০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

চীনা কাঁচামালেই ভরসা যুক্তরাজ্যের, ঝুঁকিতে নিরাপত্তা ও এআই খাত

২০৩০ সালের মধ্যে কেবল লিথিয়ামের চাহিদাই বেড়ে প্রায় ৪৫ গুণ হবে। ফলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নির্ভরশীলতার সম্পর্কটি এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

চীনা কাঁচামালেই ভরসা যুক্তরাজ্যের, ঝুঁকিতে নিরাপত্তা ও এআই খাত

সামরিক যুদ্ধবিমান, গৃহস্থালি সামগ্রীতে ব্যবহৃত বিরল খনিজ ও এর প্রক্রিয়াজাত উপজাত পদার্থ সরবরাহে বিশ্বজুড়ে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 06 Nov 2026, 04:41 PM

Updated : 06 Nov 2026, 04:41 PM

সামরিক সরঞ্জাম, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের জন্য যুক্তরাজ্য ‘বিপজ্জনকভাবে’ চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে উঠে এসেছে দেশটির এক সংসদীয় তদন্তে।

এই তদন্ত করেছে ব্রিটিশ ‘বিজনেস সিলেক্ট কমিটি’র পার্লামেন্ট সদস্যরা। তারা এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সংগ্রহের জন্য তহবিল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।

বিরল খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিতে অর্থায়ন, বৈচিত্র্যময় বিকল্প উৎস তৈরির কার্যক্রম জোরদার করা এবং অনুদান, মূলধন ও ঋণ প্রদানে এই তহবিল কাজ করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।

কমিটির চেয়ারম্যান লিয়াম বার্ন বলেছেন, “নতুন অর্থনীতির প্রাথমিক শক্তিই এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান।

“আমরা যদি এসব প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারি তবে ব্রিটেনের পুনরায় সামরিকীকরণ, এআই প্রযুক্তি নির্মাণ বা নেট জিরো লক্ষ্যে পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

“১৬ বছর আগে চীন প্রথমবারের মতো বিরল খনিজের ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরুর পরও ব্রিটেন আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়ে গেছে।”

এক সপ্তাহের ব্যবধানে বার্নের কমিটির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরকারের চীন সংক্রান্ত নীতি দ্বিতীয়বারের মতো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ল।

সামরিক যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে গাড়ির লকিং সিস্টেম, গৃহস্থালি সামগ্রী ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনে ব্যবহৃত বিরল খনিজ এবং এর প্রক্রিয়াজাত উপজাত পদার্থ বিশ্বজুড়ে সরবরাহে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে।

কমিটির কাছে উত্থাপিত তথ্যে দেখা গেছে, মূল সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে ‘প্রক্রিয়াজাতকরণ ধাপে’। কারণ মোট সাত শ্রেণির খনিজ পরিশোধনে আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন।

Image

শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে বিরল খনিজ উপাদানের বৈশ্বিক রপ্তানি বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে এক বছরের ছাড় আদায় করেছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এর মধ্যে ইলেকট্রিক যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিশোধিত লিথিয়াম ও সামরিক বিমানের ফিউজিলাজ বা বডি ও ডানায় চরম তাপমাত্রা সহনশীলতার জন্য ব্যবহৃত বিরল খনিজ অন্যতম।

পার্লামেন্ট সদস্যদের সতর্ক করে জানানো হয়েছে, এখন থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কেবল লিথিয়ামের চাহিদাই বেড়ে প্রায় ৪৫ গুণ হবে। এর ফলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নির্ভরশীলতার সম্পর্কটি এক চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।

পাশাপাশি ব্রিটেন যখন নিজেদের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে তখন সামরিক জেট ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবহারে আবশ্যক স্থায়ী চুম্বকের জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের চাহিদা হবে প্রায় ১৬ গুণ।

তবে চীন যদি হঠাৎ করে তাদের বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, যেমনটি তারা ২০২৫ সালেও করেছিল তবে বেইজিংয়ের ওপর এই ধরনের চরম নির্ভরতা যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেছে কমিটি।

গেল বছরের অক্টোবরে চীনা মালিকানাধীন ‘নেক্সপেরিয়া’ কোম্পানিতে ডাচ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্কের পর পুরনো প্রজন্মের সেমিকন্ডাক্টর চিপের ওপর আলাদা নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল।

ওই ঘটনার ফলে ইউরোপের গাড়ি নির্মাণ শিল্প কারখানাগুলো স্থবির হয়ে পড়ার একেবারেই ‘কয়েক দিন মাত্র দূরে’ ছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলোও চীন থেকে বিরল খনিজ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছিল। ফলে সংসদীয় কমিটির ভাষ্য, বিকল্প সরবরাহের পথ খুঁজতে যুক্তরাজ্য সরকার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

গেল বছরের অক্টোবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের কাছ থেকে বিরল খনিজ উপাদানের বৈশ্বিক রপ্তানি বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে এক বছরের ছাড় আদায় করেছিলেন।

চীনা প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক ওয়াশিংটন সফরের পর এই ছাড়ের মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

তবে কমিটির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, সাময়িক ওই ছাড়ের কারণে যুক্তরাজ্য এখন মার্কিন-চীন সম্পর্কের ওপর ‘পুরোপুরি নির্ভরশীল’ হয়ে পড়েছে।

Image

মোট সাত ধরনের খনিজ পরিশোধনে আধিপত্য ধরে রেখেছে চীন। ছবি: রয়টার্স

এ সমস্যার সবচেয়ে ‘বাস্তবসম্মত’ সমাধান হচ্ছে যুক্তরাজ্যের মাধ্যমে জি সেভেন অংশীদার, ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা, যাতে সমন্বিত চাহিদা তৈরির মাধ্যমে নতুন নতুন সরবরাহকারী যোগ করা সম্ভব হয়।

কমিটি বলেছে, সরকারের অস্বচ্ছতার কারণে তাদের তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

“সরকার কোন কোন সক্ষমতা রক্ষা করতে চাইছে, কোন কোন দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে বা ঝুঁকি কমাতে কী ধরনের প্রকল্পে সমর্থন দিচ্ছে তার কোনো স্পষ্ট তথ্য পার্লামেন্টের কাছে নেই।”

এই সংকট কাটাতে ১০ দফার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে কমিটি।

এর মধ্যে রয়েছে, দেশীয় খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ এবং এর সম্ভাব্য খরচ চিহ্নিত করা; কোম্পানিগুলোকে চীন থেকে কাঁচামাল ক্রয় কমানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করতে কৌশল গ্রহণ; বিনিয়োগ উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা এবং খনি খননে বাধা হতে পারে এমন পরিকল্পনা ও অনুমোদন প্রক্রিয়াগুলো মূল্যায়ন করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিটি বলেছে, সরকারের পক্ষে ১০টি শর্তের একটিও পূরণ করা সম্ভব কি না সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছে না।

প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, “যুক্তরাজ্যের এখন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক শক্তির প্রয়োজন।”

তবে সরকারের কোনো কৌশল নেই এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন একজন সরকারি মুখপাত্র।

তিনি বলেছেন, ‘দেশীয় উৎপাদন ও পুনরায় ব্যবহার বাড়াতে’ এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সরকার এরইমধ্যে ৪০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ নিয়ে কাজ করছে।

“আমাদের কৌশলে ২০৩৫ সালের জন্য স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে ১০ শতাংশ ও পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করা।

“পাশাপাশি যে কোনো নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নির্ভরতা ৬০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।”