১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঐতিহাসিক জয় পেলেন মামদানি, আসল লড়াই এখনো বাকি

জোহরান মামদানির সামনে আপাতত তার বড় চ্যালেঞ্জ হল, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মঞ্চে নিজেকে নিয়ে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠা করা, প্রতিপক্ষরা তা করে ফেলার আগেই।

ঐতিহাসিক জয় পেলেন মামদানি, আসল লড়াই এখনো বাকি
জোহরান মামদানি, নিউ ইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র। ছবি: রয়টার্স

নিউজ ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Nov 2025, 12:30 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:36 PM

নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি অনেক দিক দিয়েই অনন্য। তিনি শহরটির ইতিহাসে ১৮৯২ সালের পর সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র, প্রথম মুসলিম মেয়র এবং আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম ব্যক্তি যিনি এই পদে আসীন হচ্ছেন।

বিবিসি লিখেছে, গত বছর যখন তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হলেন, তখন খুব কম লোকই তাকে চিনত। তার তহবিল ছিল যৎসামান্য, রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাও তিনি পাননি। 

তারপরও সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার মত প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে তার এই বিজয় এক অনন্য ঘটনা।

তবে তার সাফল্যের তাৎপর্য এখানেই শেষ নয়। তিনি সেই ধরনের রাজনীতিবিদ, যাকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির বামপন্থি অংশ বহুদিন ধরে খুঁজে আসছে। তিনি কম বয়সী, ক্যারিশমাটিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারদর্শী এবং জাতিগত পরিচয়ে তিনি বৈচিত্র্যের প্রতিচ্ছবি।

বিনামূল্যে শিশু পরিচর্যা, গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের মত বামপন্থি নীতিগুলোর পক্ষে সরব মামদানি শ্রমজীবী শ্রেণির অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো নিয়েও সরাসরি কথা বলেছেন, যে শ্রেণির অনেকেই সম্প্রতি ডেমোক্র্যাট শিবির থেকে সরে গেছে।

জোহরান মামদানি আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম ব্যক্তি, যিনি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে আসীন হচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

জোহরান মামদানি আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম ব্যক্তি, যিনি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদে আসীন হচ্ছেন

সমালোচকদের কেউ কেউ বলেছিলেন, আমেরিকার বর্তমান বাস্তবতায় এমন প্রার্থী নির্বাচনে টিকতে পারবেন না। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্ক সিটি সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।

সাবেক গভর্নর কুমোকে হারিয়ে মামদানি শুধু একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে পরাজিত করেননি, বরং ডেমোক্রেটিক পার্টির ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের ওপরও আঘাত হেনেছেন, যাদের অনেকেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে করে তরুণ প্রজন্ম।

এ কারণেই মামদানির নির্বাচনি প্রচার জাতীয় পর্যায়ে বিপুল মনোযোগ কাড়ে, যা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরের মেয়র নির্বাচনের জন্য বিরল। 

কিন্তু পাদপ্রদীপের আলোয় আসা মানে, মামদানির প্রতিটি পদক্ষেপ, সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা এখন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।

ডেমোক্র্যাট বিল দে ব্লাসিও ১২ বছর আগে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর অঙ্গীকার করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখনও বামঘেঁষা আমেরিকানরা আশা করেছিলেন, তার প্রশাসন হবে উদারপন্থি শাসনের এক মডেল। কিন্তু আট বছর পর তিনি জনপ্রিয়তা হারিয়ে মিশ্র রেকর্ড রেখে বিদায় নেন।

জোহরান মামদানির মায়ের বাড়ি ভারতে, ফলে ভাতীয় উপমহাদেশের অভিবাসীদের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। ছবি: রয়টার্স

জোহরান মামদানির মায়ের বাড়ি ভারতে, ফলে ভাতীয় উপমহাদেশের অভিবাসীদের সমর্থন পেয়েছেন তিনি

নতুন নতুন নীতি বাস্তবায়নে মেয়রের ক্ষমতার যে সীমা, সেই সীমায় আটকা পড়ে গিয়েছিলেন দে ব্লাসিও। মামদানিকেও সেই একই সীমাবদ্ধতা এবং জনপ্রত্যাশার সঙ্গে লড়তে হবে।

নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল নিজেও একজন ডেমোক্র্যাট। কিন্তু এরইমধ্যে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, মামদানির উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির জন্য কর বৃদ্ধির পরিকল্পনা তিনি সমর্থন করেন না।

আবার অর্থ জোগাড় হলেও মেয়র হিসেবে মামদানি এককভাবে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না।

যাদের কারণে ম্যানহটন আজ বিশ্বের অর্থনৈতিক রাজধানী, সেই করপোরেট ও অভিজাত ব্যবসায়ী শ্রেণির কঠোর সমালোচক ছিলেন মামদানি। কিন্তু কার্যকরভাবে শাসন করতে হলে সেই গোষ্ঠীর সঙ্গে তার একটি পর্যায়ে সমঝোতায় আসতে হবে, যার ইঙ্গিত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিলেছে।

গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচক মামদানি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি নিউ ইয়র্কে প্রবেশ করেন, তবে তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে গ্রেপ্তার করবেন। এ এমন এক প্রতিশ্রুতি, যা মামদানিকে সত্যি সত্যি পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।

তবে আপাতত তার বড় চ্যালেঞ্জ হল, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মঞ্চে নিজেকে নিয়ে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠা করা, প্রতিপক্ষরা তা করে ফেলার আগেই।

জোহরান মামদানির পোস্টার ছুঁয়ে আছেন এক সমর্থক। ছবি: রয়টার্স

জোহরান মামদানির পোস্টার ছুঁয়ে আছেন এক সমর্থক

সিবিএসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৬ শতাংশ আমেরিকান মনোযোগ দিয়ে নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের খবর রাখেননি। অর্থাৎ, এখনও যুক্তরাষ্ট্রের অনেকের কাছে মামদানি অপরিচিত। তার জন্য এটা যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও বটে।

কনজারভেটিভদের শীর্ষ নেতা ডনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেকে নতুন মেয়রকে ‘বিপজ্জনক সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন, যিনি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহরকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবেন। এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে তারা মামদানির প্রতিটি পদক্ষেপের সমালোচনা করবেন, নিউ ইয়র্কের অর্থনৈতিক সূচক কিংবা অপরাধের হারকেও ব্যবহার করবেন। 

নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে ট্রাম্পের শেকড় অনেক গভীরে। তার সঙ্গে মামদানির সরাসরি টক্কর বাঁধলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে।

তবে এই মুহূর্তে মামদানির সামনে সুযোগও কম নয়। তার কাঁধে অতীতের রাজনৈতিক ভুলের বোঝা নেই। তাই নির্বাচনি প্রচারে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সেরকম কোনো ছিদ্র খুঁজে বের করতে পারেননি।

জানুয়ারিতে শপথ নেওয়ার পর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নতুনভাবে নির্মাণের সুযোগ পাবেন মামদানি। আর যদি ট্রাম্প তার সঙ্গে লড়াইয়ে নামেন, সেটা হতে পারে তার জন্য আরও বড় মঞ্চ।

রাজনৈতিক মেধা আর দৃঢ়তা মামদানিকে এ পর্যন্ত এনেছে, কিন্তু সামনের বছরগুলোতে তার সামনে যে পরীক্ষা, তা হবে আরও কঠিন।

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জোহরান মামদানির সরাসরি টক্কর বাঁধলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে। ছবি: রয়টার্স

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জোহরান মামদানির সরাসরি টক্কর বাঁধলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রাজনীতিতে তা নতুন মাত্রা যোগ করবে

নিউ ইয়র্কের বাসিন্দারা তাদের শহরকে ‘বিশ্বের কেন্দ্র’ ভাবতে ভালোবাসেন, কিন্তু মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে যে নির্বাচন হয়ে গেল, তার ফল দিয়ে পুরো আমেরিকার রাজনৈতিক তাপমাত্রা মাপার সুযোগ নেই।

নিউ জার্সি ও ভার্জিনিয়াতে একই দিনে গভর্নর নির্বাচন হয়েছে, সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক সহজ জয় পেয়েছে।

নিউ জার্সির ফলাফল বলছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প শ্রমজীবী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোট টানতে পারলেও গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে সেই সমর্থন জোটেনি।

মামদানি বামঘেঁষা, অন্যদিকে নিউ জার্সির মিকি শেরিল ও ভার্জিনিয়ার অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার মধ্যপন্থি ডেমোক্র্যাট। তবে তারা তিনজনই সাধারণ মানুষের জীবিকা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেন। জরিপে দেখা গেছে, ভোটারদের কাছে অর্থনীতিই ছিল প্রধান ভাবনার বিষয়।

ডেমোক্র্যাটরা ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে, মঙ্গলবার রাতে বাম ও মধ্যপন্থি তিন প্রার্থীর জয় দেখেই সেটা বলে দেওয়া সম্ভব না। তবে মামদানি নিজেই বলেছেন, “এই দলকে এমন হতে হবে, যেখানে প্রতিটি আমেরিকান নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।

“যে বিষয়টা আমাদের সবাইকে এক সূত্রে বেঁধে রাখে, সেটা হল আমরা কাদের জন্য লড়ছি—আমরা সবাই লড়ছি শ্রমজীবী মানুষের জন্য।”

আগামী বছর কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটদের সেই পরীক্ষায় বসতে হবে। তবে অন্তত মঙ্গলবার রাতের জন্য হলেও ডেমোক্র্যাটরা এক সুখী পরিবার।