থাকবেন না, তবু তারা এয়ারবিএনবিতে ঘর ভাড়া নিচ্ছেন ইউক্রেইনে
কিইভে নিজের বাড়িতে ঘাপটি মেরে থেকে সারাদিন কাটিয়ে দিচ্ছেন ভোলোদিমিন বনদারেনকো। থেকে থেকে শুনছেন শহরবাসীকে সতর্ক করতে বেজে চলা সাইরেনের আওয়াজ। মাঝে মাঝে ফোনে কাঁপা কাঁপা হাতে পরিবারের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে।
এসবের মধ্যেও ইউক্রেইনের রাজধানীতে এই এক বেডরুমের বাসাটি ভাড়া নিতে এয়ারবিএনবিতে বুকিং দেওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষের বার্তার জবাবও তাকে দিতে হচ্ছে।
এসব বার্তার জবাবে কখনও তিনি কান্নার ইমোজি পাঠাচ্ছেন। কখনও দুই হাত জোড় করে প্রার্থনার ইমোজি দিচ্ছেন; গ্রাহকদের প্রতি এটা তার কৃতজ্ঞতার ভাষা।
এই গ্রাহকরা নিজেরা হয়ত কখনও ভোলোদিমিন বনদারেনকোর বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াবেন না থাকার জন্য। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা এয়ারবিএনবিতে বুকিং দিয়ে চলেছেন ওই বাসা ভাড়া নেওয়ার জন্য।
রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেওয়ার পর হুট করেই এয়ারবিএনবিতে ইউক্রেইনে বাড়ি বুকিং দেওয়ার হিড়িক পড়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, রুশ বাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত ইউক্রেইনের মানুষকে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ব্যতিক্রমী প্রচার থেকেই এই তৎপরতা; আর তাতে সাড়া মিলছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে।
হোম শেয়ারিং সাইট এয়ারবিএনবির একজন মুখপাত্র সিএনএনকে বলেন, গত ২ মার্চ ও ৩ মার্চ বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৬১ হাজার রাত ইউক্রেইনের বিভিন্ন বাড়িতে থাকার জন্য বুকিং দেওয়া হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে; আর এর মধ্যে অর্ধেক বুকিং দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া থেকে অনেকে ইউক্রেইনবাসীর এই অসময়ে এয়ারবিএনবির মাধ্যমে অর্থ সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছেন বলে জানাচ্ছে সিএনএন।
৩৬ বছর বয়সী বনদারেনকো সিএনএনকে বলেন, “আজকে তো ১০টার বেশি বুকিং পেয়েছি। এটা আসলেই অবাক করার মত। এই দুঃসময়ে সবার এই সহায়তা কাজে দিচ্ছে।
“আমার অনেক স্বজন ও বন্ধুদের জানিয়ে রেখেছি, আমি এখন আমাদের বিপদে থাকা মানুষের জন্য এই অর্থ খরচ করার কথা ভাবছি।”
এয়ারবিএনবির নীতিমালা অনুসারে গ্রাহক বাড়িতে ওঠার ২৪ ঘণ্টা পর বাড়িওয়ালাকে ভাড়ার অর্থ পরিশোধ করে।
এ কারণে এয়ারবিএনবিতে স্বল্পমেয়াদী ভাড়াটিয়া চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া বাড়িওয়ালারা সব গ্রাহককে চেক-ইন তারিখের কাছাকাছি সময়েই বুকিং দিতে অনুরোধ জানাচ্ছেন। এতে করে এয়ারবিএনবি থেকে তাড়াতাড়ি ওই অর্থ মিলবে বাড়িওয়ালাদের।
যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তারা এসময় প্রতিষ্ঠানের নামে নয়, বরং ব্যক্তিমালিকাধীন বাড়ি বুকিং দিতে সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের বাসিন্দা অ্যানি মার্গারেট ড্যানিয়েল এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ইউক্রেইনীয়দের অর্থ সহায়তার উদ্যোগটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারেন; তারপর দেরি না করে তিনিও উদ্যোগী হন।
দুই রাত থাকার জন্য ওল্ড কিইভে একটি ঐতিহাসিক অর্থডক্স গির্জা ও অদ্ভূত করে বানানো প্রাণীর ভাস্কর্যের কাছাকাছি এক অ্যাপার্টমেন্ট বুকিং দেন নিউ ইয়র্কের এই স্কুল শিক্ষক।
এয়ারবিএনবির ওয়েবসাইটে ওই বাড়ির ছবিও আছে; তাতে দেখা গেল কাঠের মেঝে, ধূসর রঙের বিশাল সোফা আর হেলানো ছাদ– স্বচ্ছ কাচের জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায়।
দুই শয়নকক্ষের ওই অ্যাপার্টমেন্ট আগামী কয়েক মাসের জন্য ভাড়া হয়ে আছে।
বাসাটি এয়ারবিএনবিতে বুকিং দেওয়ার সময় বাড়িওয়ালার জন্য একটি বার্তাও জুড়ে দেন ড্যানিয়েল।
“আমি আশা করি তুমি ও তোমার দারুণ ওই বাড়িটা নিরাপদে আছে; আর এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধের যেন সমাপ্তি ঘটে... ইউক্রেইন নিরাপদে থাকুক।
“আমি একদিন তোমাকে দেখতে আসব, অপেক্ষায় থাক। আর তখন তোমার বাড়িতে থাকব। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন; তোমার, তোমার শহরের, তোমার দেশের সঙ্গে থাকুন।”
ড্যানিয়েলের কাছ থেকে এই বার্তা পেয়েই অ্যাপার্টমেন্টের বাড়িওয়ালা ওলগা জেভিরিয়ানসকায়া উত্তরে বলেন, “শান্তিপূর্ণ কিইভে তোমার সঙ্গে দেখা হলে, তোমাকে আলিঙ্গন করতে পারলে সত্যিই খুশি হব।”
তিন সন্তান নিয়ে জেভিরিয়ানসকায়া এই শহরে আছেন কয়েক বছর ধরে। রাশিয়ার আগ্রাসী হামলায় ইউক্রেইনের এই শহর যখন ধ্বংসযজ্ঞ, সে সময় তিনি সন্তানদের সঙ্গে করে কিছু দরকারি জিনিস গাড়িতে ভরে চেরকাসি অঞ্চলের কাছাকাছি পালিয়ে আসেন। একশ মাইল পাড়ি দিতে তার নয় ঘন্টা লেগেছিল।
নিরুপায় জেভিরিয়ানসকায়া এখন কিইভে তার বাড়িতে অন্যদের থাকতে দিচ্ছেন।
এয়াবিএনবির মাধ্যমে অপরিচিত একজনের কাছ থেকে বার্তা পেয়ে জেভিরিয়ানসকায়া কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পান; এর মধ্যে নতুন এই বাস্তবতাকে মেনেও নিয়েছেন তিনি।
ড্যানিয়েলকে দেওয়া ফিরতি বার্তায় জেভিরিয়ানসকায়া বলেন, “আমরা বেঁচে আছি, কিন্তু আমরা আগের মত বাঁচতে চাই। কিইভে থাকাটা এখন আতঙ্কজনক। টাকাই সব নয়, ভরসা দিতে পারে এখন প্রতিটি শব্দও অমূল্য।”
একদিন এই সংঘাত থেমে গেলে আবারও জেভিরিয়ানসকায়ার অ্যাপার্টমেন্টটি বুকিং দিতে চান ড্যানিয়েল; আর ওই সময় তিনি সেখানে যেতেও আগ্রহী।
ওসিপচুক অবশ্য তার স্ত্রী আর দুই সন্তান নিয়ে শহরেই থেকে গেছেন। গ্রাহকদের কাছ থেকে স্রোতের মত আসা বার্তা সামলাতে তিনি এয়ারবিএনবিতে একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা দিয়ে রেখেছেন।
”আপনার সহায়তার জন্য ধন্যবাদ। এই মুহূর্তে এর প্রয়োজন ছিল খুব।
“আমি সকালে খাবার কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছি; এখন তোমার পাঠানো অর্থ দিয়ে খাবার কিনতে পারব।”
জিমার নিজেই পৌঁছে গিয়েছিলেন ওসিপচুক কেমন আছেন তা দেখতে; সেই সঙ্গে পাঠানো অর্থ কাজে দিচ্ছে কি না জানতে। তিনি বন্ধুদেরও ইউক্রেইনে এ ধরনের বাড়ি খুঁজে নিয়ে বুকিং দিতে অনুরোধ করছেন।
”এই অর্থ সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছবে এবং দ্রুত”, বলেন তিনি।
নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী কারেইয়ান ডেয়ো এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ইউক্রেইনে একটি বাড়ি বুকিং দেন, যার বাড়িওয়ালা পাশেই থাকেন।
বাড়িতে থাকতে আসবেন না, তারপরও বুকিং দিয়ে অর্থ পাঠিয়েছেন জানার পর ডেয়োকে একটি বার্তা পাঠান বাড়ির মালিক।
”আমি কাঁদছি। তুমি আমার কাছে একজন মহানায়ক।”
এয়ারবিএনবি বলছে, রাশিয়ার আগ্রাসনে যুদ্ধের এই মুহূর্তে ইউক্রেইন থেকে পালিয়ে আসা লাখো মানুষের জন্য আশেপাশের দেশে অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা। এই সময়ে ভাড়ায় কিছুটা ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে।
এয়ারবিএনবির মুখপাত্র হ্যাভেন থর্ন বলেন, ”সংকটের এই মুহূর্তে সবার সহমর্মিতা আমাদের আপ্লুত করেছে।”
যারা ইউক্রেইনীয়দের আর্থিক সহায়তা পাঠাতে চান এভাবে বাড়ি বুকিং দিয়ে, বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য তাদের এয়ারবিএনবির ওয়েবসাইট দেখারও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
বিশ্বের নানা জায়গার মানুষ যখন সহমর্মী হয়ে উঠেছে, তাদের এই আবেগের সুযোগ নিতে অনেকে ইউক্রেইনে বাড়ির ভুয়া তথ্য দিয়ে এয়ারবিএনবির অ্যাকাউন্ট করতে পারেন বলেও উদ্বেগ জানিয়েছেন কেউ কেউ।
আর সেজন্য যখনই কোনো বাড়ি বুকিং দিতে যাবেন কেউ, অবশ্যই ওই বাড়ির ’রিভিউ’ ও কতদিন ধরে এই সেবা দেওয়া হচ্ছে তা দেখে নিয়ে বাড়িওয়ালা যাচাই করে নিতে পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এয়ারবিএনবি নিয়ে এমন একটি উদ্যোগ ছড়িয়ে দিতে পেছন থেকে যেসব ’ইনফ্লুয়েন্সার’ কাজ করেছেন, তাদের একজন নিজের অনুসারীদের ই-কমার্স ব্র্যান্ড ইটসিতে আর্থিক সহায়তা হিসেবে পণ্যের মূল্য পাঠাতে অনুরোধ জানাচ্ছেন; অন্যদিকে ইটসিকে অনুরোধ করা হয়, এর বিনিময়ে কোনো পণ্য যেন ডেলিভারি না করা হয়।
ইটসির পক্ষ থেকে ইউক্রেনীয় গ্রাহকদের সকল বকেয়া অর্থ আর পরিশোধ করতে হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কিইভের সেই বাড়িওয়ালা বনদারেনকো বলেন, “যেহেতু কিছু কিছু শহরে ব্যাংক বন্ধ রাখা হয়েছে, তাই এয়ারবিএনবির মাধ্যমে আসা অর্থ বাড়িওয়ালার হাতে তাড়াতাড়ি পৌঁছাবে না; তবে অনিশ্চিয়তার এই পৃথিবীতে এই অর্থ সহায়তা অনেক ভরসা যোগাচ্ছে।”
বনদারেনকোর মত ইউক্রেইনের অন্য বাড়ির মালিকরাও বলছেন, অপরিচিত বিদেশিদের কাছ থেকে যে আশ্বাস মিলছে, তার তুলনা অন্য কিছুর সঙ্গে হয় না।
