পুলিশ হেফাজতে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার ভাইয়ের মৃত্যু

অ্যান্ডারসনের পাশাপাশি জানুয়ারির শুরুতে লস এঞ্জেলেস পুলিশের হাতে আরও এক কৃষ্ণাঙ্গ ও এক বাদামি বর্ণের মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2023, 06:40 AM
Updated : 13 Jan 2023, 06:40 AM

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ঝড় তোলা আন্দোলন ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারের’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিস কালারসের পরিবারের এক সদস্য কিনান অ্যান্ডারসন লস এঞ্জেলেসে পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন।

বিবিসি জানিয়েছে, অ্যান্ডারসনকে (৩১) গ্রেপ্তারে পুলিশ বারবার টেইজার গান ব্যবহার করেছে; পেশায় শিক্ষক অ্যান্ডারসন তাতে বাধা দেওয়ারও চেষ্টা করেছিলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর সান্তা মনিকা হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।  

৩ জানুয়ারি অ্যান্ডারসন ও পুলিশের মধ্যে কী কী হয়েছিল, সে সংক্রান্ত বডি ক্যামেরা ফুটেজ প্রকাশ করেছে লস এঞ্জেলেস পুলিশ।

তাতে গ্রেপ্তারের মুখে থাকা অ্যান্ডারসনকে সাহায্য চেয়ে কাতর অনুরোধ করতে দেখা গেছে।  এক পর্যায়ে তাকে ‘এরা (পুলিশ) আমাকে জর্জ ফ্লয়েডের মতো মারার চেষ্টা করছে’ বলতেও শোনা যায়।

২০২০ সালের মে মাসে মিনেসোটার মিনেপোলিসে এক পুলিশ সদস্যের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বজুড়েও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল।

অ্যান্ডারসন ওয়াশিংটন ডিসিতে থাকতেন, তিনি লস এঞ্জেলেসে বেড়াতে এসেছিলেন। তার মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক কারণ এখনও জানানো হয়নি।

অ্যান্ডারসনের পাশাপাশি জানুয়ারির শুরুতে লস এঞ্জেলেস পুলিশের হাতে আরও এক কৃষ্ণাঙ্গ ও এক বাদামি বর্ণের মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

টাকার স্মিথ (৪৫) ও অস্কার সানচেজ (৩৫) দুজনই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।

লস এঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাস এসব ঘটনাকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’বলে অভিহিত করেছেন। পুলিশ বলেছে, তারা এ তিনজনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করে দেখছে।

বিবিসি লিখেছে, একটি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ৩ জানুয়ারি স্থানীয় সময় বিকাল ৩টার দিকে লস এঞ্জেলেসের একটি সড়কে যায় পুলিশ।

পুলিশের উপস্থিতিতে বিরক্ত অ্যান্ডারসনকে এক পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে ‘কেউ একজন আমাক মারার চেষ্টা করছে’ বলতেও ফুটেজে দেখা গেছে, যদিও সেসময় অ্যান্ডারসনের ওপর কোনো হুমকি আছে বলে ক্যামেরায় দেখা যায়নি।

প্রথম দিকে পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণ করে অ্যান্ডারসন বসেই ছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ আসার পর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সেসময় পুলিশ বারবার তাকে থামতে অনুরোধ করেছিল।

পুলিশ পরে তাকে ধরে ফেলে আটকের চেষ্টা করলে তিনি প্রথমে তাদের কথা শোনেন, এক পর্যায়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ও পরে আতঙ্কিত কণ্ঠে ‘প্লিজ’, ‘হেল্প’ ও ‘তারা আমাকে জর্জ ফ্লয়েড বানাতে চাইছে’ বলে চিৎকার করতে শুরু করেন।

পুলিশের কাজে বাধা না দিতে বারবার বলার পর এক কর্মকর্তা প্রথমে প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে তার ওপর টেইজার গান ব্যবহার করেন; সেসময় অন্য কর্মকর্তারা তাকে ঝাপটে ধরে ছিল। পরে অ্যান্ডারসনকে অচেতন করতে তার ওপর আরও ৫ সেকেন্ড টেইজার ব্যবহার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছায় এবং অ্যান্ডারসনকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সাড়ে চার ঘণ্টা পর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে লস এঞ্জেলেস পুলিশের প্রধান মাইকেল মুর বলেছেন, অ্যান্ডারসন ট্রাফিক দুর্ঘটনার পর হঠাৎ আক্রমণ করে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মতো আচরণ করছিলেন।  

“অন্য ব্যক্তির অনুমতি না নিয়ে তার গাড়িতে উঠে তা নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন অ্যান্ডারসন,” বলেছেন তিনি।

পুলিশের দেওয়া টক্সিলজি প্রতিবেদনে অ্যান্ডারসনের শরীরে গাঁজা ও কোকেইনের উপস্থিতি মিলেছে। এ সংক্রান্ত আলাদা একটি প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে লস এঞ্জেলেস কাউন্টির ময়নাতদন্তকারী কর্মকর্তার কার্যালয়ের।

অ্যান্ডারসনের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পুলিশের কার্যক্রমে সংস্কার চাওয়া আন্দোলনকারীদের ফের সচকিত করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। এই আন্দোলনকারীদের অনেকেই মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনার মতো ঘটনায় অস্ত্রধারী পুলিশ পাঠানো ঠিক নয়। 

অ্যান্ডারসনের কাজিন ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কালারস ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, “আমার ভাই সাহায্য চেয়েছিল, কিন্তু সে তা পায়নি।

“সে তার জীবন নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গ হত্যাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন দেখে সে গত ১০ বছর কাটিয়েছে। সে জানত, এটা কী রকম হয় এবং সে নিজেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কেউ তাকে রক্ষা করল না।”

কালারস এবং অন্যরা এরই মধ্যে এই ঘটনার জন্য লস এঞ্জেলেসের পুলিশপ্রধান মুরের পদত্যাগ দাবি করেছেন।

অন্যদিকে মুর বলেছেন, জনস্বার্থে তিনিই অ্যান্ডারসনের ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ ত্বরান্বিত করেছেন, স্বাভাবিকভাবে এই ধরনের ফুটেজ প্রকাশিত হতে ৪৫ দিনের মতো সময় লাগে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক