২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

স্মার্টওয়াচের বিভিন্ন রিডিংয়ে কতটা ভরসা রাখবেন বা রাখবেন না

কোম্পানির চটকদার বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে দেখে মনে হতে পারে, স্মার্টওয়াচ বুঝি সায়েন্স ফিকশন সিনেমার কোনো জাদুকরী চিকিৎসাযন্ত্রে পরিণত হতে চলেছে!

স্মার্টওয়াচের বিভিন্ন রিডিংয়ে কতটা ভরসা রাখবেন বা রাখবেন না

স্মার্টওয়াচের পরিমাপ চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট নির্ভুল নয়। ছবি: ম্যাগনিফিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 25 Oct 2026, 12:10 PM

Updated : 25 Oct 2026, 12:10 PM

বর্তমানে স্মার্টওয়াচ ও পরা যায় এমন অন্যান্য গ্যাজেট কেবল কারো হাঁটার পদক্ষেপ বা হৃদকম্পন মাপার মধ্যেই আটকে নেই।

এখন আধুনিক বিভিন্ন ডিভাইস মানুষের ঘুম, ত্বকের তাপমাত্রা, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ও হৃদকম্পনের তারতম্য পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।

ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টের সমস্যা বা ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র মতো বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলেও এগুলো ব্যবহারকারীকে আগেভাগেই সতর্ক করে দিতে পারে।

বড় বড় কোম্পানির চটকদার বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে দেখে মনে হতে পারে, স্মার্টওয়াচটি বুঝি সায়েন্স ফিকশন সিনেমার কোনো জাদুকরী চিকিৎসাযন্ত্রে পরিণত হতে চলেছে!

তবে প্রশ্ন হল, কোনো রোগের প্রাথমিক লক্ষণ বা শারীরিক জটিলতা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এসব গ্যাজেট আসলে কতটা নির্ভরযোগ্য?

কোনো স্মার্টওয়াচ মার্কিন ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা এফডিএ-এর কাছ থেকে নতুন কোনো স্বাস্থ্য-ফিচারের অনুমোদন পেলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমনভাবে ঢোল পেটাতে শুরু করে যেন ডিভাইসটি মানুষের দেহের আদ্যোপান্ত সব বলে দিতে পারে।

যেমন, অ্যাপলের যে কোনো জমকালো ইভেন্টে এমন কিছু গল্প শোনানো যেন বাধ্যতামূলক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দেখানো হয় কীভাবে সর্বশেষ অ্যাপল ওয়াচটি কারো জীবন বাঁচিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনও এই উন্মাদনায় শামিল হয়েছে, যেখানে পরিধানযোগ্যে এ প্রযুক্তিকে নিজের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার ‘অন্যতম চাবিকাঠি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র।

তবে কি পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য-প্রযুক্তির পুরো বিষয়টাই আসলে এক ধরনের অতিরঞ্জিত প্রচারণা বা ধোঁকাবাজি? বিষয়টি কিন্তু পুরোপুরি তেমনও নয়।

কিছু ডিভাইস দেহে বাসা বাঁধা কোনো রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো ধরতে পারে তবে সাধারণত ভেতরের মূল রোগটি আসলে কী তা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করার ক্ষেত্রে স্মার্টওয়াচগুলো এখনও খুব একটা পারদর্শী নয়।

এ ছাড়া, এসব ডিভাইসের সব ফিচার কিন্তু সমানভাবে কার্যকরীও নয়।

আসলে কোন বিষয়গুলো কার্যকর?

পরিধানযোগ্য এসব গ্যাজেট দেহের স্বাভাবিক নিয়মের বাইরের কোনো ব্যতিক্রম বা পরিবর্তন দ্রুত ধরে ফেলতে পারে। এসব অস্বাভাবিক পরিবর্তনই বিষয়টি নিয়ে কাউকে ডাক্তারের সঙ্গে আরও বিস্তারিত পরামর্শ করা উচিত।

একটি ক্ষেত্রে এসব ডিভাইস এরইমধ্যেই এদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে, যেখানে ‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ বা হৃৎপিণ্ডের অনিয়মিত গতি শনাক্ত করতে পারে, যে লক্ষণ স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অ্যাপল ওয়াচ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিভাইসটি যখনই হৃৎপিণ্ডের গতিতে অনিয়মিত পালস বা স্পন্দন শনাক্ত করে সতর্কবার্তা দিয়েছে, এর ৮৪ শতাংশ সময়ই চিকিৎসকদের পরীক্ষায় সেটা ‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

এ সাফল্যের কারণেই এটা এমন এক সীমিত স্মার্টওয়াচ ফিচার, যা অনেক চিকিৎসকই চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ দরকারী বলে মনে করেন। যার কারণ, ‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’-এর সুনির্দিষ্ট শারীরিক লক্ষণ রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর ডিভাইসের পক্ষেও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব।

তবে অন্যান্য ‘উচ্চ নির্ভরযোগ্য’ পরিমাপের কথা বললে সেই তালিকাটি বেশ ছোট। চিকিৎসকেরা সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক টাইমস’কে বলেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একজন মানুষের ঘুমের সাধারণ ধরন ও প্রতিদিনের হাঁটার কদমও বেশ নির্ভরযোগ্য ডেটা।

চিকিৎসাক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে দরকারী বিভিন্ন ফিচার আসলে ব্যতিক্রম মাত্র, কোনো সাধারণ নিয়ম নয়।

অ্যাপল ওয়াচের সীমাবদ্ধতা

স্মার্টওয়াচের অন্যান্য পরিমাপ চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো যথেষ্ট নির্ভুল নয়। যেমন, রক্তচাপের সতর্কবার্তা, ক্যালরি খরচের হিসাব বা ঘুমের বিভিন্ন স্তরের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ।

এসব তথ্যকে চিকিৎসকেরা পদক্ষেপ নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য মনে করেন না। অন্যদিকে, ‘ভিও২ ম্যাক্স’ ও ‘হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি’ কেবল দেহের ফিটনেস ও ধকল কাটিয়ে ওঠার ধারণা দিতে পারে।

এ ছাড়া, অরা’র ‘রেডিনেস স্কোর’ বা ‘হুপ’-এর রিকভারি স্কোরের মতো প্রতিদিনের ওয়েলনেস স্কোরগুলো তাদের নিজস্ব গোপন অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ফলে চিকিৎসকদের কাছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতো খুব বেশি অকাট্য তথ্য থাকে না।

যেসব পরিমাপ তুলনামূলক বেশি নির্ভরযোগ্য, সেগুলোও কখনো কখনো ভুল সংকেত দিতে পারে। যেমন, বিশ্রামের সময় হৃদকম্পনের গতি হঠাৎ বেড়ে যাওয়া কোনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে দেহের লড়াই করার লক্ষণ হতে পারে।

তবে, এর পেছনে আরও সাধারণ কারণও থাকতে পারে, হয়ত আগের রাতে কারো ঘুম ভালো হয়নি বা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি মদ্যপান বা ভারী খাওয়া-দাওয়া করেছিলেন।

আজকের দিনের এসব ডিভাইস দেহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা আঁচ করতে বেশ পটু। তবে সমস্যাটি ঠিক কী বা কী কারণে এটা হচ্ছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলার ক্ষেত্রে এগুলো এখনও বেশ দুর্বল।

ঠিক এ কারণেই চিকিৎসকেরা এসব গ্যাজেটের কোনো একটি নির্দিষ্ট রিডিংয়ের ওপর ভরসা না করে, দীর্ঘদিনের সার্বিক পরিবর্তনের ধারার ওপর বেশি নজর দেন।