১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

অস্থির উপসাগরীয় অঞ্চল: মৃত্যু আর ঋণের দুশ্চিন্তায় দক্ষিণ এশিয়ার লাখো পরিবার

উপসাগরীয় দেশগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করে। দেশে থাকা তাদের পরিবারের এখন প্রধান উদ্বেগ হল, প্রিয়জনের নিরাপত্তা এবং তাদের লালিত স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।

অস্থির উপসাগরীয় অঞ্চল: মৃত্যু আর ঋণের দুশ্চিন্তায় দক্ষিণ এশিয়ার লাখো পরিবার
ভারতের জয়া খুন্তিয়া পরিবার। ছবি: আল-জাজিরা

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 26 Mar 2026, 08:20 PM

Updated : 26 Aug 2026, 03:15 PM

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মাথায়, ভারতের ঊড়িষ্যার জয়া খুন্তিয়া ফোনে কথা বলেন তার ছেলে কুনার সঙ্গে। কাতারের দোহায় কর্মরত কুনার সঙ্গে প্রায়ই কথা হতো তার। 

গত ৬ মার্চ রাত ১০টার দিকেও যখন কথা হয় তখন জয়া ও তার পরিবার বেশ দুশ্চিন্তায় ছিল। কুনা তখন বাবাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, “আমি এখানে নিরাপদ আছি, চিন্তা করো না।” কিন্তু সেটিই ছিল বাবার সঙ্গে কুনার শেষ কথা।

পরদিন সকালেই ঊড়িষ্যার সেই পরিবারটি কুনার রুমমেটের কাছ থেকে একটি ফোন কল পায়। তারা জানতে পারে, ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দ আর আকাশে ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বাসার কাছে পড়ে কুনার হার্টঅ্যাটাক হয়েছে। 

কুনা সেখানেই লুটিয়ে পড়েন এবং পরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কয়েক দিন পর কুনার নিথর দেহ কফিনে করে গ্রামে পৌঁছায়। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা কুনার মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি। 

তবে কাতারের রাজধানীতে পাইপ ফিটার হিসেবে কাজ করা ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের পরিবার দক্ষিণ এশিয়ার সেই লাখো পরিবারের একটি, যাদের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে সরাসরি প্রভাব পড়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের হামলায় নিহত আটজনের মধ্যে দুইজন ছিলেন আমিরাতি সামরিক কর্মকর্তা, একজন ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং বাকি পাঁচজনই ছিলেন দক্ষিণ এশীয়। 

এই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি, একজন বাংলাদেশি এবং একজন নেপালি নাগরিক। ওমানে নিহত তিনজনের সবাই ভারতীয়। এছাড়া সৌদি আরবেও একজন ভারতীয় ও একজন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ প্রবাসী শ্রমিক কাজ করেন, যা ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলোর কাছে এখন প্রধান উদ্বেগের বিষয় হল, তাদের প্রিয়জনের নিরাপত্তা এবং তাদের লালিত স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।

ঊড়িষ্যার খুন্তিয়া পরিবার ২০২৫ সালে দুই মেয়ের বিয়ের জন্য ৩ লাখ রুপি ঋণ নিয়েছিল। সেই ঋণের বোঝা শোধ করতেই গত বছরের শেষে দোহায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তাদের ছেলে কুনা। 

কুনার আয় ছিল ৩৫ হাজার রুপি, যেখান থেকে প্রতি মাসে তিনি ১৫ হাজার রুপি করে বাড়িতে পাঠাতেন। সেই ছেলের মৃত্যুতে জয়া খুন্তিয়া কাঁদতে কাঁদতে ধরা গলায় বলেন, “ভেবেছিলাম আমাদের কষ্ট অবশেষে শেষ হতে চলেছে। 

“আমার একমাত্র ছেলে বলত, বাবা চিন্তা করো না, আমি আছি। সে-ই ছিল আমাদের একমাত্র আশা, আমাদের সবকিছু। সেই আশা এখন চিরতরে নিভে গেছে। একটি ফোন কল আমাদের সব শেষ করে দিল। 

“সে কথা দিয়েছিল ঋণ শোধ করে ফিরে আসবে, কিন্তু সে ফিরল কফিন বন্দি হয়ে। আমাদের আর কিছুই রইল না। একমাত্র ছেলেকে হারানোই এখন আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত, এই ছয়টি দেশে মোট ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখই বিদেশি নাগরিক।

এর মধ্যে ভারতের ৯০ লাখ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ৫০ লাখ করে, নেপালের ১২ লাখ এবং শ্রীলঙ্কার ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সেখানে কর্মরত। এদের অধিকাংশই ব্লু-কলার বা কায়িক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। নির্মাণ, তেল-গ্যাস ও সেবাখাতে তারা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

কিন্তু ইরানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অভিবাসী শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। কারণ, তেল শোধনাগার, নির্মাণ এলাকা, বিমানবন্দর এবং বন্দর, যেখানে অনেকে কাজ করেন, সেগুলোই এখন হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। 

কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কায় শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলো এখন চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।

আরব আমিরাতের একটি তেল মজুত কেন্দ্রে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিক হামজা জানান এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। 

তিনি বলেন, “আমাদের চোখের সামনে ড্রোন হামলায় একটি স্টোরেজ ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের শ্রমিকরা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম। 

“ড্রোনটি এত কাছ দিয়ে আঘাত করেছিল যে আমরাও মারা যেতে পারতাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল যে, পরের বার হয়ত আমরাই মরব।”

বিপদ জেনেও কেন তারা ফিরছেন না? 

হামজা বলেন, “আমরা ফিরতে চাই কিন্তু পারি না। পরিবার আমাদের ওপর নির্ভরশীল। কাজ বন্ধ করলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে। আমাদের আসলে কোনও উপায় নেই।”

অভিবাসন বিশ্লেষক ইমরান খান জানান, দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকরা মূলত নিরুপায় হয়েই মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যান। যে কোনও সংকটে এই শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

কিন্তু হামজার মতো অধিকাংশেরই দেশে ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ, কাজ ছাড়লে তাদের পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল পরিবার ও সমাজ:

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্য আয়ের প্রধান উৎস। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পায়। 

কেবল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেই ভারত পায় প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার, পাকিস্তান ৩,৮২৯ কোটি ডলার, বাংলাদেশ ১,৩৫০ কোটি ডলার, শ্রীলঙ্কা ৮০০ কোটি ডলার এবং নেপাল ৫০০ কোটি ডলার পায়। যুদ্ধের কারণে এই অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। 

পাকিস্তান-ভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফয়সাল আব্বাস বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা রেমিট্যান্স পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অর্থনীতির দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পরিস্থিতি খারাপ হলে এর প্রভাব গোটা অঞ্চলেই পড়বে।”

তার মতে, পরিস্থিতি খারাপ হলে কেবল রেমিট্যান্স নয়, অভিবাসনের ধরণও বদলে যেতে পারে। অনেক শ্রমিক দেশে ফিরে যেতে পারেন, আবার যারা বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তারা সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। এতে দক্ষিণ এশিয়ায় বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে।”

দেশের ফেরার কথা ভাবছেন অনেকেই:

পাকিস্তানি শ্রমিক হামজার মতো সবাই ঝুঁকি নিতে রাজি নন। সৌদি আরবের একটি তেল স্থাপনায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক নূর জানান, তিনি আর এক মুহূর্তও নিরাপদ বোধ করছেন না। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেই তিনি দেশে ফিরবেন।

নূর বলেন, “আমি আর এখানে আসব না। এ জায়গা খুবই বিপজ্জনক। আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না। আমরা চোখের সামনে ড্রোন হামলা দেখেছি। সেই ভয়টা আর যায় না।” নূরের পরিবারও আতঙ্কে আছে। 

নূর বলেন, “প্রতিবার ফোন করলে আমার বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। তারা আমার জীবন নিয়ে খুব ভয়ে আছে।” নূর জানেন, দেশে ফিরে যাওয়া মানে অর্থনৈতিক অনটন। 

তবুও তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল। তার কথায়, “এখানে প্রতিদিন আতঙ্কে মরার চেয়ে আমি দেশে গিয়ে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করব। অন্তত সেখানে তো আমি তাদের পাশে থাকতে পারব।”