মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনে ১৫ মিনিট দেওয়া হয় কারামিকে

কারাতে চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ মেহদি কারামি গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র ৬৫ দিন পর গত ৭ জানুয়ারিতে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Jan 2023, 03:06 PM
Updated : 18 Jan 2023, 03:06 PM

ইরানে চারমাস আগে শুরু হওয়া প্রতিবাদ বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে চার তরুণের। আরও ১৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, অন্যায়ভাবে মিথ্যা বিচারে তাদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

২২ বছর বয়সী কারাতে চ্যাম্পিয়ন মোহাম্মদ মেহদি কারামিও একই ধরনের বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র ৬৫ দিন পর গত ৭ জানুয়ারিতে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে কারামিকে ১৫ মিনিটেরও কম সময় দেওয়া হয়েছিল।

বিষয়টি সম্পর্কে যারা জানেন তারা বিবিসি- পার্সি সার্ভিসকে একথা জানিয়েছেন। প্রতিবাদ-বিক্ষোভকারীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে ইরান কিভাবে লোক দেখানো বিচারকে কাজে লাগাচ্ছে, কারামির কাহিনী সে বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। এইসব প্রতিবাদকারীর দাবি স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী থেকে মুক্তি।

ইরানে নারীদের জন্য থাকা কঠোর পোশাকবিধি ঠিকঠাক না মানার অভিযোগে আটক ২২ বছরের তরুণী মাশা আমিনিকে গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে আটকের পর পুলিশি হেফাজতে তিনি মারা গেলে তার দাফনের দিন থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা কয়েকদিনের মধ্যে ইরানজুড়ে কট্টর পোশাকবিধি ও ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভে রূপ নয়।

বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৮১ বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে নরওয়ে-ভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠী অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ‘গণআন্দোলনকে দমাতে এবং মানুষকে ভীত করতেই’ বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

গত বছর ৩ নভেম্বর রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলার সময় আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ ফোর্সের একজন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় মেহদি কারামিকে।

পরে তার বিরুদ্ধে ‘করাপশন অন আর্থ’ অপরাধের অভিযোগ এনে বিচার শুরু হয়। ওদিকে, কারাজে রেভ্যলুশনারি কোর্ট ৩০ নভেম্বর তিনটি শিশুসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে এই হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনে।

ইরানে বিবাদীকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু এই ধরনের স্পর্শকাতর মামলা কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির মতো মামলায় তাদেরকে নিজেদের পছন্দমতো আইনজীবী বেছে নিতে দেওয়া হয় না। বরং বিচারবিভাগ অনুমোদিত তালিকার একজন আইনজীবীকে নিয়োগ দেয় আদালত।

আদালতে বিবাদীর পরিবারের সদস্য এবং সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয় না। ফলে রুদ্ধদ্বার বিচারে যা হয়, তার অনেকখানি সম্পাদিত ফুটেজ বিচারবিভাগ প্রকাশ করে। এমনই একটি ভিডিওতে কারামিকে এক বাসিজ সদস্যকে পাথর দিয়ে আঘাত করার অভিযোগ স্বীকার করে নেওয়ার ঘটনায় হতাশ হতে দেখা যায়।

আদালত মেহদি কারামির পক্ষে যে আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিল, তিনি এই যুক্তিকে চ্যালেঞ্জও জানাননি, যুক্তিতর্কও করেননি। তিনি কেবল বিচারকের কাছে ক্ষমা করে দেওয়ার প্রার্থনা জানান।

কারামি তখন বলেন, তাকে বোকা বানানো হয়েছে এবং তিনি বসে পড়েন। কারামিকে ৫ ডিসেম্বরে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার সঙ্গে অন্য চার বিবাদীকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শিশুসহ অন্য আটজনকে দীর্ঘদিনের জেল দেওয়া হয়।

‘মা’কে কিছু বলো না’

সাধারনত বিবাদীর পরিবারের সদস্যদেরকে কর্তৃপক্ষ নীরব থাকার জন্য চাপ দিয়ে থাকে। তারপরও কারামির বাবা মাশালাহ কারামি ইতেমাদ পত্রিকাকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।

মাশালাহ রাস্তায় প্যাকেটজাত টিস্যু ফেরি করে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ওইদিন কান্নায় ভেঙে পড়ে তার ছেলে তাকে বলেছিল যে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সে বলেছে- “বাবা, তারা মামলার রায় দিয়েছে। আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মাকে কিছু বলো না।”

কারামিকে নির্যাতন করা হয়েছিল:

বিরোধী আন্দোলনকর্মীদের একটি গ্রুপ ‘১৫০০ তাসবির’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছে, কারামিকে নির্যাতন করা হয়েছিল। জেলখানায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল।

তাদেরকে কারামি বলেছেন, প্রহরীদের মারধরে তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। তারা মনে করেছিল, তিনি মারা গেছেন। তার দেহ প্রত্যন্ত একটি এলাকায় ফেলে আসা হয়। পরক্ষণেই তাদের মনে হয়, কারামি বেঁচে আছেন। পরিবারকে কারামি আরও বলেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা প্রতিদিনই তার জননাঙ্গে নির্যাতন করেছে। তাকে বলাৎকার করার হুমকি দিয়েছে জিজ্ঞাসাবাদে।

ইরানের আইনি ব্যবস্থায় নিম্ন আদালত কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তখন তারা তা অনুমোদনের জন্য সুপ্রিম কোর্টে পাঠায়। সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করলেও আসামিপক্ষ আপিল করতে পারে।

কিন্তু কারামির বাবা বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিয়োগ করা আইনজীবীদের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। এরপর তার পরিবার ইরানের সুপরিচিত মানবাধিকার বিষয়ক অন্যতম আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন আঘাসি’কে নেওয়ার চেষ্টা করে।

এ বিষয়ে প্রথমে নিম্ন আদালত পরে সুপ্রিম কোর্টে লিখিত অনুমতি চান আইনজীবী আঘাসি। কিন্তু প্রতিটি পর্যায়ে তার চিঠি উপেক্ষা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করাও নাকচ করেছেন একজন বিচারক।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক