১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ধনীর বাধানো যুদ্ধে গরিবের পকেটে টান

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দেশে দেশে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা জনমনে স্বস্তি ফেরাতে পারছে না। কারণ এই সংকট কত দিনে শেষ হবে, সে উত্তর তাদের জানা নেই।

ধনীর বাধানো যুদ্ধে গরিবের পকেটে টান
ঢাকার আসাদ গেট এলাকার পাম্প থেকে তেল নেওয়ার অপেক্ষা।

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Mar 2026, 01:46 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:09 PM

ঢাকার তীব্র যানজট ঠেলে প্রতিদিন মোটরসাইকেলে নানা জায়গায় পণ্য পৌঁছে দেন শাকিল খান; কখনো কখনো যাত্রীও টানেন। 

কিন্তু এখন তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাইকে জ্বালানি ভরতে গিয়েই। কারণ একসঙ্গে বেশি তেল মিলছে না, সরকার সীমা বেঁধে দিয়েছে।

জ্বালানি তেলের বাজারে এই ধাক্কা লেগেছে মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাধানো যুদ্ধের ফলে। 

শাকিল খান বলেন, “পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় আমার দৈনিক আয় কমে গেছে।”

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে যখন তিনি এই প্রতিক্রিয়া দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে ছিল মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি।

রাইসুল ইসলাম নামে আরেক গাড়ি চালক বলেন, তাকে দিনে দুবার পাম্পগুলোতে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। 

“আমি প্রতিদিন একবার সকালে এবং একবার সন্ধ্যায় তেল কিনছি।” 

পেছনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখিয়ে তিনি বলেন, “এভাবে চলা সম্ভব নয়।”

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হাজার মাইল দূরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পারস্য উপসাগরের আকাশে এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনই দৃশ্যমান। 

এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এসব দেশের সরকারকে নতুন নতুন নীতি ও কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে। 

পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়ানো ঢাকার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ জয়নাল বলেন, “পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তাহলে অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হবে। আমরা খুব খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়ে যাব।”

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের বাধানো এ যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও তীব্র প্রভাবটা সবার আগে গিয়ে পড়ছে কম সামর্থ্যবান মানুষদের পকেটে। 

একটি গবেষণা সংস্থার বরাতে সিএনএন লিখেছে, ইরান যুদ্ধে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮৯ কোটি ডলার।

লাখো মানুষকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে তারা যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমান; প্রয়োজন ছাড়া যেন বাতি না জ্বালান; এমনকি বাইরে না গিয়ে সম্ভব হলে ঘরে বসে কাজ সারার কথাও বলা হচ্ছে। 

উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গেল বুধবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা— আইইএ বলেছে, তারা নিজেদের মজুদ থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়বে। এর আগে সংস্থাটি মজুদ থেকে কখনো এত পরিমাণে তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়নি। 

জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। 

মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, “এর প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি জ্বালানির বাজার, সমুদ্র পথে পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের আঘাত হানবে।”

এলপিজির সরবরাহ বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি ডাকে বিরোধী দল কংগ্রেস। ছবি: রয়টার্স। 

এলপিজির সরবরাহ বাড়ানোর দাবিতে শুক্রবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি ডাকে বিরোধী দল কংগ্রেস

চাপ বাড়ছে দক্ষিণ এশিয়ায়

ইরান যুদ্ধের প্রভাবটা এমন সময় সামনে এল, যখন ট্রাম্পের শুল্ক নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আগে থেকেই একটা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।

এক্ষত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। কারণ অঞ্চলটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় শহর গোরখপুরের বাসিন্দা অজয় কুমার রাত ৩টার দিকে গ্যাস সিলিন্ডার পেতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন।

তিনি ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, “১০ দিন ধরে এ অবস্থা চলছে। আগেই লাইনে না দাঁড়ালে গ্যাস পাওয়া যায় না; প্রায় অর্ধেক মানুষকে খালি হাতেই ফিরতে হয়।”

বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক। দেশটিতে রান্না থেকে শুরু করে অনেক যানবাহনেও জ্বালানি হিসেবে এই গ্যাস ব্যবহার করা হয়।

রবি নামের এক ব্যক্তি বলেন, “জ্বালানি সংকটের কারণে মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গতকাল আমাদের চুলায় লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়েছে।” 

বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ভারত এলপিজির চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। সার, বিদ্যুৎ ও পরিবহনে এই জ্বালানি ব্যবহার হয়, যার প্রায় ৫০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে শোধনাগারগুলোকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেয় ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

একই সঙ্গে সরকার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে শিল্পখাত থেকে জ্বালানি নিয়ে গৃহস্থালির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।

ভারতের আহমেদাবাদে গ্যাসের জন্য মানুষের অপেক্ষা। ছবি: রয়টার্স। 

ভারতের আহমেদাবাদে গ্যাসের জন্য মানুষের অপেক্ষা

সংকট মোকাবিলায় ভারত পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষিখাতে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রাখতে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। 

জ্বালানি সাশ্রয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তানকেও নানা কৌশল নিতে হয়েছে। এর মধ্যে স্কুল বন্ধ রাখা এবং বাসায় বসে অফিসের কাজ সারার মতো সিদ্ধান্তও আছে। 

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেছেন, সরকারি দপ্তরগুলো নতুন আসবাবপত্র বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র কিনতে পারবে না।

প্রভাব পড়েছে অন্যান্য দেশেও

এই সংকটের অভিঘাত পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়াতেও। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক দেশটি ৩০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানি পণ্যের দামে সীমা বেঁধে দিয়েছে। 

কেউ যেন দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য সরকারি কর্মকর্তাদের তেল শোধনাগার কোম্পানি ও গ্যাস স্টেশনগুলোতে কঠোর নজরদারি চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং।

একই সঙ্গে তিনি এমন জাহাজে করে জ্বালানি পরিবহনের উদ্যোগ নিতে বলেছেন, যেগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে না।

থাইল্যান্ড সরকার সরকারি কর্মচারীদের বিদেশ সফর স্থগিত রেখে এবং বাসা থেকে কাজ করার মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয়ের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি জনগণকে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বানও জানিয়েছে। 

ফিলিপাইন বলেছে, জ্বালানি সাশ্রয়ে তারা কিছু সরকারি কর্মকর্তার কার্যদিবস চার দিনে নামিয়ে এনেছে। অফিসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের তাপমাত্রা রাখতে হবে কমপক্ষে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “সরকারি কার্যক্রমে জ্বালানির ব্যবহার কমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।”

সিএনএন লিখেছে, সংকট মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও তা মানুষজনের ভেতরে স্বস্তি ফেরাতে পারছে না। কারণ সংকট কতদিন থাকবে, সেই উত্তর তাদের জানা নেই। 

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ফিলিপাইনে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ। রয়টার্স। 

ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে ফিলিপাইনে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ। রয়টার্স।

মন্দার ঝুঁকিতে যুক্তরাষ্ট্রও!

যুক্তরাষ্ট্রে গত রবিবারের পর বৃহস্পতিবারও প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলারের উপরে উঠে যায়। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্বকালের ওপরে। উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক থাকছে, সেটাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর এ নিউ আমেরিকান সোসাইটির’ জ্যেষ্ঠ গবেষক র‍্যাচেল জিয়েম্বা বলেন, “যদি এখনকার মতো তীব্র সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে পণমূল্য ভোক্তাদের জন্য আরো বেশি অস্বস্তি বয়ে আনবে। 

“আর যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হলে আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক দামে ফেরার আশা করতে পারি।”

কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়বে। এক্ষেত্রে গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মতো মন্দার ঝুঁকিও দেখছেন তারা। 

বৃহস্পতিবার আইইএ বলেছে, “মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।”

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যাম ওরির মতে, অতীতে যতবারই তেলের দাম জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশে ঠেকেছে এবং দীর্ঘ সময় চড়া থেকেছে, ততবারই মন্দা দেখা দিয়েছে। 

ওরি বলেন, গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অবশ্য বিদেশি তেলের ওপর কম নির্ভরশীল।

“ফলে তখনকার মতো পরিস্থিতি হয়ত খুব দ্রুত দেখা যাবে না। তবে সারা বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারের আশপাশে থাকলে মন্দা দেখা দিতে পারে।”

আর হরমুজ প্রণালি যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে এক বছরও অপেক্ষা করতে হবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্লেষকরা।

আরো পড়ুন

ইরানকে সহায়তা করছে পুতিনের 'গোপন হাত': ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

চাইলেও হয়ত ইরান যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন না ট্রাম্প

ইরান আরও অস্ত্র বানাতে অপারগনতুন নেতা আত্মগোপনে আছেনহেগসেথ

ইরানে আগামী সপ্তাহে আরও তীব্র হামলার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ইরানের নতুন নেতা জখম হলেও বেঁচে আছেনট্রাম্প

'পরিস্থিতি ভয়াবহ': ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ভারতে রান্নার গ্যাস সংকট