ভিডিওতে দেখা যায়, বেশির ভাগ কিশোরী লাল ও সোনালী রঙের পোশাক পরে ফটোশ্যুটে অংশ নিয়েছে। পোশাকগুলো বাতিল কাপড় দিয়ে তৈরি।
Published : 23 Nov 2024, 07:46 PM
ভারতে বস্তিবাসী শিশুদের নিয়ে ফ্যাশন ফটো শ্যুটের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। রাতারাতি এই শিশুরা এখন রীতিমতো সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী বেশিরভাগ কিশোরী লাল ও সোনালী রঙের পোশাক পরে ফটোশ্যুটে অংশ নিয়েছে। পোশাকগুলো পুরনো বাতিল কাপড় দিয়ে তৈরি।
ফটোশ্যুটে অংশ নেওয়া কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাই পোশাকগুলোর নকশা তৈরি এবং সেলাই করেছে। বস্তির ভাঙাচোরা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা, কুঁড়ে ঘর এবং ছাদকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে র্যাম্পে হাঁটার জন্য।
ফেলে দেওয়া কাপড় দিয়ে ভারতের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির মতো পোশাক তৈরি, আর তা পরে ভিডিও শ্যুট করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বস্তির এই শিশুরা।
ভিডিওটি শ্যুট এবং সম্পাদনা করেছে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর। ভিডিওটি এ মাসের শুরুর দিকে প্রথম প্রকাশ হয় ভারতের লখনউ শহরের বেসরকারি সংগঠন (এনজিও) ‘ইনোভেশন ফর চেঞ্জ’-এর ইন্সটাগ্রাম পেইজে।
এই দাতব্য সংগঠন শহরের বস্তি এলাকার প্রায় ৪০০ শিশুকে নিয়ে কাজ করে। তাদের বিনামূল্যে খাবার, শিক্ষা এবং বিভিন্ন কাজের প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে। ভিডিওতে দেখা যাওয়া শিশুরা এই এনজিও-র শিক্ষার্থী।
ফটো শ্যুটে অংশ নেওয়া কিশোরী মেহক কান্নোজিয়া বিবিসি-কে জানান, তিনি ও তার সহপাঠীরা ইন্সটাগ্রামে বলিউডের অভিনেত্রীদের পোশাকের স্টাইল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। সেই ফ্যাশন দেখে তারা নিজেরা প্রায়ই কিছু পোশাক বানাতেন।
১৬ বছর বয়সী মেহেক বলেন, “এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে আমরা সবাই মিলে দল বেঁধে কাজ করব।”
আর এ কাজের জন্য তারা কলকাতার খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির আইডিয়া বেছে নেয়। সব্যসাচী বলিউডের বিভিন্ন নামকরা তারকা, হলিউড অভিনেত্রী এমনকি বহু ধনকুবেরের পোশাকও ডিজাইন করেছেন। ২০১৮ সালে তিনি কিম কার্দাশিয়ান এর ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে শ্যুটিংয়ের জন্য লাল শাড়ির ডিজাইন করেছিলেন।
তাছাড়া, ভারতে ‘বিয়ের পোশাক ডিজাইনের রাজা’ হিসাবেও পরিচিত সব্যসাচী। হাজার হাজার বধুর পোশাক তিনি ডিজাইন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকজন নামী বলিউড তারকার বিয়ের পোশাকও তিনি ডিজাইন করেন।
কিশোরী মেহক জানান, তাদের প্রকল্পের নাম ‘ইয়ে লাল রঙ’ (এই লাল রং)। ডিজাইনার সব্যসাচী মুখার্জির বিয়ের পোশাকের সংগ্রহ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই প্রকল্পের এ নাম দেওয়া হয়েছে।
সব্যসাচী মনে করেন, সব ভারতীয় নারীকেই লাল রঙের পোশাকে অসাধারণ দেখতে লাগে। সেক্ষেত্রে গায়ের রং, চেহারার কোনও বাছ বিচার নেই। ফেলে দেওয়া কাপড় দিয়ে লাল-সোনালী পোশাক বানিয়ে সব্যসাচীর এই ভাবনাতেই যেন আরও রঙ জুড়ে দিয়েছে বস্তির শিশুরা।
কিভাবে কাজ করা হল তা জানিয়ে মেহক বলেন, “মানুষের দানে পাওয়া কাপড়গুলো থেকে সব লাল পোশাক আলাদা করলাম। এরপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ঠিক কেমন পোশাক বানাতে চাই। তারপর সেগুলো নিয়ে কাজ করতে শুরু করলাম।”
এ কাজে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তিন-চার দিনের মধ্যেই প্রায় এক ডজন পোশাক সেলাই করতে হয়েছে। তবে মেহক এর কথায়- তারা আনন্দ নিয়েই একাজ করেছে। এরপর র্যাম্প ওয়াকের জন্য সব্যসাচীর ভিডিওগুলোর মডেলদের মনোযোগ দিয়ে তারা দেখেছে এবং তাদের হাঁটার স্টাইল অনুকরণ করেছে।
এ বিষয়ে মেহক বলেন, “সব্যসাচীর মডেলদের মতোই আমরা অনেকে সানগ্লাস পরেছি। কেউ স্ট্র দিয়ে পানি পান করেছে, আবার কেউ কাপড়ের পুঁটলি বগলে করে হেঁটেছে।”
মেহক আরও বলেন, “ফটোশ্যুটের সময় কিছু বিষয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটেছে। যেমন: শ্যুটের এক পর্যায়ে আমাকে হাসতে বলা হয়েছিল। ঠিক তখনই কেউ একটা মজার কথা বলল আর আমি হেসে উঠলাম।”
সাহসী এ উদ্যোগ ভারতের মানুষের হৃদয় জয় করেছে। সামান্য বাজেটে তৈরি এই ভিডিও সব্যসাচী মুখার্জি তার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকে হার্ট ইমোজি দিয়ে শেয়ার করার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়।
কিশোর-কিশোরীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশংসায় ভেসে গেছে। অনেকেই একে পেশাদার ফ্যাশন শো’র সঙ্গে তুলনা করছেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ‘ইনোভেশন ফর চেঞ্জ’ এনজিও’র প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে। বস্তিবাসী গরিব শিশুদের জন্য পরিচালিত তাদের স্কুল পরিদর্শন করেছে বেশ কিছু টিভি চ্যানেলও।
শ্যুটে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিশুকে জনপ্রিয় এফএম রেডিও স্টেশনগুলো আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এমনকি বলিউড অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়াও গেছেন গরিব শিশুদের ওই স্কুলে, শিশুদের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন একটি স্কার্ফ।
সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাটিই এখন ‘অপ্রত্যাশিত’ লাগছে কিশোরী মেহকের কাছে । তার কথায়, “মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। বন্ধুরা ভিডিওটি শেয়ার করছে আর বলছে ,‘তুমি তো বিখ্যাত হয়ে গেছো’। অসাধারণ লাগছে। এখন শুধু সব্যসাচী-কে দেখার স্বপ্নটাই বাকি।”
তবে সমালোচনারও শিকার হয়েছে এই ফটো শ্যুটের ভিডিও। শিশুদের দিয়ে বিয়ের পোশাকে ফটোশ্যুট ‘বাল্য বিয়ে উৎসাহিত করতে পারে’, বলছেন সমালোচকরা । কারণ, ভারত এমন একটি দেশ যেখানে কোটি কোটি মেয়ের ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়।
‘ইনোভেশন ফর চেঞ্জ’ তাদের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে এ সমালোচনার উত্তর দিয়ে বলেছে, বাল্য বিয়ে উৎসাহিত করার কোনও অভিপ্রায় নিয়ে তারা কাজ করেনি।
সংগঠনটি বলেছে “বাল্য বিয়ের প্রচার কখনওই আমাদের লক্ষ্য নয়। শ্যুটে অংশ নেওয়া মেয়েরা এ ধরনের ধারণা এবং সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই করেই এমন একটি কাজে অংশ নিতে পারছে। দয়া করে তাদের প্রশংসা করুন, না হলে তাদের মনোবল ভেঙে যাবে।”