১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ কি ফিরে আসছে? বর্তমান হরমুজ সংকট কেন আলাদা

হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা যখন চরমে, তখন আশির দশকের সেই পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের মিল ও অমিলগুলো তলিয়ে দেখা যায়।

‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ কি ফিরে আসছে? বর্তমান হরমুজ সংকট কেন আলাদা
ছোট নৌ-চলাচলে বিঘ্নও হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Apr 2026, 03:43 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:29 PM

মার্কিন বাহিনী উত্তর আরব সাগরে হরমুজ প্রণালির কাছে ২০ এপ্রিল ইরানের একটি পণ্যবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পর সেটি জব্দ করে । ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটে।

 এ দৃশ্য অনেককেই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আশির দশকের সেই তথাকথিত ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধের’ স্মৃতিতে, যেখানে ইরান ও ইরাক একে অপরের অর্থনীতি পঙ্গু করতে হরমুজ প্রণালিতে পরস্পরের তেলবাহী ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে হামলা চালাত।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নৌ-উত্তেজনা যখন চরমে, তখন আশির দশকের সেই পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমানের মিল ও অমিলগুলো তলিয়ে দেখা যায়। 

আশির দশকের ট্যাঙ্কার যুদ্ধ

১৯৭৯-র ইসলামি বিপ্লবের পরের বছর (১৯৮০-তে) ইরানে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন আক্রমণ করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। ১৯৮৪ সাল নাগাদ এই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। ইরাক তখন ইরানের তেল ট্যাঙ্কারগুলোতে হামলা শুরু করে যাতে তেহরানের তেলনির্ভর অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে যায়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও ইরাক ও তার মিত্রদের জাহাজে হামলা চালায়।

ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের রবার্ট স্ট্রাউস সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান তখন হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করেনি। কারণ তখন সেই প্রণালি দিয়েই রপ্তানি করা তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল যুদ্ধ আক্রান্ত ইরানের অর্থনীতি। ১৯৮৬ সালে ইরান কুয়েতি জাহাজে হামলা শুরু করলে কুয়েত বিদেশি সহায়তার আবেদন জানায়। এতে সাড়া দিয়ে প্রথম এগিয়ে আসে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা কুয়েতি জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে পারস্য উপসাগর পার হতে সাহায্য করে। 

ইরাকের উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার। ছবি: রয়টার্স

ইরাকের উপকূলে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার

পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালের জুলাইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’ শুরু করেন। আমেরিকানরা পারস্য উপসাগরে ট্যাঙ্কার রক্ষায় নেমে পড়ে আর রাশিয়ার চেয়ে বেশি সহায়তা দেওয়া শুরু করে। এ সময় কুয়েতি ট্যাঙ্কারগুলোতে মার্কিন পতাকা লাগিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুরু হয়। 

প্রবীণ মার্কিন সেনাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার ওয়েবসাইট ‘ভেটেরান্স ব্রেকফাস্ট ক্লাব’-এর একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালের জুলাইয়ে প্রথম এসকর্ট মিশনের সময়ই একটি মার্কিন পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ইরানি মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর জেরে ৩০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ পরবর্তী ১৪ মাস ওই অঞ্চলে মোতায়েন ছিল। 

এরপর ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে মার্কিন ফ্রিগেট ‘ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস’ ইরানি মাইনের আঘাতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসবিদ স্যামুয়েল কক্সের মতে, জাহাজটি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে কেবল এর ‘মেইন ডেক’ একে কোনোমতে ধরে রেখেছিল। 

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যানটিস’ শুরু করে ইরানি নৌযান ধ্বংস করতে থাকে। ১৯৮৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এই ট্যাঙ্কার যুদ্ধের অবসান ঘটে।

কক্সের তথ্যমতে, ১৯৮৭ সালের শেষ নাগাদ ইরাক ২৮৩ বার এবং ইরান ১৬৮ বার জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। এতে বিভিন্ন দেশের ১১৬ জন নাবিক নিহত হয়। 

তবে তেলের চাহিদা এত বেশি ছিল যে, শতাধিক নাবিকের প্রাণহানিকে তেলের প্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ‘গ্রহণযোগ্য মূল্য’ হিসেবে দেখা হয়েছিল।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করার পর তেহরান তাদের জলসীমায় জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিলে বর্তমান উত্তজনা শুরু হয়। গত ৪ মার্চ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয় যে তারা হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে আর এ জলপথ দিয়ে যাতায়াতের জন্য তাদের ছাড়পত্র লাগবে। 

এতে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ৯৫ শতাংশ কমে যায় আর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

শুরুতে ইরান ‘বন্ধু’ দেশগুলোর জাহাজকে টোল আদায়ের বিনিময়ে চলাচলের সুযোগ দিলেও গত ২৬ মার্চ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি স্পষ্ট করে দেন যে, তাদের শত্রুদের জন্য এই পথ বন্ধ থাকবে।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সশস্ত্র বোটের ঝাঁক। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সশস্ত্র বোটের ঝাঁক। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া

এর মধ্যে মালয়েশিয়া, চীন, মিশর, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের জাহাজ আইআরজিসি-র নির্দেশিত বিকল্প পথে চলাচল করেছে যাতে তারা মাইন এড়িয়ে চলতে পারে।

তবে ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব বন্দরে নৌ-অবরোধ আরোপ করলে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ৩৩টি ইরান সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ফিরিয়ে দিয়েছে। গত সোমবার মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ‘তুসকা’ নামক একটি জাহাজ জব্দ করে এবং এর একদিন পর বঙ্গোপসাগরে ইরানের অপর একটি জাহাজ আটক করে। পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা ইরানি পাচারকারী চক্র বা অবৈধ নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে বিশ্বব্যাপী অভিযান চালাবে। 

পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেছেন, “হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে না।” 

গত শনিবার ইরান দুটি ভারতীয় জাহাজে গুলি চালিয়েছে এবং গত সোমবার দুটি পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করেছে।

দুই যুদ্ধের মধ্যকার সমান্তরাল চিত্র

আশির দশকের মতো এবারও শিপিং ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। আশির দশকে তেলের দাম গড়ে ২০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ১০৬ ডলারে পৌঁছেছে এবং যুদ্ধের উত্তপ্ত সময়ে তা ১১৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। 

আরেকটি বড় মিল হলো সামুদ্রিক ‘মাইন’। আশির দশকে মাইনের আঘাতে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তবে বর্তমানে এখনও তেমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মাইন অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন, সিএনএন জানাচ্ছে যে বর্তমানে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মাইনসুইপিং জাহাজের স্বল্পতা রয়েছে। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষক জন ফিলিপসের মতে, ছোট নৌ-চলাচলে বিঘ্নও হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশাল কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।

পার্থক্য যেখানে স্পষ্ট

আশির দশকে নেটো মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মাইন অপসারণে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ব্রিটেন বা অন্য মিত্ররা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে শঙ্কায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। 

এপ্রিলের শুরুতে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “নিজেদের লড়াই নিজেদেরই করতে শিখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আর আপনাদের সাহায্য করতে আসবে না, ঠিক যেমনটা আপনারা আমাদের প্রয়োজনে পাশে ছিলেন না। ইরানকে মূলত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কঠিন কাজ শেষ। এখন নিজেদের তেলের ব্যবস্থা নিজেরাই করে নিন!”

বিশেষজ্ঞদের মতে, আশির দশকের যুদ্ধ ছিল দুটি আঞ্চলিক সেনাবাহিনীর স্থল যুদ্ধের অংশ। আর বর্তমান পরিস্থিতি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ। জন ফিলিপস মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি আধুনিক প্রযুক্তির কারণে অনেক বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং সম্ভবত মূল ট্যাঙ্কার যুদ্ধের চেয়েও বেশি অস্থিতিশীল। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, আশির দশকের তুলনায় ইরান এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। তখন ইরাককে পশ্চিমারা সাহায্য করলেও ইরান ছিল অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার কবলে। কিন্তু বর্তমান ইরান অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং তাদের মিসাইল, ড্রোন ও সাইবার হামলার সক্ষমতা অনেক বেশি। 

বাহরাইনে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি মনে করেন, ইরানের বিপ্লবী উদ্দীপনা তাদের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত চাপ সইবার ক্ষমতা যোগাবে।