Published : 05 Aug 2026, 01:16 AM
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানকে শায়েস্তা করতে এবার তাদের সেনা ও সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে নতুন, সৃজনশীল ও প্রচলিত ধারার বাইরে অভিনব কৌশল বা নতুন উপায় খুঁজে বের করার বার্তা দিয়েছে।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলা এবং পাল্টা হামলা চলছেই। কিন্তু ইরানকে দমাতে যথেষ্ট বেগ পোহাতে হচ্ছে।
প্রচলিত বিমান হামলা ও নিষেধাজ্ঞার কৌশলগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল না দেওয়ায় এবং সীমিত বিকল্পের মুখে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেন্টকমের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা গত সপ্তাহে সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে একটি ইমেল পাঠিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সৃজনশীল ও অপ্রচলিত কৌশলের আইডিয়া বা ধারণা চেয়েছেন।
সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ইমেইলের মাধ্যমে এমন আইডিয়া চাওয়া বিরল পদক্ষেপ। এ থেকে এই ইঙ্গিতই পাওয়া যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের হাতে তার নিজের শর্তে চুক্তি করতে ইরানকে বাধ্য করার মতো খুবই সীমিত বিকল্প আছে এবং সম্ভাব্য অস্বস্তিকর বিকল্পগুলোই কেবল অবশিষ্ট আছে।
সিএনএন-কে এমনটিই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেন্টকম সবকিছু খতিয়ে দেখছে এবং স্বীকার করছে যে, তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সিএনএন-কে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম-এর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন তিমোথি হকিন্স এক জানান, ‘‘কী ভাবে হামলার ধরন বদলানো যায়, সেন্টকম এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে আসছে। শত্রুপক্ষকে নাস্তানাবুদ করতে এ ধরনের কৌশল জরুরি প্রয়োজন। সেটাই করবে তারা।’’
“বিশেষ করে অ্যাডমিরাল কুপার সর্বোচ্চ স্তরের কর্মদক্ষতা অর্জনের জন্য পদমর্যাদা নির্বিশেষে আমাদের দলের সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে থাকেন” বলে জানান হকিন্স।
গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তার আগে দিয়ে আসে সেন্টকমের এই ইমেল। যদিও বর্তমানে সৌদি আরবের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সাময়িকভাবে ইরানে হামলা বন্ধ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সেন্টকমের এই উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের কৌশল পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত মিলছে।
সিএনএন এর প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিআইএ) মনে করছে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে আলোচনার বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব নয়।
মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও বলেছেন, কেবল বিমান হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। গত মাসে তিনি আইনপ্রণেতাদের বলেছিলেনন, “আকাশপথে সামরিক শক্তি ব্যবহারের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা কমানো এবং তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। তবে এখনও কোনও চুক্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
হামলার পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট দুই সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব স্থাপনায় পারমাণবিক কর্মসূচির উপাদান বা সরঞ্জাম থাকতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা।
তবে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহার করেও খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না বলে জানিয়েছে এই সূত্ররা। কারণ এসব স্থাপনা মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত। এগুলো ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত স্থল সেনা ব্যবহার করতে হবে, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ এবং ট্রাম্প এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে অনিচ্ছুক।
তাছাড়া, সামরিক সদস্যদের হতাহতের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
আরেক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প এমন হামলার কথাও বিবেচনা করছেন, যা হবে অনেকটা 'আতশবাজির প্রদর্শনীর' মতো। এতে এক বছর আগে হামলা চালানো একই স্থনাগুলোতে বা কাছাকাছি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হবে প্রতীকী বিজয় দেখিয়ে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসা।
তবে এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার ট্রাম্পের প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ নাও হতে পারে। তাছাড়া এতে বর্তমানে যুদ্ধের মূল সমস্যা, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দাবির সমাধান হওয়ার সম্ভাবনাও কম।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিকল্পনা আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেন, “দিন শেষে প্রেসিডেন্ট একটি চুক্তি করতে চাইবেন। তাই তিনি আরও কঠোর হওয়া এবং এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজবেন।”
তিনি আরও বলেন, “প্রচলিত সব বিকল্প ফুরিয়ে আসলে মাঝেমধ্যে সৃজনশীল চিন্তার প্রয়োজন হয়।”