Published : 14 Jan 2024, 08:50 PM
ইসরায়েলি বাহিনী শনিবারও গাজায় ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে। সেখান ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে চিরতরে নির্মূল না করা পর্যন্ত তাদের অভিযান বন্ধ না করার যে প্রতিজ্ঞা ইসরায়েল করেছে, তারা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে। এদিকে যুদ্ধের শততম দিনেও এ যুদ্ধ অবসানের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
শুধু বাড়ছে হতাহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা। গাজায় বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু যেনো এখন বিশ্বের কাছে শুধু একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। যে সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। দিনের পর দিন অনাহারে থাকা গৃহহীন ফিলিস্তিনিরা প্রাণ বাঁচাতে গাজার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছে। কিন্তু গাজার এক ইঞ্চি মাটিও এখন আর নিরাপদ নয়। গাজায় এরই মধ্যে ২৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। যাদের একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। ছোট্ট এই ভূখণ্ডটির ২৩ লাখ মানুষ এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) দ্বারস্থ হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা।
কিন্তু গাজায় নিজেদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে কেউ থামাতে পারবে না বলে হুঙ্কার ছেড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু।
শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “কেউ আমাদের থামাতে পারবে না..হগ না, অ্যাক্সিস অব এভিল না, কেউ না।”
নেতানিয়াহু ‘অ্যাক্সিস অব এভিল’ বলতে হামাস, ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের কথা বলেছেন বলে জানায় বিবিসি।
গত ৭ অক্টোবর হামাস গাজা থেকে ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালিয়ে ১২শ’র বেশি মানুষকে হত্যা করে। জিম্মি করে নিয়ে যায় আরো ২৪২ জনকে। মাঝে এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে শতাধিক জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। তখন মনে হয়েছিল, আলোচনার মাধ্যমে এই যুদ্ধ অবসানের পথ হয়তো খুলবে।
কিন্তু ওই যুদ্ধবিরতির পর যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। হামাস এখন পূর্ণ যুদ্ধবিরতি চায়। তবেই কেবল তারা বাকি জিম্মিদের মুক্তি দিতে রাজি আছে। কিন্তু ইসরায়েল জিম্মিদের মুক্তির জন্য আগের মত সাময়িক যুদ্ধবিরতির কথা বলছে। তারা বলেছে, হামাসকে নির্মূল না করা পর্যন্ত তারা থামবে না।
গাজা সিটিসহ গাজার উত্তরাঞ্চলের দখল এখন ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে। তাদের পদাতিক বাহিনী মধ্যাঞ্চলের দখলও প্রায় নিয়ে নিয়েছে। আর মিশর সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলে চলছে বিরতিহীন আকাশ হামলা। ইসরায়েলের পদাতিক বাহিনী যখন উত্তরাঞ্চলে অভিযান চালাচ্ছিল তখন সেখানকার লাখ লাখ মানুষ গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিল।
দক্ষিণাঞ্চলেও এখন নিয়মিত আকাশ হামলা চলছে। শনিবার দক্ষিণের শহর রাফাহ তে একটি বাড়িতে ইসরায়েলের বোমা হামলায় দুই পরিবারের ১০ সদস্য নিহত হয়েছে। যারা গাজার অন্য অঞ্চল থেকে পালিয়ে ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।
শুক্রবার রাতে ওই বাড়িতে যখন হামলা হয় তখন তারা রাতের খাবার খাচ্ছিল। ছোট্ট একটি মেয়ে এক টুকরো রুটি হাতেই মরে পড়ে ছিল। সেই ছবি বিশ্বকে দেখিয়ে ওই পরিবারের বেঁচে যাওয়া সদস্য বাসেম আরাফেহ বলেন, “এই শিশুটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিহত হয়েছে। এমন সময়ে তার উপর হামলা হয়েছে যখন সে কেবল এক টুকরো শুকনো রুটি খাচ্ছিল, রুটির উপর আর কিছুই ছিল না। কোথায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়? তারা কী দেখছে না কিভাবে শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। কোথায় মুসলিম বিশ্ব…এবং কোথায় বিশ্বনেতারা।?”
শুক্রবার থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ওই ১০ জন সহ গাজায় ইসরায়েলের হামলায় মোট ১৩৫ জন নিহত হয়। গাজায় প্রতিদিনই ইসরায়েলের হামলায় শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছে।
আহত হচ্ছে আরো অনেক বেশি মানুষ। যাদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাও এখন আর গাজায় নেই। সেখানে চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা অনেক আগেই ধসে পড়েছে।
গাজায় গত ১০০ দিনে যে মৃত্যু আর বিপর্যয় ঘটেছে তা ‘ভাগ করে নেওয়া মানবতাকে কলঙ্কিত’ করেছে বলে মনে করেন ইউএনডব্লিউআরএ এর প্রধান।
ইসরায়েল এখন পর্যন্ত গাজায় আট হাজারের বেশি হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করার কথা জানিয়েছে। দেশটি এখন তাদের যুদ্ধ কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে কিছু সৈন্য তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে এবং দক্ষিণে অভিযান অব্যাহত রেখেছে।