মাউন্ট এভারেস্ট আরোহীদের এবার পয়ঃবর্জ্য নিয়ে ফিরতে হবে বেজ ক্যাম্পে

পাহাড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। তাই এ নতুন নিয়ম চালু করেছে এভারেস্টের পাসাং লামু গ্রামীণ পৌরসভা।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 8 Feb 2024, 04:59 PM
Updated : 8 Feb 2024, 04:59 PM

পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে যাওয়া পর্বতারোহীদেরকে এখন থেকে পয়ঃবর্জ্য নিয়ে বেজ ক্যাম্পে ফিরতে হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পাসাং লামু গ্রামীণ পৌরসভার চেয়ারম্যান মিংমা শেরপা বিবিসি-কে বলেন, “আমাদের পাহাড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।”

এভারেস্ট এলাকার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে থাকা এই পৌরসভার বৃহৎ পরিসরে নেওয়া বেশকিছু পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে।

চরম ঠান্ডার কারণে এভারেস্টে থাকা মলমূত্র পুরোপুরি ক্ষয় হয় না।

মিংমা বলেন, “আমরা অভিযোগ পাচ্ছি যে, পাথরে মানুষের পয়ঃবর্জ্য দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কিছু পর্বতারোহী অসুস্থও হয়ে পড়ছেন। এটি মেনে নেওয়া যায় না, এতে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে।”

তাই যেসব পর্বতারোহী মাউন্ট এভারেস্ট এবং এর কাছের মাউন্ট লোৎস জয়ের অভিযানে যাবেন, তাদেরকে বেজ ক্যাম্প থেকে 'পু (পয়োঃনিষ্কাশন) ব্যাগ' কেনার নির্দেশ দেওয়া হবে। সেটি তাদের ফিরে আসার সময় পরীক্ষা করা হবে।

পাহাড়ে মলত্যাগ করা হয় কোথায়?

পর্বতারোহণের মৌসুমে পর্বতারোহীরা বেশিরভাগ সময় উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেজ ক্যাম্পেই ব্যয় করেন। সেখানে টয়লেট হিসেবে পৃথক তাঁবু তৈরি করা হয়, নীচের ব্যারেলগুলোতে মলমূত্র জমা হয়।

কিন্তু এরপর পর্তারোহীরা বিপদসংকুল যাত্রায় বেরিয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বেশিরভাগ পর্বতারোহী ও তাদের সহায়তা কর্মীরা গর্ত করে প্রাকৃতিক কাজ সারেন। এরপর আরও ওপরে উঠতে থাকলে সেখানে সাধারণত কম তুষারপাত হয়। তাই সে সময় খোলা জায়গায়তেই প্রাকৃতিক কাজ সারতে হয়।

মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণের সময় খুব কম মানুষই বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগে নিজের মলমূত্র নিয়ে আসে, যাতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

এভারেস্ট এবং ওই অঞ্চলের অন্যান্য পর্বতমালায় আবর্জনা একটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে আছে। যদিও নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বার্ষিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ বিভিন্ন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে।

'উন্মুক্ত টয়লেট'

বেসরকারি সংস্থা সাগরমাথা পলিউশন কন্ট্রোল কমিটির (এসপিসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিরিং শেরপা বলেন, “বর্জ্য এখনও একটা বড় সমস্যা, বিশেষ করে উঁচু ক্যাম্পগুলোতে, যেখানে আপনারা পৌঁছাতে পারবেন না।”

সরকারি কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও ছিরিং শেরপার সংস্থার হিসাব মতে, এভারেস্টের নিচের ক্যাম্প ওয়ান থেকে ক্যাম্প ফোর এর চূড়ার পথে মানুষের মলমূত্র রয়েছে প্রায় ৩ টন।

তিনি বলেন, “এর অর্ধেকই সাউথ কোল- এ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা ক্যাম্প ফোর নামেও পরিচিত।”

এভারেস্ট অভিযানের আয়োজক আন্তর্জাতিক পর্বতারোহী গাইড স্টিফান কেক বলেন, সাউথ কোল 'উন্মুক্ত টয়লেট' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

