১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা হামলা, সানা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা

ইয়েমেনের সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে এবং স্থল সেনাদের তীব্র লড়াইয়ের খবর জানিয়েছে।

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনি বাহিনীর পাল্টা হামলা, সানা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা
হুতি আস্তানায় সরকারি বাহিনীর হামলায় ইয়েমেনে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করেছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Sep 2026, 06:15 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী রাজধানী সানা পুনর্দখলের ঘোষণা দিয়ে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে।

সোমাবার ইয়েমেনের তায়িজ, আল-বায়দা এবং রাজধানী সানার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত আল-জাউফ প্রদেশে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে।

ইয়েমেনের সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, তারা হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, পাশাপাশি স্থল সেনাদের ‘তীব্র লড়াই’  চলার খবর জানিয়েছে।

অন্যদিকে, হুতিরা দাবি করেছে, তারা আল-জাউফে সরকারি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেছে। 

তবে আল-হাজম শহরের এক কারাগারে বিমান হামলায় অন্তত ৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে রিয়াদকে দায়ী করে গোষ্ঠীটি সতর্ক করে বলেছে, “এই হামলার জবাব না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে না।”

পাল্টা জবাবে সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন সীমান্ত থেকে হুতিদের চালানো হামলায় তাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৭৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। 

বিপজ্জনক এই উত্তেজনার পাল্টা জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে রিয়াদও।

সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে ইয়েমেনের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল সমীর আল-সাবরি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, সরকার ‘সানা পুনরুদ্ধারের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজিদ আল-নুজাইলি জানান, এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হুতিদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং “সানাকে আবার সব ইয়েমেনির রাজধানী হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা”।

একইসঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের মারিব ও আল-জাউফ থেকে সানামুখী প্রধান প্রধান যোগাযোগ সড়কগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন নুজাইলি। এর মধ্যে নিহম, সিরওয়াহ, মাহলিয়াহ ও আল-হাজম হয়ে যাওয়া সড়কগুলোও রয়েছে।

জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতির পর এটিই দেশটিতে সবচেয়ে বড় সংঘাতে রূপ নিয়েছে। 

২০১৪ সালে হুতিরা সানা দখল করলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এতে হস্তক্ষেপ করে। গত জুলাইয়ে সানা বিমানবন্দরে সরকারি বাহিনীর হামলায় ইরানি বিমান অবতরণ আটকে যাওয়ার পর সংঘাত নতুন করে শুরু হয়।

গত সপ্তাহে হুতিরা বাব আল-মানদেব প্রণালি ও আল-মাখা বন্দরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে লড়াই আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। 

লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলকারী সৌদি জাহাজে হুতিরা অবরোধের ঘোষণা দেওয়ায় কৌশলগত নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি জানান, হুতিদের প্রাথমিক আক্রমণের ধাক্কা সামলে উঠে সরকারি বাহিনী এখন একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে, যাতে বিদ্রোহী বাহিনীকে ব্যস্ত ও চাপের মধ্যে রাখা যায়।

শালাফি বলেন, “আল-জাউফ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সৌদি সীমান্ত সংলগ্ন এবং হুতিদের মূল শক্তঘাঁটি ‘সাদা’ প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ইয়েমেনের কেন্দ্রে অবস্থিত আল-বায়দা প্রদেশটি উত্তর ও দক্ষিণের আটটি জেলাকে যুক্ত করেছে।”

সংঘাতের আবহে সরকারি সামরিক মিডিয়া সেন্টার জানায়, সোমবার রাতে তাইজের পশ্চিমে হুতি অবস্থানে কয়েকটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে। 

এর আগে আল-জাউফের ‘আল-লাবানাত’ পর্বতমালা অভিমুখে পদাতিক অভিযান ও ‘ইয়াতমা’ এলাকায় রকেট হামলার দাবি করে তারা। এছাড়া সরকারি বাহিনী আল-বায়দার ‘ধি নাঈম’ জেলার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে বলে জানায়।

তবে হুতিরা দাবি করেছে, তারা আল-লাবানাত পর্বতমালার দিকে সরকারি বাহিনীর বড় ধরনের অগ্রযাত্রা ভেস্তে দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট থেকে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর থেকে অন্তত ৭২৮ জন নিহত বা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল তায়িজ এলাকা থেকেই প্রায় ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সানা থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি জানান, সোমবারের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এতে না থাকায় হতাহতের এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি দাবি করেন, সরকারি বাহিনী বিভিন্ন প্রদেশে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাচ্ছে।

আলিমি বলেন, “রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পুরো ইয়েমেনি ভূখণ্ডে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তৃত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাবে।”

এদিকে হুতি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ দাবি করেছেন, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সরকারি বাহিনীর বহু সেনা ও কমান্ডার হতাহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকটি সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে। 

এমনকি হাদরামাউতের আল-ওয়াদিয়া ক্যাম্পে সৌদি আরব থেকে আসা সামরিক সরঞ্জামের ওপর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে হুতিরা।

আল জাজিরা জানিয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উভয় পক্ষের দেওয়া এসব দাবি নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।