Published : 19 Apr 2026, 12:08 PM
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলে স্বীকার করে নিলেও ইরানের শীর্ষ আলোচক বলছেন, দুই পক্ষের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যু ও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতপার্থক্য এখনও বিদ্যমান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও তেহরানের সঙ্গে ‘খুব ভালো আলোচনা’ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ নিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইলের’ ব্যাপারে ইরানকে সতর্কও করেছেন।
আলোচনা এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে শনিবার কোনো পক্ষই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানায়নি, বলছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রায় আট সপ্তাহ আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের একযোগে হামলায় যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়েছিল, কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়ে ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে তা থামে।
বুধবার এ যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কথা; চুক্তি না হলে এর মেয়াদ বাড়ানো নাও হতে পারে বলে উভয়পক্ষ আভাস দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যকে মারাত্মক অস্থিতিশীল করে তোলা এ যুদ্ধ লেবাননেও বিস্তৃত হয়েছিল, গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগ পর্যন্ত সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী স্থল অভিযানও চালাচ্ছিল।
যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরান হরমুজ প্রণালি ‘কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায়’ বিশ্বজুড়ে তেলের দামও অনেকখানি বেড়েছে, জোর ধাক্কা লেগেছে বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারেও।
যুদ্ধ শুরুর আগে এই সঙ্কীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেলের চালান গন্তব্যে যেত।
হরমুজ খোলা রাখার সিদ্ধান্ত পাল্টাল ইরান
“আমাদের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে কিন্তু এরপরও বিরাট দূরত্ব রয়ে গেছে। কিছু বিষয় আছে যেগুলোর ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। তাদেরও কিছু রেড লাইন রয়েছে। তবে সেগুলো এক-দুইটা,” গত সপ্তাহের আলোচনার দিকে ইঙ্গিত করে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে এমনটাই বলেছেন ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘খুবই ভালো আলোচনা’ চলছে। তবে এ বিষয়ে আর বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
তার প্রশাসনের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ও লেবানন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর শুক্রবার ইরান সাময়িক সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
কিন্তু শুক্রবারই ফের সিদ্ধান্ত বদলে প্রণালিটির কর্তৃত্ব ফের নিজেদের হাতে তুলে নেয় তারা। এর পেছনে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকাকে দায় দেয় তারা। ওই অবরোধকে ‘যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন’ বলেও অভিহিত করেছে ইরান।
দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতাবা খামেনি বলেছেন, ইরানি নৌবাহিনী তার শত্রুদের ‘নতুন তিক্ত পরাজয়ের’ স্বাদ দিতে প্রস্তুত।
আলোচনাকে সাধুবাদ জানানো ট্রাম্প তেহরানের এ পদক্ষেপকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ আখ্যা দিয়েছেন।
তিনি ইরানি বন্দরে মার্কিন অবরোধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং বুধবার যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানে ‘ফের বোমা ফেলা শুরুরও’ হুমকি দিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বলছে, হরমুজে ইরানের পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এ প্রণালি ব্যবহার করা নৌযানের কাছে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণজনিত খরচ চাওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে।
নৌযানে গুলির খবর
শনিবার হরমুজ পার হওয়ার চেষ্টা করা অন্তত দুটি নৌযান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের খবর আসার পর ওই প্রণালি কবে যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরবে তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি নৌযানে গুলির খবর পেয়ে ভারত সরকার নয়া দিল্লির ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ইরানে নৌ-অবরোধ বলবৎ রেখেছে। তবে তারা তেহরানের সর্বশেষ পদক্ষেপ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছর স্থগিত রাখতে বলেছিল, কিন্তু ইরান কেবল তিন থেকে পাঁচ বছর তা বন্ধ রাখতে রাজি ছিল বলে দুই পক্ষের প্রস্তাব সম্বন্ধে অবগত একাধিক ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন।
ট্রাম্প শুক্রবার বলেছিলেন, দুই একদিনের মধ্যেই নতুন বৈঠক হতে পারে এবং দুই পক্ষই ‘চুক্তির খুব কাছাকাছি’ অবস্থান করছে।
তবে পরে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ খতিবজাদেহ জানান, পরবর্তী দফা আলোচনার তারিখ এখনও ঠিক হয়নি এবং তার আগে অবশ্যই সমঝোতার রূপরেখা ঠিক হতে হবে।
শনিবার স্থানীয় সময় সকালের দিকে হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টাদের সমবেত হতে দেখা যায়। ট্রাম্প পরে তার শীর্ষ দূত স্টিভ উইটকফকে নিয়ে ট্রাম্প ন্যাশনাল গলফ ক্লাবে যান। উইটকফ ইরানের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্বে থাকা মার্কিন দলের অন্যতম সদস্য।
মার্কিনিদের কাছে বেশ অজনপ্রিয় এ ইরান যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রতিদিনই বাড়ছে। দেশটিতে পেট্রলের দামও ব্যাপক বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও চাপে রয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের উভয়কক্ষে ‘স্বল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ ধরে রাখতেও ট্রাম্পের অনুসারী রিপাবলিকানদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শুক্রবার ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর তেলের দাম ১০% কমেছিল, বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারগুলোতেও দেখা গিয়েছিল চাঙাভাব। কিন্তু শনিবার প্রণালিটি ফের বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার পর পরিস্থিতি ফের পাল্টে গেছে।
হরমুজ পার হওয়ার অপেক্ষায় পারস্য উপসাগর ও এর কাছাকাছি অংশে এখনও বসে রয়েছে হাজারো নৌযান, আটকা পড়েছে ২০ হাজারের বেশি নাবিক, বলছে নৌ-চলাচল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।