Published : 12 Mar 2026, 01:19 AM
ইরানে যুদ্ধ শুরু করতে ট্রিগারে চাপ যুক্তরাষ্ট্র দিলেও এর মূল্য চোকাতে হচ্ছে তেল উৎপাদনকারী উপসাগরীয় দেশগুলোকে।
এতে করে ইরানের হামলার মুখে পড়া এক অঞ্চল এবং এক সুপারপাওয়ার, যার ওপর সুরক্ষার জন্য এই অঞ্চল নির্ভর করে- দু’য়ের মধ্যে অস্বস্তিকর সম্পর্কেরই ইঙ্গিত মিলছে। উপসাগরীয় কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন এমন কথাই।
পর্দার আড়ালে আরব দেশগুলোতে বাড়ছে অসন্তোষ। কারণ, তারা এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যা তারা শুরু করেনি, আবার অনুমোদনও করেনি। কিন্তু এখন অর্থনৈতিক এবং সামরিকভাবে এর মূল্য দিচ্ছে তারা।
তাদের বিমানবন্দর, হোটেল, সামরিক ও তেল স্থাপনাগুলো ইরানের হামলায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিন আঞ্চলিক কর্মকর্তা। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
‘আমিরাত পলিসি সেন্টার’-এর প্রেসিডেন্ট এবতেশাম আল-কেতবি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমরা এই সংঘাত চাই না। তারপরও আমরা আমাদের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর মূল্য দিচ্ছি।”
তিনি বলেন, তার মানে এই না যে ইরান নির্দোষ। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের ভূখন্ড ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল তেহরানকে। তারপরও ইরান এই অঞ্চলজুড়ে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এতে করে এ অঞ্চলে ব্যবসায় আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
যুদ্ধপরবর্তী ‘আহত সিংহ’ নিয়ে উদ্বেগ:
উপসাগরীয় অঞ্চলের কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ শুরু করে ফেলায় এখন তার উচিত এ অঞ্চলের দেশগুলোর দোরগোড়ায় ইরানের দীর্ঘদিনের হুমকি দূর করে ফেলা।
কারণ, “যুক্তরাষ্ট্র যদি এখন যুদ্ধ জয় না করেই রণে ভঙ্গ দেয়, তাহলে সেটি হতে এক আহত সিংহকে ফেলে যাওয়ার মতো। ইরান এ অঞ্চলে হুমকি হয়েই থেকে যাবে। তাদের আবার হামলা করার সক্ষমতা থাকবে।
“আর যদি ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে। নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়, তাহলে প্রতিবেশী দেশগুলো এর ফল ভুগবে,” বলেন আমিরাত পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেশাম আল-কেতবি।
হোয়াইট হাউজের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ইরান এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার বা নতুন করে উৎপাদনের ক্ষমতা হারিয়েছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলাই দেশটির হুমকি নির্মূল করা কেন জরুরি ছিল তা সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে এ বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান ইসরায়েল এবং যেসব উপসাগরীয় দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেখানে হামলা চালায়।
এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান পথ।
আকাশপথ বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলে প্রায় ৪০ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যা করোনাভাইরাস মহামারীর পর বৈশ্বিক আকাশপথে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। একই সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়েছে পর্যটন শিল্প, যা এই অঞ্চলের নিরাপদ ও বিলাসবহুল ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন:
যুদ্ধে এমন বিশৃঙ্খলার মধ্যেও উপসাগরীয় দেশগুলো শান্ত ও সংকল্পবদ্ধ থাকার চেষ্টা করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান গত শুক্রবার যুদ্ধের বিষয়ে তার প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে বলেন, দেশ যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যে থাকলেও তারা ভাল আছেন এবং শত্রুদের জন্য তারা সহজ শিকার নন।
একইসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের ওপর তাদের নিরাপত্তা জন্য নির্ভরতা এবং তেহরানের সঙ্গে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তির সম্ভাব্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। যদিও ইরানের ওপর আস্থা ভেঙে পড়েছে।
‘লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস’-এর বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সম্পর্ক একটি অলিখিত চুক্তির ওপর টিকে ছিল: আর তা হল- উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি, পুঁজি এবং অস্ত্র ক্রয়ের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার দেবে, বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দেবে।
গেরগেস মনে করেন, এই যুদ্ধ সেই ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এখন উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা জোরদার করবে। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে যে, নিজেদের সার্বভৌমত্ব এবং তেল. গ্যাস, জ্বালনি সম্পদ ও জনগণকে রক্ষায় তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা ব্যবস্থা না নেওয়ার পর থেকেই রিয়াদের মধ্যে যে অস্বস্তি ছিল, বর্তমান যুদ্ধ তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেদ্দাভিত্তিক ‘গালফ রিসার্চ সেন্টার’-এর চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের বলেন, ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের সুরক্ষা দিতে বা যুদ্ধের সময় তেল-গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন:
সাগের আরও বলেন, এই যুদ্ধ বহিরাগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তার সীমাবদ্ধতা প্রমাণ করেছে। ফলে এই দেশগুলো এখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেবে।
তিনি মনে করেন, বড় শক্তিগুলো মিত্রদের চেয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরান এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করবে।
এক বিরল প্রকাশ্য সমালোচনায় আমিরাতের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ‘আল হাবতুর গ্রুপ’-এর প্রতিষ্ঠাতা খালাফ আল হাবতুর এই যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তিনি বলেন, “যদি এই হামলার লক্ষ্য ইরানকে দমন করা হয়, তবে কি এর আঞ্চলিক প্রভাবের কথা ভাবা হয়েছিল? নাকি এই সংঘাতের অংশ না হওয়ার পরও উপসাগরীয় দেশগুলোকে এর মধ্যে টেনে আনার মূল্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে?”
সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের মঙ্গলবার সতর্ক করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়া তেলের বাজারের জন্য ‘বিপর্যয়কর’ হবে।
অন্যদিকে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, হামলা বন্ধ না হলে তারা এই অঞ্চল থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি হতে দেবে না। ট্রাম্পও হুমকি দিয়েছেন, তেল রপ্তানি বন্ধ করলে ইরানকে আরও কঠিন আঘাত করা হবে।
উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সরকারি মহলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, অঞ্চলজুড়ে ট্রাম্পের ওপর ব্যক্তিগত ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকের মতে, ট্রাম্প কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এবং মিত্রদের ওপর এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে কেবল ইসরায়েলের স্বার্থে তড়িঘড়ি ব্যবস্থা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছেন।
মার্কিন নীতি নির্ধারণ সম্পর্কে অবগত এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের খুব কাছের একটি ছোট বলয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা মূলত ব্যবসায়ী এবং সমঝোতাকারী (ডিলমেকার); তারা যুক্তরাষ্টে্র আবহমান ধারার অভিজ্ঞ নীতি নির্ধারক নন। ফলে তাদের সিদ্ধান্তের দায়ভার এখন উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে বইতে হচ্ছে।