০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বে প্রথম হান্টিংটন রোগের চিকিৎসায় সাফল্য

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) হান্টিংটন ডিজিজ সেন্টারের গবেষকরা একটি উল্লেখযোগ্য জিন থেরাপির ট্রায়ালের মাধ্যমে এই সাফল্য পান।

বিশ্বে প্রথম হান্টিংটন রোগের চিকিৎসায় সাফল্য
অধ্যাপক এড ওয়াইল্ড ও সারাহ তাবরিজি। ছবি: বিবিসি

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Sep 2025, 01:20 AM

Updated : 26 Aug 2026, 02:21 PM

বিশ্বে অন্যতম নির্মম ও বিধ্বংসী স্নায়বিক রোগ হান্টিংটনের চিকিৎসা প্রথম সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এই রোগ পরিবারের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে এবং একসঙ্গে ডিমেনশিয়া, পারকিনসন্স ও মোটর নিউরন রোগের মতো উপসর্গ তৈরি করে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) হান্টিংটন ডিজিজ সেন্টারের গবেষকদল একটি উল্লেখযোগ্য জিন থেরাপির ট্রায়ালের মাধ্যমে এই সাফল্য পান।

এই জিন থেরাপির মাধ্যমে রোগীদের ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ধীর করা গেছে বলে তারা জানিয়েছেন।

এর মানে, সাধারণত একবছরে রোগের যে অবনতি হওয়ার কথা, তা এই চিকিৎসার পর চার বছরে ঘটবে। এতে রোগীরা কয়েক দশক ভাল মানের জীবন পেতে পারেন,বলেছেন, ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হান্টিংটন ডিজিজ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক সারাহ তাবরিজি।

তিনি বিবিসি-কে বলেন, “আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে রোগের অগ্রগতি ৭৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। আমাদের এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রোগের চিকিৎসা আছে। এটি বিরাট ব্যাপার। আমি অত্যন্ত আনন্দিত।”

জিন থেরাপির প্রক্রিয়া:

নতুন চিকিৎসা একটি জিন থেরাপি, যা ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার সূক্ষ্ম মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেওয়া হয়। এতে একটি নিরাপদ ভাইরাস ব্যবহার করা হয়, যার ভেতর বিশেষভাবে ডিজাইন করা ডিএনএ রাখা হয়। 

অস্ত্রোপচারের সময় মাইক্রোক্যাথেটার মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছে এই ডিএনএ প্রবেশ করানো হয়।

ভাইরাসটি কোষে প্রবেশ করার পর একটি জেনেটিক নির্দেশনা তৈরি হয়, যা মিউট্যান্ট হান্টিংটন প্রোটিন উৎপাদনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে নিউরন বা মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ধ্বংস হওয়া বন্ধ হয়।

গবেষণার ফল:

ট্রায়ালে অংশ নিয়েছিলেন ২৯ জন রোগী। তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের তিন বছর পর গড়পড়তা ৭৫ শতাংশ রোগের অগ্রগতি ধীর হয়েছে। 

শুধু তাই নয়, মস্তিষ্কের কোষ বাঁচানো গেছে—যেখানে রোগ চলতে থাকলে কোষ ধ্বংসের সূচক বাড়ার কথা, সেখানে তা কমে গেছে।

অধ্যাপক এড ওয়াইল্ড, যিনি লন্ডনের ন্যাশনাল হসপিটাল ফর নিউরোলজি অ্যান্ড নিউরোসার্জারিতে কাজ করেন,তিনি বলেন, “এমন ফল আমরা হয়ত কখনও দেখব না ভেবেছিলাম। তাই এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বলা যায় এটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।”

তিনি বলেন, চিকিৎসাটি আজীবন কার্যকর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ মস্তিষ্কের কোষ শরীরের অন্য টিস্যুর মতো নতুন হয়ে ওঠে না।

হান্টিংটন রোগের প্রথম লক্ষণ সাধারণত ৩০ বা ৪০-এর কোঠায় বয়সে ধরা পড়ে এবং ২০ বছরের মধ্যে রোগীর মৃত্যু ডেকে আনে। তবে গবেষকেরা আশা করছেন, আগেভাগে চিকিৎসা শুরু করা গেলে হয়ত উপসর্গই আর কখনও দেখা দেবে না।

রোগী ও পরিবারের আশা

চিকিৎসার এই সাফল্যে হান্টিংটন রোগে ভোগা বহু পরিবারের মানুষই আশার আলো দেখছে। হান্টিংটন রোগ বয়ে বেড়াচ্ছে জ্যাক মে-ডেভিসের পরিবার।

 তার বাবা ফ্রেড এবং দাদি জয়েস এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ফ্রেডের মৃত্যু হয় ৫৪ বছর বয়সে।

জ্যাক, যিনি নিজেও এই ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করছেন, তিনি বলেন, “এখন মনে হচ্ছে ভবিষ্যত কিছুটা উজ্জ্বল। জীবনটা হয়ত দীর্ঘ হতে পারে।”

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ এ রোগে ভুগছে, আরও শতসহস্র মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন।

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ:

এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রোগীদের জন্য বড় স্বস্তি আনতে পারে।

চিকিৎসা পদ্ধতিটি তৈরি করেছে বায়োটেক কোম্পানি ইউনিকিউর। তারা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হবে। ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও আলাপ শুরু হবে শিগগিরই।

প্রধান গবেষক ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের হান্টিংটন ডিজিজ সেন্টারের অধ্যাপক তাবরিজি বলেন, এটি কেবল শুরু। 

“আমি আনন্দিত, রোগী ও তাদের পরিবারের জন্য এটা আশা জাগানিয়া সাফল্য। আমরা এখন চেষ্টা করছি, যাদের শরীরে জিন আছে কিন্তু উপসর্গ দেখা দেয়নি—তাদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ করা যায় কি না।”

এই চিকিৎসা প্রমাণ করেছে, হান্টিংটনের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিও থামানো সম্ভব। আর এ সাফল্য হয়ত এক নতুন যুগের দ্বার খুলে দিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে।