতারা যা বলছেন

২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং ট্রাম্পের 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' (মাগা) আন্দোলনের স্পষ্ট উত্তরাধিকারী ভাবা হয় জে ডি ভ্যান্সকে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই (ইরান) যুদ্ধের কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সেনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর চড়া মূল্য দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল।

ভ্যান্স জানান, ২০২৪ সালে যারা ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন, এবার তাদের একটি বড় অংশ ডেমোক্র্যাটদের বেছে নিয়েছেন। এই ভোটারদের শীর্ষ দুটি দাবি ছিল, ইরান যুদ্ধের দ্রুত অবসান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বদল আনা।

অন্যদিকে, সেনেটর টেড ক্রুজ সমালোচনা করেছেন ভিন্ন দিক থেকে। তিনি বলেন, যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত করা হয়েছে।

গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের খসড়া সমঝোতা অস্ত্রবিরতি চুক্তিতে যুদ্ধপরবর্তী ইরান পুনর্গঠনে ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি তহবিলের প্রস্তাব ছিল। ক্রুজসহ রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

ক্রুজ বলেন, কোনও পরিস্থিতিতেই ইরানের শাসকের হাতে শত শত কোটি ডলার তুলে দেওয়া উচিত নয়। পরবর্তীতে ওই অস্ত্রবিরতি চুক্তিও ভেস্তে যায়।

হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প অবশ্য স্বীকার করেছেন, ভ্যান্সের মূল্যায়ন অনেকটাই সত্য। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভোটাররা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে ট্রাম্পের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে ঠেকাতে এই অভিযান চালানো জরুরি ছিল।

কেন এই দূরত্ব?

ট্রাম্প এখন তার দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদে রয়েছেন। ফলে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এই সুযোগে দলের পরবর্তী নেতৃত্ব দখলের দৌড় এখনই শুরু হয়ে গেছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে পড়েছিল। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি (৪৭ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জেতার আশায় রিপাবলিকানদের অনেকেই এখন যুদ্ধ থেকে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন।

কাতার জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতরে বড় ধরনের বিভক্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, টেড ক্রুজ কিংবা প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ইরানে হামলার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু এ যুদ্ধ এখন তাদের জন্য দেশে ও বিদেশে চরম রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তারা সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা করতে না পেরে এর পরিচালনা ও দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

অন্যদিকে, ভ্যান্স আন্তর্জাতিক সংঘাত এড়িয়ে চলার পক্ষপাতী। তিনি ট্রাম্পের মূল সমর্থকদের পাশে টানতেই যুদ্ধ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।

যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার বিভাগের অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেট বলেন, “জে ডি ভ্যান্স শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। তাকে এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে এই সংঘাত অবসানের মধ্যস্থতাকারী বানানো হয়েছিল। এখন তিনি হয়ত দেওয়াল লিখন পড়তে পারছেন। তাই ট্রাম্পের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতেও তিনি দ্বিধা করছেন না।”

অধ্যাপক লিন্ডস্টেট আরও জানান, অন্য রিপাবলিকান নেতারাও বুঝতে পারছেন যে, ট্রাম্পের অন্ধ অনুসরণ তাদের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

সাবেক রিপাবলিকান কর্মকর্তা জন ফিহেরি বলেন, ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এতে ভ্যান্সের পাশাপাশি ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও এগিয়ে রয়েছেন। ফিহেরির মতে, শুধু যুদ্ধ নয়; জ্বালানির চড়া দাম, স্বাস্থ্যসেবা সংকট এবং প্রশাসনের দুর্নীতিও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য পদক্ষেপ

কংগ্রেসের দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা এখন যুদ্ধ বন্ধে তহবিলের লাগাম টেনে ধরতে পারে। সেনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার বলেন, “এই যুদ্ধ অবশ্যই থামাতে হবে।”

তিনি মনে করিয়ে দেন, মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা কংগ্রেসের হাতেই জাতীয় বাজেটের চাবিকাঠি দিয়ে গেছেন। জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যেন খেয়ালখুশিমতো যুদ্ধ চালাতে না পারেন, সেজন্যই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা রো খান্না একটি প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছেন। এই প্রস্তাব পাস হলে ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের সব ধরনের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। একসময় ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধেও একই পথ বেছে নিয়েছিল কংগ্রেস।

বিশ্লেষক জন ফিহেরি জানান, ট্রাম্পকে সামরিক বাজেট পাস ও সরকারের ঋণসীমা বৃদ্ধির জন্য ডেমোক্র্যাটদের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

এছাড়া কংগ্রেসের শুনানিতে ডেকে যুদ্ধের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তোপের মুখে ফেলতে পারে বিরোধীরা। এর মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়তে পারেন।

বিদায়ী রিপাবলিকান সেনেটর থম টিলিস বলেছেন, হেগসেথকে এই যুদ্ধের হিসাব দিতেই হবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জেসন ক্রো সরাসরি হেগসেথকে ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

অধ্যাপক মাসগ্রেভ সতর্ক করেছেন, আগামী দিনে সবচেয়ে বড় সংঘাত দেখা দিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যয়সীমা অমান্য করার প্রবণতা নিয়ে। প্রশাসন যদি কংগ্রেসের বাজেট সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের চেয়েও বড় সাংবিধানিক লড়াই শুরু হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে?

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধপ্রস্তুতি থেমে নেই।

গত মঙ্গলবার ভোটের দিনও হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পেন্টাগন একে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা দাবি করেছে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন রয়েছে।

যে কোনও সময় নতুন হামলার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ইরানও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, নতুন কোনো আগ্রাসন চালানো হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও ক্যাফিয়েরো বলেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই।

কারণ ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে ডেমোক্র্যাটরা আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বুঝে পাচ্ছে না। এই মধ্যবর্তী সময়টাতে ট্রাম্প তেহরানের ওপর আরও আগ্রাসী আঘাত হানার সুযোগ নিতে পারেন।

এর সমান্তরালে কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই এখনো আলোচনায় অংশ নিতে আগ্রহী।

যদিও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জবাবকে তেহরান ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

ক্যাফিয়েরো সতর্ক করে বলেন, শান্তি আলোচনায় উভয় পক্ষ বড় ছাড় না দিলে দোহাভিত্তিক এই মধ্যস্থতা সফল হবে না। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, কাতার যদি কোনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরিও করে, ইসরায়েল তা ভেস্তে দিতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালাবে।

তবে ভোটের রাতে ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালানোর কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা তার নেই।