২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ইংরেজির শিক্ষক, পার্কে বসে বানাচ্ছেন মলোটভ ককটেল

রাশিয়ার সৈন্যরা যখন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেইনে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, আরিনা তখন কাজ শেষ করে নাচের ক্লাসের জন্য তৈরি; আর তারপর যাওয়ার কথা পার্টিতে।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Feb 2022, 11:47 PM

Updated : 25 Oct 2022, 10:16 AM

কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেল। সেই সঙ্গে বদলে গেল ইংরেজি শিক্ষক আরিনার জীবন ছক। তিন দিন পর তাকে দেখা গেল পার্কে বসে রুশ সেনাদের আক্রমণ ঠেকাতে মলোটভ ককটেল বানাতে।

এক প্রতিবেদনে বিবিসি লিখেছে, তাদের প্রতিবেদক সারাহ রেইনসফোর্ড পার্কে গিয়ে আরিনাকে ঘাসের উপর কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখেন। চারপাশে আরও কয়েকজন নারী।

তারা পলিস্টাইরিন খণ্ড ঝুরি ঝুরি করে কাটছিলেন, যেন ওগুলো পনিরের টুকরো। সেগুলো কাচের বোতলে ভরে দিচ্ছিলেন কেউ কেউ।

কয়েকজন আবার কাপড় ছিঁড়ে টুকরো করে রাখছিলেন বোতলের ‍মুখে ঢুকিয়ে আটকে দিতে।

তারা সবাই মিলে হাতে হাতে বোমা বানিয়ে চলেছিলেন; এসব বোমাকে বলে মলোটভ ককটেল।  

ইউরোপে এমন দৃশ্য কল্পনাই করা যায় না। এক সময় এমন কিছু করতে হবে এই নারীরাও তা ভাবেননি। কিন্তু রুশ আগ্রাসন থেকে নিজেদের বাঁচাতে দিনিপ্রো শহরবাসী এখন এভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরিনার মুখে আর চুলে ককশিটের সাদা সাদা গুঁড়ো লেগে আছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন,  “সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এমন কিছু করতে হবে এমনটা আগে কেউ ভাবেনি। অথচ এখন এটাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।”

আরিনা বলেন,  ”পরিস্থিতি খুবই ভীতিকর। আমরা কী করছি তা হয়ত আমরা নিজেরাও উপলব্ধি করতে পারছি না। কিন্তু আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।”

কয়েক মিটার দূরেই ছিলেন এলেনা আর ইউলিয়া। বয়স্কদের কাছে সন্তানদের রেখে তারা এখানে এসেছেন বোমা বানানোর কাজে যোগ দিতে।

এলেনা বলেন, “ঘরে চুপচাপ বসে থাকলে ভয় বেশি করে জাপটে ধরে।”

কথা বলার সময়ও ককশিট গুঁড়ো করে চলেছিলেন এলেনা; কাজে এক সেকেন্ডের বিরতি না দিয়ে।

হেসে বললেন, তিনি একজন পাকা রাঁধুনি; সে কারণেই এই কাজ করতে তেমন বেগ পেতে হচ্ছে না। 

”আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আমাদের সঙ্গে এমন হচ্ছে। কিন্তু আর কোনো রাস্তা কি খোলা আছে আমাদের জন্য? কেউ তো আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেনি।”

 

ইউক্রেইনের এই শহরে চারদিকে অনেক কিছুই ঘটছে।

কাছাকাছি একটি বড় ঘরে জমে উঠেছে কাপড়ে স্স্তূপ। কেউ কম্বল দিয়ে গেছে তো কেউ খাবার জন্য বাজরা দিয়েছে।

স্রোতের মত মানুষ এসে দিয়ে যাচ্ছে; কেউ পেট্রোল এনেছে, কেউ পানি, আবার কেউ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উপকরণ।

স্বেচ্ছাসেবকরা উচ্চস্বরে সবাইকে নির্দেশা দিচ্ছেন, কোথায় কী রাখতে হবে।

এসব কিছু ইউক্রেইনের যোদ্ধাদের জন্য নিয়ে আসছে সবাই। আবার কেউ যদি দিনিপ্রো ছেড়ে অন্য কোনো শহরে যুদ্ধ করতে যেতে বাধ্য হন, তিনিও এখান থেকে প্রয়োজনীয় রসদ নিতে পারেন সঙ্গে।

আবার শহর অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে যে কোনো মুহূর্তে, সে কথা মাথায় রেখেও এসব জমা করা হচ্ছে।  

বড় পরিসরে এই উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন পাঁচ জন নারী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু পোস্টও কাজে দিয়েছে। 

এখন অনেকেই এই কাজে যোগ দিয়েছেন। দেখতে আপাত দৃষ্টিতে বিশৃঙ্খল মনে হলেও, বিষয়টা এভাবেই এগিয়ে চলেছে।

একটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হয়েছে যেখানে যুদ্ধে অংশ নিতে আগ্রহীরা কাগজে সই করে অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারবেন; আর ওই অংশে দেখা গেল মানুষের দীর্ঘ কিউ।

কানে মোবাইলের হেডফোনটা খুলে পড়ছিল কাতেরিনা লিওনোভার। বললেন, “সরকার থেকে কুলিয়ে উঠতে পারছে না, তাই আমরাই এ ব্যবস্থা নিয়েছি।”  

কাতেরিনা বলেন, “তিনি (পুতিন) কি সত্যিই বিশ্বাস করেন ইউক্রেইন দখলে নিতে পারবেন? আমরা ভীত নই। আমরা ক্ষুব্ধ।”

যুদ্ধের জন্য কি মূল্য দিতে হয় তা এর মধ্যে টের পেয়েছে দিনিপ্রো।

চারশ শয্যার সামরিক হাসপাতালগুলোর সবগুলোতেই রোগী ভর্তি হয়ে আছে। এদিকে শত শত আহত মানুষ হাসপাতালে আসছে। এই আগ্রাসী যুদ্ধে আহত মানুষদের সহায়তা করতে হাসপাতালের করিডোরেও শয্যার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। 

হাসপাতালের মুখপাত্র সার্গেই বাচিনস্কি বলেন, “আমরা কঠিন এক সময়ের চূড়ায় আছি এখন, আমার তাই মনে হয়।

“সেনাবাহিনী এখন হেলিকপ্টারও ব্যবহার করতে পারছে না। কারণ তাহলে রাশিয়ার বাহিনী ওদের গুলি করে ভূপাতিত করবে। সড়ক পথে জরুরি সেবা কেন্দ্রে পৌঁছাতেও বেশ সময় লাগে।”

তবে আহত হলেও মানুষের আত্মবিশ্বাস চাঙ্গা রয়েছে, জোর দিয়ে বললেন সার্গেই।

বিবিসি প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার মাঝেই সৈন্য ভর্তি দুটো বাস হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে যায়। পায়ে জখম নিযে হাঁটতে থাকা সৈন্যদের চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়। হাসপাতালের বেড খালি রাখা হয় সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের জন্য।

তবে সেবা ও ওষুধে কোনো ঘাটতি নেই। মানুষ লাগাতার ব্যাগ ভর্তি ওষুধ, ইনজেকশন, ব্যান্ডেজ নিয়ে আসছে হাসপাতালে।

একজন একটি পুরনো ক্র্যাচ হাসপাতালে দিয়ে গেলেন। কোনো কিছুই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

দিনিপ্রো পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করছে। তবে সবার উপরই চাপ বাড়ছে একটু একটু করে।