‘ব্রিটিশরা ভারতকে সভ্য করেছে’ মন্তব্য করে তোপে মার্কিন উপস্থাপক

টাকার কার্লসন এমন একটি সময়ে এসব মন্তব্য করেছেন যখন রানি এলিজাবেথের মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে সংবেদনশীল বিতর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 Sept 2022, 02:18 PM
Updated : 14 Sept 2022, 02:18 PM

‘ব্রিটিশরা ভারতকে সভ্য করেছে’ এমন মন্তব্য করে ভারতীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজ চ্যানেলের উপস্থাপক টাকার কার্লসন।

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত স্থাপত্যে আর কোনো বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর তার স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে কার্লসন এসব মন্তব্য করেন বলে জানায় বিবিসি।

গত বৃহস্পতিবার ৯৬ বছর বয়সে মারা যান রানি এলিজাবেথ।

ওই অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কার্লসন রাজনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষকদের সমালোচনার মুখে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। তারা কার্লসনকে বর্ণবাদী এবং অজ্ঞ বলে তিরস্কার করেন।

কার্লসন এমন এক সময়ে এমন মন্তব্য করেছেন, যখন রানির মৃত্যুর পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔপনিবেশিক অতীত নিয়ে সংবেদনশীল বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে।

গত কয়েকদিনে ভারতসহ বিশ্বের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট লেখক এবং শিক্ষাবিদ ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বর্বরতা এবং মানুষকে অসম্মানিত করার ইতিহাস গণনা এখনও বাকি আছে।

গত সপ্তাহে নিজের অনুষ্ঠানে কার্লসন এই বিতর্ক নিয়েই কথা বলেছেন। যেখানে তিনি বলেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মানে ‘শুধু গণহত্যা নয়। এটা তার থেকেও বেশি কিছু’।

একটি ভিডিও ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘শক্তিশালী দেশ দুর্বল দেশকে শাসন করবে। এই প্রথার পরিবর্তন হবে না।”

‘‘যুক্তরাষ্ট্রের মত নয় বরং ইংরেজরা তাদের ঔপনিবেশিক দায়িত্বকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিল এবং তারা বিশ্বকে যতটা ভদ্রভাবে শাসন করেছে, মানবজাতির ইতিহাসে আর কোনো সাম্রাজ্য তেমনটা করেনি।”

ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে আসে তখন তারা একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা, একটি ভাষা, একটি আইনি ব্যবস্থা, বিদ্যালয়, গির্জা এবং সরকারি ভবন রেখে আসে। যা আজও ব্যবহৃত হচ্ছে।”

কর্লসনের বক্তব্যের এই ভিডিও ক্লিপটি টুইটারে ভাইরাল হয়ে যায়।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে কার্লসন মুম্বাইয়ের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস স্টেশনের কথা তুলে ধরেন। ২০১৬ সালে যেটির নাম পরিবর্তন করে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস রাখা হয়েছে।

হলুদ বেলেপাথর, গ্রানাইট এবং নীল-ধূসর বেসাল্টটি একটি বিস্তৃত ভিক্টোরিয়ান অবকাঠামো যেটি ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশরা নির্মাণ করেছিল।

ভারতের ঐতিহ্যবাহী এ স্টেশনটি এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।

কার্লসন বলেন, ‘‘স্বাধীনতার পর ৭৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ভারত কী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি বোম্বে ট্রেন স্টেশনের মত এত সুন্দর আর একটি স্থাপনা বা একটি ভবন নির্মাণ করতে পেরেছে?”

তার এ মন্তব্য ভারত জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় অনেক রাজনীতিবিদও কার্লসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ‍যাদের একজন ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা শশী থারুর।

মঙ্গলবার তিনি টুইটারে একটি পোস্টে রেগে যাওয়ার দুটো ইমোজি দিয়ে লেখেন, ‘‘যখন আপনি নিজের মেজাজ না হারিয়ে কোনো কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারবেনই না তখন তা প্রকাশের জন্য কিছুতে চাপ দেওয়ার মত একটি বিকল্প টুইটারে থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।”

আরেক টুইটার ব্যবহারকারী লিখেছেন, কার্লসনের দাবি তার কাছে ‘হাস্যকর’ মনে হয়েছে।

‘‘তিনি (কার্লসন) ভারতে সবথেকে চমৎকার যেসব ভবনগুলো দেখেছেন সেগুলো ব্রিটিশদের তৈরি নয় বরং ভারতীয়দের নিজেদের তৈরি।

‘‘সেগুলো ঔপনিবেশিক আমলের আগের, যখন তাদের সামর্থ্যবান হওয়ার অনেক বাকি... ঔপনিবেশিকতা ভারতকে নির্মাণ করেনি বরং ধ্বংস করেছে।”

সাবেক টেনিস তারকা মার্টিনা নভ্রাতিলোভাও এ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, কার্লসনের ‘ইতিহাস সম্পর্কে এতটা অজ্ঞতা’ তাকে ‘খুবই হতবাক’ করেছে।

টুইটারে তিনি লেখেন, ‘‘আপনার বর্ণবাদ বাকি সবাইকে হার ‍মানিয়েছে। নির্দিষ্ট এই বিষয়ে আপনার অজ্ঞতা অলিম্পিকের মতই বিশাল!!!”

সাংবাদিক বারখা দত্ত বলেন, ‘‘এটা একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষের প্রাচ্যবাদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় আসক্তির একটি ঘটনা ‍মাত্র। তার বক্তব্যকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘‘একজন মার্কিন উপস্থাপকের জন্য ভারতীয় মিডিয়া কতটা সময় ব্যয় করতে ইচ্ছুক দেখে আমি বিস্মিত। যিনি এমন কী আপনি তার দেশ নিয়ে মন্তব্য করলেও তা খেয়াল করবেন না।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক