১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাতে বহুমুখী চাপ জোরদার করছে ইরান

পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য পথ, নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধের মূল্য বাড়াতে চাইছে ইরান।

ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাতে বহুমুখী চাপ জোরদার করছে ইরান
ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Aug 2026, 11:36 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করাতে এবং নিজেদের পক্ষে বড় ছাড় আদায় করতে ইরান বর্তমানে তাদের বহুমুখী চাপ প্রয়োগের কৌশল জোরদার করছে।

পশ্চিম এশিয়ার বাণিজ্য পথ, নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা যুদ্ধের মূল্য বাড়াতে চাইছে ইরান। উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন এমন কথাই।

চূড়ান্ত সামরিক বিজয় অর্জনের চেষ্টা করার চেয়ে ইরান বরং নিয়ন্ত্রিত উপায়ে উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করছে,

যার উদ্দেশ্য হল পুরোদস্তুর যুদ্ধ না বাধিয়েই সংঘাতের পরিধি আরও বাড়ানো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও এর বন্ধু দেশগুলো বাধ্য হয়ে ইরানের দাবি মেনে নেয়।ইরান বোঝাতে চায় যে, তাদের সঙ্গে ঝামেলা বা সংকট জিইয়ে রেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে যে পরিমাণ ক্ষতি বা খরচ হবে, তার চেয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের জন্য কম ক্ষতিকর হবে।

তেহরানের বার্তা হল, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বড় ভূমিকা নিশ্চিত করে নতুন কোনও সমঝোতা বা পরিস্থিতি মেনে না নিলে সংঘাত পারস্য উপসাগরের সীমা ছাড়িয়ে আরও দূর ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ইরান বিশ্বাস করে যে, একাধিক সামুদ্রিক চেকপয়েন্ট এবং জ্বালানি সম্পদকে ঝুঁকিতে ফেলার মধ্য দিয়ে যে তারা ভবিষ্যতের যে কোনও আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

ইরান প্রথম থেকেই তাদের উত্তেজনা সৃষ্টির বিকল্প পথগুলোকে এমনভাবে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে উত্তেজনা বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করেছে, যাতে প্রতি সপ্তাহে সামনে নিয়ে আসার মতো নতুন কিছু তাদের হাতে থাকে।

অর্থাৎ, “ইরান এমন সব কৌশল খাটায় যাতে প্রতি সপ্তাহে পরিস্থিতিকে নতুনভাবে উত্তপ্ত করে তোলার মতো কোনও না কোনও নতুন উপায় বা তাস তাদের হাতে থাকে। যেমন: “একটি নতুন ভূখণ্ড (ভৌগোলিক এলাকা), নতুন ধরনের অস্ত্র, নতুন ধরনের নিশানা”,  বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইটস।

তিনি বলেন, "তাদের (ইরান) বড় সুবিধাটি এটি নয় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে আঘাত করতে পারে। তাদের বড় সুবিধা হল, তারা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোকে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।"

হরমুজ প্রণালির বাইরেও হুমকি

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত সেই জলপথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত করার পর এখন এর পাশাপাশি লোহিত সাগর ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোকেও হুমকির মুখে ফেলছে ইরান।

লোহিত সাগর এবং মিশরের বন্দর পর্যন্ত ইরান সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে বিশ্বে বাণিজ্যিক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়।

তাছাড়া, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কমান্ডারদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় নতুন কোনও দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে চাইবেন না।

অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির ফলে ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীন চাপ বাড়ছে। ইরান এই পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করছে।

উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা বলেছেন "ইরানিরা... বিশ্বাস করে যে যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে এবং চাপ বাড়িয়ে তারা শেষ পর্যন্ত তাকে (ট্রাম্পকে) নতি স্বীকার করতে বাধ্য করবে।”

তার কথায়, “ট্রাম্প মনে করেন যে, তিনি ইরানিদের ওপর কঠোর আঘাত হানতে পারবেন এবং তাদেরকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারবেন, কিন্তু তারা সহজে নতি স্বীকার করবে না।"

ট্রাম্পের দাবি বনাম ইরানের অবস্থান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি 'আসন্ন' এবং সোমবার থেকেই সরাসরি আলোচনা শুরু হতে চলেছে। তবে ইরান এই দাবি নাকচ করে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনও আলোচনা হচ্ছে না।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানান, নমনীয়তা দেখালে ওয়াশিংটনের চাপ আরও বাড়ে। ট্রাম্প যে কোনও নমনীয়তাকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখেন এবং তিনি কেবল তীব্র চাপের মুখেই প্রতিক্রিয়া দেখান। তাই চাপ প্রয়োগ করা ছাড়া আলোচনা সম্ভব নয়। 

ট্রাম্প ইরানের ওপর কঠোর সামরিক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েও শেষ মুহূর্তে আঞ্চলিক মিত্রদের (যেমন সৌদি আরব) অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এবং আলোচনার সুযোগ করে দিতে তা স্থগিত করেন।

তবে ইরানের মূল্যায়ন হল, ট্রাম্পের বারবার হামলার হুমকি দিয়েও পিছিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, তেহরানের প্রতিরোধ কৌশল কাজে লাগছে এবং ওয়াশিংটনের চেয়ে তেহরানের হাত এখানে শক্তিশালী।

সার্বিকভাবে, ট্রাম্প প্রশাসন যেখানে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আধিপত্য থেকে পিছু হটাতে চাইছে, সেখানে ইরান পাল্টা সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে ট্রাম্পকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।