শুক্রাণু কমছে, প্রজননে সংকটে পড়তে পারে মানুষ, বলছে গবেষণা

দুইশর বেশি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে জার্নাল হিউম্যান রিপ্রোডাকশন আপডেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সাবধানবাণী দেওয়া হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 12:14 PM
Updated : 18 Nov 2022, 12:14 PM

শুক্রাণুর পরিমাণ কমা প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে মানবজাতি শিগগিরই প্রজনন সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে সাবধান করেছেন গবেষকরা।

দুইশর বেশি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে জার্নাল হিউম্যান রিপ্রোডাকশন আপডেটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ সাবধানবাণী দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিসি নিউজ।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান বলছে, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গড় শুক্রাণু ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে আনুমানিক ১০১ দশমিক ২ মিলিয়ন থেকে ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি মিলিলিটারে ৪৯ মিলিয়নে পৌঁছেছে।

এই সময়ের মধ্যে শুক্রাণুর পরিমাণও কমেছে ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ।

২০১৭ সালে প্রকাশিত একই দলের করা এক গবেষণায় আগের ৪০ বছরে শুক্রাণুর ঘনত্ব অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে বলে জানানো হয়েছিল।

তবে সেসময় যেসব তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকরা ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, সেসব তথ্যউপাত্ত ছিল কেবল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে পাওয়া। এ নিয়ে গবেষক দলটিকে ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল।

তবে সর্বশেষ গবেষণায় তথ্যউপাত্ত নেওয়া হয়েছে ৫৩টি দেশ থেকে। এ গবেষণা বলছে, কেবল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, শুক্রাণুর ঘনত্ব কমছে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার পুরুষদেরও।

এ ঘনত্ব কমার হার বাড়ছেও উদ্বেগজনক হারে।

সব মহাদেশের ১৯৭২ সাল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, শুক্রাণুর ঘনত্ব প্রতি বছর ১ দশমিক ১৬ শতাংশ করে কমছে; ২০০০ সাল থেকে কমার এই হার বছরপ্রতি ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ করে।

“এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করা দরকার। হ্যাঁ, আমার মনে হয় এটি একটি সংকট, যা এখনই মোকাবেলা করা উচিত, কেননা পরে এটি এমন জায়গায় চলে যেতে পারে, যেখান থেকে আর ফেরার কোনো পথ থাকবে না,” বলেছেন গবেষক দলের সদস্য, জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাজাই লেভিন।

আগের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুক্রাণুর ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে ৪০ মিলিয়নের নিচে নেমে এলে প্রজনন সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সর্বশেষ গবেষণায় ২০১৮ সালে গড় শুক্রাণু ঘনত্ব প্রতি মিলিলিটারে ৪৯ মিলিয়ন দেখা গেছে। লেভিন বলছেন, এটা গড় হিসাব; অর্থ্যাৎ, অসংখ্য পুরুষের শুক্রাণু ঘনত্ব এখনই প্রতি মিলিলিটারে ৪০ মিলিয়নের নিচে, এবং এই সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে।

“কমার এ হার স্পষ্টতই বিশ্বের জনসংখ্যার প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসেরই প্রতিনিধিত্ব করছে,” বলেছেন হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক।

গবেষণায় বয়স, বীর্যপাত ছাড়া কতক্ষণ থাকতে পারে এ ধরনের নানান বিষয় বিবেচনার মধ্যে নেওয়া হয়েছে; বন্ধ্যা পুরুষদের বাদ দেওয়া হলেও এতে শুক্রাণুর মান সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। যে কারণে এ গবেষণার সীমাবদ্ধতাও কম নয় বলে ভাষ্য অনেক গবেষকের।

এদেরই একজন শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রোলজির অধ্যাপক অ্যালান প্যাসি। তিনি জার্নাল হিউম্যান রিপ্রোডাকশন আপডেটে প্রকাশিত গবেষণা দলে ছিলেন না, তবে তাদের কাজের প্রশংসা করেছেন।

এরপরও বলেছেন, শুক্রাণু কমছে কিনা এ নিয়ে তিনি এখনও সন্দিহান।

“এমনকী গবেষণাগারে সবচেয়ে সেরা পদ্ধতিতেও শক্রাণু গণনা বেশ কঠিন। বিশ্বজুড়ে প্রশিক্ষণ ও মান নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতির কারণে হয়তো সামনে আরও ভালো তথ্যউপাত্ত পাবো বলেই আমার বিশ্বাস,” বলেছেন তিনি।

লেভিন অবশ্য এই সন্দেহ উড়িয়ে দিতে চান। যে কোনো গবেষণাতেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুক্রাণু কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে বলেও দাবি তার।

কিন্তু শুক্রাণু কমছে কেন? তার সদুত্তর নেই।

কারও অনুমান, অন্তস্রাব-বিঘ্নিত রাসায়নিক বা অন্যান্য পরিবেশগত বিষয় এখানে ভূমিকা রাখছে। বিশেষজ্ঞদের কারও কারও আঙুল আবার ধুমপান, মদ্যপান, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকেও। তাদের ভাষ্য, সুস্থ জীবনধারা শুক্রাণুর পরিমান বাড়াতে পারে।

সাউদার্ন ডেনমার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিনা কোল্ড জেনসেন বলছেন, নতুন গবেষণাতে উদ্বেগজনক প্রবণতারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।

“আপনি এই ধারাই পেতে থাকবেন, যত গবেষণাই যুক্ত করেন না কেন, এটাই আমাকে আতঙ্কিত করছে,” বলেছেন তিনি।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষ প্রজনন স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রিচার্ড শার্প বলছেন, বিশ্বজুড়েই যে শুক্রাণুর ঘনত্ব কমছে তা নতুন তথ্যউপাত্তেও দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, শুক্রাণুর এই ঘনত্ব কমে যাওয়ার মানে হতে পারে, দম্পতিদের ক্ষেত্রে গর্ভধারণে এখন বেশি সময় লাগবে; অনেক নারী যারা ৩০ বা ৪০ এর ঘরে সন্তান নিতে চান তাদের জন্য এটি আরও মারাত্মক, কেননা ততদিনে তার প্রজনন সক্ষমতাও কমতে শুরু করেছে।

“কেবল বাচ্চাকাচ্চা নিতে চাওয়া দম্পতিদের জন্যই এটি সমস্যার নয়। এটি পরের ৫০ বা তার পরের বছরগুলোর সমাজেও বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, কেননা তখন বিপুল সংখ্যক বয়স্ক লোক থাকবে, কিন্তু তাদের আশপাশে কাজ করার মতো কিংবা তাদের সহায়তা করার মতো তরুণ অনেক কমে যাবে,” বলেছেন শার্প।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক