চীনের হুমকি বাড়ছে, চ্যালেঞ্জের মুখে মার্কিন নৌবাহিনী

সিঙ্গাপুর থেকে তাইপে যেতে ন্যান্সি পেলোসির বিমানের সোজা পথ রেখে বোর্নিও দ্বীপ ঘুরে যাওয়াসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়েছে।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 August 2022, 12:40 PM
Updated : 6 August 2022, 12:40 PM

তাইওয়ানকে করায়ত্ত করতে চীনের সামরিক বাহিনীর আকাঙ্ক্ষা মোকাবেলায় মার্কিন বাহিনীকে এখন ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

সিঙ্গাপুর থেকে তাইপে যেতে ন্যান্সি পেলোসির বিমানের দক্ষিণ চীন সাগর এড়িয়ে বোর্নিও দ্বীপ ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরীর দক্ষিণ চীন সাগরে ফেরার ক্ষেত্রে পড়া জটিলতাতেই তা স্পষ্ট হয়েছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ‘অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের’ জন্য ‘নিয়মিত’ টহল দেওয়ার কথা বারবার বলে চললেও বাস্তবে তাদের জন্য তা করা যে ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে, ১৯৯৬ সালের পর তাইওয়ান ঘিরে সবচেয়ে তীব্র উত্তেজনাই তা দেখাচ্ছে বলে কূটনৈতিক, সামরিক অ্যাটাশে ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন।

কয়েকদিন আগেই মার্কিন কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, মার্কিন বিমান বাহিনীর বিমানে করে মঙ্গলবার প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পেলোসির তাইপেতে নামার আগে অহেতুক উসকানিমূলক সেনা মোতায়েন করে উত্তেজনা আরও বাড়াতে চাননি তারা।

পেলোসির সফরের পর তাইওয়ানের জলসীমার আশপাশে এবং তাইওয়ান প্রণালীর মাঝরেখা ঘেঁষে চীনা সামরিক বাহিনীর করা লাইভ ফায়ারিং মহড়ার সময়ও তারা একই মনোভাব বহাল রেখেছে।

“আমরা পেলোসির ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, কিন্তু কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবো তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি,” বলেছেন এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।

তাইওয়ান নিয়ে চীনের এখনকার সামরিক কর্মকাণ্ডের পাল্টায় মার্কিন বাহিনীর কর্ম ও কৌশল সম্পর্কে রয়টার্সের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি হাওয়াইয়ে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ড।

মঙ্গলবার সিঙ্গাপুর থেকে ওড়ার পর পেলোসি ও তার সঙ্গী কংগ্রেস প্রতিনিধিদের বহন করা বিমানটি চীনের প্রভাবাধীন দক্ষিণ চীন সাগর ও এর দুর্গসম দ্বীপগুলো এড়িয়ে ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপ ও ফিলিপিন্সের পূর্ব পাশের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাইওয়ান যায়।

“সিঙ্গাপুর থেকে তাইপে যাওয়ার স্বাভাবিক আকাশপথ হচ্ছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর দিয়ে, কিন্তু ওই এলাকাটিতে চীনের দ্বীপ ঘাঁটিগুলো এখন রাডার, সেন্সর ও জ্যামিং উপকরণে ভর্তি, যে কারণে পেলোসিকে ওই পথ এড়িয়ে যেতে হয়েছে।

“যেভাবে বিমানটি গেছে, তাতে উত্তেজনার অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এড়ানোই লক্ষ্য ছিল বলে আমরা দেখতে পাই,” বলেছেন সিঙ্গাপুর ভিত্তিক নিরাপত্তা পরামর্শক আলেক্সান্ডার নেইল।

বিরোধপূর্ণ প্যারাসেল ও স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জে স্থাপনা নির্মাণের পর চীনের কোস্ট গার্ডের নৌযান, যুদ্ধজাহাজ ও উড়োজাহাজ রুটিন মেনে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সমুদ্রসীমার কেন্দ্রে টহল দিচ্ছে, নিয়মিতই যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য নৌবাহিনীকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে।

অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকই বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাদের সামরিক বাহিনীর যে আধুনিকায়ন করেছে, তাতে তাইওয়ানের আশপাশের সমুদ্রে ২৫ বছর আগে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী যেভাবে চীনা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারতো, তা এখন অকল্পনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মোতায়েন করা ১১১টি যুদ্ধজাহাজের অর্ধেকেরও বেশি এখন পশ্চিম প্রশান্ত থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত জাপানভিত্তিক সপ্তম নৌবহরের নজরদারি এলাকার মধ্যে আছে বলে স্বনির্ভর মার্কিন নৌ ইনস্টিটিউটের ট্র্যাকিং জানাচ্ছে।

Also Read: চীনের বিমান, জাহাজ ‘আক্রমণের অনুরূপ’ মহড়া চালিয়েছে: তাইওয়ান

Also Read: তাইওয়ানের নেতৃস্থানীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কর্মকর্তার মৃত্যু

সেটা এক ব্যাপার, আর অত্যাধুনিক ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিপুল সংখ্যক জাহাজ থাকা চীনের উপকূলে সেগুলো নিয়ে আসা আরেক ব্যাপার, বলছেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস রোনাল্ড রিগান, হামলা চালাতে সক্ষম উভচর জাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলি এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হানতে সক্ষম ক্রুজার ইউএসএস অ্যান্টিয়েটনাম এখন তাইওয়ানের পূর্ব দিকে অবস্থান করছে বলে নিশ্চিত করেছে রয়টার্স। কাছাকাছি হামলা চালাতে সক্ষম আরেকটি জাহাজ জাপানের একটি বন্দরে আছে, যেটি এফ-৩৫ জঙ্গিবিমানও বহন করছে।

যেকোনো সময় হামলা চালাতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সাবমেরিন এগুলোর আশপাশে থাকার সম্ভাবনাও প্রকট, বলছেন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পেলোসির এশিয়া সফর শুরুর আগের কয়েকদিন ইউএসএস রোনাল্ড রিগানের যাত্রাপথের ওপর অনেক আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের কড়া নজর ছিল।

স্প্র্যাটলিতে চীনের শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতির মধ্যেই দক্ষিণ চীন সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে টহল শেষে জুলাইয়ে ওই রণতরীর ভিয়েতনামের মধ্যাঞ্চলীয় দানাং বন্দরের পথ ধরার কথা ছিল বলে গত মাসে রেডিও ফ্রি এশিয়া জানিয়েছিল।

কিন্তু তার বদলে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস রোনাল্ড রিগান উল্টো পথে রওনা হয় এবং ২২ জুলাই থেকে সিঙ্গাপুরে পাঁচ দিনের বিরতি নেয় বলে জানান বহরের যাত্রাপথ সম্বন্ধে অবগত কূটনীতিকরা।

প্যারাসেল দ্বীপপুঞ্জের বেশ খানিকটা উত্তরে, দানাংয়ের পূর্বাঞ্চলে ১৬ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত চলা এক লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে চীনের সামরিক মহড়া শুরুর পর মার্কিন এই রণতরীর যাত্রাপথে এ বদল আসে।

কী কারণে সেটি তার যাত্রাপথ বদলেছিল সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ভিয়েতনামি কর্মকর্তারা কিছু না বললেও কয়েকদিন আগে মার্কিন এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, রণতরীটির যাত্রার সময়সূচি প্রায়শই কোনো ঘোষণা বা বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই বদলে যায়।

ইউএসএস রোনাল্ড রিগান এরপর ফিলিপিন্স দ্বীপপুঞ্জের সংকীর্ণ সমুদ্র পথ দিয়ে তাইওয়ানের পশ্চিমে এসে পৌঁছায় বলে মার্কিন নৌবাহিনীর ফেইসবুকে পেইজে জানানো হয়।

ফিলিপিন্স ও দক্ষিণ চীন উপকূলের মধ্য দিয়ে উত্তরের পথ না ধরে বিমানবাহী রণতরীর ফিলিপিন্সের সান বার্নাদিনো প্রণালীর ভেতর দিয়ে যাওয়াটা খুবই অস্বাভাবিক, বলছেন সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কলিন কোহ।

“খুব সাবধানতার সঙ্গে এটা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে আমার, এমনভাবে এর যাত্রাপথ বেছে নেওয়া হয়েছে যেন অহেতুক চীনকে উত্তেজিত না করা হয়, আবার সেইসঙ্গে যেখানে যাওয়া দরকার, সেখানে যাওয়াটাও নিশ্চিত করা যায়,” বলেছেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক