২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্লাক হোল কেন ‘ঢেকুর তোলে’? জানালেন বিজ্ঞানীরা

তারা গ্রাস করার পর ব্ল্যাক হোল ঠিক কখন মহাশূন্যে বস্তুর প্রবাহ নিক্ষেপ করবে এতদিন এর সুনির্দিষ্ট সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যই ছিল।

ব্লাক হোল কেন ‘ঢেকুর তোলে’? জানালেন বিজ্ঞানীরা

এখান থেকে পালাতে হলে আলোর গতির চেয়েও বেশি গতিতে ভ্রমণ করতে হয়। ছবি: সায়েন্স কমিউনিকেশন ল্যাব

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 21 Sep 2026, 01:08 PM

Updated : 21 Sep 2026, 01:08 PM

ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর কখন ও কীভাবে কোনো তারা গ্রাস করার পর মহাশূন্যে বড় দূরত্বে জেট বা বস্তুর স্রোত নিক্ষেপ করে অবশেষে সেই জটিল রহস্যের সমাধান করেছেন বিজ্ঞানীরা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, মহাকাশে ব্ল্যাক হোলগুলোকে কেবল মহাশূন্যের এক সর্বগ্রাসী সিন্দুক বা গর্ত হিসেবে মনে করা হলেও গবেষকরা বলছেন, এগুলোর খাওয়ার ধরন খুব অগোছালো।

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার ‘কার্টিন ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ‘ফরেস্ট রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর ফেলো ড. অ্যাডেল গুডউইন বলেছেন, “ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্তে পৌঁছাতে হলে এর খুব কাছাকাছি যেতে হয়। তবে বিভিন্ন তারা এর অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যায়।”

ব্ল্যাক হোলের মূল গঠন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এগুলোর ঘনত্ব অনেক বেশি। ফলে নির্দিষ্ট সীমার পর এর মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে আলো বা বস্তু কোনো কিছুই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারে না।

ফিরে আসতে পরপ বা না পারার এ সীমানাকেই বলা হয় ‘ইভেন্ট হরাইজন’, যেখান থেকে পালাতে হলে আলোর গতির চেয়েও বেশি গতিতে ভ্রমণ করতে হয়।

বিজ্ঞানীদের বিরল পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, কোনো তারা ব্ল্যাক হোলের অতিরিক্ত কাছাকাছি এলে তীব্র মাধ্যাকর্ষণ টানে তা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।

‘স্প্যাগেটিফিকেশন’ নামের এ প্রসারণ প্রক্রিয়ার বর্ণনায় ড. গুডউইন বলেছেন, “খুব কাছে চলে আসা ওইসব তারার প্রায় অর্ধেক অংশ শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাক হোলটি গিলে ফেলতে পারে।”

তারার গ্রাস না হওয়া বাকি বিভিন্ন উপাদান শক্তিশালী জেট ও আউটফ্লো বা প্রবাহের মাধ্যমে প্রচণ্ড শক্তিতে মহাশূন্যে পুনরায় নিক্ষিপ্ত হয়।

Image

বিজ্ঞানীরা রূপক অর্থে ঘটনাটিকেই ব্ল্যাক হোলের ‘ঢেকুর তোলা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। ছবি: সায়েন্স কমিউনিকেশন ল্যাব

এসব জেটগুলো অনেক সময় এত বড় আকার ধারণ করে যে তা ‘পুরো ছায়াপথের’ বিবর্তনের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা রূপক অর্থে ঘটনাটিকেই ব্ল্যাক হোলের ‘ঢেকুর তোলা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

তারা গ্রাস করার পর ব্ল্যাক হোল ঠিক কখন মহাশূন্যে বস্তুর প্রবাহ নিক্ষেপ করবে এতদিন এর সুনির্দিষ্ট সময় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যই ছিল।

গবেষকদের ভাষ্য ছিল, “কখনও এ ঘটনা তারা ধ্বংসের এক বছর পর ঘটে, আবার কখনও তা ঘটে তিন বা পাঁচ বছর পর।”

নতুন গবেষণায় এ রহস্যের সমাধান মিলেছে বলে দাবি করেছেন ‘কার্টিন ইউনিভার্সিটি’র গবেষক ড. অ্যাডেল গুডউইন ও ‘ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি’র সহ-লেখক ড. অ্যান্ড্রু মামেরি।

সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের মাধ্যমে তারা গ্রাসের ২০টি ‘টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট’ রেডিও টেলিস্কোপের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’তে।

গবেষক ড. গুডউইন বলেছেন, “জেট ও আউটফ্লো বা প্রবাহগুলো যখন বাইরের দিকে অগ্রসর হয় তখন কেবল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমেই আমরা সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি।”

গবেষণায় উঠে এসেছে, সূর্যের ভরের চেয়ে লাখ লাখ থেকে শত কোটি গুণ পর্যন্ত বড় হতে পারে এমন সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল এদের খাবার গ্রহণের চক্রে দুটি ভিন্ন ধাপে শক্তিশালী জেট বা প্রবাহ তৈরি করে।

প্রথম ধাপটি ঘটে যখন ব্ল্যাক হোলটি খুব দ্রুত হারে খাবার বা উপাদান গ্রহণ করে। দ্বিতীয় ধাপটি ঘটে তারা ছিন্নভিন্ন হওয়ার শত শত থেকে হাজার হাজার দিন পর, যখন ব্ল্যাক হোলটির উপাদান গিলে খাওয়ার হার সর্বোচ্চ সীমার প্রায় ২ শতাংশে নেমে আসে।

আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের জানা ছিল, সূর্যের ভরের চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ৫০ গুণ ছোট তারা-ভরের ব্ল্যাক হোলগুলোর ক্ষেত্রেও ঠিক একই মাত্রা ‘ঢেকুর’ বা জেট নির্গমণকে ট্রিগার করে।

নতুন এ গবেষণায় দেখা গেছে, ব্ল্যাক হোলের আকার যাই হোক না কেন নির্দিষ্ট আকারের ওপর ভিত্তি না করে তারা এদের খাওয়ার চক্রের ঠিক একই বিন্দুতে জেট বা স্রোতগুলো নির্গত করে।

ড. গুডউইন বলেছেন, এ আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা এখন নিখুঁতভাবে পূর্বাভাস দিতে পারবেন, কখন এসব জেট নিক্ষিপ্ত হবে, যা টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ উইন্ডোকে আরও সংকুচিত করবে ও টেলিস্কোপের সময় বাঁচাবে।

“আমরা কেবল জেটগুলো কখন নিক্ষিপ্ত হয় তা-ই নয়, বরং সেগুলো কতটা শক্তিশালী ও তা ব্ল্যাক হোলের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কি না সে বিষয়েও বুঝতে পারব।”

এ গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না ‘সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি’র জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. সারা ওয়েব। তিনি বলেছেন, “মহাবিশ্বের সবচেয়ে চরম বস্তু বা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের একেবারে মৌলিক বিভিন্ন বিষয় আমরা এখনও উন্মোচনের চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

ড. ওয়েব বলেছেন, গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, “সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলো এদের বিবর্তনের দুটি ভিন্ন সময়ে বেশ অনুমানযোগ্য আচরণ করে।” গবেষকরা আগের ছোট স্কেলের স্টেলার-ম্যাস ব্ল্যাক হোলের সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়েছেন।