উইন্ডসর প্রাসাদে রানির চির শয়ানের প্রস্তুতি

ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে কবর দেয়া হবে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 19 Sept 2022, 10:40 AM
Updated : 19 Sept 2022, 10:40 AM

স্কটল্যান্ড থেকে শুরু করেছিলেন শেষযাত্রা। মাইলের পর মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান লন্ডনে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতাও শেষ পর্যায়ে। এবার চির শয়ানের অপেক্ষায় ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।

ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে প্রয়াত স্বামী প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে সমাহিত করা হবে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে। উইন্ডসর প্রাসাদের এখন তারই প্রস্তুতি চলছে। সেন্ট জর্জ চ্যাপেলের রাজকীয় ভল্টে নামানো হয়েছে রানির কফিন। উইন্ডসরের ডিন এ পর্ব পরিচালনা করছেন।

উইন্ডসর প্রাসাদে রওয়ানা হওয়ার আগে রানির শবমিছিল ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছায় এবং সেখানে রানির কফিন রাজকীয় নৌবাহিনীর রাষ্ট্রীয় কামানবাহী শকট থেকে নামিয়ে একটি রাজকীয় শববাহী গাড়িতে তোলা হয়।

রানিকে শেষ বিদায় জানাতে তার প্রিয় দুই কুকুর মিউক ও স্যান্ডিকে উইন্ডসর প্রাসাদের সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে আনা হয়।

গত ৮ সেপ্টেম্বর স্কটল্যান্ডের বালমোরালে নিজের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে মারা যান রানি এলিজাবেথ। সোমবার তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তার আগে চারদিন রানির মৃতদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ওয়েস্টমিনস্টার হলে বিশ্রামে রাখা হয়েছিল।

সোমবার স্থানীয় সময় ১০টা ৪৪ মিনিটে ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে রানির কফিন যুক্তরাজ্যের রাজকীয় নৌবাহিনীর রাষ্ট্রীয় কামানবাহী একটি শকটে করে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে রানির শবমিছিলের যাত্রা শুরু হয়।

এ সময় রানির বড় ছেলে রাজা তৃতীয় চার্লস, তার বোন প্রিন্সেস অ্যান, দুই ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং প্রিন্স এডওয়ার্ড, যুবরাজ প্রিন্স অব ওয়েলস উইলিয়াম, তার ভাই প্রিন্স হ্যারিসহ ব্রিটিশ রাজ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা রানির কফিন অনুসরণ করেন।

শবমিছিল ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের গির্জায় প্রবেশের সময় গির্জায় উপস্থিত দুই হাজার মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে রানিকে সম্মান জানান। যাদের মধ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের রাজপরিবারের সদস্যসহ প্রায় পাঁচশ জন বিশ্বনেতা এবং কূটনীতিক ছিলেন।

ওয়েস্টমিনস্টারের ডিন ডেভিড হোয়েলের নেতৃত্বে রানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে বলে জানায় বিবিসি।

গির্জায় রানির আত্মার শান্তি কামনা করে কমনওয়েলথের মহাপরিচালক ব্যারোনেস স্কটল্যান্ড প্রথমে বাইবেলের একটি অংশ পাঠ করেন।

তারপর বিশেষভাবে রানির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের জন্য জুডিথ ওয়্যারের লেখা একটি গান বাজানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস দ্বিতীয়জন হিসেবে বাইবেলের একটি অংশ পাঠ করে রানির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তারপর ক্যান্টার্বুরির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি ধর্মাপোদেশ দেওয়া শুরু করেন।

এসময় আর্চবিশপ বলেন, “৭০ বছরের শাসনামলে রানি বহু মানুষের জীবন ছুঁয়ে গেছেন।”

“প্রয়াত রানি তার ২১ তম জন্মবার্ষিকীতে ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, তিনি সারাজীবন জাতি এবং কমনওয়েলথের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন।

রানি যতটা ভালভাবে তার প্রতিশ্রুতি রেখেছেন তা বিরল। আর রানির মৃত্যুতে যত মানুষ তাকে ভালবাসা দিয়েছে তেমনটি খুব কম নেতার ক্ষেত্রেই দেখা যায়।”

গির্জায় উপস্থিত অন্যান্য নেতারাও একে একে রানি জন্য প্রার্থনা করেছেন। ১৯৫৩ সালের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক অনুষ্ঠানের যে গানটি গাওয়া হয়েছিল তার শেষযাত্রাও সেই গানটি গাওয়া হয়। জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে গির্জায় প্রার্থনার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

ওয়েস্টমিনস্টার গির্জায় প্রার্থনা শেষে রানির শবমিছিল ৪৫ মিনিট যাত্রা করে ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছায়। সেই পথে মিছিলটি প্রথমে পার্লামেন্ট স্কয়ার অতিক্রম করে। সেসময় যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত একটি যৌথ দল রানির কফিনে সম্মান (গার্ড অব অনার) জানান।

ওয়েলিংটন আর্চে পৌঁছানোর পথে শবমিছিল একে একে পার্লামেন্ট স্ট্রিট হয়ে ‘বিগ বেন’, লন্ডনের রাজকীয় দুইটি পার্ক গ্রিন পার্ক (রাজা দ্বিতীয় চার্লস ১৬৬৮ সালে এই পার্কটি উদ্বোধন করেন) ও সেন্ট জেমস পার্ক (সবথেকে পুরাতন রাজকীয় পার্ক) এবং বাকিংহাম প্যালেস অতিক্রম করে।

রানির শবমিছিল পার হওয়ার সময় বিগ বেনের কাটা ৬০ সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ করে রাখা হয়েছিল।

রানির শবমিছিল যেখান দিয়ে যাচ্ছে তার পুরো রাস্তার দুই পাশে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়ে রানিকে শেষশ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। এসময় ভিড়ের মধ্যে অনেককে চোখ মুছতে দেখা যায়।

১৯৫২ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জের শেষকৃত্যের পর এবারই বড় ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কারো শেষকৃত্য হচ্ছে।

যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের সশস্ত্র বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য রানির শেষকৃত্যানুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। বেসামরিক নানা প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সদস্যরাও রানির শবমিছিলে অংশ নিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যসহ গোটা বিশ্বের মানুষ এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠান দেখছেন। যুক্তরাজ্য জুড়ে কয়েকটি বড় পর্দায় সরাসরি রানির শেষযাত্রার আনুষ্ঠানিকতা দেখানো হচ্ছে।

রানির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যুক্তরাজ্যে কয়েকটি সিনেমা হল বন্ধ রাখা হলেও প্রায় ১২৫টি সিনেমা হলে রানির শেষকৃত্য প্রচারের জন্য খোলা রাখা হয়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক