মুখের প্রতি মেয়ে শিশুদের আগ্রহ বেশি? যা বলছে গবেষণা
জন্মের সময়ের এমন পার্থক্য হয়ত শিশুরা কীভাবে শিখবে ও বেড়ে উঠবে তা নির্ধারণ করে দেয় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু সাধারণ প্রবণতার পেছনে এগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
মানব সভ্যতার শুরু থেকেই এক কৌতূহলী প্রশ্ন গবেষকদের ভাবিয়ে তুলেছে– আশপাশের পৃথিবী কীভাবে নারী ও পুরুষের আচরণ গঠনে ভূমিকা রাখে ও জন্মগতভাবে উভয়ের মধ্যে আদতে কোনো পার্থক্য থাকে কি না।
‘নেচার ভার্সেস নার্চার’ বা ‘প্রকৃতি বনাম পরিবেশ’-এর এই চিরন্তন বিতর্কে জন্মগত ও পরিবেশগত প্রভাবের সীমারেখা আলাদা করা বিজ্ঞানীদের জন্য বরাবরই জটিল ও মাঝেমধ্যে বেশ বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সদ্যোজাত শিশুদের নিয়ে করা নতুন গবেষণা এ জটিল রহস্যের একটি দিকের ওপর নতুন আলো ফেলেছে, যা জন্মগত পার্থক্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
কেবল এক বা দুদিন বয়সি নবজাতকদের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের সামনে যখন পাশাপাশি একটি মানুষের মুখাবয়ব ও একটি খেলনার ভিডিও দেখানো হয় তখন ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা বেশি সময় ধরে মুখের ভিডিওটির দিকে তাকিয়ে থাকে।
গবেষণার এ ফলাফলে জোরালোভাবে ইঙ্গিত মেলে, মানুষের জন্মগত মনোযোগ বা দেখার আগ্রহের ক্ষেত্রে জন্ম থেকেই কিছু ভিন্নতা থাকতে পারে।
পরীক্ষাটি যেহেতু যেসব নবজাতকদের ওপর চালানো হয়েছে তাদের বয়স ছিল কেবল আট ঘণ্টা থেকে তিন দিন। ফলে প্রাথমিক আচরণের পেছনে সমাজ, সংস্কৃতি বা বাহ্যিক অভিজ্ঞতার কোনো প্রভাব থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
ফলে গবেষকরা বলছেন, এর পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও মায়ের গর্ভে ভিন্ন মাত্রার টেস্টোস্টেরনের সংস্পর্শে আসার মতো জৈবিক কারণগুলোই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর অটিজম রিসার্চ সেন্টারের পিএইচডি গবেষক ও এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ইয়ুমনা খান বলেছেন, “লিঙ্গ পার্থক্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে সক্রিয় ও উত্তপ্ত বিতর্ক হচ্ছে, লিঙ্গ পার্থক্যের পেছনের মূল কারণগুলো কী এবং জীবনের কত কম বয়সে এগুলো দৃশ্যমান হয়?
“আমাদের গবেষণায় যা প্রমাণ মিলেছে, জীবনের একেবারে শুরুতে বা খুব প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত কিছু পার্থক্য ছোট পরিসরে হলেও উপস্থিত থাকে।”
এ গবেষণার কার্যপদ্ধতিতে আট ঘণ্টা থেকে তিন দিন বয়সি নবজাতকদের তাদের মা-বাবা বা সংশ্লিষ্ট অভিভাবকের কোলে নিরাপদে বসিয়ে একটি ল্যাপটপের স্ক্রিন দেখানো হয়েছিল।
স্ক্রিনটিতে পাশাপাশি দুটি ভিডিও চালু করা হয়, যার একদিকে ছিল একজন তরুণীর সচল মুখাবয়ব ও অন্যদিকে ছিল ‘নিউটনের দোলনা’ নামের জনপ্রিয় এক পদার্থবিজ্ঞানের খেলনা।
এসব ভিডিও চলার পুরো সময় জুড়ে বিশেষ এক ‘আই-ট্র্যাকার’ বা দৃষ্টি শনাক্তকারী যন্ত্রের সাহায্যে নিবিড়ভাবে মনিটর করা হয় যে নবজাতকরা ঠিক কোন দিকে ও কীভাবে তাকিয়েছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, নিউটনের দোলনা খেলনার নড়াচড়ার তুলনায় তরুণীর মুখের ভিডিওটির প্রতি উভয় লিঙ্গের শিশুই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা খেলনার চেয়ে মুখের ভিডিওটির প্রতি বেশি সময় মনোযোগ দিয়েছে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘বায়োলজি অফ সেক্স ডিফারেন্সেস’-এ।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর রোসি হাসপাতালে ১৩০ জন নবজাতকের ওপর চালানো পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এ ফলাফল মিলেছে।
গবেষকরা বলছেন, ফলাফলটি ছেলে ও মেয়ে শিশুদের দুটি দলের মধ্যকার গড় পার্থক্যের দিক প্রকাশ করেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তা প্রতিটি ছেলে বা মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে অবিকল একইভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি লিঙ্গের মধ্যেই অনেক বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক মিল লক্ষ্য করা গেছে।
জন্মের সময়ের এসব সামান্য পার্থক্য হয়ত শিশুরা কীভাবে শিখবে ও বেড়ে উঠবে তা নির্ধারণ করে দেয় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু সাধারণ প্রবণতার পেছনে এগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।
যেমন, গড়পড়তা হিসেবে দেখা যায়, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় আগে কথা বলতে শেখে ও কম বয়সে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক দক্ষতাও আয়ত্ত করে।
গবেষক ইয়ুমনা খান বলেছেন, “তারা যদি জন্ম থেকেই সামাজিক বিষয়ের প্রতি বেশি কৌতূহল বা আগ্রহ দেখায় তবে তা হয়ত এসব দক্ষতার বিকাশকে বাড়াতে পারে।”
তবে এটাকে তিনি কেবল একটি অনুমান হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, শিশুরা টডলার বা হাঁটতে শেখার বয়স পর্যন্ত পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ চালালে এই ধারণার পক্ষে আরও জোরালো প্রমাণ মিলতে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর এ গবেষণা দলের আরেকটি বড় প্রশ্ন হল, জন্মের সময় নারী ও পুরুষের মধ্যে থাকা এসব সূক্ষ্ম পার্থক্যের সঙ্গে মানুষের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।
যেমন, পুরুষদের মধ্যে অটিজম ও এডিএইচডি বেশি মাত্রায় দেখা যায়। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা বেশি দেখা যায়।
গবেষক ইয়ুমনা খান বলেছেন, “আমরা যখন জানতে চাই, জীবনের শুরুর দিকে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না ও এ পার্থক্যের কারণ কী তখন এ মূল বিষয়টিই বোঝার চেষ্টা করছি।”
এর আগে, অন্যান্য গবেষণায়ও জন্মের সময় মস্তিষ্কের গঠনে অনুরূপ গড় লিঙ্গগত পার্থক্যের প্রমাণ মিলেছে।
গবেষকদের ধারণা, মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় হরমোনের প্রভাবেই এ পার্থক্য তৈরি হয়, বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে পুরুষ ভ্রূণগুলো যখন নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ মাত্রার টেস্টোস্টেরনের সংস্পর্শে আসে।
