২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পের রাখা ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নাম কি শেষ পর্যন্ত টিকবে?

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাপ ও ফেডারেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে লেক অন্টারিও ও মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের পর এটাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম বদলের সর্বশেষ ঘটনা।

ট্রাম্পের রাখা ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নাম কি শেষ পর্যন্ত টিকবে?

“সুপার ইন্টেলিজেন্স বা এসআইয়ের নতুন বিশ্বে আপনাদের স্বাগতম।” ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Sep 2026, 12:12 PM

Updated : 24 Sep 2026, 12:12 PM

‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নামকে ‘ভুয়া’ শোনায় দাবি করে প্রযুক্তিটির নাম বদলে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক দীর্ঘ ভাষণে ট্রাম্প এই রিব্র্যান্ডিংয়ের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, “সুপার ইন্টেলিজেন্স বা এসআই-এর নতুন বিশ্বে আপনাদের স্বাগতম।”

এর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাপ ও ফেডারেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে লেক অন্টারিও ও মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তনের পর এটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘এখনপর্যন্ত সর্বশেষ’ নাম পরিবর্তনের পদক্ষেপ বলে প্রদিবেদনে লিখেছে বিবিসি।

ট্রাম্প বলেছেন, “আজ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সব নথিপত্র ও আশা করি গোটা বিশ্বেরও ‘আর্টিফিশিয়াল’ বা কৃত্রিম শব্দের পরিবর্তে আরও নির্ভুল ‘সুপার’ শব্দটি ব্যবহার করা হবে। এআই এখন থেকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’।”

এর আগের সপ্তাহে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনুসারীদের কাছে এআইয়ের জন্য সম্ভাব্য নতুন কিছু নাম নিয়ে ভোট দিতে বলেছিলেন। এর মধ্যে ‘সুপিরিয়র ইন্টেলিজেন্স’, ‘এক্সট্রিম ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘সুপ্রিম ইন্টেলিজেন্স’ নামগুলোও তালিকায় ছিল।

নিজের ‘ট্রুথ সোশাল’ প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক জরিপ পরিচালনার পর শেষ পর্যন্ত ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামটি জয়ী হয়।

তবে এআইয়ের নামকরণের এ হঠাৎ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কী ও প্রযুক্তি শিল্প শেষ পর্যন্ত এটা গ্রহণ করবে কি না সে বিষয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়েছে।

এআই বলতে এমন এক কম্পিউটার প্রযুক্তিকে বোঝানো হয়, যা বিভিন্ন মেশিনকে এমন সব কাজ করার সুযোগ করে দেয় যেগুলোর জন্য সচরাচর মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তার প্রয়োজন।

অন্যদিকে, প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞদের কাছে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট ও আলাদা মানে রয়েছে।

পরিভাষাটি প্রায়শই লেখক ও দার্শনিক নিক বস্ট্রোমের ধারণার সঙ্গে জড়িত, যিনি এক দশকেরও বেশি সময় আগে এটাকে এমন এক বুদ্ধিমত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, যা সব ক্ষেত্রেই মানুষের মেধার চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।

তবে প্রযুক্তি জগতের এ রূপটি এখনও পুরোপুরি তাত্ত্বিক ও কল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।

এদিকে, ট্রাম্পের নতুন নামকরণের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘ইউনভার্সিটি অফ মেলবোর্ন’-এর ডিজিটাল নীতিবিদ্যার প্রভাষক সাইমন কগ্লান বলেছেন, এ রিব্র্যান্ডিং একেবারেই ‘ভ্রান্তিমূলক’। কারণ সুপার ইন্টেলিজেন্স বলতে এমন উন্নত সিস্টেমকে বোঝায় যার নিজে থেকেই প্রতিনিয়ত আরও উন্নত হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।

“আমার সন্দেহ আছে ‘এসআই’ নামটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না। কারণ এটা প্রযুক্তির বর্তমান বাস্তব বিভিন্ন সক্ষমতাকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেখায়।”

“সুপার ইন্টেলিজেন্স কোনো সিস্টেম যদি বাস্তবে রূপ নেয় তবে তা সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।”

কম্পিউটার বিজ্ঞানী কোকিল জয়দকা বলেছেন, “আজকের সব এআই প্ল্যাটফর্ম সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবিদার নয়। নতুন নামটি গবেষকরা ভবিষ্যৎ বা বড় কোনো অগ্রগতির জন্য যে পরিভাষাটি জমিয়ে রাখেন তার আভিজাত্য ধার করে নিয়েছে।”

‘ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর’-এর কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষক বেন লিং বলেছেন, “আমার ধারণা, পেশাদাররা ‘এসআই’ পরিভাষাটি ভবিষ্যতের আরও উন্নত স্তরের এআইয়ের জন্যই তুলে রাখতে চাইবেন, আজকের এআইকে বর্ণনা করতে নয়। বর্তমান প্রযুক্তিটি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”

এর মধ্যেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের অনেকে নতুন পরিভাষাটি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্কিন চিফ টেকনোলজি অফিসার ইথান ক্লেইন লিখেছেন, “সুপার ইন্টেলিজেন্স নিয়ে প্রেসিডেন্ট কথা বলেছেন! যুক্তরাষ্ট্র এসআইয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা ছিল ও ভবিষ্যতেও থাকবে।”

অন্যদিকে, জাতিসংঘের নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওয়াল্টজ বলেছেন, “আপনারা যদি প্রেসিডেন্টের ভাষণ না দেখেন তবে জেনে রাখুন এআই এখন সুপার ইন্টেলিজেন্স। আমার মনে হয় তিনি একেবারে সঠিক কথাই বলেছেন।”

তবে নতুন এ নাম নিয়ে কানাডার এআই মন্ত্রী ইভান সলোমন বলেছেন, “কানাডার মানুষ জিনিসপত্রের নাম বদলানোর বিষয়ে মোটেও উৎসাহী নয়।”

এর আগে ট্রাম্পের লেক অন্টারিও নাম পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করেই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন।

জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্পের অন্যান্য বার্তা

জাতিসংঘে ডনাল্ড ট্রাম্পের বক্তৃতার মূল আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল মার্কিন ক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও একটি ওয়াকআউট বা অধিবেশন বর্জনের ঘটনা।

সম্প্রতি শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও গবেষকরা এআই মানবজাতির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কায় মার্কিন সরকারকে এ শিল্প নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানালেও ট্রাম্প এসব শঙ্কাকে স্রেফ ‘প্রতারণা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের বিরোধী অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রধান প্রযুক্তি প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে কোনো ধরনের সুবিধা দিতে পারে না।

“যে পক্ষ এআইয়ে জিতবে, সেই বিশ্বজয়ী হবে। চীন ও বাকি সবার চেয়ে আমরা এখন অনেকটাই এগিয়ে আছি এবং আমরা এভাবেই এগিয়ে থাকব।”

ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা এমন কোনো বিষয়ের উন্নয়নে লাগাম টানবে না, যা ‘শিল্প বিপ্লবের চেয়েও বড় কিছু হতে চলেছে’।

প্রয়োজন সাপেক্ষে সরকার পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণে রাখবে’ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই এই খাতের নেতৃত্ব দেবে বলে আশ্বস্ত করেছেন ট্রাম্প।

এ সপ্তাহেই বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির শীর্ষ নেতা অর্থাৎ চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এআইয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।