১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কিউবায় সরকার উৎখাত হলে পরিণতি ইরানের মতো হতে পারে: যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে আটক করলে তার জায়গায় যারা ক্ষমতায় আসতে পারেন, তারা ইরানের নেতাদের মতোই কট্টরপন্থি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন বলে মনে করছেন মার্কিন গোয়েন্দারা।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2026, 11:51 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

কিউবার সরকার উৎখাত করা হলে এর পরিণতি ভেনেজুয়েলার চেয়ে বরং ইরানের মতো হতে পারে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর চাপ বাড়াতে থাকার পাশাপাশি মার্কিন কর্মকর্তারা কিউবার জন্য এমন একজন নতুন নেতা খুঁজছেন যিনি ভেনেজুয়েলার ভাইস-প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের মতো হবেন, যিনি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র গ্রেপ্তার করার পর ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়েছিলেন।

তবে কিউবার পরিস্থিতি ভেনেজুয়েলার মতো নয় বরং ইরানের মতো বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে অবহিত কয়েকটি সূত্রের বরাতে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ একথা জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাউল কাস্ত্রোকে আটক করলে তার জায়গায় যারা ক্ষমতায় আসতে পারেন, তারা ইরানের নেতাদের মতোই কট্টরপন্থি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দারা।

কিউবা নিয়ে গোপনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। এতে বোঝা যাচ্ছে, কিউবার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দাবি পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাদের অভিযান সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কমিউনিস্ট দেশ কিউবার ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন নয়, বরং শাসনব্যবস্থার সংস্কার বলে মনে করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মার্কিন এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দেশটির জন্য একই ধরনের পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন।

ট্রাম্প ইরানে ভেনেজুয়েলার মডেল অনুসরণ করে এমন একজন নেতাকে গদিতে বসাতে চেয়েছিলেন, যিনি সহজে ক্ষমতা গ্রহণ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারবেন।

তবে যুদ্ধ শুরুর পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় সম্ভাব্য নেতা হিসেবে চিহ্নিত ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়।

এর আগে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ বাহিনীর রাতের অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত এবং আটক করে। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কে ব্রুকলিনের কারাগারে মাদক পাচার ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় আছেন। তার জায়গায় দেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতায় বসানো হয়।

ওদিকে, কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধ দেশটিতে জ্বালানি সরবরাহ আটকে দিয়েছে। ফলে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

জানুয়ারি থেকে ট্রাম্প কেবল একটি রুশ তেলবাহী ট্যাংকারকে কিউবায় ভেড়ার অনুমতি দিয়েছেন। এতে দেশটির পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সরবরাহ কমে গেছে।

কিউবার নেতৃত্বে কাকে দেখতে চায় হোয়াইট হাউজ তা এখনও স্পষ্ট নয়। বাস্তবসম্মত বিকল্পও খুব বেশি নেই। কিউবা সরকার ফিদেল কাস্ত্রোর ভাইয়ের নাতি অস্কার পেরেস-অলিভা ফ্রাগাকে সমর্থন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে। বরং ট্রাম্প প্রশাসন কাস্ত্রো পরিবারের আরেক সদস্য ‘রাউলিতো’ নামে পরিচিত রাউল জি রদ্রিগেজ কাস্ত্রোকে বিবেচনা করতে আগ্রহী হতে পারে।

রাউলিতো সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর নাতি এবং সাবেক প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তিনি কখনও কোনও সরকারি বা নির্বাচিত পদে দায়িত্ব পালন করেননি।

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ চলতি বছরের শুরুতে কিউবা সফর করে রদ্রিগেজ কাস্ত্রো এবং দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাজারো আলবার্তো আলভারেস কাসাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তাদের দুজনের নামও আলোচনায় রয়েছে।

তবে রাউল কাস্ত্রো বর্তমানে কোনো সরকারি পদে না থাকায় তাকে আটক ও গ্রেপ্তার করলেও ভেনেজুয়েলার মাদুরোর মতো তাৎক্ষণিকভাবে নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটবে না। মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প অভিযোগ এনে তার আটকের পক্ষে যুক্তি তৈরি করেছিলেন এবং পরে দেলসি রদ্রিগেজকে ক্ষমতায় বসানো হয়।

এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত কিউবার রাষ্ট্রদূত ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করলে কিউবার জনগণ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়াই করবে।

কিউবার রাষ্ট্রদূত ইসমারা মার্সেদেস ভার্গাস ওয়াল্টার ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকাকে বলেন, কিউবা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তবে দেশের জনগণ নিজেদের রক্ষায় লড়াই করবে, এমনকি এর ফলে কিউবা জনসংখ্যা শূন্যে নেমে গেলেও।

লন্ডনে চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস সাবাতিনি বলেন, কিউবার পরিস্থিতি ইরানের কাছাকাছি বলে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন সঠিক। কারণ, ভেনেজুয়েলা ও কিউবায় শাসনব্যবস্থা অনেকটাই ভিন্ন ধরনের।

তিনি বলেন, ইরান ও কিউবা উভয় দেশেই বিপ্লবী শাসনব্যবস্থা, যা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে আছে। ইরানের ক্ষেত্রে এর শিকড় ১৯৭০-এর দশকে এবং কিউবার ক্ষেত্রে ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের সময় থেকে।

তার মতে, “দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে এই দেশগুলোর নেতারা অত্যন্ত গোঁড়া, অনমনীয়, আদর্শবাদী এবং তারা এমন একটি নেতৃত্ব চক্রকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে যা অনেক বেশি সমজাতীয় এবং একই মতাদর্শে বিশ্বাসী।

অন্যদিকে, “ভেনেজুয়েলা দাবি করলেও প্রকৃত অর্থে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দেশ তারা কখনও ছিল না।” সাবাতিনির মতে, দেশটি মূলত ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট পুঁজিবাদী গোষ্ঠী ও ব্যাপক দুর্নীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় আরও বেশি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং তাদের কথা শোনে এমন একজন নেতা খুঁজছে। তবে এমন কাউকে কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ।