প্রো’র ইতি টেনে যেভাবে অ্যাপলের প্রধান ভরসা এখন ম্যাক স্টুডিও
ডিভাইসটি অ্যাপলের এমন এক চিপ রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত ম্যাক প্রো’র সমাপ্তি ঘটিয়ে অ্যাপলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কম্পিউটারের মুকুট নিজের করে নিয়েছে।
প্রথম প্রজন্মের অ্যাপল ম্যাক স্টুডিওর পাশে নতুন মুক্তি পাওয়া এম৫ আল্ট্রা রাখলে বাইরে থেকে দেখে দুটির মধ্যে তফাৎ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
চতুর্থ প্রজন্মের মতো এবারও অ্যাপল তাদের সিগনেচার ডিজাইন ৭ দশমিক ৭ ইঞ্চির বর্গাকার আর ৩ দশমিক ৭ ইঞ্চি উঁচু অ্যালুমিনিয়ামের ডিজাইনটি ধরে রেখেছে।
তবে ২০২২ সালে ম্যাক স্টুডিওর যাত্রা শুরুর পর থেকে এর ভেতরের হার্ডওয়্যার প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।
প্রথম প্রজন্মের এম১ আল্ট্রা মডেলে সর্বোচ্চ ১২৮ জিবি মেমোরি পাওয়া যেত, সেখানে নতুন এম৫ আল্ট্রা দিচ্ছে ৫১২ জিবি পর্যন্ত মেমোরি। প্রতি সেকেন্ডে ১.২ টেরাবাইট (১.২ টিবি/এস) গতিতে ডেটা ট্রান্সফার করতে পারে এম৫ আল্ট্রা, যা এম৩ আল্ট্রার গতির চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।
এর আগে, হার্ডওয়্যারগত কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অ্যাপল এম৪ আল্ট্রা সংস্করণটি বাদ দিয়েছিল। তবে কেউ নতুন ম্যাক স্টুডিও কেনার কথা ভেবে থাকেন তবে তাকে এবার কিছুটা বেশি অর্থ খরচ করতে হবে।
মেমোরি খরচের কারণে অ্যাপল গেল জুনে নিজেদের বেশিরভাগ হার্ডওয়্যারের দাম বাড়িয়েছে। ফলে এন্ট্রি-লেভেল ম্যাক স্টুডিও এম৪ ম্যাক্স-এর দাম ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৯৯ ডলারে।
যেভাবে ম্যাক প্রো’র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে ম্যাক স্টুডিও
২০২২ সালের মার্চে ম্যাক ম্যাক্স ও আল্ট্রা ভেরিয়েন্ট নিয়ে বাজারে আসে প্রথম ম্যাক স্টুডিও। এর মধ্যে আল্ট্রা সংস্করণটির চিপে ছিল দারুণ চমক।
অ্যাপল তাদের ‘আল্ট্রাফিউশন’ নামের এক ইন্টারকানেক্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে দুটি ‘এম১ ম্যাক্স ডাই’ একসঙ্গে যোগ করে বাজারে আনে ‘এম১ আল্ট্রা’, যেখানে ১১ হাজার ৪০০ কোটি ট্রানজিস্টর একক প্রসেসর হিসেবে কাজ করত।
অন্যদিকে, এম১ ম্যাক্স সংস্করণে ছিল ১০-কোর সিপিইউ, ৩২ জিবি মেমোরি ও ৫১২ জিবি এসএসডি, যার দাম শুরু হয়েছিল ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে।
শুরুতে ৩ হাজার ৯৯৯ ডলার দামের এম১ আল্ট্রা মডেলে ২০টি কোর ও ৬৪ জিবি মেমোরি দিয়েছিল অ্যাপল, যা আরও বেশি অর্থ খরচ করলে ১২৮ জিবি পর্যন্ত উন্নীত করা যেত।
এর পেছনের প্যানেলে রয়েছে চারটি থান্ডারবোল্ট পোর্ট, ১০জিবি ইথারনেট, এইচডিএমআই, দুটি ইউএসবি-এ পোর্ট, আরও দুটি ইউএসবি-সি পোর্ট ও একটি এসডি কার্ড স্লট। অ্যাপল এরপর থেকে এই ডিজাইন বা পোর্টের বিন্যাসে আর কোনো পরিবর্তন আনেনি।
একই বডি, দ্বিগুণ মেমোরি
২০২৩ সালের জুনে ডব্লিউডব্লিউডিসি’তে দ্বিতীয় প্রজন্মের ম্যাক স্টুডিওর নতুন লাইনআপ ঘোষণা করেছে অ্যাপল। এ সংস্করণেও পুরো ডিজাইনে একটি পোর্টও কমানো বা বাড়ানো হয়নি।
এম২ ম্যাক্স চিপে যোগ করা হয় ১২-কোর সিপিইউ, ৩৮-কোর পর্যন্ত জিপিইউ ও ৯৬ জিবি মেমোরি। আর ‘এম২ আল্ট্রা’ এই সবকিছু দ্বিগুণ করে নিয়ে আসে ২৪-কোর, ৭৬-কোর জিপিইউ ও ১৩ হাজার ৪০০ কোটি বেশি ট্রানজিস্টরের শক্তিতে চালিত ৮০০ জিবি/সেকেন্ড ব্যান্ডউইথের ১৯২ জিবি মেমোরি।
একই সময়ে অ্যাপল বেশ অদ্ভুত এক ঘোষণায় নিজেদের অ্যাপল সিলিকন ম্যাক প্রো বাজারে আনে, যেখানে একই এম২ আল্ট্রা চিপ, ১৯২ জিবি মেমোরি ও আকাশচুম্বী ৬ হাজার ৯৯৯ ডলার দাম নির্ধারিত হয়েছিল।
২০২৫: অসঙ্গতিপূর্ণ চিপ ও দামবৃদ্ধির ধাক্কা
এম২ সংস্করণের পর প্রায় দুই বছর ম্যাক স্টুডিও লাইনআপে কোনো পরিবর্তন আনেনি অ্যাপল।
তবে ২০২৫ সালের মার্চে এর আপডেট বাজারে আসার সময় অ্যাপল সিলিকনের দুটি ভিন্ন প্রজন্মের চিপ একসঙ্গে যোগ করে নতুন চিপ হিসেবে ‘এম৪ ম্যাক্স’ ও বড় সংস্করণ হিসেবে ‘এম৩ আল্ট্রা’ আনে আইফোন নির্মাতা কোম্পানিটি।
এ মডেলে ছিল ৩২-কোর সিপিইউ, ৮০-কোর জিপিইউ, ৫১২ জিবি পর্যন্ত ইউনিফায়েড মেমোরি, ১৬ টিবি স্টোরেজ ও উভয় মডেলেই ১২০ জিবি/এস গতির থান্ডারবোল্ট ৫।
এর ঠিক এক ব্যছর পর অ্যাপল ম্যাক প্রো উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করে বলেছিল, এ লাইনআপে আর কোনো নতুন মডেল আনার পরিকল্পনা নেই। ফলে এ ছোট স্কয়ার আকৃতির ডিভাইসটিই অ্যাপলের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারে পরিণত হয়।
এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইভিত্তিক মেমোরি সংকটের কারণে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যার ফলে অ্যাপলকে এম৪ ম্যাক্সের দাম ১ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪৯৯ ডলার ও এম৩ আল্ট্রার দাম ৩ হাজার ৯৯৯ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ২৯৯ ডলার করতে হয়।
অ্যাপলের ইতিহাসে এটাই কম্পিউটারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দামবৃদ্ধির রেকর্ড। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অ্যাপল বলেছিল, তারা এর আগে কখনো এত দ্রুত ও বেশি পরিমাণে পণ্যের দাম বাড়তে দেখেনি।
২০২৬: বাজারে এল নতুন দুই এম৫ পণ্য
কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই ২০২৬ সালের অগাস্টে হঠাৎ করেই চতুর্থ প্রজন্মের ম্যাক স্টুডিও বাজারে আনে অ্যাপল।
ম্যাক পণ্যের ঘোষণার জন্য অগাস্ট মাসটি বেশ ব্যতিক্রমী হলেও ইনফরমেশনের প্রতিবেদন অনুসারে, স্থানীয়ভাবে এআই মডেল পরিচালনার জন্য শক্তিশালী মেশিনের চাহিদার কথা বলা করপোরেট ও এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকদের চাপে বাধ্য হয়েই অ্যাপল এ পদক্ষেপ নিয়েছে।
২০২৩ সালের পর এই প্রথম ম্যাক্স ও আল্ট্রা উভয় মডেলেই অ্যাপল সিলিকনের একই প্রজন্ম ব্যবহৃত হয়েছে।
এম৫ ম্যাক্স মডেলে রয়েছে ১৮-কোর সিপিইউ, প্রতিটি কোরে নিউরাল অ্যাকিলারেটরসহ ৩২ বা ৪০-কোর জিপিইউ ও ১২৮ জিবি পর্যন্ত মেমোরি, যার দাম ২ হাজার ৪৯৯ ডলার।
অন্যদিকে, এম৫ আল্ট্রা মডেলে রয়েছে ৩৬টি সিপিইউ কোর, ৮০-কোর জিপিইউ ও ৫১২ জিবি পর্যন্ত মেমোরি, যার দাম শুরু হচ্ছে ৫ হাজার ৪৯৯ ডলার থেকে। তবে এই কনফিগারেশনের ডিভাইসটি এ বছরের অক্টোবরের শেষ নাগাদ বাজারে আসার কথা রয়েছে।
এম৩ আল্ট্রার তুলনায় এম৫ আল্ট্রা মডেলে ৪ দশমিক ৩ গুণ বেশি এআই পারফরম্যান্স ১ দশমিক ৮ গুণ বেশি গ্রাফিক্স এবং ১ দশমিক ৩ গুণ দ্রুতগতির সিপিইউ পাওয়ার দাবি করছে অ্যাপল।
এ ছাড়া, এতে রয়েছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুতগতির স্টোরেজ ও অ্যাপলের নিজস্ব এন১ নেটওয়ার্কিং চিপের মাধ্যমে ওয়াই-ফাই ৭ প্রযুক্তি।
চিপের কোরগুলোর গঠনেও পরিবর্তন এসেছে। ‘পারফরম্যান্স-এফিশিয়েন্সি’ বা কার্যক্ষমতাভিত্তিক ভাগের পরিবর্তে এবার পারফরম্যান্স কোরের পাশাপাশি যোগ হয়েছে ‘সুপার’ কোর।
ম্যাক স্টুডিওর সবকটি প্রজন্মকে একসঙ্গে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডিভাইসটি অ্যাপলের এমন এক চিপ রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত ম্যাক প্রো’র সমাপ্তি ঘটিয়ে অ্যাপলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কম্পিউটারের মুকুট নিজের করে নিয়েছে।
