Published : 31 Aug 2026, 06:52 PM
নেপালে প্রলয়ঙ্করী ঢল নেমে এসে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার মাত্র ১০ মিনিট আগে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন তিনি। আর তাতেই অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছে ৯০০ শিশুর প্রাণ।
নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশূলি সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বিবিসি-কে শুনিয়েছেন সেই উদ্ধারকাজের অভিজ্ঞতা ও বেঁচে ফেরা শিশুদের গল্প।
যে দুর্যোগে নেপালে ইতোমধ্যে ৯০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
রাজেন্দ্র জানান, দুর্যোগের দিন সকালে স্থানীয় সময় ৯টা ১০ মিনিটে তার মোবাইলে পরপর চারটি ফোন কল আসে। প্রতিটি কলেই তাকে জানানো হয়, পাহাড় থেকে বিশাল প্লাবন নেমে আসছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে এক উদ্বিগ্ন অভিভাবক দৌড়ে স্কুলে এসে বলেন, "বিশাল বন্যা আসছে, আমি আমার মেয়েকে নিতে এসেছি।"
শিক্ষক রাজেন্দ্র বলেন, "অভিভাবকরা কোনও গুরুতর কারণ ছাড়া এভাবে ছুটির আগেই ছুটে আসেন না। তখনই আমি নিশ্চিত হই যে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করা যাবে না। আমি তখনই ক্লাস থামিয়ে সব শিক্ষার্থীকে দ্রুত পাহাড়ি উঁচুপথের দিকে দৌড়াতে বলি এবং যেসব স্কুল বাস শিক্ষার্থীদের নিয়ে বের হচ্ছিল, সেগুলোকে ঘুরিয়ে উঁচু নিরাপদ স্থানে চলে যেতে নির্দেশ দিই।"
তিনি আরও বলেন, "যদি আমরা সেদিন দ্রুত এই সিদ্ধান্ত না নিতাম, আর মাত্র ১০ মিনিট দেরি হত, তবে আজ আমিসহ আমার কোনও শিক্ষার্থীই আপনাদের সামনে কথা বলার জন্য বেঁচে থাকত না।"
শিক্ষকদের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে পাহাড়ি পথ ধরে উঠে যায় শিক্ষার্থীরা। তারা নিরাপদে পাহাড়ে ওঠার মিনিট দশেকের মধ্যেই নদীর কূল ছাপানো উত্তাল ঢল এসে ১০০ মিটার দূরে থাকা হোস্টেল ও মূল স্কুল ভবনকে কাদা ও পাথরের নিচে মাটিচাপা দেয়।
১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইউনিশা আমাত্য সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলে, "আমি এবং আমার বন্ধুরা মাত্র ১০ সেকেন্ডের ব্যবধানে বেঁচে গেছি। আমরা যখন ক্লাসে পড়ছিলাম, তখন শিক্ষকরা এসে আমাদের দ্রুত বাড়ি চলে যেতে বলেন।"
স্কুলের পেছনের একটি সরু পাহাড়ি সিঁড়ি দিয়ে পাহাড়ের দিকে ওঠার সময় ইউনিশা দেখতে পায় কীভাবে চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে তাদের পুরো ত্রিশূলি বাজার ভেসে চলে গেল।
"আমার জুতো যদি পাহাড়ি মাটিতে পিছলে যেত, তবে আমিও হারিয়ে যেতাম। চোখের সামনে ঘরবাড়ি, বাজার পানির তোড়ে ভেসে যেতে দেখেছি," বলে ইউনিশা।
পাহাড়ের ওপর উঠে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে পাহাড়ে দুদিন কাটাতে হয়। পরবর্তীতে তাদের উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।
বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিশার বাবা যুবরাজ আমাত্য পাগলের মতো মেয়ের স্কুলে ছোটেন। কিন্তু ততক্ষণে ত্রিশূলি বাজারের বড় অংশ পানির নিচে।
যুবরাজ বলেন, "ফোন দিচ্ছিলাম কিন্তু সংযোগ পাচ্ছিলাম না। বাজারে গিয়ে চারপাশের ধ্বংসস্তূপ দেখে ভেবেছিলাম আমার মেয়ে আর বেঁচে নেই। রাস্তায় বাইক থামিয়ে কাঁদতে শুরু করি।"
প্রায় এক ঘণ্টা পর হঠাৎ ফোনে মেয়ের কণ্ঠ শুনতে পান তিনি। ইউনিশা জানায় সে পাহাড়ে নিরাপদে আছে।
মেয়ের কথা শুনে ফোনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন বাবা। টানা তিন দিন পর শুক্রবার অবশেষে মেয়েকে অক্ষত অবস্থায় কোলে ফিরে পান তার মা সাবিনা কুমারী শ্রেষ্ঠ।
তবে সেদিনের প্রলয় থেকে ৯০০ শিশুর জীবন বাঁচলেও তাদের প্রিয় স্কুল ভবনটি এখন শুধুই এক কাদার স্তূপ।
প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি মনে করেন, এলাকায় যদি কোনও আগাম সতর্কীকরণ সাইরেন থাকত, তবে মানুষ আরও আগে সচেতন হতে পারত।
তিনি বলেন, "যদি ক্লাসের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম, তবে স্কুলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকত না, ৯টা ৩০ মিনিটে কেবল ঘণ্টাটিই বাজত, কিন্তু কেউ বেঁচে থাকত না।"
ওদিকে, প্রিয় স্কুল ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত ইউনিশা। সে বলে, "এখন আমার ভবিষ্যৎ পড়াশোনা নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে। স্কুল বদলে গেলে পুরনো বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে, নতুন বন্ধু বানানো কঠিন হবে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।"