যে পথে চললেন রানি শেষ ঠিকানায়

শ্রদ্ধা জানানোর সময় কফিনের ওপর বসানো থাকবে রত্নখচিত রাজ মুকুট।

নিউজ ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Sept 2022, 01:34 PM
Updated : 11 Sept 2022, 01:34 PM

স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদ থেকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কফিন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এডিনবরায়, সেখান থেকে লন্ডনে নেওয়ার পর রাজকীয় আনুষ্ঠানিকতা সেরে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য হবে।

রীতি অনুযায়ী রানির কফিন থাকবে রাজকীয় পতাকায় আচ্ছাদিত, যা মূলত যুক্তরাজ্য ও রাজতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে।

সেই পতাকায় খচিত রয়েছে ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী তিনটি সিংহ, স্কটল্যান্ডের প্রতিচ্ছবি একটি লাল সিংহ এবং আয়ারল্যান্ডের প্রতীক বাদ্যযন্ত্র হার্প।

শ্রদ্ধা জানানোর সময় কফিনের ওপর বসানো থাকবে রাজকীয় মুকুট- ইম্পেরিয়াল স্টেট ক্রাউন, যাতে খচিত রয়েছে সেইন্ট অ্যাডওয়ার্ড’স স্যাফায়ার।

এ ছাড়া পৃথিবীর সবথেকে বড় হীরা থেকে নেওয়া কালিনান-২ হীরাও খচিত রয়েছে ওই মুকটে। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদে পৌঁছানোর পর কফিনের ওপর রাজকীয় গোলক ও রাজদণ্ড রাখা হবে।

এই গোলকের উপর খ্রিস্টান বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করা ক্রস চিহ্ন বসানো হয়েছে। আর রাজদণ্ডে রয়েছে কালিনান হীরা থেকে কেটে নেওয়া বৃহত্তম রত্ন কালিনান-১।

৯২ সেন্টিমিটার লম্বা দণ্ডটি সোনার তৈরি, যার ওপর কারুকার্য করে আঁকা হয়েছে গোলাপ। এ ছাড়া রয়েছে স্কটল্যান্ডের প্রতীক থিসেল ও আয়ারল্যান্ডের প্রতীক শ্যামরক।

বৃহস্পতিবার স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদে মারা যান রানি। পরদিন শুক্রবার থেকে সাত দিনের রাজকীয় শোক চলছে। নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে রানিকে বিদায় জানানো হচ্ছে।

যাত্রাপথ

স্কটল্যান্ডের বালমোরাল প্রাসাদ থেকে রানির কফিন রোববার এডিনবারার হলিরুডহাউস প্যালেসে নেওয়া হবে। এই বালমোরাল প্রাসাদ স্কটল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজা বা রানির বাসভবন।

কফিন বহনকারী গাড়িটি ধীরগতিতে এবারডিন, দুন্ডে এবং পার্থ হয়ে ২৫ কিলোমিটারের পথ অতিক্রম করে এডিনবারায় পৌঁছাবে। সেখানে সিংহাসন কক্ষে সোমবার বিকাল পর্যন্ত রানিকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে কফিন।

রাজা এবং রাজপরিবারের সদস্যরা সেই যাত্রায় রানির সঙ্গী হবেন। এরপর সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রালে মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার জন্য রানির কফিন রাখা হবে এবং সবাইকে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে।

এরপর এডিনবারা থেকে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমানে কফিন পৌঁছাবে লন্ডনে। বাকিংহাম প্যালেস বিবিসিকে বলেছে, এই যাত্রায় প্রিন্সে অ্যানি রানির সঙ্গী হবেন।

বুধবার রানির কফিন লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার প্রাসাদের প্রাচীনতম অংশ ওয়েস্টমিনস্টার হলে নেওয়া হবে। সেখানে তিনি বিশ্রামে থাকবেন।

আগের রাজা-রানিদের ক্ষেত্রেও ওই হলের মাঝখানে উচু বেদীতে কফিন রাখা হয়েছিল। সার্বভৌম দেহরক্ষী, পদাতিক গার্ড ও অশ্বারোহী সেনা ইউনিট চব্বিশ ঘণ্টা সেখানে পাহারা দেয়।

১৯১০ সালে সপ্তম এডওয়ার্ড, ১৯৩৬ সালে পঞ্চম জর্জ, ১৯৫২ সালে ষষ্ঠ জর্জ এবং তার এক বছর পরে কুইন মেরিকে ওই বেদীতে রাখা হয়েছিল, ১১ শতকের প্রাচীন সেই হলে পিতলের ফলকগুলো সেই সাক্ষ্য দেয়।

এক হাজার বছরের বেশি পুরনো এই হলে ব্রিটেনের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কফিনও ১৯৬৫ সালে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়েছিল।

রাজপরিবারের সর্বশেষ সদস্য হিসেবে সর্বেশেষ ২০০২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মায়ের কফিন ওয়েস্টমিনস্টার হলে নেওয়া হয়েছিল।

সামরিক কুচকাওয়াজের সঙ্গে শোভাযাত্রার মাধ্যমে রানির কফিন ওয়েস্টমিনস্টার হলে নেওয়া হবে। রাজপরিবারের সদস্যরা সেখানে থাকবেন।

সেই শোভাযাত্রা মানুষ দেখতে পাবে। লন্ডনের রয়্যাল পার্কে বড় পর্দায় সেই দৃশ্য দেখানো হবে।

ওয়েস্টমিনস্টার হলে রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যদের আনুষ্ঠানিকতার পর জনগণকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে। তবে তারা কীভাবে সেখানে প্রবেশ করে রানিকে একনজর দেখার সুযোগ পাবেন, তা পরে জানাবে বাকিংহাম প্যালেস।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

ওয়েস্টমিনস্টার হলে কয়েকদিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯ সেপ্টেম্বর সোমবার সেখান থেকে স্বল্প দূরত্বের পথ ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে রানির মরদেহ নেওয়া হবে। যুক্তরাজ্য জুড়ে সেদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

এই অ্যাবি হল একটি ঐতিহাসিক গির্জা, যেখানে রাজা-রানির মাথায় মুকুট পরানো হয়। ১৯৫৩ সালে এই গির্জাতেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক হয়েছিল। তার আগে ১৯৪৭ সালে প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে সেখানে তার বিয়ে হয়েছিল।

১৮ শতকের পর থেকে এই গির্জায় কোনো রাজা বা রানির শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়নি। তবে ২০০২ সালে এই গির্জায় রানিমাতার শেষকৃত্য হয়েছিল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে আসবেন। তারা রানির জীবন ও কর্মজীবনকে স্মরণ করে শ্রদ্ধা জানাবেন। ব্রিটেনের শীর্ষ রাজনীতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীরাও থাকবেন।

শেষ শয্যা

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতার পরে রানির কফিন নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি থেকে উইন্ডসরের দিকে শেষ যাত্রা হবে। তাকে উইন্ডসর ক্যাসেলের মাঠে সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে নেওয়া হবে।

প্রিন্স ফিলিপের স্মারক অনুষ্ঠানও সেখানে হয়েছিল। একইসঙ্গে রানির নাতি-নাতনির বিয়ের মত অনুষ্ঠানগুলোও হয়েছিল সেখানে।

২০২১ সালে ডিউক অব এডিনবারা ফিলিপের কফিনটি চ্যাপেলের রয়্যাল ভল্টে রাখা হয়, যেখানে রাজপরিবারের অনেক সদস্যকে রাখা হয়েছিল।

রানির মৃত্যুতে তাকে রয়্যাল ভল্ট থেকে সরিয়ে এই জুটিকে একসঙ্গে পঞ্চম জর্জ চ্যাপেলে শায়িত করা হবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক