Published : 26 Jul 2025, 07:59 PM
থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত সংঘর্ষ শনিবার টানা তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। এদিন সীমান্তের নতুন কয়েকটি পয়েন্টে সংঘর্ষ বিস্তৃত হয়েছে। উভয়পক্ষ বলেছে, এই সীমান্ত বিরোধে তারা আত্মরক্ষার্থে কাজ করছে আর অপরপক্ষকে লড়াই বন্ধ করে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে গত ১৩ বছরে এটিই সবচেয়ে মারাত্মক সংঘর্ষ। এ সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি নিহত এবং এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
উভয় দেশ জানিয়েছে, শনিবার ভোরেও সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু এবারের সংঘর্ষ হয়েছে দুই দেশের বিরোধপূর্ণ সীমান্তের সংঘর্ষ এলাকাগুলো থেকে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাইল্যান্ডের উপকূলীয় প্রদেশ থ্রাত ও কাম্বোডিয়ার পুরসাত প্রদেশের সীমান্তে।
মে মাসের শেষ দিকে সংক্ষিপ্ত এক সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার এক সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুই দেশের মধ্যে পূর্ণ মাত্রার একটি কূটনৈতিক সংকটের মধ্যে উভয়পক্ষ সীমান্তে সেনা শক্তি বৃদ্ধি করে।
থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত দেশটির সাতজন সৈনিক ও ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। অপরদিকে, কাম্বোডিয়ায় পাঁচ সৈনিক ও আটজন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মালি সোচেতা জানিয়েছেন।
এদিকে, সীসাকেত প্রদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে ৫ হাজারের বেশি মানুষ অবস্থান করছে বলে জানিয়েছেন এক স্বেচ্ছাসেবকরা।
৫১ বছর বয়সী সামরং খামদুয়াং জানান, সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে তার খামার। বৃহস্পতিবার গোলাগুলি শুরু হলে তিনি সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে আসেন। তবে তার স্বামী তাদের সঙ্গে আসতে পারেননি।
“এখন আর যোগাযোগ করতে পারছি না। কিছুই জানি না ওখানে কী ঘটছে,” বলেন সামরং।
মালয়েশিয়ার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ
আসিয়ান জোটের সভাপতির দায়িত্বে থাকা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব বাস্তবায়নে তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। এই পরিকল্পনাকে সমর্থন দিয়েছে কম্বোডিয়া, আর থাইল্যান্ড বলেছে, তারা নীতিগতভাবে এর সঙ্গে একমত।
“এখনও গোলাগুলি চলছে,” বলে মন্তব্য করেছেন আনোয়ার। তিনি জানান, তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং প্রয়োজনে তিনিও আলোচনায় যুক্ত হবেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে উত্তেজনা
জাতিসংঘে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে থাই ভূখণ্ডে নতুন করে পুঁতে রাখা স্থল মাইনে দুই দফায় সৈন্য আহত হয়েছেন, যা তারা কাম্বোডিয়ার দায় বলে মনে করছেন। তবে কাম্বোডিয়া এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
থাইল্যান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “কাম্বোডিয়া যেন অবিলম্বে শত্রুতামূলক ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করে আন্তরিক আলোচনায় ফিরে আসে।”
অপরদিকে, কাম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “থাইল্যান্ড ইচ্ছাকৃত, উসকানিমূলক এবং বেআইনি সামরিক হামলা চালিয়েছে। সীমান্তে সশস্ত্র সেনা মোতায়েন করছে।”
“এই সামরিক প্রস্তুতি স্পষ্টভাবে থাইল্যান্ডের আগ্রাসন প্রসারিত করার উদ্দেশ্য প্রকাশ করে,” বিবৃতিতে বলা হয়।
কাম্বোডিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে থাইল্যান্ডের আগ্রাসনের নিন্দা ও তা প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে থাইল্যান্ড আবারও জানিয়েছে, তারা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চায়।
উল্লেখ্য, ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন অংশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের বিরোধ চলে আসছে। ২০০৮ সালে প্রেয়াহ ভিহেয়ার মন্দিরকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পর উত্তেজনা চরমে ওঠে। তখন কয়েক বছরের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষে অন্তত ডজনখানেক লোক নিহত হয়।
কম্বোডিয়া জুনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের কাছে এই বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আবেদন জানালেও থাইল্যান্ড আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করেনি এবং তারা সরাসরি আলোচনার পথেই সমাধান খোঁজার পক্ষে।