Published : 12 Sep 2026, 05:26 PM
সেদিনের সকালটা ছিল অন্য সব দিনের মতই।
নিউ ইয়র্কে মানুষ কাজে যাচ্ছিল। রাস্তায় ছিল স্বাভাবিক ব্যস্ততা। দিনের কাজকর্ম কেবল জমে উঠছিল।
তারপর একটি উড়োজাহাজ বদলে দিল সব।
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে।
১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ আঘাত করে দক্ষিণ টাওয়ারে।
ততক্ষণে মানুষের চোখ চলে গেছে টেলিভিশনের পর্দায়। কিন্তু কেউ বুঝে উঠতে পারছিলেন না, কী ঘটছে এসব।
এরপর তৃতীয় আঘাত। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭।
আর চতুর্থ উড়োজাহাজ, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩, যাত্রীদের প্রতিরোধের পর সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।
ধারণা করা হয়, ছিনতাইকারীরা সেটি ওয়াশিংটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় আছড়ে ফেলতে চেয়েছিল।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ছিনতাই করা একটি বিমান আঘাত হানার পর নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় টাওয়ারে আগুন জ্বলছে
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ছিনতাই করা একটি বিমান নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একটি টাওয়ারে আঘাত হানার পর বিস্ফোরণে আগুনের গোলা সৃষ্টি হয়
চারটি উড়োজাহাজে ছিলেন ২৪৬ জন। তাদের কেউ আর ঘরে ফেরেননি।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন এবং পেনসিলভানিয়ার সেই মাঠ মিলিয়ে নিহত হন মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন।
৯/১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়ামের হিসাবে, নিহতদের তালিকায় ছিলেন ৯০টি দেশের মানুষ।
সেদিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটির নিরাপত্তাব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ছবি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীজুড়ে।
নিউ ইয়র্কের আকাশে সেদিন ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছিল। ধসে পড়ছিল টুইন টাওয়ার। পেন্টাগনের দেয়ালে আগুন জ্বলছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছিল মানুষ।
পরের ২৫ বছরে সেই ধ্বংসস্তূপের বিস্তার ঘটেছে আফগানিস্তান থেকে ইরাক, পাকিস্তান থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে সোমালিয়া, সাহেল থেকে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত।
একটি সন্ত্রাসী হামলার জবাবে শুরু হয়েছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ আমেরিকার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ বদলে দিয়েছে যুদ্ধের সংজ্ঞা। বদলে দিয়েছে নিরাপত্তার ধারণা। বদলে দিয়েছে নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রের নজরদারির ধরণ।
কিন্তু এই ২৫ বছরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এই পৃথিবীকে কতটা নিরাপদ করতে পেরেছে?
আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভেঙে পড়েছে, ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের অভিযানে নিহত হয়েছেন। ৯/১১-এর মত বিশাল মাত্রার হামলা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আর ঘটতে পারেনি।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের চিত্র আরও ভয়াবহ। আফগানিস্তানে দুই দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সেই তালেবানই আবার ক্ষমতায় ফিরেছে।
ইরাক যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যকে চুরমার করে দিয়েছে; সেই যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নিয়েছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মত আরও ভয়ংকর গোষ্ঠী।
আল-কায়েদা এখন আর আফগানিস্তানের গুহায় সীমাবদ্ধ নেই, তারা ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নানা প্রান্তে।
শেষ পর্যন্ত বদলে গেছে বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রও।
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস ১৫ দেশের ১৬ জন বিশেষজ্ঞের একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। তাদের মতামতের একটি অভিন্ন সুর হল–সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে কিছু কৌশলগত সাফল্য এলেও, ৯/১১ পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
আর ২৫ বছর পর, যুক্তরাষ্ট্র আবারও পশ্চিম এশিয়ায় এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান যুদ্ধকে অনেক বিশ্লেষকই আফগানিস্তান ও ইরাকের সেই দীর্ঘ ‘ফরএভার ওয়ার’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
তাতে প্রশ্ন উঠছে, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলোর ক্ষত থেকে ওয়াশিংটন কি সত্যিই কোনো শিক্ষা নিয়েছে?
প্রতিশোধের আগুন থেকে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’
৯/১১-এর হামলার পর তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সামনে প্রথম লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট।
হামলার পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা। আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা। ওসামা বিন লাদেনকে বিচারের মুখোমুখি করা।
আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন আফগানিস্তানে। তালেবান সরকার তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, তাকে হস্তান্তর করতে হবে।
তাতে রাজি না হওয়ায় ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন এন্ডিওরিং ফ্রিডম’ নামের সেই অভিযানে খুব দ্রুতই তালেবান সরকারের পতন ঘটে।
আল-কায়েদার ঘাঁটিগুলোতে হামলা হয়। বিন লাদেন ও সংগঠনের অন্য নেতারা আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়ে যান।
দেখতে মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের লক্ষ্য বুঝি পূরণ হয়েছে। কিন্তু সেই যুদ্ধের শেষ সেখানে হয়নি।
২৭ নভেম্বর ২০০১। যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিম কাবুলে সাবেক সোভিয়েত দূতাবাসের বিশাল চত্বরে আশ্রয় নেওয়া একদল আফগান শরণার্থী শিশু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে
কাবুল দখলের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে। কাবুলের যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছে একটি সড়কে তালেবান সদস্যদের উল্লাস
আল-কায়েদাকে পরাজিত করার অভিযান ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে দেওয়ার প্রকল্পে।
আফগানিস্তানে পশ্চিমা ধাঁচের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় করে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই লক্ষ্য পরিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পরবর্তী দুই দশকের সবচেয়ে বড় সমস্যার বীজ।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে রিচার্ড হ্যাস লিখেছিলেন, আফগানিস্তান ও পরে ইরাক বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বদলাতে কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ কতটা অকার্যকর।
সেই ব্যর্থতার সবচেয়ে প্রতীকী ও মর্মান্তিক দৃশ্যটি দেখা যায় দুই দশক পর, ২০২১ সালের অগাস্টে কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে।
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে তালেবান অভাবনীয় দ্রুততায় আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৫ অগাস্ট কাবুলের পতনের পর প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি দেশ ছাড়েন।
যে সরকারকে দুই দশক ধরে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ও হাজারো সেনার জীবন বিনিয়োগ করেছিল, মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
যে তালেবানকে সরাতে ২০০১ সালে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, দুই দশক পর সেই তালেবানই আবার কাবুলের ক্ষমতায় ফেরে বিপুল শক্তি নিয়ে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে চীনা গবেষক লি হংমেই আফগানিস্তানের দুই দশকের যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘কৌশলগত ও সামরিক ব্যর্থতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার মতে, বিপুল প্রাণ ও সম্পদ ব্যয় করেও ওই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত তালেবানকে নির্মূল করতে পারেনি।
যুদ্ধ গেল ইরাকে
৯/১১-পরবর্তী ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সম্ভবত সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অধ্যায়টি হল ইরাক যুদ্ধ।
২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে উৎখাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে আগ্রাসন শুরু করে, তার প্রধান যুক্তি ছিল–ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে।
তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল সে সময় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি ছোট শিশি দেখিয়ে দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেন বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
কিন্তু সাদ্দামের পতনের পর সারা ইরাক চষে ফেলেও সেই কথিত অস্ত্রের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি।
ইরাকে এরপর যা ঘটেছিল, তা শুধু ইরাকের নয়, পুরো পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়।
পল ব্রেমারের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রোভিশনাল অথরিটি যখন ‘ডি-বাথিস্টিফিকেশন’ নীতি (সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টির প্রভাব সম্পূর্ণ দূর করার বিতর্কিত নীতি) গ্রহণ করে ইরাকি সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ভেঙে দেয়, তখন লাখ লাখ সামরিক ও বেসামরিক মানুষ বেকার হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে, মাথাচাড়া দেয় শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সংঘাত।
৯ এপ্রিল ২০০৩। ইরাক যুদ্ধে বাগদাদের পতনের পর প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের একটি ভাস্কর্য উপড়ে ফেলা হচ্ছে
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামরিক বিজয়ের পর ইরাকে এক ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। আর এই চরম বিশৃঙ্খলা, ক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাম্প বুকার মত কারাগারগুলোর পরিবেশ থেকেই জন্ম নেয় ইসলামিক স্টেট বা আইএস।
একটি জঙ্গি সংগঠনকে নির্মূল করার নামে শুরু হওয়া বৃহত্তর যুদ্ধের ভেতরেই জন্ম নেয় নতুন এক জঙ্গিবাদী শক্তি।
সেই সংগঠন পরে ইরাক ও সিরিয়ার বিশাল অঞ্চল দখল করে তথাকথিত ‘খেলাফত’ ঘোষণা করে, বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে দেয় জঙ্গিবাদের আতঙ্ক।
সবচেয়ে মর্মান্তিক সত্য হল, ৯/১১-এর হামলার সঙ্গে ইরাক বা সাদ্দাম হোসেনের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না।
ফলে ৯/১১-এর প্রতিশোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার নামে যে রাজনৈতিক আবেগ ব্যবহার করে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল, ইরাক যুদ্ধ হয়ে ওঠে তার সীমা, বিচ্যুতি ও নৈতিক স্খলনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ফ্লোরিডার সারাসোটার এমা ই বুকার এলিমেন্টারি স্কুলে পাঠচক্রে অংশ নেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় বিমানটি আঘাত হানার খবর দেন হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ অ্যান্ড্রু কার্ড
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারের কাছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন একদল দমকলকর্মী
আল-কায়েদা হারল, কিন্তু সন্ত্রাসবাদ কি হারল?
২০০১ সালের সেই আল-কায়েদা এখন আর নেই।
পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে ২০১১ সালের ২ মে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে নিহত হন ওসামা বিন লাদেন। তাতে আমেরিকার প্রতিশোধ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতীকী লক্ষ্যটি অর্জিত হয়।
কিন্তু ততদিনে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নিজেই বিশাল এক বৈশ্বিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পারস্পরিক গোয়েন্দা সহযোগিতা, কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক বিমানবন্দর নিরাপত্তা এবং ড্রোন হামলার মত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মূল্যায়ন বলছে, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার নিরাপদ আশ্রয়স্থল ধ্বংস হওয়া এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণেই ৯/১১-এর মত বড় মাত্রার কোনো হামলা পশ্চিমা বিশ্বে আর ঘটেনি।
বিন লাদেন নেই। আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন আর আগের মত শক্তিশালী নয়। কিন্তু সন্ত্রাসবাদের কি শেষ হয়েছে?
সশস্ত্র সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২৫ বছর পর বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ আর একটি নির্দিষ্ট সংগঠন, একজন নেতা বা একটি ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে না।
গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স এর সাম্প্রতিক উপাত্ত অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদের উপকেন্দ্র এখন পশ্চিম এশিয়া থেকে সরে গিয়ে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে (বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার) স্থানান্তরিত হয়েছে।
আল-কায়েদার বিভিন্ন শাখা (যেমন আল শাবাব বা একিউএপি), ইসলামিক স্টেটের বিভিন্ন প্রদেশ (যেমন আইএস-কে) এবং বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলো এখন স্থানীয় সংঘাতের ভেতরে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে।
২০০১ সালের শত্রুকে খুঁজতে গেলে বিন লাদেন ও আল-কায়েদার নাম আসত। কিন্তু ২০২৬ সালের শত্রু ছড়িয়ে পড়েছে নানা দিকে, নানা নামে, নানা চেহারায়।
এখন তাদের কোনো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই, কোনো রাজধানী নেই, এমনকি একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রও নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষোভ, দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা এবং বৈশ্বিক জঙ্গিবাদী মতাদর্শের সংযোগই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি।
সন্ত্রাসবাদ হারিয়ে যায়নি; বরং তার ভূগোল বদলেছে।
২ মে ২০১১। ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরদিন হোয়াইট হাউসের একটি দেয়ালে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে পত্রিকায় ছাপা হওয়া সেই খবর
১ মে ২০১১। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে তখন ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার অভিযান চলছে
যুদ্ধের মাশুল
২৫ বছর পর এই যুদ্ধের মূল্য শুধু সামরিক জয়-পরাজয়ের হিসাব দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মাশুল দিয়েছে সাধারণ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউটের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রজেক্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সরাসরি সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ লাখের বেশি মানুষ এবং আরো অন্তত ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এই হিসাব শুধু নিহত সৈন্য বা ধ্বংস হওয়া সামরিক স্থাপনার পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে ছিল একটি পরিবার। একটি ঘর। একটি অসমাপ্ত জীবন। একটি শিশুর শৈশব। একটি শহর, যেটি আর আগের মত নেই।
আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের জীবন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব ভয়াবহ।
৯/১১ এর বার্ষিকীতে এসে শুধু নিউ ইয়র্কের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে হবে না। তাকাতে হবে কাবুলের বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ মানুষের দিকে। বাগদাদের ধ্বংসস্তূপের দিকে। সিরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া পরিবারগুলোর দিকে। ইয়েমেনের ক্ষুধার্ত শিশুদের দিকে। সাহেলের সংঘাতপ্রবণ গ্রামগুলোর দিকে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশ্লেষণে রিচার্ড হ্যাস দেখিয়েছেন, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা ও বিশাল অর্থনৈতিক ব্যয় খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করেছে।
বিদেশে বড় পরিসরে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে। আর এই যুদ্ধক্লান্ত জনমানসই পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে চরম মেরুকরণ, জনতুষ্টিবাদ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
৯/১১ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকেই বদলায়নি, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ডিএনএ-ও বদলে দিয়েছে।
মুসলিম বিশ্বের ওপর দীর্ঘ ছায়া
৯/১১ হামলার আরেকটি ফল অত্যন্ত জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক।
হামলাকারীরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ধর্মের নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এর ফলে সেই সহিংস মতাদর্শকে পুরো মুসলিম সমাজের সঙ্গে এক করে দেখার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা পশ্চিমা বিশ্বে তৈরি হয়।
ইসলামোফোবিয়া, মুসলমানদের প্রতি কাঠামোগত বৈষম্য এবং নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত নজরদারি—এসবই ৯/১১ পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
এর প্রভাব শুধু পশ্চিমা দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ ছিল না। মুসলিম বিশ্বের বড় অংশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান, বিশেষ করে ইরাক যুদ্ধ, আমেরিকাবিরোধী ক্ষোভ আরও গভীর করে।
এই ক্ষোভ আবার জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রচারের উপাদান হয়ে ওঠে। তৈরি হয় একটি ভয়াবহ চক্র।
সন্ত্রাসী হামলা নিরাপত্তা অভিযান বাড়ায়। নিরাপত্তা অভিযান কখনও বেসামরিক মানুষের ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গি সংগঠন নতুন সদস্য সংগ্রহ করে। নতুন হামলা আবার আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ডেকে আনে।
২৫ বছর পরও সেই চক্র ভাঙা যায়নি। অস্ট্রেলিয়ার লোই ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লিডিয়া খলিল কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মূল্যায়নে বলেছেন, "শুধু জঙ্গি সংগঠনকে অপারেশনাল বা সামরিকভাবে পরাজিত করলেই হবে না; যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনাগুলো চরমপন্থি বয়ানকে সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে, সেগুলোরও সমাধান করতে হবে।"
ঠিক এ জায়গাতেই সামরিক শক্তির চরম সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ড্রোন হামলা হয়ত কোনো শীর্ষ জঙ্গি নেতাকে হত্যা করতে পারে; একটি ক্রুজ মিসাইল হয়ত একটি প্রশিক্ষণ শিবির ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু কোনো মিসাইল বা স্মার্ট বোমা দিয়ে রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা, রাজনৈতিক বঞ্চনা বা দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্বের মত কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করা যায় না।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কাছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন একজন দমকলকর্মী
১৫ সেপ্টেম্বর ২০০১। নিউ ইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালের একটি দেয়ালে টাঙানো হয়েছে টুইন টাওয়ারে হামলায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি
নিরাপত্তা কড়াকড়ি বাড়ল, স্বাধীনতার কী হল?
৯/১১-এর পর নিরাপত্তার ধারণা কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে বদলায়নি। বদলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।
বিমানবন্দরে দীর্ঘ নিরাপত্তা তল্লাশি এখন স্বাভাবিক ঘটনা। সীমান্তের মত ব্যাংকিং ব্যবস্থাতেও সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ বেড়েছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারির সক্ষমতা।
যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১-এর পর প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট পাস হয়, যার মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ।
ড্রোন, বিগ ডেটা, ফেসিয়াল রিকগনিশন (মুখ শনাক্তকরণ) এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করার ক্ষমতা বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর বিনিময়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা চরমভাবে খর্ব হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মূল্যায়নে এই বৈপরীত্যকে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষক হিউনজিন চোই।
তিনি বলেন, "প্রযুক্তি সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করার ক্ষমতা বাড়িয়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে নিখুঁত আঘাতও রাজনৈতিকভাবে সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করার নিশ্চয়তা দেয় না। ড্রোনের আঘাতে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু উল্টো নতুন করে জঙ্গিবাদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করে দেয়।"
১২ সেপ্টেম্বর ২০০১। নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি বিমান আঘাত হানার পরদিনও স্যাটেলাইট ছবিতে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়
বদলেছে আমেরিকার দুনিয়াও
৯/১১-এর সময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল একক পরাশক্তি। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়েছে তখন এক দশকও হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। আমেরিকার সামরিক শক্তির সামনে কার্যত কোনো সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।
গত ২৫ বছরে সেই একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন আফগানিস্তান ও ইরাকের পাহাড়ে আর মরুভূমিতে ট্রিলিয়ন ডলারের দীর্ঘ যুদ্ধে আটকা পড়ে ছিল, ঠিক সেই সময়টিতেই নীরব উত্থান ঘটেছে চীনের।
বেইজিং তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বাড়িয়ে বৈশ্বিক পরিসরে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মত প্রকল্প নিয়ে হাজির হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও জর্জিয়া ও ইউক্রেইন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিজেকে আবারও শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। ফলে ২০০১ সালের ‘একক পরাশক্তির বিশ্ব’ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, বহুমেরুকেন্দ্রিক ও রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত।
এই চরম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি হল–যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই সেই দিন থেকে কোনো শিক্ষা নিয়েছে?
বাস্তবতা সেই প্রশ্নের কোনো ইতিবাচক উত্তর দিচ্ছে না। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধকে আফগানিস্তান ও ইরাকের সেই অন্তহীন যুদ্ধের সঙ্গেই তুলনা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মূল্য, প্রতিপক্ষের প্রতিরোধক্ষমতা এবং একটি স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ না থাকার পুরোনো সেই ভূতগুলো এখনও ওয়াশিংটনকে তাড়া করে ফিরছে।
আফগানিস্তান, ইরাক ও ইরানের সংঘাত এক নয়। তিন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। তাদের সামরিক সক্ষমতা আলাদা। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা।
তবু একটি প্রশ্ন তিন ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। যুদ্ধ শুরুর আগে কি তার শেষটা কল্পনা করা গিয়েছিল?
২৫ বছরের হিসাব: কী পেল বিশ্ব?
২৫ বছর আগে আল-কায়েদার হামলাকারীরা সম্ভবত ভেবেছিল, পেন্টাগন ও টুইন টাওয়ারে আঘাত করে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে; বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র দেবে পাল্টে।
তারা একটি জায়গায় সফল হতে পেরেছে। বিশ্ব সত্যিই বদলে গেছে। তবে তা তাদের প্রত্যাশার মত করে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি, আর আল-কায়েদাও বিশ্বব্যাপী কোনো খেলাফত প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং, আন্তর্জাতিক তৎপরতায় আল-কায়েদার মূল শক্তি বহুলাংশে খর্ব হয়েছে।
কিন্তু এর বিনিময়ে বদলে গেছে যুদ্ধের চরিত্র। পশ্চিম এশিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, লাখ লাখ মানুষের রক্ত ঝরেছে, আর বিশ্বে জন্ম নিয়েছে এক নতুন মাত্রার নিরাপত্তাহীনতা।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের আগুন নিভে গেছে বহু আগেই। গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপ সরে গিয়ে সেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিস্তম্ভ। নিহতদের নাম পাথরে খোদাই করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কের আকাশ হয়েছে ‘নিরাপদ’।
কিন্তু সেদিনের পর পৃথিবী যে পথে হাঁটা শুরু করেছিল, সেই পথ এখনও শেষ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এখনও নতুন নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে, যেখানে যুদ্ধ জেতার চেয়ে যুদ্ধ শেষ করার প্রশ্নটি আরও কঠিন।
প্রশ্ন আরো আছে। বিপুল রক্তের বিনিময়ে নেওয়া প্রতিশোধ কি মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পেরেছে? লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে লড়া যুদ্ধ কি পৃথিবীতে আদৌ কোনো শান্তি আনতে পেরেছে? সামরিক বিজয় কি রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করেছে?
আর ২৫ বছর পরও যদি সন্ত্রাসের নতুন রূপ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জন্ম নিতে থাকে, তাহলে সিকি শতাব্দীর এই ‘অনন্ত যুদ্ধ’ থেকে পৃথিবী আসলে কী শিখল?