Published : 28 Aug 2026, 11:34 PM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর ছয় মাস পর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে যুদ্ধকে একসময় ‘ছোট্ট অভিযান’ বলে বর্ণনা করেছিলেন, তা এখন ঘোর অজনপ্রিয় এবং অচলাবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে। এমনকি তা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে, যুদ্ধ অবসানের কোনও সুস্পষ্ট পথও দেখা যাচ্ছে না।
শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন, চার সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ হবে। কিন্তু পেরিয়ে গেল ছয় মাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা এখনও পূরণ হয়নি। আরও সামরিক হামলা চালিয়ে যে ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করা যাবে না, সেটি এখন দৃশ্যমান এবং যুক্তরাষ্ট্র তা ঠাহর করতে পারছে।
আর তাই ওয়াশিংটন এখন আবার ইরান সরকারকে আরও দুর্বল করতে তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পথে ফিরছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের জানিয়েছেন, আপাতত ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা চালানোর সম্ভাবনা কম।
পরবর্তীতে কী ঘটবে তা স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই যুদ্ধের সম্ভাব্য স্থায়ী পরিণতির অনেকগুলোই ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছেন ট্রাম্প
যুদ্ধ শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে তা অপছন্দের ছিল। ক্রমেই তা আরও অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও নিম্নগামী হয়েছে। সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমেছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, অর্থাৎ, মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জরিপে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দিয়ে মূল্যস্ফীতি ও যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকান পার্টির জন্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান যুদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী রিপাবলিকানদের মধ্যে দুরত্বও বাড়িয়েছে। যে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা দ্রুত যুদ্ধের অবসান চান, আর যারা মনে করেন ট্রাম্পের উচিত তেহরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখা- এই দুই পক্ষের মধ্যকার দূরত্ব বেড়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ধাক্কা খেয়েছে
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। যুদ্ধের কারণে ইরান এই জলপথ অবরুদ্ধ করে রাখায় তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্বে মন্দার আশঙ্কা দেখা দেয়।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। যদিও অর্থনীতিবিদরা প্রথমে যতটা মারাত্মক পরিণতির আশঙ্কা করেছিলেন, সেই তুলনায় ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দুই বার বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। এবছর ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
তবে বড় অর্থনীতির দেশগুলো এখন আগের তুলনায় কম জ্বালানিনির্ভর। তাছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগসহ গতিশীল ব্যয় ও বিনিয়োগ অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হয়েছে।
ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পরাজিত হয়নি
ইরানের সামরিক বাহিনী ও অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ইরান এখনও হামলা চালিয়ে যেতে পারছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে।
গত মে মাসে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার কংগ্রেসে দাবি করেন যে, মার্কিন বাহিনী ১৬১টি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে এবং তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮২ শতাংশ নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে।
তিনি এও বলেন, ইরানের বিমান বাহিনী আগে প্রতিদিন ১০০টি পর্যন্ত যুদ্ধবিমান বা সামরিক বিমান পরিচালনা করত, তারা আর কোনও অভিযান পরিচালনা করছে না।
তবু ইরানের হাতে এখনও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে এবং তারা আঞ্চলিক মার্কিন স্থাপনা ও জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়ে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধ হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত করেছে, যার ফলে মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, জুলাই মাসে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।
তবে যুদ্ধের কারণে ইরানের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কাদা ছোড়াছুড়ি বিশ্ববাসীর দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে এবং সরকার ভিন্নমতের মানুষদের কণ্ঠরোধ করতে আগের চেয়েও বেশি কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।
পশ্চিম এশিয়া আরও অস্থিতিশীল হয়েছে
পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের হুমকি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ উল্টো তেহরানের অবস্থানকে আরও বলিষ্ঠ করেছে এবং গোটা অঞ্চলটিকে আরও অনিরাপদ করেছে, বলছেন বিশ্লেষকরা।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিমান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর ইরানের হামলা এবং লোহিত সাগরে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোকে টার্গেট করে ইয়েমেনের হুতিদের অবরোধ মিলিয়ে গোটা অঞ্চলেই পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে আরও সময় লাগতে পারে
গতবছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এবছর ফের দেশ দুটির ইরানে সামরিক হামলার শুরুর দিকে তেহরানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং অস্ত্র তৈরির কাজ চলার সন্দেহজনক কয়েকটি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পারমাণবিক বোমার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরি করতে ইরানের সর্বোচ্চ ৬ মাস সময় লাগতে পারত। কিন্তু গত মে মাসের মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেই সময় এখন বাড়িয়ে ১ বছর পর্যন্ত ধরা হয়েছে। অর্থাৎ, বোমার জন্য পর্যাপ্ত বিদারণযোগ্য উপাদান তৈরি করতে ইরানের এখন একবছর সময় লাগতে পারে।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখাই ছিল দেশটিতে যুদ্ধের জন্য ট্রাম্পের প্রধান ঘোষিত লক্ষ্য। তবে এই কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা কি তা জানা নেই। কারণ, জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শকরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ফিরে যেতে পারেননি।
ফলে ২০২৫ সালের হামলার পর থেকে ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম কোথায় রাখা হয়েছে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এই ইউরেনিয়ামের অবস্থান যাচাই করে দেখতেও অপারগ।
এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয়ত কোনও গোপন স্থানে আরও সমৃদ্ধ করে বোমা বানানোর উপযোগী করা হয়ে থাকতে পারে। ইরান অবশ্য বরাবরই পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন সেনা সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা ও বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণে ড্রোন ও বিমান হারিয়েছে এবং গত মে মাসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংঘাতে ৪২টি মার্কিন সামরিক বিমান ধ্বংস বা নিখোঁজ হয়েছে।
তাছাড়া, গোলাবারুদ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী নির্দিষ্ট কিছু গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক মজুদের 'প্রায় সবটুকুই' ব্যবহার করে ফেলেছে।
‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ -এর হিসাবমতে, জুলাই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপটরের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছে এবং তাদের থাড প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমপক্ষে ৩৮ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছে।
ওয়াশিংটন ইউরোপ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর করেছে। ফলে সেসব এলাকায় এই সাজ-সরঞ্জামগুলো মোতায়েনের সময়সীমা দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং অন্য কোথাও সামরিক প্রস্তুতি রাখার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড বিমানবাহী রণতরী এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রাখা হয়েছে, যা ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর থেকে এর দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন। অন্যদিকে, টানা ২০০ দিন সমুদ্রে থাকার পর আরেক বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর ভেতরের অসহনীয় পরিস্থিতি এবং নাবিকদের মানসিক চাপ নিয়ে আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত সপ্তাহে রণতরীটিকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন থাকা অন্য একটি রণতরীকে সেখানে পাঠানো হয়, এতেই স্পষ্ট হয় যে, ইরান যুদ্ধ কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।