১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

আইফোন ডুও’র প্রি-অর্ডার: বাজার দখলে অ্যাপলের নতুন জুয়া

অ্যাপলের মূল লক্ষ্য ফোল্ডএবল ফোনকে রাতারাতি মানুষের পণ্যে রূপান্তর করা নয়, বরং তাদের সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয়কারী গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যবসার পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়া।

আইফোন ডুও’র প্রি-অর্ডার: বাজার দখলে অ্যাপলের নতুন জুয়া

প্রি-অর্ডারে এমন অভূতপূর্ব সাড়াকে ‘অসাধারণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়’ বলে বর্ণনা করেছে অ্যাপল। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 19 Oct 2026, 11:14 AM

Updated : 19 Oct 2026, 11:14 AM

আগাম বিক্রির প্রথম দিনেই বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে অ্যাপল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ফোন আইফোন ডুও। ঘোষণার পর প্রথম দিনেই দোকান থেকে সরাসরি বিতরণের জন্য সংরক্ষিত স্টক শেষ হয়ে গেছে।

এখন অনলাইনে অর্ডার করলে গ্রাহকদের হাতে ফোন পৌঁছাতে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।

প্রি-অর্ডারে এমন অভূতপূর্ব সাড়াকে ‘অসাধারণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়’ বলে বর্ণনা করেছে অ্যাপল।

বিবৃতিতে আইফোন নির্মাতা বলেছে, “এ নতুন পণ্যটি যত দ্রুত সম্ভব গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দিতে আমরা কঠোর পরিশ্রম করছি এবং অনলাইনে অর্ডার নেওয়ার প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকবে।”

অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডএবল আইফোনের শুরুর সংস্করণটির দাম ১ হাজার ৯৯৯ ডলার। আর ২ টেরাবাইট স্টোরেজ ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে এর দাম তিন হাজার ডলারের বেশি।

Image

অ্যাপলের বহুল প্রতীক্ষিত ফোনটির মাধ্যমে বহু বছর পর আইফোনের চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এল। ছবি: রয়টার্স

বহুল প্রতীক্ষিত ফোনটির মাধ্যমে বহু বছর পর আইফোনের চেহারায় বড় ধরনের পরিবর্তন এল, যা ‘আইফোন প্রো’ ও ‘প্রো ম্যাক্স’ মডেলগুলোকে ছাড়িয়ে এক নতুন দামের স্তর তৈরি করল।

প্রাথমিক এ তুমুল চাহিদা অ্যাপলের এক বড় জুয়ার সমীকরণ উন্মোচন করছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, একদম নতুন ডিজাইনের ফোনটি কি গ্রাহকদের বাড়তি অর্থ খরচে রাজি করাতে বা আইফোনকে সামাজিক মর্যাদা বা স্ট্যাটাস সিম্বল হিসাবে আরও উঁচুতে তুলে ধরতে পারবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, অ্যাপলের মূল লক্ষ্য ফোল্ডএবল ফোনকে রাতারাতি গণমানুষের পণ্যে রূপান্তর করা নয়, বরং তাদের সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয়কারী গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যবসার পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে নেওয়া।

গবেষণা কোম্পানি ‘আইডিসি’র তথ্য অনুসারে, এ বছর বিশ্বজুড়ে মোট স্মার্টফোন বিক্রির কেবল ২ শতাংশ ফোল্ডএবল ফোনের দখলে থাকলেও সার্বিক রাজস্বের বা আয়ের ক্ষেত্রে এর অবদান প্রায় ৭ শতাংশ।

২০৩০ সালের মধ্যে এ ক্যাটেগরি থেকে শিল্পের মোট রাজস্বের ১০ শতাংশ আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিক্রির সংখ্যায় এটা থাকবে কেবল ৩ শতাংশ।

পণ্য বিক্রির সংখ্যা ও আয়ের এ বড় ব্যবধানটিকেই অ্যাপল তাদের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। আইডিসি’র বিশ্ব গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল বলেছেন, “ডুও দ্রুতই সবার কাঙ্ক্ষিত এক লাক্সারি ফোল্ডএবল ফোনে পরিণত হচ্ছে।”

পোপাল বলেছেন, প্রযুক্তিটি যে বড় কোনো নতুন উদ্ভাবন, তা নয়। ফোল্ডএবল অ্যান্ড্রয়েড ফোন বাজারে বেশ কয়েক বছর ধরেই রয়েছে। নতুন বিষয় হল, অ্যাপল ডিজাইনটিকে তাদের বড় ও অনুগত গ্রাহকভিত্তির কাছে নিয়ে এসেছে।

অ্যাপল অবশ্য এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ফোল্ডএবল প্রযুক্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ২০১১ সালেই তাদের ছয়জন প্রকৌশলী এ সংক্রান্ত একটি পেটেন্ট আবেদন করেছিলেন।

অন্যদিকে, শিল্পের অনেক পর্যবেক্ষক যতটুকু অনুমান করেছিলেন ডুও’র প্রাথমিক দাম সে তুলনায় কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক আনশেল সেগ বলেছেন, অনেকেই ধারণা করেছিলেন ফোল্ডএবল আইফোনের দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে আড়াই হাজার ডলারের মধ্যে শুরু হবে।

সেখান থেকে ১ হাজার ৯৯৯ ডলারে দাম নির্ধারণ করায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, অ্যাপল এ ক্যাটেগরির বড় অংশটি নিজেদের দখলে নিতে চায়।

বড়দিনের উৎসবের মৌসুমে ও আগামী বছরজুড়ে ডুও এক অনন্য ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন সেগ।

বাজার গবেষণা কোম্পানি কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পরিচালক তরুন পাঠাক বলেছেন, শুরুতে যে পরিমাণ সরবরাহ রয়েছে, চাহিদা তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি সক্রিয় আইফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। ফলে প্রারম্ভিক এ গ্রাহকদের ক্ষুদ্র একটি অংশও যদি নতুন ফোনটি কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে শুরুতেই থাকা আনুমানিক ৬০ লাখ বা তার চেয়ে কম ইউনিট ফোন নিমেষেই শেষ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

প্রযুক্তিগত জটিলতা ও অ্যাপলের নিজস্ব মান ধরে রাখার কারণে শুরু থেকেই সরবরাহে ঘাটতি থাকবে বলে মনে করছে আইডিসি। আর এই চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহই ফোনটির প্রতি বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করছে।

এর আগেও বিলাসবহুল বা লাক্সারি পণ্যের বাজারে পা রেখেছিল অ্যাপল। প্রথম অ্যাপল ওয়াচ চালুর সময় ১৮-ক্যারেট সোনার তৈরি ‘এডিসন’ সংস্করণের দাম শুরু হয়েছিল ১০ হাজার ডলার থেকে।

এ ছাড়া, বিখ্যাত ফরাসি ফ্যাশন হাউস ‘এরমেস’-এর সঙ্গে প্রিমিয়াম ওয়াচ ব্যান্ডের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পার্টনারশিপ গড়ে তুলেছিল তারা।

তৎকালীন রিটেইল প্রধান ও বারবারির সাবেক সিইও অ্যাঞ্জেলা আরেনড্সের আমলে অ্যাপল নিজেদের স্টোরে ফ্যাশন ও লাক্সারি পণ্যের আমেজ যুক্ত করার যে চেষ্টা চালিয়েছিল আইফোন ডুও’র মাধ্যমে সেই ধারা এবার অ্যাপলের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক পণ্য আইফোনে এসে যুক্ত হল।

ফোল্ডএবল বাজারের মুকুট কি পেতে যাচ্ছে অ্যাপল?

বিশ্ববাজারের সার্বিক পরিসংখ্যান বলছে, অ্যাপলের নতুন ফোল্ডএবল ফোন আইফোন ডুও বিক্রির পরিমাণের দিক থেকে খুব একটা বড় অংশ দখল না করলেও আয়ের অংকে বড় বিপ্লব ঘটাতে চলেছে।

গবেষক কোম্পানি ‘আইডিসি’র অনুমান বলছে, এ বছর অ্যাপল প্রায় ৭০ লাখ ইউনিট ডুও সরবরাহ করতে পারে, যা ২০২৬ সালে অ্যাপলের মোট আইফোন চালানের কেবল ৩ শতাংশ।

তবে আইডিসির বিশ্লেষক নাবিলা পোপালের পূর্বাভাস অনুসারে, আগামী বছরই ডুও’র শিপমেন্ট প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এটা সত্যি হলে স্যামসাং ও হুয়াওয়েকে পেছনে ফেলে বিশ্বের ফোল্ডএবল বাজার বাজারে প্রায় ৪০ শতাংশ দখলে নিয়ে শীর্ষস্থানে থাকবে অ্যাপল।

অ্যাপলের কাছে এ বিক্রির সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডুও ক্রেতাদের বড় একটি অংশই হলেন পুরনো আইফোন ব্যবহারকারী, যারা ‘প্রো ম্যাক্স’ মডেল কিনতেন এবং এখন সেখান থেকে আরও কয়েকশ ডলার বেশি খরচ করে এই প্রিমিয়াম ডিভাইসে উন্নীত হচ্ছেন।

আবার অনেকেই মূল আইফোনের পাশাপাশি দ্বিতীয় স্মার্টফোন হিসেবে ডুও লুফে নিচ্ছেন, যা অ্যাপলের ইকোসিস্টেমের কল্যাণে সাবলীলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

আইডিসির পোপাল বলছেন, প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারের প্রিমিয়াম আইফোন থেকে প্রায় ২ হাজার ডলারের ডিভাইসে ব্যবহারকারীদের এই স্থানান্তর সার্বিক শিপমেন্ট কম হওয়ার পরও অ্যাপলের আয়ে উল্লম্ফন তৈরি করবে।

একই ধরনের কথা কথা বলছে মার্কিন ব্যাংক জায়ান্ট ‘জেপি মরগ্যান’ও।

ব্যাংকটি বলেছে, সার্বিক আইফোন বিক্রি আগামী বছর একই রকম থাকলেও, ডুও’র উচ্চ গড় বিক্রয়মূল্যের কারণে এটা কোম্পানির মোট আয়ে বেশ বড় প্রভাব ফেলবে।

আসছে আইফোন ১৮ সাইকেলটি পণ্যের ভিন্নতা ও উচ্চদামের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হবে, বিক্রয় সংখ্যার ওপর নয়।

‘ডি এ ডেভিডসন’-এর বিশ্লেষক গিল লুরি বলেছেন, শক্তিশালী আপগ্রেড চক্রের মুখে পড়ায় অ্যাপলের জন্য ডুও’র সাফল্য জরুরি, বিশেষ করে ‘ডুওর কাছ থেকে বাড়তি গতি বা প্রবৃদ্ধি না পেলে তাদের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি বেশ মন্থর হয়ে পড়তে পারে’।

তবে লুরি বলছেন, এ একটিমাত্র ডিভাইসের মাধ্যমে অ্যাপল একাধিক উপায়ে লাভবান হতে পারে। এটা কট্টর অ্যাপল ভক্তদের আকৃষ্ট করে গড় বিক্রয়দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অতীতে যারা ফোল্ডএবল আইফোন ফোন না থাকায় অ্যান্ড্রয়েডের দিকে ঝুঁকেছেন, অ্যাপল তাদের নিজের দিকে টেনে আনছে। এটা পুরো আইফোন লাইনআপের জন্যই চমৎকার ইতিবাচক আকর্ষণ তৈরি করছে।

লুরির ভাষ্য, অনেক ক্রেতাই কেবল ডুও দেখতে অ্যাপল স্টোরে ভিড় করবেন। তবে শেষ পর্যন্ত হয়ত তার অর্ধেক দামের নিয়মিত আইফোন বা আইফোন প্রো কিনে বাড়ি ফিরবেন। কেউ যদি শেষ পর্যন্ত ডুও নাও কেনেন তবুও ডিভাইসটি পরোক্ষভাবে অ্যাপলকে বিক্রি বাড়াতে সাহায্য করছে।

আইফোনকে লাক্সারি ক্যাটেগরিতে উন্নীত করার কৌশল

স্মার্টফোন বাজারের সার্বিক অর্থনীতি যখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে তখনই নিজেদের পণ্যকে আরও মহার্ঘ করার এই পথ বেছে নিয়েছে অ্যাপল।

বর্তমান সময়ে মানুষ আগের চেয়ে বেশি দিন ধরে একই ফোন ব্যবহার করছেন ও বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন বাজারের প্রবৃদ্ধির গতিও শ্লথ হয়েছে।

‘টেকইনসাইটস’-এর বিশ্লেষক ওয়েইন ল্যাম বলেছেন, আইফোনের বয়স প্রায় ২০ বছর হতে চলায় অ্যাপলের বর্তমান বাজার অবস্থানে দাঁড়িয়ে আর নতুন কোনো দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই।

স্মার্টফোন বিক্রি শ্লথ হওয়ার এই বাজারে দামি ক্যাটেগরির দিকে যাওয়া মানে প্রতি কোয়ার্টারে আইফোনের অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের ধারা সুরক্ষিত রাখা।

ডুও’কে মানুষের ফোন না বলে লাক্সারি পণ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন ল্যাম। তবে অ্যাপলের ভিশন প্রডাক্টের মতো নয়, বরং ফোল্ডএবল ফোনের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে এটা বড় ক্যাটেগরিতে পরিণত হওয়ার পথ রয়েছে, বিশেষ করে এআই যখন ব্যবহারকারীদের ডিভাইস ব্যবহারের ধরন বদলে দিচ্ছে।

এর উল্টো পিঠ বা ঝুঁকি হল, দাম বাড়িয়ে দেওয়ায় ক্রেতারা হয়ত আরও বেশি দিন ধরে ফোনটি পুরনো না হওয়া পর্যন্ত আপগ্রেড করবেন না।

এটা নেতিবাচক চক্র তৈরি করতে পারে, যেখানে ডিভাইস বেশি দামি হলে মানুষ দীর্ঘ সময় তা ধরে রাখে ও সার্বিক চাহিদাও কমে যায়।

এরপরও, প্রাথমিক সীমিত সরবরাহের তুলনায় ডুও’র চাহিদা বেশি থাকবে বলেই ধারণা করছেন ওয়েন ল্যাম। ভবিষ্যতের প্রিমিয়াম আইফোনের জন্য ডিভাইসটি এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।