Published : 07 Aug 2026, 11:07 PM
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কাছে ননতাবুরি প্রদেশের বাং ক্রুয়াই জেলার ‘দেবসিরিন ননথাবুরি স্কুলে’ শুক্রবার সকালে গোলাগুলির ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা আসতে শুরু করেছে।
সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে, ঠিক কোন কারণে মাত্র ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর তার দাদা-দাদিকে খুন করে স্কুলে এসে শিক্ষক ও সহপাঠীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। অস্ত্রটি সেই কিশোর কোথায়, পেয়েছে সে বিষয়েও তদন্ত হচ্ছে। দাবি উঠেছে থাইল্যান্ডে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন আরো কঠোর করারও।
শুক্রবার সকালে সপ্তাহের শেষ ক্লাস চলাকালে স্কুলটি গুলি শুরু হলে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। নবম শ্রেণির এক ছাত্র তার দাদা-দাদিকে গুলি করে হত্যা স্কুলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়।
এ ঘটনায় স্কুলটির ৫ শিক্ষক নিহত ও অন্তত ২৩ জন আহত হয়।
স্থানীয় পুলিশের বরাতে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, হামলার পর বন্দুকধারী শিক্ষার্থী নিজেও মারা গেছে। তবে সে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দেবসিরিন স্কুলের গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী বিবিসিকে বলেন, “আমার শিক্ষক যখন গুলিবিদ্ধ হন, তখন আমি ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন সময় সেখানে হামলাকারী এসে হাজির হয়।”
মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই স্কুল ইউনিফর্ম পরা মেয়েটি বর্ণনা করে কীভাবে বন্দুকধারী এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
নাম প্রকাশ না করা ওই মেয়েটি বলে, “অন্য বন্ধুদের সঙ্গে আমাকেও স্কুলের দেয়াল টপকে পালাতে হয়েছিল।”
এদিকে স্কুলে গোলাগুলির ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তম শ্রেণির ওই ছাত্রীর মা বলেন, “আমার মেয়ে ভেবেছিল সে হয়ত আর বাঁচবে না। বলেছিল, হয়ত আমাদের আর কোনোদিন দেখতে পাবে না।”
স্কুলটির ১৮ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী রয়টার্সকে বলে, “প্রথমে ভেবেছিলাম পটকা ফুটছে। আমি ভাবিনি যে এটা বন্দুকের আওয়াজ। পরপর অনেকগুলো গুলির শব্দ হয়েছিল। তারপর সব চুপচাপ হয়ে যায়। এরপর আবার শব্দ শুরু হয়।”
ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিবিসি লিখেছে, স্কুলের গেট থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে প্যারামেডিক দল আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে পাঠাচ্ছিল, আর অন্যদিকে ভিড় জমানো মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। শিশুরাও আহত হয়েছে শুনে উদ্ধারকর্মী কিয়াতিখুন ভিরাপংপ্রাদিত দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
৪৭ বছর বয়সি কিয়ানতিখুন বলেন, “আমি এমন কিছু শিক্ষার্থীকে দেখেছি যাদের গুলি লেগেছে, কারো হাতে, কারো পিঠে, আবার কারো বুকে। তাই আমি প্রথমে তাদের হাসপাতালে পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য ছুটে যাই।”
ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সবাই শিক্ষক। তাদের মৃত্যুতে এখন শোকাহত সহকর্মীরাও। ৩১ বছর বয়সি এক শোকাহত শিক্ষক বিবিসিকে বলেন, “নিহতদের মধ্যে আমার এক বন্ধুও রয়েছে। তার বয়স আমার মতই ছিল। আমরা দুজন এই স্কুলেই একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। এরপর আমরা দুজনেই এই স্কুলে শিক্ষক হয়েছিলাম।”
কেন ওই কিশোর দাদা-দাদিকে খুন করে স্কুলে এসে এলাপাথারি গুলি চালাল তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিবিসির খবরে বলা হয়, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশ ঘটনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো কিছু জানায়নি। তাদের ধারণা, হামলাকারীর ব্যবহৃত ৯ মি.মি পিস্তলটি তার দাদার ছিল।
ফরেনসিক কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাকারী খুব ‘নিখুঁত নিশানায়’ গুলি করেছে। কারণ গুলির বেশ কয়েকটি ভুক্তভোগীদের শরীরের ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থানে’ লেগেছে।
স্কুলের এক শিক্ষক বলেন, ওই কিশোর ভালো ছাত্র ছিল। তাকে কখনো উগ্র মেজাজে দেখা যায়নি এবং তার গ্রেডও ভালো ছিল।
তবে থাইল্যান্ডের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ওই কিশোরকে ‘ভিডিও গেমে আসক্ত’ বলে বর্ণনা করেছে।
এ বিষয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল বলেছেন, “পড়াশোনার চাপ হয়ত ওই কিশোরের এই ঘটনা ঘটনানোর পেছনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা জানতে পেরেছি, তার দাদি একজন শিক্ষক ছিলেন এবং তিনি হয়ত তার প্রতি একটু কঠোর ছিলেন। পুলিশ ওই কিশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পেরেছে, এই বিষয় নিয়ে সে মানসিকভাবে চাপে ছিল।”
বিবিসির খবরে বলা হয়, দেবসিরিন স্কুলের এই ঘটনার পর এটি স্পষ্ট যে আগামী দিনগুলোতে কর্তৃপক্ষকে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে; যার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল, এই অপরাধের ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কী ধরণের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
কারণ এটি থাইল্যান্ডে এ বছরই স্কুলে গুলিবর্ষণের দ্বিতীয় ঘটনা। গত ফেব্রুয়ারিতে, দক্ষিণ থাইল্যান্ডের একটি স্কুলে জিম্মিদশার সময় ১৮ বছর বয়সি এক বন্দুকধারীর গুলিতে প্রধান শিক্ষক এবং একজন ছাত্রী নিহত হন।
এছাড়া চার বছর আগে, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় নোং বুয়া লামফু প্রদেশে ৩৪ বছর বয়সি এক ব্যক্তি শিশু যত্ন কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে গুলি ও কুপিয়ে ৩৭ জনকে হত্যা করে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিল শিশু।
বর্তমানে থাইল্যান্ডের ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের কাছে অস্ত্র রয়েছে, যা বিশ্বে অস্ত্র মালিকানার সর্বোচ্চ হারের অন্যতম। এর মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি অবৈধ বা লাইসেন্সহীন অস্ত্র মালিক। যদিও দেশটিতে অস্ত্রের লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু কড়াকড়ি রয়েছে। তা সত্ত্বেও মানুষ আইনগত বা অবৈধভাবে তুলনামূলক সহজেই এসব অস্ত্র জোগাড় করে ফেলে।
থাইল্যান্ডে দাদা-দাদিকে মেরে স্কুলে এসে ছাত্রের এলোপাতাড়ি গুলি, নিহত ৭