৭,৯০৬ মিটার (২৫,৯৩৮ ফুট) উচ্চতায় পর্বতারোহীরা এভারেস্ট ও লোৎসে শৃঙ্গে পৌঁছানোর আগে সাউথ কোল-কে বেস হিসেবে ব্যবহার করে। জায়গাটি প্রচণ্ড বাতাসপ্রবণ।

স্টিফান কেক বলেন, “এখানে বরফ আর তুষার প্রায় নেই বললেই চলে, তাই আপনি চারিদিকে মানুষের মল দেখতে পাবেন।”

পাসাং লামু গ্রামীণ পৌরসভা অনুমোদিত এসপিসিসি এখন মার্চ মাসে শুরু হওয়া আসন্ন পর্বতারোহণ মৌসুমের জন্য আনুমানিক ৪০০ বিদেশি পর্বতারোহী এবং ৮০০ জন সহায়তা কর্মীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৮ হাজার পু ব্যাগ সংগ্রহ করছে।

এই ব্যাগগুলোতে রাসায়নিকসহ এমন ধরনের পাউডার থাকে, যা মানুষের মলমূত্রকে শক্ত করে এবং গন্ধহীন করে ফেলে।

গড়ে একজন পর্বতারোহী প্রতিদিন ২৫০ গ্রাম মলমূত্র ত্যাগ করে বলে ধারণা করা হয়।চূড়ায় ওঠার আগে তারা সাধারণত সবচেয়ে উচুঁর ক্যাম্পে প্রায় দুই সপ্তাহ কাটায়।

ছিরিং শেরপা বলেন, “সে হিসেবে আমরা পর্বতারোহীদেরকে দুটি ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছি, এর প্রতিটি তারা পাঁচ থেকে ছয়বার ব্যবহার করতে পারবে।”

এক্সপেডিশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব নেপাল এর সভাপতি দাম্বার পারাজুলি বলেন, “এটি অবশ্যই ইতিবাচক বিষয় এবং এ উদ্যোগ সফল করতে আমরা ভূমিকা পালনে খুশি হব।”

তিনি বলেন, তার সংস্থা পরামর্শ দিয়েছে যে, এটি প্রথমে এভারেস্টে একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে আনা উচিত এবং তারপর অন্যান্য পর্বতগুলোতেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

প্রথম নেপালি হিসেবে ৮ হাজার মিটার উঁচু ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ জয় করা মিংমা শেরপা বলেন, মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করে অন্যান্য পর্বতমালায় পরীক্ষা করা হয়েছে।

নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা মিংমা জানান, “পর্বতারোহীরা মাউন্ট ডেনালি (উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ) এবং অ্যান্টার্কটিকাতেও এ ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করছেন। এজন্য আমরাও এই ব্যাগ ব্যবহারের পক্ষে কথা বলছি।”

আন্তর্জাতিক পর্বত গাইড স্টিফান কেকও এই কথার প্রতিধ্বনিত করে বলেছেন, “এ উদ্যোগ এভারেস্ট পরিষ্কার রাখতে সহায়ক হবে।”

নেপালের কেন্দ্রীয় সরকার অতীতে পর্বতারোহণে বেশ কিছু নিয়ম ঘোষণা করলেও, তার অনেকগুলোই যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি বলে সমালোচনা আছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ মাঠ পর্যায়ে লিয়াজোঁ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি। 

সরকারি কর্মকর্তাদের বেস ক্যাম্পে অভিযাত্রী দলের সঙ্গে থাকার কথা থাকলেও, তাদের অনেককেই দেখা না যাওয়ায় তারা সমালোচিত হয়েছেন।

পাসাং লামু গ্রামীণ পৌরসভার চেয়ারম্যান মিংমা বলেন, “দায়িত্বপ্রাপ্তরা সব সময়ই বেজ ক্যাম্পে অনুপস্থিত থাকার কারণে অনুমতি ছাড়া পাহাড়ে ওঠাসহ সব ধরনের অনিয়মই হয়।”

তিনি বলেন, “এখন এসব বদলাবে। যোগাযোগের জন্য আমরা একটি অফিস চালাব এবং পর্বতারোহীদের মলমূত্র ফিরিয়ে আনাসহ নতুন সব পদক্ষেপ কার্যকর করা হয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করব।”