টেসলা-স্পেসএক্স একীভূতকরণে মাস্কের সামনে যত বাধা
বড় দুটি আলাদা কোম্পানিকে একত্র করার ফলে বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়বেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।
বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, রকেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ও রোবোটিক্স খাতের সমন্বয়ে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন প্রযুক্তি জায়ান্ট গড়তে টেসলা ও স্পেসএক্সের সম্ভাব্য একীভূতকরণের কথা বলেছেন ইলন মাস্ক।
মঙ্গলবার মার্কিন এই ধনকুবের বলেছেন, ব্যবসা ও কার্যক্রম দিন দিন আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ার কারণে তার মালিকানাধীন এ দুই প্রধান কোম্পানিকে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলার যৌক্তিকতা দিন দিন বাড়ছে।
টেসলা ও স্পেসএক্স এক সময় দুটি আলাদা ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হলেও এআই, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর তৈরি ও মহাকাশে ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মাস্কের ক্রমাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা দুই কোম্পানির মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলেছে।
উন্নত এআই সফটওয়্যার, চিপ, রোবোটিক্স ও মহাকাশ অবকাঠামো তৈরির সুফলের কথা উল্লেখ করে মাস্ক বলেছেন, “আমি সত্যিই মনে করি, কোম্পানি দুটিকে একত্র করার মধ্যে যথেষ্ট যুক্তি ও সম্ভাবনা রয়েছে।”
বিশ্বের অন্যতম দুই প্রযুক্তি কোম্পানিকে একীভূত করার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এটাই মাস্কের সবচেয়ে স্পষ্ট বক্তব্য।
তবে আনুষ্ঠানিক কোনো একীভূতকরণ চুক্তির ঘোষণা এখনও আসেনি। যে কোনো সম্ভাব্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গেলে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের অনুমোদনের মুখে পড়তে হবে।
ইভি থেকে রকেট: ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা-কোম্পানি
সম্ভাব্য এ একীভূতকরণের ফলে টেসলার বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি, ব্যাটারি স্টোরেজ, স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং প্রযুক্তি ও অপটিমাস হিউম্যানয়েড রোবট এক ছাদের নিচে আসবে স্পেসএক্সের রকেট উৎক্ষেপণ, স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ও মহাকাশভিত্তিক কম্পিউটিং ব্যবস্থার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার সঙ্গে।
সম্মিলিত এ নতুন কোম্পানির সম্ভাব্য দাম দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর শীর্ষ তালিকায় আসবে।
এ চুক্তির ফলে টেসলার বিনিয়োগকারীরা স্পেসএক্সের দ্রুত বর্ধনশীল স্যাটেলাইট ও রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার অংশীদার হতে পারবেন।
অন্যদিকে, স্পেসএক্সের বিনিয়োগকারীরা টেসলার অটোমোবাইল, শক্তি ও রোবোটিক্স খাতে সরাসরি মালিকানা পাবেন।
পাশাপাশি, একাধিক প্রকল্পের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মাস্কের ক্ষমতার পরিধি আরও বাড়বে, যা বর্তমানে একটি অন্যটির ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বর্তমানে মাস্ক টেসলার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ শেয়ারের মালিক ও স্পেসএক্সের ভোটাধিকার সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই রয়েছে।
এর আগে, এআই ও রোবোটিক্স খাতের লক্ষ্য পেতে টেসলায় আরও বেশি কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা একাধিকবার প্রকাশ করেছিলেন মাস্ক।
তবে বড় ও বিস্তৃত দুটি আলাদা ব্যবসাকে এক করার ফলে বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত আর্থিক ও পরিচালনগত ঝুঁকির মুখে পড়বেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন সমালোচকরা।
রোবোট্যাক্সি, হিউম্যানয়েড রোবট ও মহাকাশে ডেটা সেন্টার
কোম্পানিগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার সুফল পাওয়া যাবে এমন বেশ কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প সামনে রেখে যখন এগোচ্ছেন মাস্ক তখনই এ সম্ভাব্য একীভূতকরণের বিষয়টি সামনে এল।
স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো টেসলার স্বয়ংক্রিয় রোবোট্যাক্সি ও নতুন প্রজন্মের অপটিমাস হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর মধ্যে যোগাযোগ লিংক তৈরি করতে কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে, স্পেসএক্সের স্থাপনা ও ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টারগুলোতে শক্তি জোগাতে সহায়তার ভূমিকা রাখতে পারে টেসলার তৈরি ব্যাটারি ও এনার্জি-স্টোরেজ সিস্টেম।
অটোনমাস যানবাহন, রোবট ও এআই কম্পিউটিংয়ের জন্য উন্নত চিপ তৈরির লক্ষে ‘টেরাফ্যাব’ নামের সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্পে এরইমধ্যে একসঙ্গে কাজ শুরু করেছে কোম্পানি দুটি।
মাস্ক বলছেন, ২০২৮ সালের শেষদিকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে বড় পরিসরে চিপ উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।
স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন প্রক্রিয়ায় টেসলার বিষেশজ্ঞ অভিজ্ঞতা স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিপরীতে, স্পেসএক্সের উন্নত প্রযুক্তি এরইমধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে টেসলার পরবর্তী প্রজন্মের রোডস্টার গাড়ির নকশায়।
কোম্পানি দুটিকে একত্র করা হলে মাস্ক আলাদা বোর্ড ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বারবার অনুমোদন নেওয়ার ঝামেলা এড়িয়ে একক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনেই এসব বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
মাস্কের প্রস্তাবিত সাম্রাজ্যে চীনের ছায়া
সম্ভাব্য সুবিধার পরও একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অন্যতম বড় ঠিকাদার কোম্পানি স্পেসএক্স, যা সংবেদনশীল বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প পরিচালনা করে।
অন্যদিকে, টেসলার মূল উৎপাদন ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বড় অংশ রয়েছে চীনে, যার মধ্যে সাংহাইয়ের মেগা-ফ্যাক্টরি অন্যতম।
একই ছাতার নিচে দুই কোম্পানি চলে এলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিপরীতমুখী জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ওয়াশিংটন ও বেইজিং উভয় পক্ষের মনেই নতুন উদ্বেগ জন্ম দিতে পারে।
এ ছাড়া, বিনিয়োগকারীদেরও মাস্কের একচ্ছত্র ভোটাধিকার, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও সমন্বিত এ নতুন কোম্পানি তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে কীভাবে শত শত কোটি ডলার বরাদ্দ দেবে সেসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
টেসলা ও স্পেসএক্স একীভূত হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ সুগম হতে পারে সত্যি, তবে এটা মাস্কের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সামনে থাকা বড় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জকে একেবারে দূর করে দেবে না।
স্টারশিপ রকেট, চালকহীন গাড়ি, হিউম্যানয়েড রোবট ও কক্ষপথে ডেটা সেন্টারের মতো বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনো বিপুল খরচের প্রয়োজন ও বাণিজ্যিক দিক দিয়ে এগুলোর সাফল্য কতটা আসবে তা এখনও অনিশ্চিত।
আপাতত নিজের দুটি ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিকে একীভূত করার ধারণা প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন মাস্ক। তবে বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এই ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের মেগা-মার্জার বাস্তবে মেনে নেবে কি না তা এখনও বড় প্রশ্ন।
