Published : 02 Apr 2026, 02:13 PM
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানের ওপর আরও আগ্রাসী আক্রমণ চালানোর অঙ্গীকার করার পর, এক মাস পেরোনো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হবে—এই আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে।
যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার আশায় থাকা বিনিয়োগকারীদের জন্য তার এই ভাষণ ছিল ব্যাপক হতাশাজনক, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আগামী ২-৩ সপ্তাহ ইরানে সামরিক অভিযান আরও তীব্রতর হবে, ট্রাম্পের এ ঘোষণার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন এবং তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুরাবস্থার ঝুঁকিতে ফেলা সংঘাত কবে বন্ধ হতে পারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণে তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও পাওয়া যায়নি।
“আমেরিকার সব সামরিক লক্ষ্য দ্রুত, খুব শিগগিরই যে পূরণ হওয়ার পথে রয়েছে, আজ রাতে আমি তা বলতে পারি।
“আমরা আগামী দুই-তিন সপ্তাহ তাদের ওপর অত্যন্ত কঠোর আঘাত হানতে যাচ্ছি। আমরা তাদেরকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছি, যেখানে থাকার যোগ্য তারা,” বুধবার সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে এসবই বলেন ট্রাম্প।
ইরানের নেতারা যদি এরপরও যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে আলোচনায় না বসে তাহলে ইরানের জ্বালানি ও তেল স্থাপনায় হামলাসহ সংঘাত আরও তীব্রতর হতে পারে বলেও তিনি ভাষণে ইঙ্গিত দেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল আগের অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস ভাষণে না থাকায় বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৬ দশমিক ১৬ ডলারে পৌঁছে যায়। বৃহস্পতিবারও এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের পাশাপাশি জাপানসহ এশিয়ার একাধিক শেয়ারবাজারেও লেগেছে জোর ধাক্কা।
“তিনি যদি শেয়ারবাজারে আস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকেন, তিনি তা পারেননি। সব বিনিয়োগকারীদের মনেই এখন মূল প্রশ্ন, ‘কবে এই যুদ্ধ শেষ হবে?’, এ কারণেই এই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে,” বলেছেন ভানেক অস্ট্রেলিয়ার বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারপ্রধান রাসেল চেসলার।
এদিকে ট্রাম্পের ভাষণের কিছু সময় পরই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায় তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পেরেছে তারা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা করে বসার পর তেহরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরে থাকা বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা শুরু করে। পরে লেবাননের হিজবুল্লাহও এ যুদ্ধে যোগ দেয়।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাত এরই মধ্যে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রত্যুত্তরে ইরানও তাদের ভূখণ্ড সংশ্লিষ্ট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে এই সঙ্কীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের তেল-গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ সরবরাহ হত।
হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে, নভেম্বরে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ দামবৃদ্ধি ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের ভরাডুবির কারণ হতে পারে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই আশঙ্কা করছেন।
তবে ট্রাম্প তার ভাষণে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রণালি দরকার নেই। মিত্রদের মধ্যে যারা ওই অঞ্চলের তেলের ওপর নির্ভরশীল তাদেরই হরমুজ খোলার চ্যালেঞ্জ নেওয়া দরকার।
“অনেক মার্কিনিই দেশের ভেতর সম্প্রতি পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। সাময়িক এই বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে ইরানি শাসকদের প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্যিক তেলের ট্যাংকারে উন্মত্ত সন্ত্রাসী হামলা, যার সঙ্গে এই সংঘাতের কোনো সম্পর্কই নেই,” বলেছেন তিনি।
এর আগে বুধবারই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায় তা নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলে দেশটিতে হামলা চালিয়েছেন।
তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি ফের কখনো দেখা দিলে মার্কিন বাহিনী ‘নির্দিষ্ট লক্ষে হামলা চালিয়ে’ ফিরে আসতে পারবে, ভাষ্য তার।
“তারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর দোরগোড়ায় ছিল,” কোনো প্রমাণ না দিয়েই টিভি ভাষণে এ কথা বলেন ট্রাম্প।
ভাষণে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘দ্রুত, সাঁড়াশি ও বিপুল বিজয়’ নিয়ে গর্বও করতে দেখা গেছে।
“যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি বা নিজেদের সীমানার বাইরে শক্তি প্রদর্শনের যে সক্ষমতা ইরানি শাসকদের ছিল, তা পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছি আমরা,” বলেন এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তার ভাষণের আগে মার্কিন জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া খোলা চিঠিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি তাদের দেশের কোনো বিদ্বেষই নেই।
ট্রাম্প বলছেন, তার সঙ্গে ইরানের ‘আগের নেতাদের তুলনায় কম কট্টর’ নতুন নেতাদের আলোচনা চলছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানিয়েছে, কিন্তু হরমুজ খুলে দেওয়া না হলে তিনি সেই অনুরোধ বিবেচনা করবেন না।
ইরান এমন অনুরোধের কথা অস্বীকার করেছে।
বুধবার দেশটির এক ঊর্ধ্বতন সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, পাল্টা হামলা বন্ধে তেহরান যুদ্ধবিরতি বহাল থাকবে এমন নিশ্চয়তা চেয়েছে।
সাময়িক যুদ্ধবিরতি নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের কোনো কথা হয়নি, বলেছে সূত্রটি।