২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কতার উদ্যোগ খাদ্য কোম্পানির আপত্তিতে পণ্ড

বড় বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলোর চাপে চিপসের প্যাকেট কিংবা সোডার বোতলের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ভারতে প্যাকেটজাত খাবারে স্বাস্থ্য সতর্কতার উদ্যোগ খাদ্য কোম্পানির আপত্তিতে পণ্ড
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 07:33 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:54 PM

প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ে অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং ফ্যাটের বিষয়ে ক্রেতাদের আরও স্পষ্টভাবে সতর্ক করতে চেয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু সেই উদ্যোগে আপত্তি জানায় বড় বড় খাদ্য ও পানীয় কোম্পানিগুলো।

তাদের চাপে শেষ পর্যন্ত চিপসের প্যাকেট কিংবা সোডার বোতলের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এরই মধ্যে একটি তুলনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লন্ডনে বিক্রি হওয়া একটি ফ্যান্টা ক্যানে প্রায় ৬৩ ক্যালোরি থাকলেও ভারতে একই ব্র্যান্ডের পানীয়তে প্রায় তিন গুণ বেশি চিনি রয়েছে।

ভারতীয় সংস্করণে কৃত্রিম রংও ব্যবহার করা হয়। ইউরোপের কিছু দেশে এই ধরনের রং ব্যবহার করা হলে প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার নিয়ম আছে। ভারতে অবশ্য কৃত্রিম রঙের উপস্থিতি সাধারণত প্যাকেটের পেছনের দিকে ছোট করে লিখে দেওয়া হয়।

এ পরিস্থিতিতে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই চলতি বছর অগাস্টে জানায়, প্যাকেটের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা তারা আর এগিয়ে নিচ্ছে না।

সংস্থার যুক্তি ছিল, ভারতীয় খাবারে পশ্চিমা খাবারের তুলনায় স্বাদ ও মশলার ব্যবহার অনেক বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিলিয়ে তাতে সতর্কবার্তা সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন। এর বদলে প্যাকেটের সামনে কালো-সাদা ছকে চিনি, ফ্যাট এবং লবণের পরিমাণ জানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত মার্চে কোকা-কোলা, নেসলে, পেপসিকো এবং ইন্ডিয়ান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফবিএ) শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বৈঠকের পর খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতিস্বীকার করে।

বৈঠকে কোকা-কোলা ইন্ডিয়ার জ্যেষ্ঠ নির্বাহী মিলি ভট্টাচার্য দাবি করেন, যেসব গ্রাহক উপাদান তালিকা পড়েন না, তারা মোড়কে কোনো সংকেত দেখলেই যে সচেতন হয়ে যাবেন, এমন ভাবাটা ভুল।

সতর্কবার্তা দিলেই যে মানুষ চিনি বা লবণযুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করবে তা নয়, উপরন্তু চিকিৎসকরা এমনিতেই রোগীদের বর্জনীয় খাবার সম্পর্কে সচেতন করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকেটের সামনের দিকে সহজে বোঝা যায় এমন পুষ্টিগত সতর্কবার্তা থাকলে মানুষ খাবার বেছে নেওয়ার সময় আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে ইতিমধ্যেই এ ধরনের ব্যাখ্যামূলক লেবেল চালু হয়েছে।

ইউরোপের প্রায় দুই ডজন দেশে কোকা-কোলা ও নেসলে স্বেচ্ছায় লাল-সবুজ সতর্কসংকেত ব্যবহার করে। নেসলে ২০১৩ সাল থেকেই যুক্তরাজ্যে মোড়কের সামনে এই সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

‘দ্বিমুখী নীতি’ ও নিম্নমানের উপাদান সরবরাহ

আইনি বাধ্যবাধকতা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো একই পণ্যের উপাদানে পরিবর্তন আনে। কিন্তু ভারতে বিশ্বমানের তুলনায় নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় ভোক্তারা।

সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও স্বাস্থ্য সচেতনদের আপত্তিতে উঠে এসেছে বেশ কিছু তথ্য:

কিটকাট: অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া নেসলের কিটকাটের 'মিল্ক চকোলেটে' অন্তত ২২ শতাংশ কোকো থাকে, অথচ ভারতে বিক্রি হওয়া সাধারণ কিটকাটে এর পরিমাণ মাত্র ৪.৫ শতাংশ।

ম্যাগি নুডুলস: যুক্তরাজ্যে বিক্রি হওয়া অনেক ম্যাগি নুডুলসে সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়, যা তৈরি হয় ভারতেই। অথচ ভারতের স্থানীয় বাজারে বিক্রি হওয়া ম্যাগি নুডুলসে তুলনামূলক সস্তা পাম তেল ব্যবহার করা হয়।

সেরেল্যাক: গত ৫০ বছর ধরে নেসলে ভারতে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ‘সেরেল্যাক’ বিক্রি করে আসছিল, যদিও উন্নত দেশগুলোতে তারা চিনিমুক্ত সেরেল্যাক বিক্রি করত। ২০২৪ সালে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারতে চিনিমুক্ত সেরেল্যাক বিক্রির ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি।

শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের ১০০ বিলিয়ন (১০ হাজার কোটি) ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেটজাত খাদ্য ও পানীয় বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্যে অতিরিক্ত চর্বি, চিনি ও লবণ রয়েছে।

ফলে মোড়কের সামনে রঙিন স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার নিয়ম চালু হলে অধিকাংশ প্যাকেই লাল সতর্কবার্তা চলে আসবে, যা বিক্রি কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কায় কোম্পানিগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।

সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

মেডিকেল জার্নাল ‘ল্যানসেট’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতের প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় পড়তে পারেন। এই পরিস্থিতিতে মোড়কের সামনে স্পষ্ট সতর্কবার্তার দাবিতে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মীরা দেশটির সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই সতর্কবার্তা দেওয়া থেকে পিছিয়ে আসার পর সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। বিশ্বমানের সঙ্গে মেলানো কঠিন বলে এফএসএসএআই আদালতকে জানালে বিচারকরা সংস্থাটিকে ভর্ৎসনা করে বলেন, "বিশ্বের জানা উচিত যে, ভারত তার নাগরিকদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত চিন্তিত।"

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিরোধ ও আইনি লড়াই

ভারতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন অনেক সচেতন নাগরিক। এর মধ্যে অন্যতম ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ৫০ লাখের বেশি অনুসারী থাকা ৩৪ বছর বয়সী রেবন্ত হিমাতসিংকা।

২০২৩ সালে পেপসিকোর ‘স্টিং’ নামক ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম মিষ্টির ব্যবহারের সমালোচনা করে একটি ভিডিও বানান রেবন্ত। এরপর পেপসিকো দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করে সেই ভিডিওটি সরিয়ে দেওয়ার আদেশ হাসিল করে।

তবে পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভারতের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা পেপসিকোসহ অন্যান্য কোম্পানিকে তাদের পানীয় থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ‘এনার্জি ড্রিংক’ লেখা বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার জর্জ ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের খাদ্য নীতি প্রধান সিমন পেটিগ্রু জানান, স্বাস্থ্য সতর্কতা মোড়কে যুক্ত হলে খাদ্য কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমে যাওয়ার ভয় থাকে।

তাই তারা যতটা সম্ভব তথ্য গোপন রেখে বিষয়টিকে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। আর লবিংয়ের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েছে।